ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

পৃথিবীর সব ভাষাকে ভালো না বাসলেও মাতৃভাষাকে সবাই ভালোবাসে। তবে আমাদের ক্ষেত্রে কথাটি আমি জোর দিয়ে বলতে পারছি না। কারণ, এমন অনেক মানুষকে আমি জানি যারা কথায় ইংরেজি বলতে গর্ববোধ করেন। তাদের ভাব দেখে মনে হয় ইংরেজিতে কথা বলে তারা নিজেদেরকে ‘শিক্ষিত’ প্রমাণ করতে চান! তারা হয়তো এটা ভুলে যান যে ইংরেজি শুধুই একটি ভাষা, এটা দ্বারা কারো শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রমাণ হয় না। কারণ, যাদের মাতৃভাষা ইংরেজি তাদের ছয় বছরের একটা বাচ্চাও আমাদের তথাকথিত শিক্ষিত মানুষগুলোর চেয়ে ভালো ইংরেজি বলতে পারবে।

বাংলাকে যে আমরা অবহেলা করি তা স্কুল-মাদ্রাসার কিছু শিক্ষার্থীকে দেখলেও বোঝা যায়। এই শিক্ষার্থীরা সারা বছর যাদু-মন্ত্রের মত ইংরেজি ও অন্যান্য বিষয় মুখস্ত করে। বাংলাকে তারা হিসেবের বাইরে রাখে। যখন পরীক্ষা ঘনিয়ে আসে তখন সামান্য সময়ের জন্য তারা বাংলাকে একটু-আধটু পড়ার চেষ্টা করে। প্রতি বছর বোর্ড পরীক্ষাগুলোতে বাংলায় ফেল করা শিক্ষার্থীরাই এর প্রমাণ। আর বাংলায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা তো একেবারেই নগণ্য।

বাংলাকে যে আমরা কি পরিমাণ গুরুত্বহীন ভাবি তার সাক্ষী আমি নিজে। আমি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের একজন ছাত্র। কেউ যখন আমাকে জিজ্ঞেস করে, ‘কোন বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করছো?’ তখন আমি বাংলার কথা বললে তারা আমার দিকে এমন ভাবে তাকায় যেন আমি কোন জেল পলাতক আসামি! তাদের ভাবখানা এমন যে, বাংলা কি পড়ার মত একটা বিষয় হলো?

 

 

প্রতিবছর আমরা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করি। বলতে লজ্জা হচ্ছে যে, বাংলা ভাষার শহীদদের স্মরণে আমাদের ভাষা প্রেমিকরা মাইকে হিন্দি গান বাজায়। আহা! কতই না ভালোবাসি আমরা বাংলাকে!

প্রভাতফেরি আর শহীদ মিনারে পুস্পস্তবক অর্পণ করতে গিয়ে আমি দেখেছি, প্রভাতফেরিতে এবং শহীদ মিনারে পুস্পস্তবক অর্পণের সময়ে জুতা পায়ে রাখতে সামান্যতম দ্বিধাও করছে না কেউ কেউ। এতে ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা করা হচ্ছে, নাকি অপমান- এই সামান্য জ্ঞানটুকু তাদের নেই।

আরেকটা বিষয় না বললেই নয়, আমাদের সমাজের কিছু ‘বাংরেজি’ বাবু আছেন, যারা পাঁচ মিনিটের বাংলা কথায় ৫০টা ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করেন। এরা আসলে বাংলা নাকি ইংরেজি কোনটাতে কথা বলছে তা নিয়ে দ্বিধায় পড়ে যেতে হয়।

বাংলা ভাষা ও ভাষা শহীদদের এই অপমান সত্যিই দুঃখজনক। আমরা নিজেরাই যদি বাংলাকে ভালো না বাসতে পারি, তাহলে বিশ্বের মানুষ কি করে বাংলাকে ভালোবাসবে? যদি আমরা বাংলা ভাষাকে একটা সুদৃঢ় অবস্থানেই নিয়ে যেতে না পারি, তবে ইউনেস্কো যে বাংলাকে জাতীয় বিষয় থেকে আন্তর্জাতিক বিষয়ে পরিণত করেছে, তার গুরুত্ব বিশ্ববাসী কি করে বুঝবে?

ভুলে গেলে চলবে না, ভাষার জন্য জীবন দেয়া বিশ্বের একমাত্র জাতি আমরা। এই ভাষার মর্যাদা আমাদেরকেই রক্ষা করতে হবে। ভাষা শহীদদের যথাযোগ্য সম্মান জানানো এবং বাংলা ভাষার ব্যবহার ও চর্চার মাধ্যমেই আমরা এটা করতে পারি।

আসুন, আমরা বাংলাকে ভালোবাসি, বাংলা ভাষার চর্চা করি। শুধু ফেব্রুয়ারি নয়, যেন সারা বছরই হয় বাংলা ভাষার কদর।

‘সত্যিই কি আমরা বাংলা ভাষাকে ভালোবাসি?’- এই শিরোনাম যেন আর কেউ দিতে না পারে সেই প্রত্যাশাই করছি।