ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

‘হে নারী,
তোকে মহিলা বা রমণী অর্থে বিবেচনা করে নিয়ন্ত্রণ করি আমরা, তাই তোর মুক্তি নেই। তুই আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবি ভোগ্য পণ্য হিসেবে। কিভাবে তোকে ভক্ষণ করবো তা নির্ধারণ করবো আমরা। তোকে কিভাবে , কখন আমি আমার শয্যাসঙ্গী হিসেবে নিব সেটা একান্তই আমার নিজস্ব ব্যাপার। তোর কোন স্বাধীনতা নেই , নেই আমার স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ করার অধিকার। নিজেকে মহলে মহলে বিকিয়ে বেড়ানো নতুন বাজারের এক নতুন পণ্য বলেই তো তোকে আমরা মহিলা বলে ডাকি। আর রমণী কেন বলি সেটা মনে হয় আর নতুন করে বলার কিছু নেই কেননা রমণ জিনিসটাই যে তোর সাথে সংশ্লিষ্ট ।’

কথাগুলো শুনতে কি খুব খারাপ লাগছে আপনাদের ? আমার মনে হয় না। আমি তো খারাপ কিছু বলছি না , আমি আমার পুরুষতান্ত্রিক সমাজের একটু ব্যবচ্ছেদ করছি – মানে পোস্টমর্টেম করছি। যদি আপনাদের কারো খারাপ লেগে থাকে তাহলে আজকের পর থেকে মহিলা বা রমণী না বলে নারী বলে ডাকুন। আপনারা হয়তো ভাবছেন এত কিছু রেখে আমি এই শব্দ চয়ন এর উপর এত জোড় দিচ্ছি কেন! কারণটাও স্পষ্ট , সামাজিক জীবনে মর্যাদা তো দিতে পারেন না অন্তত তাঁকে আহ্বান করার মাধ্যমে হলেও তাঁর প্রাপ্য সম্মানটুকু দিন। মা কে মায়ের সম্মান দিতে যে জাতি জানেনা সেই জাতিকে আমি কিভাবে বলবো অন্য নারীকে সম্মান দিতে? আমি কিভাবে বলবো অন্য নারীকে মা বা বোনের আসনে বসাতে? তাই আমি অত্যন্ত দুঃখিত যে, আমি শুধু শব্দ চয়নের উপরেই জোর দিলাম, কেননা আগে কাগজে কলমে এবং আহবানের মাধ্যমে হলেও অন্তত তাঁর প্রাপ্য আসনে তাঁকে বসান;তারপর না হয় সামাজিক এবং ব্যক্তিগত জীবনে নিজকে পরিবর্তন করে নিবেন !

‘বেলাল্লপনার নিকৃষ্ট উদাহারন ছিল এই মেয়েটি। ধর্ষক ছেলেটির চাইতে মেয়ের চলন বলনই এই ক্ষেত্রে বেশি প্রভাব ফেলেছে। শরীর ভালভাবে ঢেকে না রাখলে ছেলেরা তো নজর দিবেই ব্লা ব্লা ব্লা …।’

আরে নরাধম , পুরুষতান্ত্রিক সমাজকে তাহলে কি নপুংসক করে রাখতে হবে? নাকি নষ্ট সমাজের চোখ উপড়ে ফেলতে হবে? আর আমার মা বোনদেরকে বলছি , আপনারা একটু শক্ত হউন । পুরুষতান্ত্রিক সমাজ আপনাদেরকে অধিকার হাতে তুলে এনে দেবে না বরং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা ছাড়া কখনো আপনি আপনার অধিকার আদায় করতে পারবেন না । নিজেদের অবস্থানকে নিজেরাই দিন দিন দুর্বল করছেন আপনারা । তাই বলছি , রুখে দাঁড়ান এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে । সেই আন্দোলনের সূচনা করুন আপনার ঘর থেকেই । আর সেটা হতে পারে আপনার স্বামী বা আপনার সন্তানের বিরুদ্ধেই । মনে রাখতে হবে আপনার একটি প্রতিবাদ যেমন আপনাকে আপনার মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করতে পারে ঠিক তেমনি লক্ষ কোটি নারী আপনার এই প্রতিবাদকে নিজের চলার পথের শক্তি হিসেবে আমাদের ঐক্যবদ্ধ এই আন্দোলনকে আরও বেশি জোরদার করতে সক্ষম হবে ।

