ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

আর কয়েকদিন পরেই আমাদের প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। খাবারের দোকান, শপিং মলসহ সব জায়গা জুড়ে ব্যবসায়ীদের পণ্যের পসরা সাজানো শুরু হয়ে গেছে। নানা পন্যের সামগ্রীসহ আলোর ঝলকানি সব জায়গায়। শুধু যেন বিক্রয় শুরু হবার পালা!

গত বছরের পহেলা বৈশাখের ৩-৪ দিন আগের ঘটনা বলছি। পহেলা বৈশাখের আগে একটু ঘুরতে গিয়েছিলাম একটি  শপিং মলে, অবশ্য কিছু দরকারও ছিল। শপিং মলে ঘুরাঘুরি করলে যেসব পাঞ্জাবির দোকান থাকে তাতে বরাবরই আমি একটু ঢুঁ মেরে থাকি। যদিও পাঞ্জাবি আমার তেমন পরা হয়না, তারপরেও কোনও এক বিশেষ কারণে পাঞ্জাবির প্রতি আমার বেশ টান আছে। আমার সেই ভালোলাগার টানে আমাকে টেনে নিয়ে গেলো কোনো একটা দোকানে। পাঞ্জাবিগুলো দেখছিলাম, আর কিছু স্মৃতির কথা মনেমনে বিড়বিড় করছিলাম।

হঠাৎ  আমার একটা পাঞ্জাবির দিকে চোখ গেলো, অবশ্য পাঞ্জাবিটা আগের মাসেও দেখেছিলাম। পাঞ্জাবিটা বেশ দাম ছিল, তো কৌতুলবশত বৈশাখ উৎসব উপলক্ষ্যে কোনো ছাড় আছে কিনা দেখতেই আমার চক্ষু ছানাবড়া। যে পাঞ্জাবিটা শুধু একমাস আগেও ১০০০ টাকা কম ছিলো, সেই একই জিনিসটি মাত্র পহেলা বৈশাখের ৩-৪ দিন আগেই ১০০০ টাকা বেশি দামের কোড দেয়া হয়ে ছিল।

আমি দোকানদারকে ব্যাপারটা জিজ্ঞেস করতেই একটু মুচকি হেসে জানালো, “স্যার সবই তো বুঝেন”।

আমিও উত্তর দিয়েছিলাম, “সবই বুঝতে পেরেছি”।

পহেলা বৈশাখ এখন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ উৎসব। যে উৎসবে এখন ঈদের মতই অনেকেই সরকারি ও বেসরকারি (কিছু ক্ষেত্রে) ভাবে উৎসব ভাতা পেয়ে থাকেন। একদিনের বাঙালি এই উৎসবে মেতে উঠি আমিসহ আমরা সবাই। ৩০০-৪০০ টাকার ইলিশ মাছ ৩০০০-৪০০০ টাকায় কিনি। যে পান্তাভাত ঠাণ্ডা লাগবে বলে বছরে একদিনও হয়তো খাওয়া হয়না সেই পান্তাভাত ৫০০-৬০০ টাকা প্লেট কিনে খেয়ে থাকি। যা হোক, এতো গেল পহেলা বৈশাখের কথা।

এবার আসি আমাদের ঈদ উৎসবের কথায়। গত বছরে বহুল প্রচারিত অনলাইন সংবাদ মাধ্যমের ঈদ উৎসব ভিত্তিক একটি প্রতিবেদন ‘ঢাকার মিরপুর বেনারসি পল্লীর ঈদ মৌসুমেও বেচাকেনার ভাটা’ পড়েছিলাম। সংবাদটি পুরো পড়ে যা বুঝেছিলাম সেটা হলো, গত বছরে ভারতে ভিসা সহজলভ্য হবার কারণে বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষই ভারতে যাচ্ছে তাদের ঈদের কেনাকাটার জন্য। যার ফলে বেনারসি পল্লীর দোকানদারগণ কেনাকাটার ঈদ উৎসবের ভরা মৌসুমে অলস সময় পার করেছেন। বেচাকেনা নাকি নেই বললেই চলে (দোকানদারগণের ভাষ্য মতে)। এমন কি আমি অন্যান্য কয়েকটি সংবাদ মাধ্যমগুলোতেও বিভিন্ন বাজারের প্রেক্ষাপট নিয়ে একই ধরণের প্রতিবেদন পড়েছিলাম।

