ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

 

সিনেমা বাংলাদেশের মানুষের অনেক বড় একটি বিনোদনের মাধ্যম। কিন্তু এই বাংলাদেশের কিছুদিন আগেই ছিল অনেক করুন দশা, যা ভাবলেও অনেক আফসোস করি একজন বাংলাদেশের সিনেমা দর্শক হিসাবে। আমার একটি লেখায় আমি বলেছিলাম যে, বাংলাদেশে নির্মিত বাংলা সিনেমা দেখা অনেকটা লজ্জার বিষয়। আমার এক বড় ভাই তো বলেইছিলেন যে আমি অভদ্র দেখে বাংলাদেশের বাংলা সিনেমা দেখি। কিন্তু তারপরেও বাংলা সিনেমার প্রতি ভালোলাগার জায়গাটা ছিল মনে। আর ভাবতাম বাংলা সিনেমার ভালো দিন আসবে, যেদিন বাংলা সিনেমার নিন্দুকের মুখ এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে।

আমি বলছি বাংলা সিনেমার জন্য ভালো সময়টা শুরু হয়ে গেছে। পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা সিনেমা “ঢাকা অ্যাটাক” আমার ভাবা কথাটাই বোধয় আরও একবার প্রমান করে দিয়েছে। আমার আজকের লেখা সম্প্রতি মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা ‘ঢাকা অ্যাটাক’ নিয়ে। মুক্তির দ্বিতীয় দিনে সিনেমাটি দেখা হয়। সম্পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহ (সিনেমা হল) পূর্ণ ছিল দর্শকে। দর্শক ভর্তি সিনেমা হলে বাংলা সিনেমা দেখার মজাই আলাদা, যারা সিনেমা দেখেন তাঁরা হয়তো এই আনন্দতা বুঝতে পারবেন। ঢাকা অ্যাটাক সিনেমাটি বাংলাদেশের দুর্দিনে অত্যন্ত ভালো একটি চেষ্টা। আমি এই লেখাটি যখন লিখছি তখন ঢাকা অ্যাটাক সিনেমাটি অনেক দর্শকের মন জয় করে নিয়েছে। সিনেমাটি নিয়ে দেখা গেছে অনেকের মধ্যে উচ্ছ্বাস। জানিয়েছেন অনেকেই শুভ কামনা।

ঢাকা অ্যাটাক বাংলাদেশে প্রথম পুলিশ থ্রিলার একটি সিনেমা, যা আগে এই ধরনেরর নির্মিত কোন সিনেমা দেখা যায়নি।  সেক্ষেত্রে অনেক অনেক ভালো একটি চেষ্টা বলতে হবে এই সিনেমাটিকে। চেষ্টা করতে হবে, আর চেষ্টা করতে করতেই একদিন আমাদের দেশের সিনেমা এগিয়ে যাবে। যার কারনে ভালো সিনেমাকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য দর্শক হিসাবে আমাদেরই এগিয়ে আসতে হবে। দীপংকর দীপনের নির্মাণে চলচ্চিত্রটির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন-আরেফিন শুভ, মাহী, এবিএম সুমন, নওশাবা, শতাব্দী ওয়াদুদ, তাসকিন, হাসান ইমাম, আলমগীর, আফজাল হোসেন প্রমুখ।

 

ঢাকা অ্যাটাক সিনেমাটির কাহিনী নিয়ে বিস্তারিত শুরু করছি।

স্কুল বাসে বোমা হামলা এবং ধনী পরিবারের মানসিক বিকারগ্রস্থ একটি ছেলের অপরাধ আর সেই অপরাধ দমনের কার্যক্রম দিয়েই এগিয়ে যায় সিনেমার কাহিনী। ঢাকা মহানগরের কিছু খুন ও বোমা বিস্ফোরণের বিরুদ্ধে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রেক্ষাপট ও অবস্থান চিত্রিত হয়েছে এই সিনেমাতে। বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর সাহসী ও আত্মতাগের কিছু গল্প নিয়ে সিনেমার কাহিনী এগিয়ে গেছে। বিশেষ করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের বিভিন্ন দক্ষ বিভাগের দক্ষ কর্মকর্তার আত্মতাগের গল্পও উঠে এসেছে আই সিনেমাতে। সিনেমাটির কাহিনী লিখেছেন বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীরই একজন কর্মকর্তা  সানী সানোয়ার।

