ক্যাটেগরিঃ দিবস প্রসঙ্গ

 

আমি যখন এই লেখাটি লিখতে বসেছি, ততোক্ষণে হয়তো অনেকের বসন্তের দ্বিতীয় ফাল্গুন তথা ভালোবাসা দিবসের প্রস্তুতি নেয়া শেষ। না… না… এই প্রস্তুতি কোন পরীক্ষা বা যুদ্ধের প্রস্তুতি নয়। এই প্রস্তুতিটা দিবস পালনের প্রস্তুতি। বাঙালির বারো মাসের তেরো ফাল্গুন ছাড়াও অন্য একটি অতিরিক্ত ফাল্গুন এসে জুটেছে, নাম তার ‘ভালোবাসা দিবস’। বলছি বিশ্ব ভালবাসা দিবসের কথা। বিশ্বের অনেক দেশ ঘুরে শেষ পর্যন্ত বাঙালির ঘরেও পৌঁছে গেছে এই ভালোবাসা দিবস।

আজকের লেখায় এই দিবসের কাহিনী প্রেক্ষাপটে কোন আলোকপাত বা ভাব সম্প্রসারণে তেমন কোন ব্যাখা থাকছেনা বলে আমি কিছুটা দুঃখ প্রকাশ করছি। তবে ভালোবাসা দিবসের ঐতিহাসিক ঘটনাকে আমিও স্মরন করছি একাগ্রচিত্তে। ভালোবাসা দিবস নিয়ে টিভিতে,পত্রিকায়, ফেসবুকে, ঘরে বাইরে সব জায়গায় চর্চা থাকে। যদি কেউ চর্চা না করে সে অনেকটাই সমাজের বাহিরে, মানেটা হচ্ছে সমাজ তাকে মেনে না নেওয়ার মতো একটি অবস্থা। তাই সমাজ যাতে আমাকে মেনে নেয় সেই জন্যই আমি ভালোবাসা দিবস নিয়ে আজকে চর্চা করছি।

প্রথমেই একটি কথা না বললেই নয়। সেটি হলো আমাদের ভালোবাসা দিবসের প্রেক্ষাপটের কিছু বিশেষ ভাবনা। আমরা অনেকেই এই দিবসটি পালনের দিনে ভালোবাসার সংজ্ঞা নিয়ে খুব ব্যস্ত দিন পার করে থাকি। কিসের মধ্যে কি বা কার সাথে কার ভালোবাসা হবে বা বুঝায় সেটা নিয়েও অনেককে চিন্তিত থাকতে দেখা যায়। আমার নিজের মাথাতেও ঢাকা শহরের ট্রাফিক জ্যামের মতো  বেশ কিছু জট লেগে যায়। ছেলের সাথে মেয়ের ভালোবাসা, আবার কেউ কেউ বলেন বুড়োর সাথে বুড়িরও ভালোবাসা। আমি অনেক সময় বেশ আবেগাপ্লুত হয়ে যাই যখন শুনি অনেকেই বলে থাকেন যে, আরে না না… ভালোবাসা মানে সবার সাথে সবার ভালোবাসা। তার মানে বাদ যাবেনা পরিবারের একটি সম্পর্কও। এটি যখন আমি অনুধাবন করি তখন আমার চোখে মুখে একসাথে আনন্দের হাসি ও অশ্রু বের হয়ে আসে। বলতে পারেন আবেগ সামলাতে না পেরে হাসি-ক্রন্দন করা। হবেই না কেন বলেন?

যেদিন থেকে ভালোবাসা দিবসটি বুঝতে শিখেছি, সেদিন থেকে অনেক কিছু আমি খেয়াল করেছি। যেমন ধরুন-