আমার এক বন্ধুর সাথে আলাপ করলাম এই ব্যাপারে। কারণ আমার এই বন্ধুটির ভারতে যাবার অভিজ্ঞতা আছে। তাই ভাবলাম বন্ধুটির কাছে শুনে দেখি আসলে ঘটনা কী? যা শুনলাম তা শোনার পরে আমিও কিছুটা চমকে যাই। ভারতে নাকি কাপড়সহ অন্যান্য জিনিসপত্রের দাম খুবই সহজলভ্য। তারা উৎসবকে ঘিরে অনেক বিশেষ মুল্যছাড় দিয়ে থাকে জিনিসপত্রের দামে।

আমার বন্ধুটি এমনটিও বললো যে, দশ হাজার টাকা দিয়ে ভারতে যা কেনাকাটা করা যাবে সেটা দিয়ে না কি বাংলাদেশে কল্পনাও করা যাবেনা। সববিত্তের (উচ্চ,মধ্য,নিম্ন) মানুষদের জন্য ভারতে বাজার আছে, যেটা বাংলাদেশে আজকাল কমে যাচ্ছে। আমার বন্ধুটি আরও জানালো যে, বাংলাদেশের অনেক দেশীয় ব্র্যান্ড শপের  টি-শার্ট বা শার্ট এর দাম নাকি অন্যান্য দেশের ব্র্যান্ড শপের দামের চেয়ে অনেক কম হয়ে থাকে(বৈদেশিক মুদ্রার হার ভিত্তিতে)।  

এখন আসি মূলকথায়। আমার আজকের এই সম্পূর্ণ লেখাটি আমাদের দেশের ক্রেতা সাধারনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

আমাদের দেশে যে কোনো উৎসবেই জিনিসপত্রের দাম যে বেশি নেয়া হয়ে থাকে, তা আমাদের কারোও অজানা নয়। আমার এই লেখার শুরুতে পড়ে এতক্ষনে বোধহয় বুঝে গেছেন আশা করি। আমি এখনো বুঝতে পারিনা যে কেন এমনটা হয়?

আমাদের দেশের অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের বেধে দেয়া পণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে দেশীয় গ্রাহক-ভোক্তা শ্রেণির বেশিরভাগই ঝুঁকছে বাহিরের দেশে ও তাদের পণ্যের উপরে। যার ফলে আমাদের দেশের টাকা চলে যাচ্ছে বাহিরে।

কিন্তু বাড়তি দাম কেনো নেয়া হয় সেই ধরণের প্রশ্ন করলে ব্যবসায়ীরা কিছু খরা যুক্তি দিয়ে থাকেন। যেমন ধরুন, দোকানের ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, বেতন, উৎসব ভাতাসহ আরো অনেক কিছু।

আমি একজন ক্রেতা হিসাবে একজন ব্যবসায়ীর কাছে প্রশ্ন করতেই পারি-

(১) দেশে ব্যবসায়ীরা যে খরচগুলোর কথা বলেন সেটা কি অন্যদেশে নেই?
(২) আর যদি থেকেই তাহলে তারা কিভাবে বিষয়গুলো সামলে তাদের ব্যবসা বাণিজ্য করে থাকেন?
(৩) উৎপাদন ব্যয় আমাদের দেশে সবচেয়ে কম হয় জানি (সব পণ্যের ক্ষেত্রে নয়) কারণ আমাদের দেশে নাকি সস্তায় মজুর পাওয়া যায়। তাহলে আমাদের দেশের পণ্য কি বিদেশের শ্রম দিয়ে উৎপাদন করা হয়?
(৪) অন্যান্য দেশে কি উৎসব বোনাস দেয় হয় না কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের?
(৫) ভ্যাট তো সব দেশেই আছে। তাহলে কেবল ভ্যাটের কারণে এদেশের পণ্যমূল্য বেশি হবে কেন?

আরও অনেক প্রশ্ন আসছে চিন্তায়। জানিনা কে দিতে পারবেন আমার এই প্রশ্নের উত্তর?