সিনেমার শেষ দৃশ্য দেখানো হয় ঢাকা অ্যাটাকের সিনেমা সিকুয়েল ‘ঢাকা অ্যাটাক এক্সট্রেম’  নির্মাণের ঘোষণা দিয়ে। আর এই বিষয়টি সিনেমা হলে থাকা প্রতি দর্শকদের আলাদা আনন্দ দিয়েছে সিনেমা দেখার শেষে, আমি যা দেখেছি।

যে রাঁধে সে যেন চুলও বাঁধে, পরিচালক দীপঙ্কর দীপন এমনই একটি বার্তা দিলেন আমাদের দর্শকদের তারই নির্মিত ‘ঢাকা অ্যাটাক’ সিনেমা দিয়ে। বাংলাদেশে ছোট পর্দা থেকে বড় পর্দায় মুল ধারার বাণিজ্যিক সিনেমা নির্মাণ করতে দেখা গেছে অনেক নির্মাতাদের। কিন্তু কোন বিশেষ কারনে তেমন সফলতার ছাপ দেখা যায়নি এই সকল নির্মাতাদের জন্য। কিন্তু পরিচালক দীপঙ্কর দীপন তার প্রথম নির্মাণেই বাজিমাত করে দিলেন ঢাকা অ্যাটাকে। দুই একটি বিষয় ছাড়া তেমন কোন অসঙ্গতি দেখা যায়নি সিনেমাটি নির্মাণের ক্ষেত্রে। ঢাকা অ্যাটাক নির্মাণের জন্য অনেক অভিবাদন থাকলো পরিচালক এর জন্য।

এবার সিনেমার  মূল চরিত্রদের কিছু কথা।

আবিদ রহমান নামে ঢাকা মহানগর পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার এবং বোমা নিষ্ক্রিয় বিশেষজ্ঞের চরিত্রে অভিনয় করেন আরেফিন শুভ। বেশ মানাসই ছিলেন বাংলা সিনেমার এই অভিনেতা। আরেফিন শুভ এখন অনেক ভালো কাজ করছেন এবং তার জন্যই ঢাকা অ্যাটাক দেখতে আসা হয়েছে, এমনটাই শোনা গেলো সিনেমা দেখতে আসা  গেলো  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর মুখে। আমিও একমত তার সাথে। তবে আরেফিন শুভর কয়েকটি সিনেমা দেখা হয়েছে। সেই দিক থেকেই বলছি যে, তার অভিনয়ের দিকটা আরও ভালো করলে সে দর্শকের মনে খুব সহজেই জায়গা করে নিতে পারবেন। সিনেমার কিছু অংশে সংলাপ বলার ধরনে/অভিনয়ে কিছুটা বেমানান লেগেছে। এমনটাই বোঝা গেলো একজন দর্শকের সাথে কথা বলার সময়ে।

চৈতি- একটি টেলিভিশন চ্যানেলের তদন্তকারী সাংবাদিক এর চরিত্রে দেখা যায় অভিনেত্রী মাহিয়া মাহিকে। সিনেমাটিতে মাহির কিছু দৃশ্যে অতি নাটকীয়তা অভিনয় কিছুটা এক ঘেয়েমি লেগেছে। সাংবাদিক চরিত্রটি নিয়ে খুব একটা পূর্বপ্রস্তুতি ও পর্যবেক্ষণ ছিলোনা তা বোঝা গেছে। তবে গানের দৃশ্যে গুলোতে ভালো করেছেন এই অভিনেত্রী।

আশফাক হোসেন- ঢাকা মহানগর পুলিশের বিশেষ বাহিনী সোওয়াটের কমান্ডার এর চরিত্রে অভিনয় করেছেন এ বি এম সুমন। এই অভিনেতার অনেক মেয়ে ভক্তকে উচ্ছ্বাস করতে দেখা গেছে। চমৎকার মানানসই ছিলেন তার চরিত্রে। ভবিষ্যতে একশন নির্ভর অনেক সিনেমাতে এই অভিনেতাকে মানাবে, এমনটাই জানালেন একজন দর্শক।

সিনথিয়া- আশফাকের সন্তানসম্ভবা  স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করেন কাজী নওশাবা আহমেদ। বেশ প্রাণবন্ত অভিনয় দেখা গেছে তার চরিত্রে।

