ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 
বাংলাদেশের আকাশ

১৯৬৬ সালের ৭ জুন। বাঙালি জাতির মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে এক অনন্য প্রতিবাদি রক্তঝরা দিন। বাঙালি জাতির আত্মত্যাগে ভাস্বর সংগ্রামি এই দিনে আজকের বাংলাদেশে ঘটে এক অনন্য ঐতিহাসিক ঘটনা। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দেশব্যাপী তীব্র গণআন্দোলনের এক ঐতিহাসিক দিন হিসেবে বাঙালির হৃদয় সত্ত্বাতে চিরঞ্জীব হয়ে থাকবে এই ৭ জুন। আজ থেকে প্রায় অর্ধশতাব্দী আগের এই দিনটিতে কী ঘটেছিল আমার এই বদ্বীপে তা জানতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই অগ্নিঝরা আন্দোলনের সময়টিতে।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান স্বাধীন হলেও বাঙালি তার আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার লাভ করতে পারেনি বরং পাকিস্তানি শাসকদের বিরামহীন বঞ্চনার শিকারে পরিণত হয় বাংলার কোটি কোটি জনতা। ভাষা আন্দোলন এবং ৫৪’র যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন বাঙালিদেরকে সাময়িক সুযোগ সৃষ্টি করে দিলেও পাকিস্তানি শাসকদের নগ্ন রাজনৈতিক খেলার দাবার গুটির চাল থেকে তখনো মুক্ত হতে পারেনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান। জনগনের রায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সামরিক জান্তা আইয়ুব খানের ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে পুরো পাকিস্তানের রাজনীতির অঙ্গনে এক নতুন মাত্রা রূপ পায় যা কিনা বাঙালির অত্যাচারের স্টিম রোলারকে আরও বেশি বেগবান করে । ১৯৬৬ সালে এমনি এক উদ্ভুত পরিস্থিতির উপর দাঁড়িয়ে বাঙালি জাতির ত্রাণকর্তা রুপে আবির্ভূত হন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান । জাতির এই ক্রান্তিকালে বঙ্গপিতা ঘোষণা করেন বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ ঐতিহাসিক ছয় দফা।

বাঙালির প্রাণের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর তাসখন্দ চুক্তিকে কেন্দ্র করে ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত সম্মেলনের সাবজেক্ট কমিটিতে ৬ দফা উত্থাপন করেন এবং পরের দিন সম্মেলনের আলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার অনুরোধ জানান। এই সম্মেলন তাসখন্দ চুক্তিকে কেন্দ্র করে হওয়াতে এবং ভারত – পাকিস্তান এর রাজনীতির ক্ষেত্রে এই চুক্তি পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীকে এক হুমকির সম্মুখে ফেলার চিন্তা ভাবনার জায়গা থেকে এই বৈঠকে বঙ্গবন্ধুর এ দাবি আয়োজক পক্ষ প্রত্যাখ্যান করে। তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তানের অংশগ্রহণ আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনকে আরও বেশি সুসংহত করবে এই লক্ষ্য নিয়ে পাঞ্জাবীদের অনুরোধে ইত্তেফাক সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার মধ্যস্থতায় শেখ মুজিব সেই বৈঠকে যোগ দিতে সম্মত হন। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমানের দাবি পেশের ব্যাপারে তিনি রাজি ছিলেন না ফলশ্রুতিতে আমরা দেখি ৬ দফা ঘোষণার পরেও অনেকদিন ইত্তেফাক ৬ দফাকে সমর্থন দেয়নি।

অপরদিকে ৫ তারিখেই নেজামী ইসলাম দলের প্রধান চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর বাসভবনে আওয়ামী লীগ, নেজামে ইসলাম, জামায়াতে ইসলাম ও কাউন্সিল মুসলিম লীগ নেতাদের মিটিং হয়। এখানেই শেখ মুজিব বাঙালির অসহায়ত্বের চিত্র তুলে ধরে স্বায়ত্বশাসনের দাবি সম্বলিত ঐতিহাসিক প্রস্তাবটি উপস্থাপন করেন এবং বিষয়টিকে আলোচ্যসুচীতে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান। কিন্তু সেখানে উপস্থিত পূর্ব পাকিস্তানি অন্যান্য দলের নেতারাসহ পশ্চিম পাকিস্তানের সবাই এটিকে গ্রহণ করতে এমনকি শুনতেও অনীহা প্রকাশ করলে সঙ্গে থাকা ঢাকার পাইয়নিয়ার প্রেস থেকে ছাপা স্বল্প সংখ্যক লিফলেট মিটিং স্থলেই বিলি করেন। সবার বিরোধীতায় শেখ মুজিবের নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ বৈঠক থেকে ওয়াক আউট করে, সম্মেলনের সঙ্গে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে বেরিয়ে আসে । ফলে লাহোরের এই সম্মেলন তার গুরুত্ব হারায় ।

