ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

 

ঢাকা শহরে বাড়ি ভাড়ার সঙ্গে ‘লাগামহীন, আকাশছোঁয়া, আকাশচুম্বী’ প্রভৃতি শব্দগুলো স্বাভাবিকভাবেই চলে আসে। একই সঙ্গে চলে আসে বাড়ি ভাড়া প্রসঙ্গ। সম্প্রতি কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) তার এক সমীক্ষায় বলেছে, গত ১০ বছরে ১৫ শতাংশ হারে বাড়ি ভাড়া বেড়েছে। বাড়ি ভাড়া ব্যবসা যখন তুঙ্গে, তখন বিনিয়োগও বাড়ছে এখানে। ফলে গোটা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এক নতুন দিকে মোড় নিয়েছে। এখন বাড়ি ভাড়াকে হাইলাইটস করে সে বিষয়টিই ব্যাখ্যা করা যাক। বলা হয় ঢাকায় টাকা উড়ে। আর সে টাকার ভাগ নিতে এখানে মানুষ আসে। গবেষকরা দেখাচ্ছেন ঢাকামুখী মানুষের স্রোত প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ১৩৬ জন। ঢাকা বিশ্বের ২৫টি মেগাসিটির মধ্যে ১৯তম, উইকিপিডিয়া বলছে, এখানে লোকসংখ্যা ১ কোটি ৪০ লাখ। ঢাকা শহরে যেমন প্রতিদিন মানুষ বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে এখানকার বাড়ি ভাড়া। এই দুই বাড়াবাড়ির কোনোটিই কিন্তু সীমার মধ্যে নেই। এখানে যার মাসিক আয় ২৫-৩০ হাজার টাকা, তাকে বাসা ভাড়া বাবদ ব্যয় করতে হয় ১৫-১৮ হাজার। যার আয় ১৮-২৫ হাজার তার বাসা ভাড়া ১০-১৫ হাজার। আর যার আয় ৮-১২ হাজার তাকে বাসা ভাড়া দিতে হচ্ছে ৩-৫ হাজার টাকা। এগুলো নিয়ে আবার গবেষণাও হয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের আওতাধীন নগর গবেষণা কেন্দ্র জরিপ করে বলছে, ঢাকার ৭০ শতাংশ মানুষ উপার্জনের ৬০ শতাংশ অর্থ ব্যয় করে বাড়ি ভাড়া বাবদ। বাকি ৪০ শতাংশ অর্থ দিয়ে তাদের পুরো মাসের বাজার, পোশাক-পরিচ্ছদ, যাতায়াত, চিকিত্সা এবং সন্তানদের পড়াশোনার খরচ মেটান।

ঢাকার মানুষেরা আয়ের এ অধিকাংশ খরচ করেও যে খুব ভালো আছে তাও নয়। তাদের দুর্ভোগের চিত্রও দেখিয়েছে ক্যাব। জরিপ করে বলছে— পানি, বিদ্যুত্, গ্যাস নিয়ে বাড়িমালিকদের সঙ্গে ভাড়াটের নিয়মিত ঝগড়া হয়। বাড়ি ভাড়া নিয়েও ভাড়াটের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন বাড়িমালিক। ক্যাব আরও দেখাচ্ছে, প্রতিনিয়ত বাড়ি পরিবর্তন করেন ভাড়াটেরা, ১-৫ বছর একই বাড়িতে থেকেছে ৭৯ শতাংশ। ৫-১০ বছর থেকেছে ১৫ শতাংশ, আর এর বেশি সময় থেকেছেন মাত্র ৬ শতাংশ ভাড়াটে।

ক্যাবের হিসাব ধরলেও আমরা দেখছি প্রতি ছয় বছরে বাড়ি ভাড়া বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। অনেকে বলছেন, গত ১৫ বছরে বাড়ি ভাড়া বেড়েছে তিন গুণ। বাড়ি ভাড়ার এ চিত্র আমাদের এক অনির্দিষ্ট অর্থনীতির দিকে ধাবিত করছে। যেটা আগেই বলা হয়েছে। টাকাওয়ালারা বিনিয়োগ করছেন এখানেই। কারণ এখানে তার ব্যবসায় লাভ অন্য খাতে বিনিয়োগের চেয়ে বেশি। ফলে আমরা দেখছি, ঢাকা শহরে হাজার রিয়েল এস্টেট কোম্পানি গড়ে উঠেছে। তারা জমজমাট ব্যবসা করছে। অনেকে আবার বাড়ি করে ফ্ল্যাট বিক্রি করছেন। অনেকে বাড়ি করে ভাড়া উঠাচ্ছেন। এভাবে ঢাকা শহরে যার একটা বাড়ি আছে সে আরও বাড়ি বানায়। আরও ফ্ল্যাট চায়।