সাজেদুল করিম- বাংলাদেশ পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তার চরিত্রে দেখা যায় শতাব্দী ওয়াদুদকে। সিনেমাতে চমৎকার অভিনয় ও বিশেষ কিছু দৃশ্যে হাসির কিছু খোরাক  দিয়ে দর্শকের মন জয় করে নিয়েছেন গুণী এই অভিনেতা। তবে তার চরিত্রের প্রয়োজনে কিছুটা শারীরিক ফিটনেস দরকার বলে মনে হয়েছে আমার।

জিসান- মুল খলনায়কের চরিত্রে অভিনয় করেছেন তাসকিন। সিনেমার কাহিনী অনুযায়ী খলনায়কের চরিত্রে বেশ ভালো চেষ্টা দেখিয়েছেন। তবে ছব্দবেশের কিছু দৃশ্যের অভিনয়গুলো তেমন প্রাণবন্ত ছিলোনা। জিসানের চরিত্রে কিছু সামাজিক ও পারিবারিক অবক্ষয়ের বিষয় তুলে ধরা হয়েছে যা আমাদের বর্তমান সময়ে বেশ প্রাসঙ্গিক। জিসানের চরিত্র দিয়ে পরিচালক অনেক ভালো কিছু বার্তা দিয়েছেন আমাদের বর্তমান সমাজকে।

আফজাল হোসেন অভিনয় করেছেন কমিশনার নিয়াজ, ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার এর চরিত্রে হাসান ইমাম ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর চরিত্রে। নায়ক আলমগীর আইজির একটি অতিথি চরিত্রে। অতিথি চরিত্রে দেখা গেছে অভিনেতা শিপন মিত্র। তবে সিনেমার এই চরিত্রগুলোর কাজ খুব কম দেখা গেছে। এই চরিত্রগুলি কাহিনীর অনেক জায়গাই অনুপস্থিত ছিলেন, যা কিছুটা খাপছাড়া মনে হয়েছে। এছারাও রয়েছে আরও বিভিন্ন চরিত্রে অনেক অভিনেতা/অভিনেত্রী।

সিনেমাটিতে মোট ৩টি গান দেখা গেছে। অরিজিত সিং এর কণ্ঠে টুপ টাপ গানটি বেশ ভালো হয়েছে এবং সাথে গানের দৃশ্যায়ন। মুল গানের দৃশ্যের সাথে ঠোঁট মেলান মাহি ও আরেফিন শুভ। তবে অনেক দিন পর অত্যন্ত চমৎকার একটি গান ‘পথ যে ডাকে’ পাওয়া গেল, সিনেমায় গানের সাথে কিছু আবেগপ্রবন দৃশ্য। দর্শককে অনেকটাই নিস্তব্ধ করে দিয়েছিল গানটি ও গানের দৃশ্যগুলো। তবে ‘টিকাটুলির মোড়’ গানটি একেবারেই বেমানান ছিল আমার মতে। চিটাগাং(সম্ভবত) এ এক গাড়ি চোরকে পুলিশি অভিযান ধরতে যাওয়ার সময় চোরের আস্তানায় এই গানের দৃশ্য দেখানো হয়। এখানে সিনেমার দৃশ্য প্রয়োজনে অন্য গান ব্যবহার করা যেতো বলে মনে করছি।

ঢাকা অ্যাটাকের সিনেমার চিত্রনাট্যের কাজ খুবই চমৎকার। কাহিনীর সাথে অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল সিনেমাটির চিত্রনাট্যটি। সিনেমাটির চিত্রগ্রহণের কাজ অনেক প্রশংসনীয়। ড্রোন ক্যামেরার কাজ দেখা গেছে অনেক দৃশ্যে। রূপসজ্জার কাজ বেশ ভালো ছিল। তবে সিনেমার নায়িকার রূপসজ্জায় আরও একটু যত্নবান হওয়া যেতো। পুলিশের অপারেশনের দৃশ্যে অনেক পোশাকসজ্জা চোখে পড়ার মতো। গ্রাফিক্স এর কাজ দৃশ্য অনুযায়ী ভালো ছিল। অ্যাকশন দৃশ্যগুলো কাহিনী অনুযায়ী মানানসই আছে।