অপরদিকে ভেস্তে যাওয়া লাহোর সম্মেলন নিয়ে শুরু হয় বিরোধী শিবিরের অপপ্রচার। তারা বলতে শুরু করে, লাহোর সম্মেলনকে অকার্যকর করতে শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান সামরিক শাসকের চর হিসেবে কাজ করেছে এমনকি শেখ মুজিব ও আওয়ামীলীগ তার দূতের সাথে সরকারি খরচেই গোপন মিটিং করেছে । ৭ ফেব্রুয়ারি করাচীর ইংরেজী পত্রিকা ‘ডন’ উর্দু পত্রিকা ‘জং’সহ পশ্চিম পাকিস্তানের সকল পত্রিকা এবং ঢাকার পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনেম খানের ‘পয়গাম’সহ অন্যান্য সরকারী পত্রিকায় প্রথম পৃষ্ঠার ব্যানার হেডলাইনে বঙ্গবন্ধুকে ” বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা ” হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। এতে তাঁর জীবন বিপন্ন হলে তিনি সর্বদলীয় কনফারেন্সের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করে করাচীতে সোহরাওয়ার্দীর লাখাম হাউসে আশ্রয় গ্রহণ করেন। সোহরাওয়ার্দীর কন্যা আখতার সোলায়মানও ৬ দফা প্রশ্নে শেখ মুজিবের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। অবশেষে ১১ ফেব্রুয়ারি ’৬৬ (শুক্রবার) ঢাকায় ফিরে এসে বঙ্গবন্ধু বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের কাছে ৬ দফার ব্যাখ্যা করেন।

৬ দফা প্রশ্নে শেখ মুজিবের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে সর্বপ্রথম ১৩ ফেব্রুয়ারি পত্রিকায় বিবৃতি দেন চট্টগ্রামের জেলা আওয়ামী লীগ সম্পাদক এমএ আজিজ। ১৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকার ২১ বিশিষ্ট আইনজীবী পত্রিকায় এক বিবৃতিতে ৬ দফাকে সময়োচিত কর্মসূচী বলে সমর্থন করেন। ২১ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগ কার্যকরী সংসদের এক বিশেষ সভায় বঙ্গবন্ধু ৬-দফা দাবি প্রস্তাবাকারে পেশ করেন এবং তা সর্বসম্মতিক্রমে বাঙালীর মুক্তির সনদ হিসেবে গৃহীত হয়।৬-দফার প্রচারে শেখ মুজিব প্রথম জনসভা করেন চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে ২৫ ফেব্রুয়ারি ’৬৬ শুক্রবার। জহুর আহমদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত লাখো জনতার বিশাল সমাবেশে বঙ্গবন্ধুর প্রস্তাব ৬-দফাকে সমর্থন জানানো হয়। শেখ মুজিব বলেন,” জনগণ শক্তিশালী পাকিস্তান চায়, শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার নয় এবং ছ’দফাই শক্তিশালী পাকিস্তানকে নিশ্চিত করবে।