জাতীয় দৈনিকে আমি আজ পর্যন্ত ছেলে-মেয়ের ভালোবাসার ছবি-গল্প ছাড়া অন্য কোন পারিবারিক/সামাজিক ভালোবাসার সম্পর্কের ছবি-গল্প দিয়ে ভালোবাসা দিবস উপলক্ষ্যে কোন প্রতিবেদন দেখতে পাইনি। শুধু ভালোবাসা দিবস নিয়ে একটি টুথপেস্ট কোম্পানি কাছে আসার গল্প নিয়ে স্বল্পদৈর্ঘ্য কাহিনীচিত্র নির্মাণ করে থাকে, সেখানেও দেখানো হয় কিছু ছেলে-মেয়ের ভালোবাসার গল্প। অন্য সম্পর্কের মধ্যে বিদ্যমান ভালোবাসা নিয়ে কোন কাহিনীচিত্র আমি উক্ত নির্মাণাধীন কাহিনীচিত্রে আজ পর্যন্ত দেখতে পাইনি।

-বিভিন্ন ধরনের দর্শনীয় স্থান, খাবার, বিনোদনমুখী ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলোও এই ভালোবাসা দিবসে ইংরেজি পরিভাষায় ‘কাপল’ দের জন্য বিভিন্ন ধরনের আংশিক/বিশেষ মূল্যছাড়ের বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে। এই জায়গাতেও আমি সবার জন্য ও সব সম্পর্কের ভালোবাসা উল্লেখপূর্বক কোন বিশেষ কোন বিজ্ঞাপন দেখতে পাইনি।

সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট গুলো ভালোবাসা দিবসের ভালোবাসা প্রকাশের অন্যতম জায়গা। যেখানে কিছু বছর হলো ভালোবাসা দিবসকে ঘিরে প্রিয়জনের সাথে ‘ফটো কনটেস্ট’ দেখা গেছে। এই ফটো কনটেস্টেও কাপলদের বহু ফটো দেখা যায়। তবে দুই একজনের কাপল ছাড়া আমি ফটো দেখেছি যেটা একদমই সত্যি। কিন্তু তাতেই বা কি!

-তাছাড়া ভালোবাসা দিবসের আগের কয়েক রজনী তো আছেই… প্রপোজ, চকলেট, হাগ, টেডি, আর কিছু না বলি! ভালোবাসা দিবস পূর্বক এই দিনগুলোও যেন শুধু একটি সম্পর্কের ভালবাসারই ইঙ্গিত দিয়ে থাকে হয়তো…

 

 

যাইহোক, বলতে বলতে অনেক কথাই বলা হয়ে গেলো। আসলে আমি কোন কিছুর বিপক্ষে না, আবার অযৌক্তিক পক্ষেও না। এই দিবস নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন সম্পর্কের মধ্যে তেনা প্যাঁচানোটা আমার কাছে কেমন জানি একটু হাস্যকর লাগে। আমাদের মধ্যেই আবার অনেকেই আছেন যাদের এই ভালোবাসা দিবসের কোন ভালোবাসার মানুষ না থাকায়, নিজের মনকে সান্ত্বনা দিয়ে ‘ভালোবাসা দিবস তো সবার, সব সম্পর্কের জন্যই ভালোবাসা’ বলতে শুনেছি।

বর্তমানে বাংলাদেশে বাবা-মা, বন্ধু সম্পর্কিত যথাক্রমে ‘বাবা ও মা’ এবং বন্ধু দিবস প্রচলিত আছে। শুধু বাকি থাকলো ভাই, বোন, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশি দিবস। স্বাস্থ্যের প্রতি খেয়াল রাখার কথা চিন্তা করে এখন বিশ্বব্যপি ‘বিশ্ব হাত ধোয়া’ দিবসও পালন করা হয়। বর্তমানে এটিও অল্প কিছুদিন হলো বাংলাদেশে শুরু হয়েছে। তো যেখানে হাত ধোয়া দিবস চালু আছে, সেখানে ভাই, বোন, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী দিবস আসতে কতক্ষন? ৩৬৫ দিনে বছর হয়, আমার জানা মতে এখনও অনেক তারিখ ফাঁকা আছে যে তারিখগুলোতে এখন পর্যন্ত কোন দিবস বরাদ্দ দেয়া হয়নি। সুতরং আমাদের শুধু একটু অপেক্ষার পালা! তাই ভালোবাসা দিবসটি নাহয় শুধু বিশেষ দুইজনের মধ্যেই থাক…!