আমাদের বাংলাদেশের ক্রেতাদের বোধহয়  সহনশীলতা সবচেয়ে বেশি। কষ্ট করে উপাৰ্জন করেও বেশি দামে জিনিস কিনে  মুনাফালোভী ব্যবসায়ীর পকেট ভারি করে দেয়।

ক্রেতা হিসাবে আমি নিজেকেও যদি চিন্তা করি তাহলে আমিও চাইবো যে সুলভ মূল্যে ভালো জিনিসটি যেন পাওয়া যায়। এখানে অপরাধের কিছু নেই। ক্রেতার এই ধরণের বৈশিষ্ট্য থাকবে এটাই স্বাভাবিক এবং এটি সব দেশের ক্রেতার ক্ষেত্রেই থাকবে।

গত বছরে দেখেছি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের ভিসা সহজ হবার কারণে হয়তো আমাদের মধ্যে অনেকেই সেখানে গিয়েছি অনায়াসে। আর সেখানে যাবার ফলে আমরা দামের বিভিন্ন চুলচেরা বিশ্লেষণ করে থাকছি। এটা ভালো না, ওটা ভালো না, এইটার দাম বেশি, ঐটার দাম কম এই রকম বিভিন্ন কথা। ফেসবুকে এমন অনেকেই আছেন যেখানে উন্নত বিশ্বের কিছু দেশের পণ্যের দামের তুলনা করে পোস্ট দিয়েছেন, যা আমি নিজেও দেখেছি।

কিন্তু আমার কথা সেটা নয়। কিছুটা ভিন্ন। ধরুন ভারতের ভিসা বন্ধ করে দিলেন সেই দেশের সরকার প্রধান। তাহলে আমার কিছু প্রশ্ন ক্রেতা সাধারণের প্রতি – তাহলে আমরা কেনাকাটার জন্য কোথায় যাবো? তখন কি অন্য দেশ খুঁজবো? এভাবে কয়টা দেশ খুঁজবো? আর সব সময় কি কেনাকাটার জন্য অন্য দেশে যেতে হবে বা যেতে পারবো? তাহলে নিজের দেশে কি কিছুই কেনা যাবে না?

আমার উত্তরটা হচ্ছে, হ্যাঁ।

অবশ্যই নিজের দেশেই আমরা সব ধরণের কেনাকাটা করবো এবং করতে হবে। তাহলে দেশের টাকা দেশেই যেমন থাকবে তেমনি দেশেরও ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতি সাধন হবে। আমাদের প্রত্যেক নাগরিকের উচিত দেশের বাজার থেকে পণ্য কেনা। তবে সেটা অবশ্যই যথাযথ দাম দিয়ে, বেশি দাম দিয়ে নয়।

আর তাই ক্রেতাসাধারণ মানুষের প্রতি আমার কিছু কথা তুলে ধরছি।

ক্ষুধা লাগে বলে আমরা যেমন খাই, আমরা বেশি দাম দিয়ে জিনিস কিনি বলে ব্যবসায়ীরা বেশি দাম রাখার সাহস দেখায়। আমরাতো প্রতিবারই বেশি যে দাম দিয়ে পণ্য কিনে অসাধু ব্যবসায়ীর পকেট ভারী করে থাকি, কিন্তু আমরা একবার যদি বেশি দাম দিয়ে কিছু না কিনি তাহলে ভেবে দেখুন তো কী হতে পারে?

বেশি দামে যে শুধু ঈদ উৎসবেই কেনাকাটা হয় ঠিক তা নয়, এটা কিন্তু পহেলা বৈশাখসহ বাংলাদেশে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের উৎসবের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা দেখা যায়। আমাদের বাংলাদেশই সম্ভবত একটি দেশ যেখানে উৎসব হলে জিনিসপত্রের দাম দ্বিগুণহারে বেড়ে যায়। যেটা পৃথিবীর আর কোনো দেশেই হয়না, এমনকি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ মধ্যপ্রাচ্যেও  বিভিন্ন উৎসবে দামে অনেক ছাড় পাওয়া যায়, যা আমি অনেকেরই মুখে শুনেছি। যা বাংলাদেশে কল্পনাও করা যায়না।

আমার এই লেখাটি পড়ে অনেকেরই মনে একটা কথা উঠতে পারে যে, তাই বলে কি আমরা কোনো উৎসব পালন করবো না?

আমি বলবো, অবশ্যই পালন করবো। কিন্তু খুশির উৎসবটা খুশির হলেই ভালো, সেটা যেন কোনো বিশেষ দামের দামি উৎসব না হয়। সামান্য একটা পাঞ্জাবি, শাড়ি, অন্যান্য পোশাক অথবা যে কোনো খাদ্যদ্রব্যের দাম যদি দ্বিগুণ হয় তাহলে, যার বেতন না বেড়ে যদি খরচ বেড়ে যায় তাহলে সে কীভাবে চলবে?

