ভাষা ও ভালোবাসার মাস ফেব্রুয়ারি। এই মাসেরই ১৪ তারিখ পর্যন্ত বিদেশি সব দিবস শেষ হয়ে যায়। তারপর ১৪ তারিখ থেকেই ২১ শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাঙালির শুরু হবে ভাষার জন্য মাতম। এই কয় দিন সবার মুখেই একই কথা শোনা যায়, বাংলা ছাড়া আমার চলেই না……..। মাঝে মাঝে মনে হয় বাংলা আমার মায়ের ভাষা আর ইংরেজি হলো বাবার ভাষা। আমরা বাঙালিরা বোধয় মায়ের চেয়ে বাবাকেই বেশি ভালোবাসি। সেই ভালোবাসায় মিল রেখে বাবার জন্য ১১ মাস আর মায়ের জন্য ১ মাসেরও কম সময় রেখে দেই মায়ের ভাষাকে ভালোবাসার জন্য। দেশটা এখনো বাংলাদেশই আছে কিন্তু সব আমরা কাজে-কর্মে ইংরেজ দেশ হয়ে গেছি।
কোথায় আমরা বাংলা ভাষা ব্যাবহার করছি আর কোথায় করছি না, তা আমার আজকের লেখার মূল বিষয়বস্তু নয়। আজকে আমি সবারই জানা একটি বিষয় আমার ভাবনায় বলার চেষ্টা করবো।
আমাদের বাংলা ভাষার জন্য কারা কারা তাদের জীবন দিয়েছেন সেটি নিশ্চয় আমাদের কারোই অজানা নয়। ভাষার জন্য তাদের এই আত্মত্যাগেই আমরা পেয়েছি বাংলা ভাষা। আমরা সবাই তাদের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ।
আমি টিভিতে একটি প্রতিবেদন দেখেছিলাম যে ভাষা শহীদদের পরিবারের কিছু দুঃখ দুর্দশার চিত্র। দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারছিলাম না। এমনও শুনলাম যে তাদের খোঁজ-খবর কেউ রাখে না। ঐ প্রতিবেদনেই দেখলাম যে টাকার অভাবে চিকিৎসা করতে পারছে না অনেকেই। এই অবস্থা যে শুধুমাত্র ভাষা শহীদদেরই- তা কিন্তু নয়, এটা মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের ক্ষেত্রেও দেখেছি। অথচ আমাদের সেই ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেই। ২১ শে ফেব্রুয়ারিতে আমরা শহীদ মিনারে কত কোটি টাকার ফুল দেই সেই হিসাব কারো অজানা নয়। সারা বাংলাদেশেই এই ফুল দিয়ে থাকি।
অবশ্যই আমরা শ্রদ্ধা জানাবো এবং জানাতে হবে। আমি দেখি আমাদের দেশে প্রতিবারই আমাদের মাননীয় রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ফুল দিয়ে জাতির পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানিয়ে থাকেন শহীদ মিনারে। আমি বলছি তাহলে তো হয়েই গেলো। একটি জাতির পক্ষ থেকে যদি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রধান দুইজন ব্যাক্তি যদি শ্রদ্ধা জানিয়ে থাকেন তাহলে তো আর কিছু লাগেনা শ্রদ্ধা-ভালোবাসা জানানোর জন্য।
তাহলে কেউ কেউ বলতে পারেন , “তাই বলে কি আমরা শ্রদ্ধা জানাবো না?” অবশই জানাবো। আমরা যে টাকা দিয়ে ফুল কিনে থাকি সেই টাকা দিয়ে আমরা তো তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করতে পারি, যারা দেশের ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে। আমরা সবাই আমাদের টাকা দিয়ে তাদের চিকিৎসা করাতে পারি, যাদের কর্ম নেই তাদের একটা কর্মসংস্থান করে দিতে পারি। যাদের থাকার ঘর নেই তাদের জন্য ঘর গড়ে দিতে পারি।
তাহলেই তো যারা শহীদ হয়েছেন তাদের আত্মা শান্তি পাবেন। যারা আমাদের ভাষার জন্য, দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন আমরা তাদের জন্য যদি কিছু না করি তাহলে বোধয় ভবিষ্যতে নিজের ও নিজের পরিবারের কথা ভেবে দেশের জন্য আর কেউ কোন দিন জীবন দেবে না। যারা জীবন দিয়েছেন তারা দেশের কথা ভেবে জীবন দিয়েছেন। সুতরাং তাদের অনুপস্থিতিতে তাদের পরিবারের সমস্যা দেখার দায়িত্ব আমাদের।
আমাদের দেশের সরকার অনেকটাই এগিয়ে। কিন্তু একা সরকারের পক্ষে অনেক কিছুই করা সম্ভব নয়। আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। আমরা সবাই যে যার সামর্থ অনুযায়ী যে টাকার ফুলটি কিনছি সেটা সবারটা একত্রিত করে আমরা ঐসব মানুষদের সাহায্য-সহযোগিতা করতে পারি।