তাহলে আমি দুইজন ছেলে-মেয়ের ভালোবাসার গল্প দিয়েই ভালোবাসার কিছু খণ্ড কথা তুলে ধরছি।

ঘটনা-১: অফিস থেকে ট্র্যাফিক জ্যাম ঠেলে বাসায় ফেরার পথে টং দোকানে চায়ের জন্য অপেক্ষা করছি। দুই জন ছেলে মেয়ের আলাপচারিতার ধ্বনি ভেসে আসছিল বেশ জোরেই। আমিসহ টং দোকানের সবাই বেশ আগ্রহ নিয়েই শুনছিল। আবেগ সামলাতে না পেরে অবশেষে আমিও একটু মনোযোগ দিলাম। একটু তুলে ধরছি…(কিছুটা হুবুহু)

ছেলেঃ তোমার সাথে রিলেশনের পর থেকে আমি একটা দিনও শান্তিতে থাকতে পারলাম না। প্রতিটা দিনই প্যারা আর প্যারা। ভালো লাগেনা… আমার। আমি আর নিতে পারতেছিনা! খালি এই দাও সেই  দাও, এইখানে চল, ঐখানে চল…

মেয়েঃ আজিব তো! এইগুলো আগে মনে ছিল না…আমি নিজে তোমার কাছে আসছিলাম, নাকি তুমি আমার কাছে আসছিলা? আমি কি তোমাকে জোর করে আমার কাছে নিয়ে আসছিলাম? আমি রিলেশনের আগে আমার চাওয়া-পাওয়ার কথা বলি নাই? কি বলছিলাম? পরে সরাসরি তুমি সম্বোধন থেকে তুইয়ে এসে মেয়েটি বলল, কথা বলিস না কেন? ফালতু কোথাকার! থাক তুই আমি গেলাম…

এই রকম আবেগতাড়িত সময়ে আমি নিজেকে কোন ভাবে সামলিয়ে কান দুটিকে সরিয়ে নিলাম। মনের ভেতরে তাদের কথাগুলো ভাবাচ্ছিলো।

যা ভাবছিলাম: ঘটনা-১ পড়ে হয়তো আমরা অনেকেই ছেলেটার দোষ এতক্ষণে দিয়ে ফেলেছি, হয়তো আমি নিজেও। ঠিকই তো, মেয়েটা কি ছেলেকে জোর করেছিলো সম্পর্ক করতে? তাছাড়া ছেলেটাকে তো আগেই বলেছিলো মেয়েটার চাওয়া-পাওয়ার কথা। তাহলে এত কথা এখন কেন? কেন এখন প্যারা নিয়ে এত ভাবনা? আবার না হয় ছেলেটা হয়তো কিছু বিষয়ে অপারগ ছিল, ভালোবাসার খাতিরে কি কিছুটা মেনে নিতে পারতোনা মেয়েটা?

ভালোবাসার সঠিক সংজ্ঞাতো আসলেই কিছু নেই, যা আছে সেগুলো কিছুটা মানে বহন করে। তো ভালোবাসার সেই মানেগুলোর মধ্যেই একটি হচ্ছে ‘পারস্পরিক সমঝোতা’। তো ঐ মেয়েটা বা ছেলেটা কি পারতোনা একটু নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করে সম্পর্কটাকে এগিয়ে নিতে? এখন বলি অন্য আরও একটি ঘটনা।   

 

 

ঘটনা-২:  ব্যস্ততম গ্রিন রোডে একদিন আলুপুরি, পেঁয়াজু খেতে বসেছি। হঠাৎ এক জুগল এসে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসছে। অবশ্য হাসির রহস্যটা বুঝতে আমার দেরি হলোনা, দ্রুত জায়গা করে দিলাম হাসি মুখে। রহস্যটা ছিল এমন যে, আমাকে একটু সরে উনাদের বসার জায়গাটি একটু প্রশস্ত করে দিতে হবে। উনাদের এক সাথে বসার আকুলতা আমার মনকেও বেশ পুলকিত করে দিয়েছিলো।

