ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

একই ঘটনা, একই চিত্রনাট্য শুধু নাম ভূমিকায় ছাত্রলীগের জায়গায় ছিলো ছাত্রদল, ফয়েজের জায়গায় আখতারুজ্জামান। গতকাল যে ন্যাক্কারজনক ঘটনার সাক্ষী হলো বাংলাদেশ তা বহু বছর আগের ঘটনার সাথে হুবুহু মিলে গেলো। ২০০৫ সালের সেই কালো অধ্যায় আমরা ভুলিনি, ভোলা সম্ভব নয়।

.

এবার আসুন শিক্ষার্থী লাঞ্ছনা ইস্যুতে ছাত্রলীগের যুক্তিগুলো একটু খণ্ডন করা যাক এবং ভিসির এই অল্প ক’দিনের অপকর্মগুলোতেও একটু চোখ বুলানো যাক। তথাকথিত ছাত্রলীগের যুক্তিগুলো এক করলে যে সারমর্ম পাওয়া যায় তা হলো–

১। ভিসি পিতাসম, আর তাই ভিসিকে উদ্ধার করতে তারা সেখানে গিয়েছিলো।

এটার আলোচনায় আসলে প্রথমেই বলতে হয় ভিসি অবরুদ্ধ থাকলে আপনারা কে তাকে উদ্ধার করার? দেশে আইন-শৃংখলা বাহিনী আছে, তারা সেখানে দায়িত্ব পালন করবে, আপনারা না। আপনাদের দায়িত্ব না অবরুদ্ধ ভিসিকে উদ্ধার করা। এভাবে যদি দায়িত্ব নিতে চান তবে বিজিবি আর্মির দায়িত্বগুলোও কি ভবিষ্যতে নিজেরাই নেবেন?

২। দ্বিতীয়ত, ছাত্রলীগও সেখানে মার খেয়েছে।

উত্তরে পাল্টা প্রশ্ন থাকবে, কেন? তারা প্রথম থেকেই কেন সেখানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের বিরুদ্ধে? ইদানিংকালে যতো আন্দোলন ঢাবিতে বা শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবির জন্য হয়েছে প্রতিটি আন্দোলনে কেন তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। আজ কেনো তারা সেখানে মার খাবে? প্রশাসনের হাতে সব শিক্ষার্থী যেখানে মার খাবার কথা সেখানে প্রশাসনের ভূমিকা কেন নিলো ছাত্রলীগ? প্রশাসন আজকে যদি এখানে আক্রমণ করতো তবে প্রশাসনের কিছু লোক আহত হতোই, এটাই নিয়ম এবং সেখানেও তাই হয়েছে। ছাত্রলীগের সেখানে যাবারই তো কথা না, গেলেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে থাকার কথা। যখনি এই আন্দোলনের বিরুদ্ধে গিয়ে ছাত্রলীগ সেখানে অবস্থান নিয়েছে তখনি ছাত্রলীগের উপস্থিতি সেখানে বৈধতা হারিয়েছে। সুতরাং ক্যাডার বাহিনী দিয়ে সেখানে আক্রমণ ঘটিয়ে নিজেরাও ব্যাণ্ডেজ মেরে দেবেন শরীরে এই নাটক সবাই বুঝে। গোটা মিডিয়ার আজকের রিপোর্ট গুলো দেখে নেবেন আমার ছাত্রলীগ ভাইয়েরা। আপনারা তো প্রথম আলো বলেন শত্রু, আজকে সব আলোই দেখবেন আপনাদের কতো সুনাম করেছে!

.