১৯৬৬ থেকে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত বাঙ্গালির মুক্তির সনদই ছিল সকল আন্দোলন সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু । ১৯৬৬-এর ১ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ৬-দফার পক্ষে জনমত সংগঠিত করার লক্ষে সারা বাংলায় গণসংযোগ শুরু করেন। এ সময় তাঁকে সিলেট, ময়মনসিংহ ও ঢাকায় বারবার গ্রেফতার করা হয়। ১৯৬৬-এর প্রথম তিন মাসে তিনি ৮বার গ্রেফতার হন। ৮ মে নারায়ণগঞ্জ পাটকল শ্রমিকদের জনসভায় বক্তৃতা করার পর তাঁকে আবার গ্রেফতার করা হয়। মুজিবের আটকের প্রতিবাদে এবং ছয় দফার সপক্ষে প্রথম প্রদেশব্যাপী হরতাল পালিত হয় ১৯৬৬ সালের ৭ জুন। দিনটি যাতে পালন করতে না পারে সেজন্য মোনেম খান সবিশেষ তৎপর ছিলেন। পূর্বদিন রাতে বেতার ভাষণে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এমনকি সাম্প্রদায়িকতা, বাঙালি-অবাঙালির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উস্কানি দিয়ে মোনেম খান তাঁর চিরাচরিত ভাষণ দেন। ৬ জুন ছিল প্রাদেশিক পরিষদের বাজেট অধিবেশন। গভর্নর মোনেম খান প্রাদেশিক পরিষদে ভাষণ দিতে গেলে বিরোধী দলের সদস্যরা পরিষদ বর্জন করে হরতালের প্রতি পূর্ণ সমর্থন করেন।

৭ জুন সকাল বেলা লখো শ্রমিকের সমাবেশে তেজগাঁওয়ে যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মনি এক জ্বালাময়ী বক্তৃতা দেন। সভাশেষে এক বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। হঠাৎ পুলিশ মিছিলের ওপর আক্রমণ চালায়। প্রথমে লাঠিপেটা শুরু করলে পুলিশের সঙ্গে জনতার সংঘর্ষ বাঁধে। পুলিশ গুলি চালায়, যার ফলে ৩ জন গুলিবিদ্ধ হয়। এর মধ্যে সিলেটের অধিবাসী বেঙ্গল বেভারেজ কোম্পানির শ্রমিক মনু মিয়া ঘটনাস্থলে নিহত হন। তাঁর লাশ নিয়ে নুরে আলম সিদ্দিকীসহ অন্যরা মিছিল বের করেন। উক্ত ঘটনায় তেজগাঁও শিল্প এলাকায় শ্রমিকরা আরও বিক্ষুব্ধ হয় এবং তেজগাঁও রেল ক্রসিংয়ে দিয়ে উত্তর দিক থেকে আগত ট্রেনটি পথিমধ্যে থামিয়ে দেয়। ট্রেনটি পুনরায় চালাবার চেষ্টা করলে লাইনচ্যুত হয়। এই সময় পুলিশ ও ইপিআর বাহিনী জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার জন্য ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এর মধ্যে একটি গুলি আজাদ এনামেল ও এলুমিনিয়াম ফ্যাক্টরির ছাঁটাইকৃত শ্রমিক নোয়াখালীর আবুল হোসেনের পায়ে বিদ্ধ হয়। আবুল হোসেন উত্তেজিত হয়ে পুলিশকে তার বুকে গুলি চালানোর আহ্বান জানালে পুলিশ তার বক্ষভেদ করে গুলি ছোড়ে এবং আবুল হোসেন শাহাদাতবরণ করেন। এখানে পুলিশের গুলিতে আরও ৫ জন আহত হয়। দুপুর নাগাদ তেজগাঁও থেকে পল্টনমুখী এক জঙ্গি মিছিল পাক মোটরস, হোটেল শাহবাগ, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন হয়ে সেগুনবাগিচার মোড়ে এলে সশস্ত্র পুলিশ বেষ্টনীর সম্মুখীন হয়। ছাত্রনেতৃবৃন্দ কার্জন হল প্রাঙ্গণে সমবেত হওয়ার জন্য মিছিলটিকে আহ্বান জানায়। তখন এক জঙ্গি মিছিল বের হয়।

৭ জুন নারায়ণগঞ্জের শিল্প এলাকার জনগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। কলকারখানা বন্ধ রাখে। জনতা ও রেলওয়ের শ্রমিকদের ওপর হামলা চালালে পুলিশের গুলিতে ৬ জন ঘটনাস্থলে মারা যান। তা সত্ত্বেও শ্রমিক নেতা সাদুর নেতৃত্বে লক্ষাধিক শ্রমিক-জনতা পোস্তগোলা, ডেমরা নারায়ণগঞ্জ থেকে মিছিল নিয়ে যাত্রাবাড়ি পৌঁছলে পুলিশ ও ইপিআর বাহিনীর প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। পল্টনে জনসভা হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু পুলিশ ও ইপিআর বাহিনী এলাকাটি সকাল থেকেই ঘিরে রাখে, যার জন্য জনসভা করা সম্ভব হয়নি। ছয় দফা দাবি প্রতিষ্ঠার প্রথম পর্যায়ের সংগ্রামে সাফল্য ও গৌরবের ইতিহাস রচনা করে তেজগাঁও, পোস্তগোলা, নারায়ণগঞ্জ, ডেমরা, আদমজীনগর শিল্পাঞ্চলের সংগ্রামী শ্রমিকরা।