এটা স্বাস্থ্যকর অর্থনীতির চিত্র হতে পারে না। কারণ বাড়ি ভাড়া সংক্রান্ত যত বিষয় আছে, সবই অর্থনীতির ভাষায় সার্ভিস সেক্টর বা সেবা খাত। এর বিপরীতে রয়েছে উত্পাদন। সেবা খাতে বিনিয়োগ যত কমবে অর্থনীতির জন্য ততই মঙ্গল। দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে উত্পাদনে বিনিয়োগ আবশ্যক। আমাদের পুঁজিপতিরা নতুন নতুন উত্পাদনে কমই বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। এখানে টাকা খাটিয়ে তিনি যে লাভ পাচ্ছেন, উত্পাদন খাতে ব্যয় করে সেটা পাচ্ছেন না। অবশ্য আমাদের সেবা খাতে বিনিয়োগ বা সেবা খাতে কাজ করতে কেবল পুঁজিপতিরাই আগ্রহী তা নয়, সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখছি মধ্যবিত্ত কিংবা দরিদ্র শ্রেণীর অধিকাংশ সেবা খাতেই কাজ করছেন। ঢাকা শহরে মোবাইল ফোনের ফ্লেক্সিলোডের দোকানের সংখ্যা দেখা যাক। কিংবা ছোট টং ঘরে চা-বিস্কুট বিক্রেতার সংখ্যা কত অথবা হেঁটে চা বিক্রি করে কত মানুষ জীবন-যাপন করছে? এদের সংখ্যা হিসাব করলেই আমাদের সেবা খাতে কত মানুষ আছে তা সহজেই বের করা সম্ভব।

আবার একই সঙ্গে আমরা ক্যাবের হিসাবে দেখছি, ৭০ শতাংশ মানুষই আয়ের ৬০ শতাংশ খরচ করছে বাড়ি ভাড়ার পেছনে। তারা এখানে খরচ কমিয়ে সেটি কোনো উত্পাদনমূলক কাজে ব্যবহার করতে পারত। এখন ঢাকা শহরে অহরহ যেটা দেখা যায়, মধ্যবিত্ত শ্রেণী, সে যত কষ্টেই থাকুক; তার বাড়ি ভাড়ার অবস্থা দেখে প্রথমেই একটা বাড়ি করার চেষ্টায় থাকে। অন্য কোনো খাতে বিনিয়োগের চেয়ে এ খাতকেই সে প্রাধান্য দেয়। বাড়ি ভাড়া বেশি না হলে হয়তো এ প্রবণতা থাকত না।

আমরা আরও দেখছি, এর ফলে ধনী-গরিবের ব্যবধান বাড়ছে। এ ব্যবস্থায় যে ধনী সে দিন দিন ধনী হচ্ছে, আর গরিব আরও গরিব হচ্ছে। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ঢাকা শহরের জনসংখ্যার মাত্র ২ শতাংশ উচ্চবিত্ত ব্যবহার করেন এ শহরের ১৫ শতাংশ জমি। মধ্যবিত্তের ২৪ শতাংশ ব্যবহার করেন ৬৫ শতাংশ আর নিম্নবিত্ত ৭০ শতাংশ মানুষ ব্যবহার করেন ২০ শতাংশ জমি। শেষোক্তদের সংখ্যা হবে বর্তমানে ৩০ লাখের মতো। নিম্নবিত্ত ও বস্তিবাসীদের বসবাসের এলাকার প্রতি মাইলে জনবসতির ঘনত্ব সাড়ে ৩ হাজারেরও বেশি। মধ্যবিত্ত এলাকায় ঘনত্ব প্রতি একরে ৪০০। আর উচ্চবিত্তের এলাকায় এ সংখ্যা ১০০ থেকে ১৫০।

দেশে বাড়ি ভাড়া আইন ১৯৯১ কার্যকর রয়েছে। সেটা যে মানা হচ্ছে না, সে কথা নাইবা বললাম। বাড়ি ভাড়া নিয়ে বাড়িমালিকদের এসব নৈরাজ্যের পর, কর্তৃপক্ষের দর্শকসুলভ দৃষ্টিভঙ্গির কথাও বাদ দিচ্ছি, আর অর্থনীতি আসলেই কোন দিকে যাচ্ছে, তা বলার পাটাতনও নেই। শুধু একটা প্রশ্নই করছি— আসলে হচ্ছেটা কী?