ক্যাটেগরিঃ কৃষি, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

01_Paddy_Rice_Harvest_140515_0022

বর্তমানে বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি দেশ। আমাদের খাদ্যের এত পরিমান সংগ্রহ রয়েছে যে অন্তত কারো না খেয়ে মরতে হবেনা, দুর্ভিক্ষ আসার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এটা সম্ভব হয়েছে কাদের জন্য?
আমার ধারণা কৃষকদের জন্য! অবশ্য বিদেশ থেকেও চাল সহ অনেক খাদ্য আমদানি করে রিজার্ভ করা হয়েছে বা হচ্ছে। তবে এটার সিংহভাগ আসছে কৃষকদের কাছ থেকে! এখন প্রশ্ন হচ্ছে কৃষকরা কি আদৌ তাদের নায্যমুল্য পাচ্ছে?

আমাদের দেশের প্রধান চাষ হলো ধানচাষ। আসেন এই চাষের একটা হিসাব করি তাহলে কৃষকের লাভ ক্ষতি বের হয়ে আসবে। অধিকাংশ জমিতে ইরি এবং আমন ধানের চাষ করা হয়। আমি ইরি ধানের একটা হিসাব করেছি, কারন আমি নিজে একবার এক বিঘা ইরি ধান করেছিলাম। আমাদের এলাকায় এক বিঘা ( ৩৩ শতক ) জমিতে ধান চাষ করলে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যে টাকা কৃষকের খরচ হয় তার একটা হিসাব দিচ্ছি। আমার মনে হয় অন্যান্য এলাকাতেও এই হিসাবের খুব বেশি পার্থক্য হবে না।

– জৈব সার ১০০০ টাকা ( যদি কিনে ফেলানো হয়, নিজের থাকলে শুধু বহন খরচ দিলে হবে )
– জমি চাষ ১২০০ টাকা।
– ধানের চারা ( পাতা ) ৮০০ টাকা।
– সার খরচ ৩০০০ টাকা।
– নিড়ানি খরচ ৮০০ টাকা।
– গভীর নলকুপের পানি খরচ ৩০০০ টাকা ( যাদের তেলের মেশিনে পানি নিতে হয় তাদের ৫০০০ টাকা লাগবে )
– ধান কাটা ১২০০ টাকা।
– বাড়িতে ধান আনতে খরচ ৬০০ টাকা।
– ধান ঝাড়া ১০০০ টাকা।

সর্বমোট ১২৬০০ টাকা।

আমি লিখে দিতে পারি এর থেকে বেশি ছাড়া এক টাকাও কম খরচ হবেনা। এবার প্রাপ্ত আয়ের একটা হিসাব করি। এক বিঘা জমিতে খুব ভাল ধান হলে ১৮ থেকে ২০ মন ধান হয়। আমি এভারেজে ১৯ মন ধান ধরলাম।
আমাদের এলাকায় ( যশোরে ) প্রথম দিকে মিনিকেট ধান বিক্রি হয়েছে সর্বোচ্চ ৭০০ টাকা ( কৃষকরা পেয়েছে এইদাম )। এখন সেই ধানের দাম ৬২০ টাকা থেকে ৬৭০ টাকা। আমি এভারেজে ৬৫০ টাকা ধরলাম।

তাহলে ধান থেকে মোট আয় ৬৫০*১৯=১২৩৫০ টাকা। আর যে খড় হয় তার হিসাব করলে সর্বোচ্চ ১০০০ টাকা পাওয়া গেছে এইবার। তাহলে এক বিঘা জমির মোট আয় ১৩৩৫০ টাকা। এখন যদি খরচ বাদ দিই তাহলে থাকছে ১৩৩৫০-১২৬০০=৭৫০ টাকা।

আসুন একটু হেসে নিই! হা হা হা! এত কষ্ট করে ধান করে, এত টাকা ইনভেস্ট করে ছয়মাস পরিশ্রম করে লাভ মাত্র ৭৫০ টাকা! এইবার যাদের ব্যক্তিগত কোন জমি নেই তারা বর্গা করলে তিনভাগের একভাগ দিয়ে দিতে হয় জমির মালিককে!  তাহলে তার হিসাব করলে করলে দাঁড়ায় –

মোট লাভ = ১৩৩৫০-(১৩৩৫০/৩) =১৩৩৫০-৪৪৫০ =৮৯০০-৩৩৩(খড়) =৮৫৬৭ টাকা।

মোটলাভ – মোট খরচ=নিট লাভ =৮৫৬৭-১২৬০০ =-৪০৩৩

অতএব উক্ত অংক করে আমরা পেলাম যারা বর্গা ধান করে তাদের নিট লসের পরিমান ৪০৩৩ টাকা।

এখন হয়তো আপনারা প্রশ্ন করতেই পারেন, তাহলে ওরা কেন ধানের চাষ করছে? আসল কথা হচ্ছে ওরা বাপ-দাদার আমল থেকেই চাষী, আপনার-আমার মত ওদের পক্ষে চাকরি কিংবা ব্যবসা করা সম্ভব না। লাভ হোক লস হোক ওদের কৃষি কাজ করতেই হবে। এই কাজ করতে ওরা প্রায় বাধ্য।

তবে আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে আমি মোট যে খরচ দেখিয়েছি, তারা সেগুলো একবারে খরচ করে না। বরং আস্তে আস্তে খরচ করে এবং ওই খরচের একটা অংশ সে নিজের পরিশ্রম দিয়ে বাঁচায়! কিন্তু ব্যবসায়িক হিসাব করলে আপনি কোনভাবেই এই হিসাব এড়াতে পারবেন বলে আমার মনে হয়না। একটা কৃষিনির্ভর দেশে কৃষকদের এমন অবস্থা দেখতে হবে ভাবতেই অবাক লাগে।

তবে আমাদের কৃষকরা এখন একটা শান্তনা নিয়ে বেঁচে আছে যে অন্তত তাদের এখন আর সারের জন্য লাইন দিয়ে দাঁড়াতে হয়না, অথবা সারাদিন লাইনে দাঁড়িয়ে বিকালে সার না নিয়ে ফিরতে হয়না। পানির জন্য আন্দোলন করে তাদের এখন আর জীবন দিতে হয়না। সত্যিই আমার বড্ড আফসোস হয় এদের নিয়ে। কৃষকের পেটে লাথি মেরে এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ আমাদের বাংলাদেশ।