কিন্তু বাধ সাধল যখন উনাদের কথাবার্তার অংশ থেকে মেয়ের মুখ থেকে শোনা একটি বাক্যে। বাক্যটি ছিল, “কিছু একটা তাড়াতাড়ি করো। আমাকে কিন্তু খুব শিগ্রই বিয়ের জন্য দেখতে আসবে। তখন আমার আর করার কিছু থাকবেনা। তুমি কি বুঝতে পারছ আমি কি বলছি? তুমি তো জানো আমার আব্বার শরীর বেশি ভালো না”।

কথাগুলি শোনার পরে একটু ইচ্ছে হলো ছেলেটার দিকে তাকাতে এই ভেবে যে, কি মুখভঙ্গি হয় ছেলেটার। ছেলেটার দিকে তাকিয়ে আমি আবেগে আপ্লুত হয়ে গেছিলাম। কারণ, মেয়েটি যখন ঐ কথাগুলি বলছিলো ততোক্ষণে ছেলেটার খাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। ছেলেটার চোখের কোণে কিছু একটা চকচক বা ছলছল করছিলো। পরে মেয়েটা আগে খেয়ে চলে গেলে ছেলেটা কিছুক্ষণ বসে ছিল। কৌতূহলবসত ছেলেটি কি করে জানতে চাইলে সে নিজেকে ছাত্র বলে পরিচয় দেয়। পরে অল্প কিছুক্ষণ কথা বলে তাঁকে একটু সান্তনা দিয়ে আমিও চলে গিয়েছিলাম। আসার সময় আবারও মাথায় ঘটনা-১ এর মতো কিছু ভাবাচ্ছিল বটে!

যা ভাবছিলাম: ঘটনা ২ পড়ে এখানেও অনেকেই ছেলেটাকে হয়তো অভিযুক্ত করে থাকবেন, সাথে আমিও। ঠিকই তো, ছেলেটার তো আগে থেকেই জানা উচিৎ ছিল মেয়েটার ব্যাপারে। ছেলেটার অবশ্যই জানা উচিৎ ছিল তার দায়বদ্ধতার সীমা কতোটুকু!

আচ্ছা বুঝলাম ছেলেটি না হয় ভুল করেই এই পথটি বেছে নিয়েছে, তাই বলে কি মেয়েটিরও একবার ভাবা উচিৎ ছিলোনা সম্পর্কে জড়ানোর আগে? তাছাড়া ঐ মেয়েটার বাবার শরীর কি একদিনেই খারাপ হয়ে গেছে? তার কি একবারও বোঝা উচিৎ ছিলোনা যে, তার প্রতি তার অভিভাবকের চাওয়া পাওয়াটি কি রকম হতে পারে? অনেকেই বলতে পারেন যে সম্পর্কের আগে কি ভাই এত কিছু মনে পড়ে বা ভাবা যায়? যদি এমন প্রশ্নের উদ্রেক কারোও মনে হয়ে থাকে, তাহলে তাদের প্রতিও একটি প্রশ্ন করা যেতেই পারে। সেটা হলো কোন কিছু না ভেবেই বা বুঝেই যদি সম্পর্ক করা যায় তাহলে সম্পর্কের মাঝ পথে কেন এত শর্ত উঠে আসে? কোন কিছু যদি শর্ত না দিয়ে গড়ে উঠে, তাহলে সেই কিছুর জন্য পরে কেন এত শর্ত সামনে আসবে?    

 

 

পরে আমি ভেবে ভেবে কিছু সান্তনামূলক উত্তর খুঁজলাম। আমাদের দেশে ছেলের আগে মেয়েদের ব্যাপারেই অভিভাবকগণ আগে ভেবে থাকেন, এটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে। বাংলাদেশে প্রাক্তন প্রেমিকার সন্তানের বয়স ৩/৪ বছর না হওয়ার আগ পর্যন্ত এবং সেই সন্তান প্রাক্তন প্রেমিককে মামা ডাকার আগ পর্যন্ত কোন প্রেমিকের বিয়ে হয় না, এটাতো বাংলাদেশে আরও স্বাভাবিক বিষয়। আমার এই বাক্যে কিছুটা মজা পেলেও কিন্তু এটাই কষ্টকর সত্য। উপরে বর্ণিত ঘটনাগুলোর প্রেক্ষাপটে আমার করা সামান্য  পর্যবেক্ষণে কিছু বিষয় তুলে ধরছি। বিষয়গুলো-