FB_IMG_1504190658005

এবার নজর দেয়া যাক কয়েকদিন আগে ঘটে যাওয়া একটা ধর্ষণের দিকে। এইতো কিছুদিন আগে কিশোরগঞ্জ জেলার অষ্টগ্রাম উপজেলার ৯ বছরের একটি শিশু যে কিনা রঙ্গিন স্বপ্নে নিজের জগতকে নিজের মত করেই সাজানোর কথা সেখানে তারই স্কুলের প্রধান শিক্ষক দ্বারা ভয়ংকর যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এই শিশুটির আর্তনাদ আমাদের বিবেককে শুধু চপেটাঘাতই করেনি বরং চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে মানবিকতার নষ্ট প্রতিচ্ছবি। এই ফুটফুটে শিশুটির কোন নাম নেই কেননা সে আপনার আমার বোন, সন্তান। যাকে নিয়ে তার পরিবার স্বপ্ন দেখেছিলো একটি সুন্দর ভবিষ্যতের। যার সকল দুষ্টামি আহ্লাদ তাদের সব সময় আনন্দে মাতিয়ে রাখত। যার কপালে চুমু খাওয়া ছাড়া বাবা ঘুমাতেও যেতেন না আবার ঘুম থেকে উঠতেনও না। তাই আজ আপনি ঘরে বসে থাকতে পারেন কি না সেটা নির্ভর করবে একান্তই আপনার উপর। কারন আপনার বোনের পালাক্রম নির্যাতনও যদি আপনাকে প্রতিবাদের ভাষা না শিখাতে পারে তবে প্লিয আপনার এই কাপুরুষোচিত নির্লজ্জ মুখ অবয়বটা আর আমাদের দেখাবেন না। কেননা আপনার এই ভয়াবহ কুৎসিত চেহারা দেখতে আমরা অভ্যস্ত নই ।

রুপা একটি ছোট্ট নাম, যে কিনা একজন সচেতন স্বাবলম্বী মেয়ে ছিলেন, কিন্তু আমরা তার নিরাপত্তা দিতে পারিনি। এই দায় একা কারো না, আমাদের সকলের। পরিবার থেকে মেয়েদের বাইরে যেতে বাধা দেয়ার ক্ষেত্রে এই একটি ঘটনাই যথেষ্ট, বাস্তবতা অন্তত তাই বলে। ছোঁয়া পরিবহনের সেই বাসের হেল্পার ড্রাইভার তারা স্বীকারোক্তি দিয়েছে কি বর্বর উপায়ে গণধর্ষণ এর পর তার ঘাড় মটকিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে। বাসে করে একা যাচ্ছিলেন কিন্তু ছোঁয়া পরিবহনের একটি বাসে তাকে গণধর্ষণ করে হত্যা করে বনের মধ্যে ফেলে দেয়া হয়! আপনি নিজের বোনকে দিয়ে একবার ভাবুন, স্থির কি থাকতে পারছেন? আমি জানি, এরা বিচারিক আদালতে গিয়ে জামিন পাবে যেমন অষ্টগ্রামের সেই প্রধান শিক্ষক জামিনে মুক্ত হয়েছে গত দুইদিন আগে। এই দেশের আইন, বিচার ব্যবস্থা একটা ধর্ষক নরপিশাচকে শাস্তি দিতে পারেনি এর চাইতে লজ্জা আর কি হতে পারে?