৩। তৃতীয় যুক্তি, এই আন্দোলন সাধারণ শিক্ষার্থীদের না, বাম-শিবির-ছাত্রদলের।

বহু পুরোনো যুক্তি, নতুন বোতলে পুরোনো মদ। যেকোন আন্দোলন, ন্যায্য দাবির পক্ষে যারাই দাঁড়াবে তাদেরকেই জামাতশিবির-ছাত্রদল আখ্যা দেয়া পুরানো ট্রেন্ড। একটা ঘটনা মনে করাই, ভ্যাট বিরোধী আন্দোলনে এই ছাত্রলীগ কি করেছিলো মনে আছে কি? এমন কোন হীন কাজ নেই তারা করে নাই, শেষ পর্যন্ত আমরা যারা এই ভ্যাটের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি তাদেরকেও বিএনপি-জামাত-বাম এসব ট্যাগ দেয়া হয়েছে। পুরো অনলাইনে এই আন্দোলনকে শিবির এবং ছাত্রদলের আন্দোলন হিসেবে তারা প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছে। কিন্তু অবাক হলেও সত্য, অবশেষে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মানে এই ছাত্রলীগ আর তথাকথিত লীগের ভাষায় এই শিবির-ছাত্রদল এর দাবি মেনে নিয়েছিলো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী! তাই এখনের আন্দোলনও সেম কথা তারা বলবে এবং বলছেও।

এই যুক্তিগুলো সেম ২০০৫ সালের যুক্তি। ছাত্রদলের হায়েনারা হামলে পরেছিল সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর এবং ঠিক এই যুক্তিগুলোই দিচ্ছিলো যা আজ ছাত্রলীগ দিচ্ছে। এখন আপনি অস্ত্র তাদের হাতে তুলে দিয়ে বলবেন কেন তারা অস্ত্র হাতে নিলো তা কি হবে? শিক্ষার্থীদের প্রতিটি ন্যায্য দাবির আন্দোলনে ছাত্রলীগ তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এই আন্দোলনের শুরুতেই এক দফা নারীর উপর নিপীড়ন ঘটিয়েছে ছাত্রলীগ, আর কাল আরেক দফা লজ্জাজনক অধ্যায়ের সূচনা করলো।

 


এবার আসি এই অযোগ্য ভিসি ও প্রক্টরের দিকে। তার অপকর্মের লিস্ট দিলে এই কদিনেই তা অনেক দীর্ঘ হয়ে যায়।

১। পাকিস্তান সরকার আমাদের ঘায়েল করার জন্য প্রথম আঘাত হানে আমাদের সাহিত্য সংস্কৃতি, ভাষার উপর। আমরা দেখতে পাই এই ভিসি আসার পর আঘাত আসে টিএসসি’র উপর। সামনের সব দোকান বন্ধ করে দেয়া, টিএসসি রাত ৮টার পর বন্ধ এসব সিদ্ধান্ত অন্তত আওয়ামী লীগ এর আমলে হবে এটা মানা কষ্টের এবং অবাক করার বিষয়। কারণ লীগ তো এই রাজনীতিতে বিশ্বাসী না, প্রগতির নিভু নিভু আলোটা এখনো জ্বালানোর স্বপ্ন দেখি শেখ হাসিনা আছে বলেই। তবে কেনো এইরকম মধ্যযুগীয় চিন্তার ভিসি আসবে আমার ক্যাম্পাসে?

২। সাধারণ শিক্ষার্থীরা খুব সিম্পল কয়েকটি দাবি নিয়ে রাস্তায় আসে যা প্রথম দিনেই সমাধান সম্ভব ছিলো, কিন্তু সেখানে এই সহজ বিষয়টাকে যতোভাবে পারা যায় ঘোলাটে করা হয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের নামে প্রক্টর মামলা দিয়েছে। কেনো? কি কারণে মামলা দিলেন? অবশেষে দাবি মানলেন কিন্তু মামলা কেন উইথড্র করলেন না? তাই শিক্ষার্থীরা আবারো ভিসি কার্যালয় ঘেরাও এর জন্য আসলো। তারা যখন রওনা দিয়েছে ভিসি কেন রাস্তায় নেমে এসে তাদের কাতারে যোগ দেননি? কেনো বলেননি ২৪ ঘন্টার মধ্যে মামলা প্রত্যাহার করছি। আপনি তিন তালা কেচি গেট মেরে বসে রয়েছেন উপরে। এটা একজন ভিসির অদক্ষতা, অযোগ্যতার ভয়াবহ রূপ প্রকাশিত হয়। আপনি তাদের সাথে যোগ দিয়ে তাদের বক্তব্যগুলোর সাথে একমত পোষণ করলেই সব সমস্যা সমাধান হয়ে যায় কিন্তু আপনি তা করেন নাই বরং তাদের উপর ক্যাডার বাহিনী লেলিয়ে দিয়েছেন। এটা ভুল, মারাত্মক ভুল।