জনতার এই আন্দোলনকে থামাতে হলে বঙ্গবন্ধুকে বোতলবন্দি ছাড়া আর কোন পথ ছিল না বলে তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে ১৯৬৮ সালের ৩ জানুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনকে হুমকির মধ্যে ফেলা হয় এবং বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখানো হয়। কিন্তু লক্ষ্যে অবিচল থাকা জাতির এ শ্রেষ্ঠ সন্তান কোন ভয়ভীতি বা প্রলোভনের কাছে নিজেকে বিক্রি করে দেননি বরং সাহসী চিত্তে মোকাবেলা করেছেন সবকিছু। কুখ্যাত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা শুরু হবার পর ১৯৬৯ সালে ৫ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানের ৬-দফাসহ ছাত্রদের ১১ দফা দাবি আদায়ের লক্ষে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় এবং ওই পরিষদ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও শেখ মুজিবুর রহমানের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে অভূতপূর্ব সংগ্রামি গণআন্দোলনে গড়ে তোলে।

অপরদিকে বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ৬ দফা দাবির মুখে পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক শাসক আইয়ুব খান বিচলিত হয়ে পড়েন। তিনি হুমকি দিয়ে বলেন, ৬ দফা নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে অস্ত্রের ভাষায় উত্তর দেয়া হবে। নিষ্ঠুর ও নির্বোধ পাক সরকার কঠোর দমননীতির পথ বেছে নেয়। কিন্তু বাঙালিরাও এর জবাব দিতে নিজেদেরকে ততদিনে প্রস্তুত করে ফেলেছে এবং আন্দোলনকে আরও তীব্রতর করে । সরকার ১৪৪ ধারা ও কারফিউ জারি করে। জনগণ তা ভঙ্গ করে রাজপথ দখল করে নেয়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বিচারকার্যে নিয়োজিত প্রধান বিচারপতির বাসভবনে জনতা আগুন লাগিয়ে দেয়। পুলিশ, ইপিআর গুলি চালায় তবুও আন্দোলন থামে না। বহু হতাহতের মধ্য দিয়ে গণঅভ্যুত্থান অদমনীয় হয়ে উঠলে সরকার ১৯৬৯-এর ১ ফেব্রুয়ারি গোলটেবিল বৈঠকের আহ্বান জানান এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হবে বলে ঘোষণা দেন। অসামান্য নেতৃত্বের গুণে গুণান্বিত শেখ মুজিবুর রহমান প্যারোলে মুক্তিদানের প্রস্তাব তাচ্ছিল্যের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেন। অবশেষে গণমানুষের অব্যাহত চাপের মুখে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্যান্যদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ঢাকার রাজপথ জেলের তালা ভেঙ্গেছি শেখ মুজিবকে এনেছি” স্লোগানে প্রকম্পিত হয়। মুক্তি পাবার পরদিনই অর্থাৎ ২৩ ফেব্রুয়ারি, সেদিনের রেসকোর্স ময়দান, আজকের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে, কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে এক বিরোচিত সংবর্ধনা প্রদানের আয়োজন করা হয়। প্রায় ১০ লক্ষ ছাত্র জনতার এই সংবর্ধনা সমাবেশে শেখ মুজিবুর রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

পরবর্তী ইতিহাস আমাদের এই ছয় দফা ভিত্তিক ইতিহাস । ছয় দফা হয়ে উঠে বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির ঠিকানা। ছয় দফার মাধ্যমেইসৃষ্টি হয় ‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ‘৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামীলীগের নিরঙ্কুশ বিজয় মূলত ছয় দফার পক্ষে গণরায়, অগ্নিঝরা ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা,১৯৭১ সালের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পাক হানাদার বাহিনীকে পরাস্ত করে বিজয় অর্জন এবং লাখো শহিদের বিনিময়ে বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় সবই একসূত্রে গাঁথা।