অবশ্যই তার আয়ের বাড়তি উৎস থাকতে হবে। সেটা বৈধ ও অবৈধ দুই ভাবেই হতে পারে। অবশ্য আমাদের দেশে অবৈধ উপায় একটু বেশিই জনপ্রিয়। কিন্তু একজন সৎলোকের (অবৈধ উপার্জন যার নেই) কথা চিন্তা করুন তো সে কি করবে?

আমি মনে করি একজন সৎ লোকের দ্বিগুণ দামে কোনোকিছু কেনার উপায় থাকেনা। তাহলে কি উনার জন্য কোনো উৎসব হবে না?

আমরা যদি একজন বেশি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীর কাছে থেকে বেশি দাম দিয়ে জিনিসপত্র কেনাকাটা করি তাহলে ওই মুনাফালোভী ব্যবসায়ী মানুষটি কখনোই দাম কমানোর কথা চিন্তা করবে না। বরং সে সুযোগের অপব্যবহারে দাম সব সময় বাড়ানোর কথা চিন্তা করবে। কিন্তু আমাদের যাদের সামর্থ্য আছে তারা বেশি দাম দিয়ে জিনিসটি কিনে তাদের সমস্যায় ফেলছি, যাদের অতিরিক্ত দাম দিয়ে ওই একই জিনিসটি কেনা সম্ভব নয়।

আমাদের এই ন্যায্য দাম ছাড়া বেশিদাম দিয়ে জিনিস কেনার ঐতিহ্য থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

এই মুহূর্তে একটি দেশের ঘটনা খুব মনে পড়ছে। একবার ব্যবসায়ীরা এক জোট হয়ে চিনির দাম বাড়িয়ে দিয়েছিলো সম্ভবত কোনো বিশেষ মুনাফা বা বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য। দাম বাড়ানোর পরে ভোক্তাকুল এর অনেক সমস্যায় পড়তে হয় এই চিনির চাহিদা অনুযায়ী তার দাম মেটাতে। পরে একজন রাষ্ট্রীয়নেতার উৎসাহে ওই দেশের ভোক্তাবৃন্দ যারা ছিলেন তারা সবাই চিনির ব্যবহার এতটাই কমিয়েছিলেন যে পরে চিনির দাম এমনিতেই কমাতে হয়েছিল সেই মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের। আমাদের বাংলাদেশেও একজন প্রাক্তন বাণিজ্যমন্ত্রীর কথা মনে পড়ছে, যিনি “একটু কম খাবেন” বলে বেশ আলোচিত হয়েছিল। আমরা দেশবাসী সেই সময় সবাই উনার উপরে বেশ ক্ষিপ্ত হয়েছিলাম।

কিন্তু এখন উৎসবের সময় জিনিসপত্রের অতিরিক্ত দাম দেখে মনে হয়, আসলেই তো আমরা যদি কোনো জিনিসের দাম অতিরিক্ত নেয়া হচ্ছে দেখি তাহলে একটু কম খেতেই পারি বা পরতে পারি। তাতে খুব বেশি ক্ষতি হবে না। লাভ যা হবে আমাদের, তা হচ্ছে ভবিষ্যতে বেশি মুনাফালোভী বা কালোবাজারিরা বেশি দাম নেবার সাহস দেখাবেনা।

একটা উৎসবে বাড়তি দামে জিনিসপত্র কেনা থেকে বিরত থাকলে কী হবে এমন? আসুন, আমরা সবাই বেশি দামে যে কোনো জিনিসপত্র ক্রয়-বিক্রয়কে অনুৎসাহিত করি। দেখবেন আর কেউ বেশি দামে জিনিস কিনতে পারেনি বলে আফসোস করবে না। তখনই আমাদের উৎসবটা টাকার অংকে দামি না হয়ে, খুশির উৎসব এ পরিণত হবে।

এখন আমাদের ক্রেতা সাধারণের উচিত একটা পরিবর্তন দিয়ে নতুন ‍উৎসব শুরু করা।তাহলে সবকিছু পরিবর্তন হয়ে যাবে। পরিবর্তন চাইলেই সম্ভব। তার জন্য চাই একটু সচেতনতা।