ধর্ষণের কোন ঘটনা যখন সামনে আসে তখন সেটার বিচারের দাবীতে আমরা রাস্তায় নামি, প্রশাসনকে বাধ্য করানো হয় অপরাধীদের গ্রেফতার করতে। অপরাধীরাও যথারীতি গ্রেফতার হয় কিন্তু বিচারে গিয়ে আমরা দেখি তারা জামিনে মুক্ত হয়ে যায়। এই অবস্থা উত্তরণের জন্য স্পেসিফিক একটা ঘটনা নিয়ে কাজ করলে হবেনা বরং সার্বিকভাবে আইন সংশোধন ও সামাজিক আন্দোলন জরুরি।

এরই প্রেক্ষিতে আমরা শিক্ষার্থীদের নিয়ে যৌন নিপীড়নবিরোধী নির্দলীয় ছাত্রজোট গঠন করেছি। দেশব্যাপী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নারী নিপীড়ন ধর্ষণের বিরুদ্ধে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন “জাগো মানুষ, জাগো বহ্নিশিখা” পরিচালিত করছি। আমাদের সুনির্দিষ্ট ৪টি দাবী রয়েছে যে দাবীগুলোর প্রেক্ষিতে আমরা এই সামাজিক আন্দোলন পরিচালিত করছি। দাবীগুলো নিম্নরূপ
১. বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা কাটিয়ে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা।
২. ধর্ষকের একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের আইনি বিধান নিশ্চিত করা।
৩. ১৫৫ (৪) সংশোধন, ধর্ষিতাকে নয় বরং ধর্ষককে জেরা করতে হবে।
৪. স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নারী সেল গঠনের মাধ্যমে নিপীড়িত নারীর সব ধরনের পরিচয় গোপন রেখে তার জন্য সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

শুধু তাই না যৌন নিপীড়নবিরোধী নির্দলীয় ছাত্র জোট-এর পক্ষ থেকে নারী নিপীড়নবিরোধী একটি সেল গঠন করা হয়েছে, যেখানে নির্যাতন নিপীড়নের শিকার নারীদের দেয়া হবে সব ধরনের সহায়তা। যে নারী নির্যাতনের শিকার হয়ে পুলিশের কাছে গিয়েও মামলা করতে পারছেন না অথবা স্থানীয় প্রভাবশালীর কারণে মামলা করতে ভয় পাচ্ছেন কিংবা বখাটেদের উৎপাতের কারণে দুঃসহ জীবন যাপন করছেন, সেই নিপীড়িত নারীদের সহায়তা দেবে তারা। এই নাম্বারে( ০১৭৭৮০২৪৬২৪) একটি কল দিলেই তাদের কর্মীরা পৌঁছে যাবে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে।

সবশেষে আসুন না আমরা সবাই মিলে একটু ধর্ষণ করি! আরে লজ্জা পাচ্ছেন নাকি আমার কথা শুনে ? প্রতিনিয়ত যে কাজটি আপনাকে লজ্জায় ফেলে না বরং পরোক্ষ সমর্থন দিন কখনো পোশাকের প্রশ্ন তুলে আবার কখনোবা চলনের কথা বলে, তা আজ সেই আপনি হঠাৎ এই কথাটি শুনে লজ্জা পেয়ে গেলেন!অনেকেই তো এই কাজটি সাবলীলভাবে করে যাচ্ছেন তাহলে আজ সমস্যার তো কিছু নেই । আর যদি এটা নাই করতে চান তাহলে আসুন না ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করি যার যার অবস্থান থেকে। নাকি এখানেও নিরপেক্ষ থেকে নিজেকে এক শ্রেণীজাত প্রমাণ করতে চান ! আপনার ইচ্ছা , আপনি যা চাইবেন তাই হবে। তবে একটি কথা মনে রাখবেন, এখানে নিরপেক্ষতার কোন স্থান নেই। এখানে বলতে পারবেন না যে ‘আমিও ধর্ষকের বিচার চাই তবে, কিন্তু , আন্তর্জাতিক মান’। এখানে আপনাকে স্পষ্ট করেই বলতে হবে ‘ধর্ষিতার কণ্ঠই আমার কণ্ঠ , ধর্ষিতার চিৎকারই আমার আর্তনাদ, আমার প্রসববেদনা!’