ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

“মা গো মা ভাবনা কেন, আমরা তোমার শান্তি প্রিয় শান্ত ছেলে, তবু শত্রু এলে অস্ত্র হাতে লড়তে জানি, তোমার ভয় নেই মা আমরা প্রতিবাদ করতে জানি”- খুব মনে পড়ছে এই গানের কথা গুলো। তবে এর সাথে আমি একটু যোগ করতে চাই, আমরা শুধু প্রতিবাদ করতে না প্রতিরোধ করতেও জানি। ১৯৭১ সালে যেসব বুনো শকুনের লোলুভ চোখ পড়েছিল আমাদের মা-বোনদের উপর, যেসব হায়নার দলেরা তাদের কায়েমি স্বার্থ বাস্তবায়নের নীল নকশা অনুসারে হত্যা করেছিল এদেশের মুক্তিকামী জনতাকে, তারা আজ সংগঠিত হয়ে অপমান করছে আমাদের তীব্র আবেগের পবিত্র মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে। তারা স্বাধীন বাংলাদেশে লাল-সবুজ পতাকা গাড়িতে লাগিয়ে বীরদর্পে ঘুরে বেড়িয়েছে ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত ভেজা পূন্যভূমির উপর দিয়ে। এক প্রচন্ড ক্ষোভ, ঘৃণা আর অপমান বোধ নিয়ে এতদিন দেখে আসছিলাম সেইসব ঘাতক আর তাদের দোসরদের আস্ফালন। আর দেখছিলাম তাদেরকে বাঁচানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত কিছু মানুষকে, যাদের কেউ কেউ ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা। আজ সেই দেখার দিন শেষ, আজ আমরা গর্জে উঠেছি। আমাদের এই গর্জন ফিরিয়ে এনেছে ‘৭১-এর সেই বজ্রকঠিন শপথকে, প্রিয় মাত্রিভূমিকে সব কালো থাবার হাত থেকে রক্ষা করার মিশন নিয়ে। তখন আমরা ছিলাম সাড়ে সাত কোটি, আজ আমরা ১৬ কোটি। আমাদের হারাবে এমন শক্তি কার? বলা হচ্ছে শাহবাগের আন্দোলনে কোন রাজনৈতিক নেতৃত্ব থাকবে না, এটার কারন হলো সাধারণ মানুষ আমাদের রাজনীতিবিদদের খুব সন্দেহ আর অবিশ্বাসের চোখে দেখে। যেখানে দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল জামাত-শিবিরকে সাথে নিয়ে জোট করে, সেখানে এই ধারণা খুব স্বাভাবিক। আর ক্ষমতায় থাকা দলটির কর্মকান্ড এমন কিছু নয় যে তাদের উপর মানুষের ‘৭১-এর আগের সময়ের মত বিশ্বাস থাকবে। আর তাই এই মহান আন্দোলনের সূচনা করার গুরুদায়িত্ব নিল দুর্বিনীত তরুণ সমাজ। আমি আমার অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে ধন্যবাদ জানাই শাহাবাগে যেসব মানুষ গিয়েছেন এবং সংহতি প্রকাশ করেছেন। আমাদের বিচার ব্যবস্থা স্বাধীন, কাদের মোল্লার বিরদ্ধে যে রায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ দিয়েছেন তা প্রসিকিউশনের উপস্থাপিত যুক্তি এবং প্রমানের ভিত্তিতে। রায়ে যখন ফাঁসি হয় নাই, আমাদের ধরে নিতে হবে প্রসিকিউশনের দূর্বলতা ছিল, আপীল করার সময় তাই আরো সতর্ক থাকতে হবে। নিজামী,মুজাহিদ, গোলাম আজম, কাদের মোল্লারা যদি রাজাকার না হয়, তাহলে রাজাকার কারা?কারা সাহায্য করেছিল পাক-হানাদার বাহিনীকে?এদের যখন বিচার চলছে তখন সর্বচ্চো শাস্তি হওয়া কি কাম্য নয়? আমরা জানি জোর করে কাউকে স্বাধীন দেশে ফাঁসি দেয়া যায় না, কিন্তু বিচারের সময় যদি নারকীয় গণহত্যা, তান্ডব আর ধর্ষণের সেসব কথা মনে রাখা না হয়, যদি এটা মনে রাখা না হয় যে ৪২ বছর পর সব আলামত আর সাক্ষী একই রকম ভাবে পাওয়া সম্ভব নয় তা হলে একটা বড় ভুল হয়ে যাবে। আর সেই ভুলের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে পড়বে আমাদের সমাজে। কিন্তু আমরা জেগে আছি, আমরা সমাজকে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাঁচিয়ে রাখবই। আমরা হয়তো রায় পাল্টাতে পারবো না, কিন্তু আমরা বর্জন করতে পারবো স্বাধীনতা বিরোধী সকল অপশক্তিকে। আমরা আজ জেগে আছি, আমাদের এই জাগরণ এক নতুন বাংলাদেশ গড়ার, যেখানে কোন যুদ্ধাপরাধীদের স্থান হবে না। ছাত্র-জনতার এই জাগরণ অবশ্যই প্রত্যাশিত ফল বয়ে আনবে। হুমায়ুন আহমেদের “তুই রাজাকার” এখন যেমন আমাদের জাতীয় স্লোগান তেমনি তার একটি লেখার কথাও আমি মনে করিয়ে দিতে চাই। উনি লিখেছিলেন “এরশাদ একটা আইন করেছিলেন, সব সাইনবোর্ড বাংলায় লিখতে হবে, কেউ চাইলে ইংলিশেও লিখতে পারবে তবে বাংলা আগে থাকতে হবে”। আমরা যদি সেই আইন নিজেরাই বাস্তবায়ন করতাম তাহলে আমাদের সেই সুমহান চেতনার কাছে অনেক আগেই হার মানত ‘৭১-এর পরাজিত শক্তি। তবে আবার আমরা এক হয়েছি, এবার সময় দেখিয়ে দেবার। আমাদেরকে পারতেই হবে।