৩। প্রক্টরের বিষয় কি বলবো, কয়েকদিন আগে আরেক শিক্ষককে ভরা হাউজে শারিরিক আক্রমণ করে এই প্রক্টর। শিক্ষার্থীদের নামে মামলা দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি উলটো থ্রেট অব্যাহত, মামলাও সরায়নি।

৪। আরেকটি অদক্ষতার প্রমাণ হলো কালকের ঘটনার ক্ষেত্রে উনার ভূমিকা। ভিসি যদি মনে করেন তিনি অবরুদ্ধ তবে উনি নিশ্চয়ই প্রশাসনকে ইনফর্ম করবেন, ছাত্রলীগকে না। নাকি ভিসি ছাত্রলীগকেই ফোন করেছিলো? যদি ছাত্রলীগকে ফোন করে থাকে তবে বলতে হবে দেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি ভিসির আস্থা নেই বরং ঢের আস্থা ছাত্রলীগের প্রতি। তাই ক্যাম্পাসে আর সাধারণ শিক্ষার্থীদের কি দরকার লীগই থাকুক।

 

.

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, অযোগ্য এই ভিসির পদত্যাগ না হলে সমস্যা আরো জটিল হবে। আমরা আরেফিন স্যারকে দেখেছি কতো চমতকারভাবে সমস্যা হ্যাণ্ডল করতেন। অথচ এই ভিসি একের পর এক ইস্যু তুলে দিচ্ছেন বিরোধী শিবিরে। আবারো বলছি এই ভিসি থাকলে আখেরে ক্ষতি লীগেরই হবে। কারণ কোন সমস্যার সমাধান এই ভিসি দিতে পারবেন না। গতকালের ঘটনা এই ভিসি বাড়িয়েছে এবং সেখানে প্রশাসনকে না এনে ছাত্রলীগকে নামিয়ে পুরো ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে বিরোধী শিবিরে অস্ত্র তুলে দিয়েছে। ছাত্রলীগ ভিসি স্যারকে উদ্ধার করে সরকারের সুনাম বাড়িয়েছে কি খুব? বরং ঢের দুর্নাম হয়েছে। উদ্ধারের নামে সেখানে যা হয়েছে তা কোন জায়গাতেই সরকারের অবস্থান মজবুত করবে না।

এই ভিসি আসার পর থেকে শুধুমাত্র ভিসি এবং প্রক্টরের ভুলের কারণে একের পর এক সমস্যা দাঁড়াচ্ছে এবং তা বড় হচ্ছে। এই ভিসি কে না সরালে সামনে আরো ভয়াবহ সময় আসবে। এভাবে একের পর এক ঘটনার জন্ম দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্ষেপালে ফল কিন্তু ভালো হবেনা! তাই দলের জন্য, সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য সর্বোপরি সবার ভালোর জন্য এই ভিসির অপসারণ সময়ের দাবি। কারণ সময় খুব অল্প, সামনে নির্বাচন। ঢাবিকে উত্তপ্ত করে পুরো দেশকে অস্থিতিশীল করার নীল নকশা বাইরের কেউ করবে না বরং আপনার দলের লোকেরাই করবে যেমন করে আপনার অজান্তে উপ-কমিটিতে বিএনপি-জামাতের স্থান দিয়েছে।