ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

 

অনেক মানুষের ভিড় জমেছে, ভিড়ের মাঝখানে একটি পুলিশের গাড়ি। পুলিশের গাড়িতে বন্দি আসামী। পুলিশ সদস্যদেরও হিমশিম খেতে হচ্ছে মানুষের জটলা ঠেলে সামনে এগোতে। ভিড়ের মধ্যে কেউ কেউ বলছে ফাঁসি চাই… ফাঁসি চাই। হাতকড়া পরা অপরাধী মাথা নিচু করে গাড়ি থেকে নেমে সামনের দিকে যাচ্ছে আর তার দিকে তেড়ে মারতে আসা লোকজনের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। আবার কেউ কেউ জুতোও ছুঁড়ছে। চারপাশে ততক্ষনে অনেক টিভি ও সংবাদপত্রের কর্মীদের ভিড় জমে গেছে। যে যার মতো  সংবাদ সংগ্রহের কাজ করে যাচ্ছে।

অল্প অল্প কিছু আবহ সুর। অল্প কিছুক্ষণ পরেই অন্ধকার। আর তার পরেই বড় বড় অক্ষরে ভেসে উঠলো পর্দায় আগুন ঝলসানো দহন

সত্য ঘটনার অনুপ্রেরণায় নির্মিত ‘দহন’ সিনেমার প্রথম দৃশ্যের কথা বলছি। দহন সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন পোড়ামন-২ খ্যাত রায়হান রাফি ও প্রযোজনা ও পরিবেশনা করে জাজ মাল্টিমিডিয়া। সিনেমাটিতে অভিনয় করেছেন সিয়াম, পুজা, মম, ফজলুর রহমান বাবুসহ আরও অনেকে।

বাংলাদেশে সত্য ঘটনায় অনুপ্রাণিত কিংবা অবলম্বনে সিনেমা তেমন একটা নির্মাণ হয়না বললেই চলে। পর পর সিনেমার কাস্টিং পরিবর্তন ও ট্রেলার প্রকাশিত হবার পর থেকেই বেশ আলোচিত ও সমালোচিত হয়েছে দহন সিনেমাটি। বিশেষ করে সিনেমায় ব্যবহৃত ‘হাজির বিরিয়ানি’ খ্যাত বিশেষ একটি গান নিয়ে। তাই আগ্রহের পারদ না বাড়িয়ে আবারও কর্মব্যস্ততার চুপিসারে মুক্তির এক সপ্তাহ পরেই সিনেমাটি দেখার সুযোগ করে নিলাম।

সিনেমার চমৎকার আবহ সঙ্গীতসমৃদ্ধ কাহিনীর দৃশ্যায়নই এই সিনেমার মূল আকর্ষণ। সিনেমায় মূলত সমাজের নোংরা পরিবেশে গড়ে উঠা এক বখাটে যুবক তুলা ও গার্মেন্টস কর্মী আশার পরিণয় ও পরিণতি দেখানো হয়েছে। দহনে ছিল কয়েকটি পরিবারের স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হবার গল্প ও নোংরা রাজনীতির আগ্রাসী চিত্র।

বছর কয়েক আগে রাজধানী ঢাকার রাজনৈতিক হরতাল অবরোধের প্রেক্ষাপটই ছিল দহনের মূল বিষয়বস্তু। সিনেমার কাহিনী নিয়ে আর বেশি কিছু না বলাই শ্রেয়। কারণ দর্শকদের প্রেক্ষাগৃহে গিয়েই সিনেমার মূল্যায়ন করতে হবে ।

পরিচালক রায়হান রাফির পরিচালিত দ্বিতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা এটি। প্রথম সিনেমার সাফল্যের পরে দ্বিতীয় সিনেমাতেও করলেন বাজিমাত। সিনেমাটি নির্মাণে তার যথেষ্ট পেশাদারিত্ব রয়েছে সেটা বুঝেই হল থেকে বেরিয়েছে দর্শক।

সিনেমায় অল্পক্ষণের একটি দৃশ্যেও দেখা যায় দহন নির্মাতাকে। পরিচালকের ক্ষণ উপস্থিতি আমাকে  স্পাইডারম্যান খ্যাত মারভেল কমিক সিরিজের সদ্য প্রয়াত লেখক স্ট্যানলির কথা কিছুটা মনে করিয়ে দিয়েছে। উনাকেও মারভেলের অনেক পর্বে ছোট ছোট অতিথি চরিত্রে দেখা যেতো। ঠিক এইরকম কিছু অতিথি চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের চমকে দিতেন বাংলাদেশের আরেক প্রয়াত চিত্র পরিচালক শহিদুল ইসলাম খোকন।

দহনে অভিনয় করেন তুলার চরিত্রে পোড়ামন-২ খ্যাত অভিনেতা সিয়াম। সিনেমার কাহিনী প্রয়োজনে নিজেকে অনেক প্রস্তুত করতে হয়েছে বলেই বুঝতে পেরেছি তার অভিনয় দেখে। ভালো অভিনয়ের জন্য সিয়াম  প্রশংসার দাবী রাখেন, আমার পাশে বসা এক ভদ্রলোক বলছিলেন আমাকে । আমিও তার সাথে দ্বিমত পোষণ করিনি। হাজির বিরিয়ানি গানেই তাকে বেশ লেগেছে, একথা আবারও  বলতে হবে।