যদিও এটা ঢাকা অ্যাটাক সিনেমা নিয়ে লেখা। তবুও একটা কথা না বললেই নয়, সেটা হলো সিনেমা হলের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ। আমি আমার একটি লেখায় সিনেমা হলের পরিবেশ নিয়ে লিখেছিলাম। আমি আবারও কিছু কথা বলছি এই সিনেমা হলের পরিবেশ নিয়ে। বাংলাদেশের সিনেমা হলের পরিবেশের জন্য আজ অনেক দর্শকই হল বিমুখ। শীতাতপযন্ত্র(এসি) নিয়ন্ত্রিত বলে ১৫০ ও ২৫০ টাকা টিকেটের জন্য রাখা হলেও ঢাকার শ্যামলী সিনেমা হলে সিনেমা দেখাকালীন অনেক গরমের মধ্যে দেখতে হয়েছে। সিনেমা চলাকালিন এসি চলা নিয়ে অনেক বাকবিতণ্ডা দেখা গেছে হলের দর্শকের সাথে গ্রাহক সেবা প্রতিনিধিদের। আসা করি চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট সবাইক এই হলের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নিয়ে একটু যত্নবান হবেন।

maxresdefault-2

এবার সিনেমা থেকে নেয়া কিছু পর্যবেক্ষণ এর কথা। ঢাকা অ্যাটাক সিনেমাটির বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর কার্যক্রম ও কর্মদক্ষতার উপর ভিত্তি করেই কাহিনী গড়ে উঠেছে। সিনেমার এক দৃশ্যে শুনেছিলাম যে, বাংলাদেশের মানুষ এখনও নিশ্চিন্তে ঘুমায় পুলিশ বাহিনীর নিরলস পরিশ্রম ও প্রচেষ্টার জন্য। আমি নিজেও একমত। আমরা প্রায়ই পত্র পত্রিকায় পুলিশ নিয়ে বিভিন্ন নেতিবাচক খবর দেখে থাকি, যা আমাদের কারই অজানা নয়। আমি কিছুতেই সিনেমার পুলিশের সাথে বাস্তবের পুলিশকে মেলাতে পারছিলাম না। বার বারই মনে হচ্ছিল যে, পুলিশ অফিসার আবিদ এর মতো যেন সবাই হতে পারে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর সব পুলিশ সদস্য। তাহলে হয়তো ভবিষ্যতে পুলিশ কে নিয়ে আর দেখতে হবে না কোন নেতিবাচক খবর।

সব শেষে কিছু কথা। চেষ্টা করলেই ভালোমন্দ  কিছু পাওয়া সম্ভব বলে আমি বিশ্বাস করি।  যদি চেষ্টা না করা হয় তাহলে ভালোমন্দ কোনটিই পাওয়া সম্ভব নয়। ভালো ও পরিচ্ছন্ন ছবি দর্শককে প্রেক্ষাগৃহে ফিরিয়ে আনে। সেটা আবারো প্রমান করে দিয়েছে সিনেমা ‘ঢাকা অ্যাটাকের’ সকল কলাকুশলীবৃন্দ।  যেকোনো নতুন চেষ্টায় ভুল ত্রুটি থাকবে এবং সেটাই স্বাভাবিক। ঢাকা অ্যাটাক সিনেমাটিও তার ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশে ঢাকা অ্যাটাকের মতো সিনেমা এই প্রথম নির্মিত হলো। প্রত্যেকটি দর্শকের কাছেই সিনেমাটি জনপ্রিয় হবে এবং ইতিমধ্যে অনেকটাই পেয়ে গেছে। ভালো একটি সিনেমা দেবার জন্য পরিচালক, প্রযোজক, অভিনেতা, অভিনেত্রীসহ সকল কলাকুশলীকে ধন্যবাদ। এখন ‘ঢাকা অ্যাটাক এক্সট্রিম’ দেখার অপেক্ষা নিয়ে শেষ করছি …।

বি:দ্রঃ আমার এই লেখাটি সম্পূর্ণ ব্যাক্তিগত আবেগ, অনুভূতি, অভিজ্ঞতার আলোকে লেখা। এই লেখাটি কোনো ভাবেই পাঠকের আবেগ, অনুভূতি, অভিজ্ঞতাকে আঘাত করেনা। গঠনতান্ত্রিক মতামত সব সময়ের জন্য উৎসাহযোগ্য।