  • আমাদের দেশে বেশিরভাগ ভালোবাসার সম্পর্কগুলো আবেগের বশে গড়ে উঠে, শর্তের ভিত্তিতে নয়।
  • সম্পর্ক গড়ে উঠার পর সময়ের সাথে আবেগ শেষ হয়ে গেলে সম্পর্কের মাঝে থাকা দুইজন মানুষ গুলোর মধ্যে অনেক শর্তের কথা উঠে আসে।
  • এবং ফলশ্রুতিতে শর্ত ও আবেগের সমন্বয় না ঘটলে, অবশেষে সম্পর্কের করুণ পরিণতি।

তাই যদি সবাই একটু নিজেদের চাওয়া-পাওয়ার প্রতি একটু খেয়াল রাখা যায়, তাহলে সব সম্পর্কই একসময় সুখকর পরিণতির দিকে যাবে। আর যদি তা না হয়, তাহলে সম্পর্ক ভাঙ্গা-গড়ার হিসাবটা বাড়বে বৈ কমবে না।

আজকে অনেক নীতি সেই সাথে ভারি কথা বলে ফেলেছি। এখন তো মানুষের ভালো সময়ই ভালোভাবে কাটেনা। আর আমার তো সামান্য কিছু নীতি কথা। তারপরেও এই কথাগুলো ভালোভাবে কেউ মেনে না নিলে সমাজে আমার স্থান বেশ নাজুক বলা যেতে পারে। তারপরেও সমাজ আমাকে মেনে নিক বা না নিক, সমাজের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্কের ভিত শক্ত করতেই আমার ভালোবাসা দিবসের লেখাটি।

 

আসলে সব বিশেষ দিবসই কিছুনা কিছু বার্তা বহন করে থাকে। কোন দিবসই তো নিজে খারাপ হয় না, আমাদের মনুষ্য কৃতকর্মে দিবসগুলির বার্তা কিছুটা পরিবর্তন হয়ে যায়। সেই ক্ষেত্রে আমরা কোন ভাবেই নিজেদের দায় এড়াতে পারি না। এই ভালোবাসা দিবস নিয়ে আমাদের মধ্যেই অনেক বাড়াবাড়ি দেখা যায়। বিশেষ দিবসের কারণে কিছুটা আলাদা প্রস্তুতি থাকতেই পারে, তবে সেটা যার যার সামর্থ্যের মধ্যেই থাকা উচিৎ।

ভালোবাসা দিবস আসার আগে থেকেই আমার অনেক পরিচিত জনের মধ্যেই একটা সাধারণ উদ্বিগ্নতা দেখেছি, বিশেষ করে যারা একটি সম্পর্কের মধ্যে দিয়ে সময় অতিবাহিত করে। কেমন যেন একটা খরচের ভীতি দেখেছি আমি ছেলে-মেয়ে উভয়ের মাঝেই। কিছু দিতে হবে, বাইরে খেতে যেতে হবে, আলাদা সময় কাটানো ছাড়াও আরও অনেক কিছু আছে। এই সকল ভীতি যাদের মধ্যে আছে এবং যাদের জন্য এই ভীতি তাদের সবার উদ্দেশ্যে কিছু কথা না বললেই নয়।

হ্যাঁ মেনে নিচ্ছি বিশেষ দিন, সেই জন্যই তো  খাওয়া-দাওয়া, ঘুরে বেড়ানো, উপহার আদান-প্রদান, সিনেমায় দেখতে যাওয়ার কথা এসেই যায়। কিন্তু তারপরেও তো সামর্থ্য বলে একটি কথা আছে। হতেই পারে একটি বছরে হয়তো অনেক কিছুই সামর্থ্যের অনুকূলে নাও আসতে পারে। তাই বলেতো রাগ বাড়িয়ে একে অপরকে কেন দোষারোপ করা? একটি বছর না হয় হলো না তাই বলে কি পরের বছরের জন্য অপেক্ষা করা যাবেনা? সমস্যা সবারই থাকতে পারে সে হোক ছেলে বা মেয়ের পক্ষ থেকে। তাই চাইলেই তো ছেলে-মেয়ে দুই জনই একটু একটু করে প্রস্তুতি নিয়ে পরের ভালোবাসা দিবসটি ভালোভাবে কাটাতে পারে বা পারবে। এই নিয়ে মন খারাপ করার কিছুই নেই।