সিনেমার বিশেষ একটি সাংবাদিক চরিত্রে রুপদান করেন অভিনেত্রী মম। তবে পর্দায় তার উপস্থিতি অনেক কম। উনি অভিনয় ভালো করেছেন, তবে সিনেমার পরিচালক, কাহিনিকার উনার সিনেমার চরিত্রটা নিয়ে খুব একটা ভাবেনি বলেই বোঝা গেলো। খুব দায়সারা একটি চরিত্র লেগেছে।

একজন গার্মেন্টসকর্মী রুপে হাজির হলেন সিনেমার অন্য একটি মূল চরিত্রে অভিনেত্রী পুজাকে। যথেষ্ট পরিপক্ক ও সাবলীল অভিনয় করেছেন।

সিনেমার একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন জনপ্রিয় অভিনেতা ফজলুর রহমান বাবু। বাবু চরিত্রের প্রয়োজনে নিজেকে বেশ ভালোভাবেই ভাঙতে পারেন সেটা খুব জোরালো ভাবে তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন। তবে খল চরিত্রে অভিনয়ের জন্য নতুন একজন পাবে বাংলাদেশি সিনেমা দর্শক যদি তিনি নিয়মিত ভাবেই খল চরিত্রে অভিনয় করেন।

সিনেমায় বিশেষ দুটি অতিথি চরিত্রে ছিল পদ্মা নদীর মাঝির কুবের খ্যাত রাইসুল ইসলাম আসাদ ও জাহিদ হোসেন শোভন।

দহন সিনেমার বেদনাদায়ক দৃশ্যগুলো বেশ আবেগঘন, হলভর্তি দর্শকের নীরবতাই যেন সেটা প্রমাণ করছিলো। সিনেমার আবহ সঙ্গীতের কাজ এক কথায় চমৎকার। বাংলাদেশের সিনেমাগুলোতে আবহ সঙ্গীতের দিকটা খুব অবহেলিত।  দহন পরিবার এই দিক থেকে বেশ সচেতন ছিলেন।

সিরিয়াস কাহিনীর সিনেমায় কমেডি দৃশ্য ও সংলাপ থাকবে এটা আশা করা হয়ত বিলাসিতাই। অথচ দহনের পরিচালকসহ সিনেমার কেউই নিরাশ করেনি দর্শকদের।

সিনেমার মোট চারটি গান থাকলেও আমি পুরো সিনেমায় তিনটি গান দেখলাম। গানের দৃশ্যায়ন চমৎকার। তবে হাজির বিরিয়ানি গানটি যে দর্শক খুব ভালো ভাবেই গ্রহন করেছে তা গানটি চলাকালীন সময়ে দর্শকের উচ্ছ্বাস ছিলো বেশ সরব। এই গানটিতে সিয়ামও ভালো করেছেন তার চরিত্র অনুযায়ী।

দহনে চিত্রগ্রহণের কাজ ছিল বেশ প্রশংসাদায়ক। হরতালে গাড়ি পোড়ানোর দৃশ্যটি  আবেগপূর্ণ ছিল। জরুরি অবস্থা ও হরতালের দৃশ্যগুলোও ভালো হয়েছে। তবে কিছু টিভি আর্কাইভ ফুটেজ ব্যবহার করা হয়েছে সেটাও স্পষ্ট ছিল।

সিনেমার রূপসজ্জা ও পোশাকের কাজে মানানসই ছিল। কাহিনীর প্রয়োজনে দহনের আউটডোরের লোকেশন অনেক বাস্তবসম্মত মনে হয়েছে।

আমি যখন দহন এর টিকেট সংগ্রহ করার সারিতে ঠিক তখনই একজন বলছিলেন, আরে বন্ধু সিনেমার ট্রেলার দেইখা বুঝ নাই সিনেমাতে কী হইব? আমি কিন্তু বুইঝা গেছি কী হইব?

তখন সাথে থাকা আর একজন বলছিলেন যে, তাতে কী হইছে? সিনেমাটা কেমন বানাইল দেখবনা?

এই আলাপটা তুলে ধরার উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের সিনেমার ট্রেইলার হয়ত অনেকটা উন্নত করতেই হবে। সিনেমার কাহিনীচিত্রে কিছুটা রহস্যময়তা থাকবে এটা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু এই কাহিনীরহস্য যদি সিনেমা দেখার আগেই দর্শক প্রায় পুরোটা বুঝে যায় তবে তা  দুঃখের বিষয়।

আমিও দহনের ট্রেইলার দেখে যে কিছুই বুঝতে পারিনি সেটা কিন্তু ঠিক নয়।

হল বিমুখ দর্শকদের হলে ফেরাতে দহন হালের সিনেমার ধারাবাহিকতায় আরেকটি ভালো প্রচেষ্টা।