আমরা এখন কাজের থেকে কথা বলায় বেশি ব্যাস্ত থাকি। মাঠে-ঘাটে, রাস্তায়, বাড়িতে, টক শো তে আলোচনার ঝড় দেখা যায়। সচেতন হবার জন্য আমাদের কোন কিছুরই অভাব নেই। আমরা করুণ সংবাদ প্রতিবেদন দেখে আবাগে আপ্লুত হয়ে যাই। শহীদ পরিবারের দুঃখ দুর্দশার কথা শুনে আমাদের চোখে পানিও আসে। আমরা সচেতন হচ্ছি ঠিকই, কিন্তু কোন উদ্যোগ নেই আমাদের মাঝে। একটি বার আমরা স্ব-উদ্যোগে যদি কোন ছোট কিছুরও পরিবর্তন আনতে পারি, তাহলে বড় পরিবর্তনটি ঠিকই আসবে। আমরা একটি বার যদি কাউকে সহযোগিতার হাতটি বাড়িয়ে দেই, তাহলে পরবর্তীতে আরও হাজার হাত পেয়ে যাবে দুঃখ-দুর্দশায় থাকা সেই অসহায় শহীদ পরিবারগুলো।
তাই আসুন আরো একটিবার আমরা গর্বিত বাংলাদেশি হিসাবে বিশ্ব দরবারে নিজেদের পরিচই করিয়ে দেই এক অন্য বাংলাদেশি হিসেবে। এবারের ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে, আমরা সবাই আরো একটি বার বলি- “আমরা ছাড়া আর কেউ নাই এই পৃথিবীতে, যারা ভাষাকে এত ভালোবাসতে পারে এবং সেই সাথে ভাষা শহীদদেরও।”
সকল ভাষা শহীদদের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা। আমার আজকের এই লেখাটি তাদের জন্যই লিখেছি যে মানুষদের জন্য আজকের এই বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের বাংলা ভাষা।
.
বিঃদ্রঃ আমার এই লেখাটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত আবেগ, অনুভূতি, অভিজ্ঞতার আলোকে লেখা। কোনোভাবেই পাঠকের আবেগ, অনুভূতি, অভিজ্ঞতাকে আঘাত করার উদ্দেশ্যে লেখা নয়। গঠনতান্ত্রিক মতামত সব সময়ের জন্য উৎসাহযোগ্য।

নিতাই বাবু বলেছেনঃ
পাভেল দাদা ঋতুরাজ বসন্তের আগমনে, ভালোবাসার মাসে দারুণ একটা লেখনী উপহার দিলেন। আসলেও দাদা আপবার ভাবনার সাথে আমিও একেক সময় ভাবি! ভাষার মাসে ভাষা শহীদদের মিনারে কোটি কোটি টাকার ফুলের সাথে, জীবিত থাকা ভাষা সৈনিকদের পরিবারদের যদি একটু আমরা দেখতে পারতাম। তাহলে হয়ত ভাষা শহীদদের আত্মা একটু শান্তি পেতো। কিন্তু না, আমরা তা করি না। রাষ্ট্র তা করে কিনা, তা আমার জানা নেই দাদা। আমজনতা না করলেও রাষ্ট্রের তা করা উচিৎ বলে আমি মনে করি।
আবার দেখুন, যারা এই ভাষা রক্ষা করার জন্য রাজপথে বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছে। তাদের কাঙ্ক্ষিত বাংলাভাষাকে আমরা কতটুকু সম্মান করছি? প্রতিটি অফিস আদালতে ব্যাংক, বীমা অফিসে বাংলার কোনও কারবারই নাই। সব বিদেশী ভাষা ইংলিশ। বাংলা শুধু আমাদের মুখেমুখে, অন্তরে ধারণ করে আছে হরেকরকমের বিদেশী ভাষা। দুঃখ হয়, কারণ, আমি একজন বাঙালি তাই।
পাভেল হাসান বলেছেনঃ
প্রিয় নিতাই বাবু ভাইয়া, প্রথমেই শুভেচ্ছা জানাচ্ছি আপনাকে। আমি ভীষণ উচ্ছ্বসিত আপনার মতামত পেয়ে। ভাইয়া আমি যা বলেছি এটা আমার অনেক দিনের ভাবনার কথা। আমি যা পর্যবেক্ষণ করেছি সেটাই বলেছি। সাথে আমার মতামতও তুলে ধরেছি, জানিনা আদৌ সব কিছু বাস্তবায়ন হবে কিনা??? আসলে সরকারের একার পক্ষ্যে অনেক কিছুই দেখা সম্ভব হয়ে উঠেনা, যা একেবারেই সত্য। সেক্ষেত্রে আমাদের সাধারণ মানুষেরই এগিয়ে আসা উচিৎ। আমরা সবাই এক কণ্ঠে একমত হলে সরকার অবশ্যই তা বিবেচনা করবে বলে আশা করি। কিন্তু বেড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে??? এই প্রশ্নটা থেকেই যায়!!! অফিস-আদালতের ব্যাবহারিত ভাষা নিয়ে আর কথা না বলায় ভালো… ভাইয়া আপনি তো এটা বুঝিয়ে দিয়েছেন। তবে পরিবর্তন আসবে একদিন, সেটা আপনাকে বা আমাকে দিয়েই হবে।
সব শেষে অনেক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। ভালো থাকবেন সব সময় ভাইয়া।