এতক্ষণ যারা ধৈর্য নিয়ে আমার কথাগুলো পড়ে ফেললেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা। তাই সময় না নিয়ে শেষ কিছু কথা দিয়ে আমার আজকের লেখার ইতি টেনে নিচ্ছি।

আমরা সারা বছর ব্যবসায় লেনদেন করে বছরের একটি দিনে হালখাতার ব্যবস্থা করে থাকি, সেটিও কিন্তু বছর শুরুর প্রথম দিন। সুতরং এটিও কিন্তু একটি দিবস হয়ে গেছে ব্যবসায়ীদের কাছে। ঠিক তেমনি না হয় ভালোবাসায় জড়িত দুই জন মানুষের ভালোবাসার হিসাব নিকাশের দিনটিই হোক আজকের দিনে পালিত ভালোবাসার দিবসটি। হোক না আজকের দিনে পালিত ভালোবাসা দিবসটি ‘ভালোবাসার হালখাতার দিন’, যেখানে দুই জন মানুষ তাদের মনের হিসাবগুলো মিলিয়ে নেবেন বা নিতে পারেন। যেমন ধরুন,

গেলো বছরে কে কাকে কতোটুকু ভালোবেসেছে,

-কে কাকে কতোটা সময় দিয়েছে,

-কে কাকে কতোটা যত্ন করেছে বা নিয়েছে,

-কে কাকে কতোটা সহযোগিতা করেছে বা নিয়েছে,

-কে কাকে কতোটা দুঃখ দিয়েছে,

-কে কাকে কতোটা হাসিয়েছে,

-গেলো বছরে কার কতোটুকু অভিমান ছিল,

-কে কতোটা কার উপরে রাগ করেছে,

-কে কাকে কতোটা সরি বলেছে ইত্যাদি। 

 

 

এইতো অনেক কিছুই বলে ফেলেছি। হালখাতায় যেমন বছরের সমস্ত হিসাব নিকাশ করা হয়ে থাকে, তেমনি দুইজন ভালোবাসার মানুষও কিন্তু উপরে বলা আমার কথা গুলোর প্রেক্ষিতে তাদের বছরের হিসেব নিকেশ গুলো সেরে ফেলতে পারে বা পারেন।

অনেকেই বলে থাকেন যে, ‘ভালোবাসার জন্য আবার নির্দিষ্ট দিন-ক্ষণ লাগে?’  জী হ্যাঁ, আমি তাদের কথার সাথে স্বীকার করে বলছি, ভালোবাসার জন্য কোন নির্দিষ্ট দিন-ক্ষণ লাগেনা। তবে না হয় ৩৬৪ দিনই থাক একে অপরকে ভালোবাসার দিন এবং একটি বিশেষ দিনই থাক শুধু ভালোবাসা বছরের হালখাতা হিসাবে। ভালোবাসার প্রতি বছরটিই না হয় ১৪ই ফেব্রুয়ারি থেকেই শুরু হলো… ১৩ই ফেব্রুয়ারিতে শেষ হলো, মন্দ কি! বেঁচে থাকুক সবার সব ভালোবাসা।

বি:দ্রঃ আমার এই লেখাটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত আবেগ, অনুভূতি, অভিজ্ঞতার আলোকে লেখা। এই লেখাটি কোনো ভাবেই পাঠকের আবেগ, অনুভূতি, অভিজ্ঞতাকে আঘাত করেনা। গঠনতান্ত্রিক মতামত সব সময়ের জন্য উৎসাহযোগ্য। এই লেখায় ব্যাবহৃত সকল ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত।