ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

#‎অষ্টম‬ পে-স্কেলে বৈষম্য আর কামলা ও গাধা কাহিনী

১) পুরোনো গল্প দিয়েই শুরু করি। পথযাত্রায় স্বামী -স্ত্রী গাধার পিঠে করে শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছেন। আশেপাশের লোকগুলো সেটা দেখে সমালোচনায় মুখর! দেখছো কাজকারবার? মানুষের মায়া মহব্বত, সবই গেল গেল! দুজন মানুষ একটা গাধার পিঠে যাচ্ছে, কোন দরদ নাই। এটা শুনে স্বামী বেছারা গাধার পিঠ থেকে নেমে গেল। সে গাধার দড়ি হাতে নিয়ে হাঁটতে লাগল স্ত্রীকে গাধার পিঠে দিয়ে।

কিছুক্ষণ পর আরো কিছু লোক এই দৃশ্য দেখে যারপরনাই হাসাহাসি শুরু করল। তারা বলতেছিল, “ দেখো এক বলদ লোককে। স্ত্রীকে গাধার পিঠে দিয়ে নিজে হেঁটে যাচ্ছে!” এটা শুনে স্ত্রীর সম্মানে খুব লাগল। স্ত্রী গাধার পিঠ থেকে নেমে স্বামীকে বলল, “তুমি গাধার উপরে উঠ।“ স্বামী বেচারা গাধার উপরে উঠে আরো কিছুদুর যাবার পর কিছু লোক উষ্মা প্রকাশ করল! লোকজন বলাবলি করতে লাগল, “বলদ স্বামীটা মহিলা মানুষকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।“ তখন তারা দুজনে সিদ্ধান্ত নিল যে দুজনেই হেঁটে যাবে। যেই ভাবা সেই কাজ। গাধাকে সাথে নিয়ে তারা হেঁটেই রওয়ানা দিল। পথিমধ্যে আরো কিছু লোক এ দৃশ্য দেখে ব্যঙ্গ করে বলতেছিল, দেখ! দুই বলদকে। গাধা আছে সাথে অথচ নিজেরা হেঁটে যাচ্ছে। দুজনে ত্যাক্ত বিরক্ত হয়ে সিদ্ধান্ত নিল যে তারা গাধাকেই পিঠে করে নিয়ে যাবে তাইলে হয়ত সবাই ভাল ভাববে, মহানুভব ভাববে। তারা তখন দুজনেই গাধাকে পিঠে করে হাটতে শুরু করল।

এ দৃশ্য দেখে মানুষের হাসিতে পেট ফেটে যাবার উপক্রম। মানুষ বলাবলি করতে লাগল যে দুজন গাধা আরেকটা গাধাকে পিঠে করে নিয়ে যাচ্ছে! আমাদের কিছু মানুষের সমস্যা হচ্ছে উপরের গল্পের মতই। আপনি যাই করেন সমালোচনা হবেই। সেটা ভাল হলেও করবে, না হলেও করবে। একদল নিন্দুক সবসময় আপনার পিছনে, সামনে, চারিদিকে সমালোচনার জন্য থাকবেই।
মোরালঃ আপনি যাই করেন, সমালোচনা থাকবেই।

২) উপরোক্ত, গল্পটা বলছিলাম অষ্ঠম পে-স্কেলের মন্ত্রীসভায় অনুমোদনের পর মর্যাদা নিয়ে টানাটানি, সচিবের সমান কেন হইলাম না, কেন টাইম স্কেল-সিলেকশন গ্রেড আরো নানা বিষয় নিয়ে ত্যানা প্যাছাইতে প্যাছাইতে পরিবেশটাকে গুমোট করে ফেলার জন্য। দীর্ঘ ডিসকাশন, আলোচনা ও গবেষণা করে অত্যন্ত মেধাবী একজন অর্থনীতিবিদ ড. ফরাশ উদ্দিনের নেতৃত্বে পে কমিশন বেতন প্রায় দিগুন করে যুগোপযোগী একটা পে-স্কেল সুপারিশ করেছেন। সে সুপারিশের আলোকে বাস্তবতার যৎসামান্যই কাট-ছাট করে আরেক মেধাবী মাননীয় অর্থমন্ত্রী এটাকে বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছেন এবং সর্বশেষ অষ্ঠম পে স্কেল মন্ত্রী সভায় অনুমোদিত হয়েছে। কোথায় আমরা খুশি হয়ে সরকারকে ধন্যবাদ জানাবো না উল্টো আমরা পড়ে আছি সমালোচনায় মুখর হয়ে। তাও সমালোচনা কি? আমি কেন সচিবের সমান হইতে পারলাম না! আমার মান থাকল না। আমার এই গেল, ঐ গেল। সব আমলারা নিয়ে নিয়েছেন ইত্যাদি ইত্যাদি!
পে –স্কেলের অনেক সুযোগ সুবিধা এখনই পুরোপুরি প্রকাশ হয় নাই। গেজেট হলে সুস্পষ্ট ভাবে বুঝা যাবে। তবে সকল ধরণের সুবিধাই বাড়ছে বলে মনে হচ্ছে। এটা সবার জন্যই সুখবর। পে-স্কেলে সার্ভিসের ভিন্নতার কারণে হয়ত কেউ কেউ কিছুটা ফ্যাভার পাবেন কেউ কেউ হয়ত কিছুটা বঞ্চিত হবেন সেটাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। কারণ একটা ইউনিক পে-স্কেল সবার জন্য ফিট নাও হতে পারে তবে সেক্ষেত্রে স্ট্যাটিস্টিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সিটা যৎসামান্যই । প্রত্যেক সার্ভিসের কিছু ইনহেরেন্ট বৈশিষ্টের কারণে কেউ কেউ বেতন ছাড়াও লাখ লাখ টাকা কামাচ্ছেন কিন্তু কেউ দিনরাত কাজ করে বেতন ছাড়া আর কিছুই পাচ্ছেন না। আর এক্ষেত্রে যারা আন্দোলন করছেন তারাই এর সুবিধাভোগী। একজন এ.এস.পি , একজন সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ২৪ ঘন্টা ডিউটি করে যদি একটু বেশি সুযোগ আশা করে সেটা কি অন্যায় হয়ে যাবে? আপনি ৯-৫ টার ডিউটিও করেন না ঠিকমত কিন্তু কেউ কেউ ২৪ ঘন্টা স্ট্যান্ডবাই ডিউটি করে যাচ্ছে এবং বেতন ছাড়া আর আহামরি কিছু পাচ্ছে না। অথচ একই সময়ে প্রাইভেট প্রাক্টিস, টিউশন, অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে সময় দিয়ে আপনি লাখ লাখ টাকা আপনি কামাই করছেন সেটা বলতে চান না। এ সব সুযোগ নিয়েই আপনি ‘আগার টা খেয়ে গোড়ার টা খেতে চান’ মানে শেষ বেলায় সচিব ও হইতে চান!
যাই হউক, এসব নিয়ে আসলে কথা বলে খুব একটা ফায়দা হবে বলে মনে হচ্ছে না। কারণ খুব কম মানুষই আছেন যারা নিরপেক্ষ পজিশন থেকে বিচার করে থাকেন। আমি শিক্ষক হলে শিক্ষকতার পক্ষে, ডাক্তার হলে আমার পেশাকেই অন্যের সামনে তুলে ধরব এটাই স্বাভাবিক। তবে কিছু বিষয় আমার কাছে হাস্যকর মনে হয়েছে। সে বিষয়ে কিছু বলতে ইচ্ছে করছে।

৩) একটা নতুন বিষয় যখন এক্সিকিউট করা হয় তখন এটার অনেক সমালোচনা হয়, হবে সেটাই স্বাভাবিক। যারা কনফিডেন্ট, মেধাবী, এবং ডিটারমাইন্ড তারা এসব সমালোচনাকে থোড়াই পাত্তা দেন। কারণ তারা জানেন তারা যা করছেন তা ভাল কিছুই করছেন, নতুন কিছুই করছেন এবং তারা সফলতা নিয়ে আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান থাকেন। এ প্রসঙ্গে আমি সাবেক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সচিব এবং বর্তমানে মাননীয় শিক্ষা সচিব এন.আই.খান (নজরুল ইসলাম খান) স্যারের উদ্যোগের কথা না বলেই পারছি না। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে যে লোকটার কথা সবাই মনে রাখবেন অন্তত যারা ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে কাজ করছে তারা জানেন যে এন.আই খান স্যার আইসিটি বিনির্মাণে কি করে গেছেন। একটা দেশের ভিত্তিই পালটে দিয়েছেন এ মেধাবী আমলা। দেশের পলিসি মেকাররা যদি মেধাবী হয় তাহলে কত দ্রুত যে দেশের চেহারা পালটে দেয়া সম্ভব তার জ্বলন্ত প্রমান এন.আই.খান। আজ আইসিটি বাংলাদেশের অন্যতম বর্ধনশীল সেক্টর। দেশের প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে ডিজিটাল সেন্টার বিনির্মাণ করে আধুনিক প্রযুক্তির সেবা শিক্ষায় পিছিয়ে থাকা একটা জাতির কাছে পৌছে দিয়েছে এ সরকার। এ ডিজিটাল সেন্টার থেকে ইন্টারনেট সেবাসহ সকল ধরণের সুবিধা প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ নিতে পারছে। ডিজিটাল সেন্টারগুলোর মাধ্যমে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে নারী উদোক্তা বাধ্যতামূলক রাখা হয়েছে। এতে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হয়েছে। আর এতে এ দেশের সকল শ্রেনী পেশার মানুষ ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের সাথে সম্পৃক্ত হতে পেরেছেন। এ বিরাট কর্মযজ্ঞে বাস্তবায়নে কিন্তু নেতৃত্ব দিচ্ছেন অনেকেরই অপ্রিয়, অনেকের মতে অদক্ষ, অকর্মট আমলারা! যাই হউক, একজন এন.আই খান স্যার (আমলাদের গৌরব, দেশের ও নয় কি?) বেঁচে থাকবেন বাংলাদেশের ডিজিটাল সেবাপ্রেমী মানুষের কাছে।

৪) বলছিলাম, এন.আই খান স্যারের কথা। এত ট্যালেন্ট একজন লোককেও আমরা আমাদের অজ্ঞতার জন্য, ধৈর্যচ্যুতির জন্য একটুও ছাড় দেই নাই! স্যার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে যোগদান করেই প্রমোশন, শিক্ষায় ডিজিটালাইজেশন, মাল্টিমিডিয়া ক্লাস নিয়ে অতি অল্প সময়ে দ্রুত বেশ কিছু উদ্যোগ নিলেন। দ্রুতই স্যার শিক্ষা সেক্টরে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিলেন। অনেকেই আশার আলো দেখতে লাগলেন। কিন্তু সমস্যা শুরু হলো স্যার যখন কিছু অব্যবস্থাপনা সংস্কারে হাত দিলেন তখনই। অব্যবস্থাপনা, ভর্তি বানিজ্য বন্ধ ও দেশীয় প্রযুক্তিকে উৎসাহ প্রদানের মাধ্যমে একটি নতুন সিস্টেমের মাধ্যমে কলেজে ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতিতে মনোনিবেশ করলেন। শুধুমাত্র রেজাল্ট দিতে কিছু টেকনিকেল সমস্যা হওয়াতে আমরা মাননীয় সচিব স্যারের সবকিছু উদ্ধার করলাম। আমরা আমাদের সেরা শিক্ষা প্রতিষ্টান বুয়েট ও এর শিক্ষার্থীদেরকে কথা, লেখনীর মাধ্যমে তুলোধুনো করলাম। প্রশ্ন করলাম তাদের যোগ্যতা নিয়ে। শিক্ষা সচিব মহোদয়কে পারলে আমরা মাঠিতে নামিয়ে আনি। অথচ এ লোকটা বিশাল ভর্তি বানিজ্য বন্ধ করে গরীব ছাত্রদের সুশৃঙ্খল ভাবে ভর্তির সুযোগ করে দিয়েছেন, দাড় করিয়ে দিয়েছেন একটা নতুন সিস্টেম। নানা রকমের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি থেকে কোমলমতি ছাত্র ও তাদের অভিভাবককে রক্ষা করলেন। কিন্তু এ সবই সে সব সমালোচকদের চোখে পড়বে কেন? তাদের যে পকেট ভারী করার সুযোগ শেষ করে দিয়েছেন সচিব মহোদয়। আর কিছু লোক আছেন সমালোচনা করতে হবেই তাই করা। কিছু মানুষ আছেন অত্যন্ত ধৈর্য হারা লোক। তারা নতুন কিছু চান , ভাল কিছু চান কিন্তু এর জন্য সাময়িক কষ্টও নিতে চান না।
এ প্রসঙ্গে বলতে চাই শ্রদ্ধেয় ড. জাফর ইকবাল স্যারের কথা যার হাত ধরে মোবাইলের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রক্রিয়ার সূচনা এ দেশে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সিস্টেমের উদ্ভোধন করেন। অথচ শুরুটা এত মসৃণ ছিল না। অনেক সমালোচনা গায়ে মাখতে হয়েছে গুণী এ মানুষকে এবং এ সিস্টেমকে। অথচ আজ প্রায় সকল বিশ্ববিদ্যালয় এ সিস্টেমকে গ্রহন করেছে। শ্রদ্ধেয় ড. জাফর ইকবাল স্যার সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু নানা মুখী সমালোচনার মধ্য দিয়ে এখনো সফল হতে পারছেন না। সমালোচনা কিন্তু সাধারণ কেউ করছেন না। যারা করছেন তারাও খুব জ্ঞানী, বিজ্ঞ লোক এ দেশের। আমি আশা করি, এ সব সমালোচনা একদিন বানের জলে ভেসে যাবে এবং স্যার সাধারণের জন্য সুন্দর এ ব্যবস্থা সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা এ দেশে সূচনা হবে।

৫) আবারো ফিরে যাচ্ছি পে-স্কেলে। পে-স্কেলের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা সমালোচনা হয়ত চলবে। হয়ত ভারসাম্যে আমরা আসব হয়তা ভারসাম্যে আসব না। অর্থনীতির ভাষায় ঘাত প্রতিঘাতের মাধ্যমে একসময় সবাই হয়ত ভারসাম্যে আসবেন। কিন্তু কিছু বিষয় সত্যিই আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে। আমরা এমন কেন?

ক) আমরা এমনই জাতি যে অনেক সুন্দর, মানসম্মত একটা পে –স্কেল পেয়েও আমরা সরকার, মাননীয় অর্থমন্ত্রী, পে কমিশনের কাউকে আমরা ধন্যবাদ জানাই নাই শুধু মাত্র কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমাদের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হয়েছে ভেবে (যদিও ক্ষুণ্ণ হয়েছে কি না সেটা গবেষণার বিষয়)। আমরা নতুন কিছু গ্রহণে এত ভীতু কেন?

খ) পে-স্কেল, সিলেকশন গ্রেড নিয়ে হা হুতাশ, অতিরিক্ত মাতামাতি, এবং এ দুটি সুবিধা তুলে নেওয়াতে বিশেষ বিশেষ ক্যাডারের, বিশেষ বিশেষ সার্ভিসের কিছু অফিসারগণ যেভাবে পাবলিক প্লেস, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ নানা জায়গায় ইচ্ছেমত ঢালাও মন্তব্য করছেন তাতে তারা যে সরকারি কর্মচারী সেটা যেন ভুলে গেছেন। পারলে তারা অর্থমন্ত্রী ও পে কমিশনের চেয়ারম্যানের কাপড় খুলে ফেলেন। তাদের একটাই কথা অর্থমন্ত্রী আমলা ছিলেন তাই তিনি আমলাদের স্বার্থ রক্ষা করেছেন। যদিও আমলারা কোথায় কোথায় বেশি বেনেফিটেড হলেন সেটা বলতে চাইছেন না। তাদের অনেকের প্রশ্ন সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল এ দুটি সুবিধা তুলে দেওয়াতে বিশেষ কিছু ক্যাডার ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন আর আমলারা লাভবান হয়েছেন। আমার প্রশ্ন হচ্ছে এ সুবিধা তো আমলাদের জন্য ও ছিল। তারাও এখন থেকে বঞ্চিত হবেন। এটা তো এমন না যে, আমলাদের জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে আর বাকিদের জন্য তুলে দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া একই ক্যাডারের ও সবাই সিলেকশন গ্রেড পান না। সুতরাং এটা একই ক্যাডারের মধ্যেও বৈষম্য সৃষ্টিকারী। তাছাড়া নতুন একটি সিস্টেম এ দুটি সুবিধা তুলে দেয়া হয়েছে অন্যরকম সুবিধা দিয়ে, এটাও তো আমাদের দেখতে হবে। প্রতি বছর ক্রমবর্ধমান হারে যে ৫% ইনক্রিমেন্ট হবে তা তো সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্ক্লেল রিমুভের ক্ষতি পুষিয়ে দেয়ার কথা। তাছাড়া সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্ক্লেল সবাই না পেলেও নতুন সিস্টেমের সুবিধা সবাই পাচ্ছেন। নতুনকে আমাদের মেনে নিতে শিখতে হবে। কিন্তু দুঃখজনক আমরা নতুনকে মেনে নিতে অভ্যস্থ নই। আমরা পানি খাই ঠিকই কিন্তু গাধার মত পানিকে ঘোলা করে। এক্ষেত্রে এন.আই.খান স্যার ও ড. মু. জাফর ইকবাল স্যারের ইনোভেশনের উপরোক্ত উদাহরণ প্রণিধানযোগ্য।

গ) প্রতেকটা ক্যাডারের, প্রতিটা সার্ভিসের কিছু বৈচিত্রতা আছে। গ্যাসে চাকুরী করলে বছরে তারা প্রফিটের উপর বোনাস দেয়। পুলিশে চাকুরী করলে আপনি রেশন, ঝুকি ভাতা, বিদেশে ফরেন মিশনে যাওয়া সহ বাড়তি কিছু সুবিধা পাবেন। সরকারি কলেজে চাকুরি করলে হাতেগোনা কয়েকটা ক্লাস নিয়ে প্রাইভেট পড়িয়ে মাসে লাখখানেক টাকা আয় করার সুবিধা নিতে পারতেছেন (আমার ব্যাচমেট রা অনেকেই প্রাইভেট পড়ানোর টাকা দিয়ে জমি কিনেছেন আর আমি ডাল ভাতই ঠিকমত জোগাড় করতে পারি না), বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকুরীতে ইচ্ছেমত ক্লাস নেয়ার সুবিধা, দ্রুত প্রমোশন, বিদেশ যাওয়ার অবারিত সুযোগ, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেয়া, ইচ্ছেমত কথা বলার সুযোগ (যা সিভিল সারভেন্টরা পারবেন না) , ডাক্তারগণ প্রাইভেট প্রাক্টিস করার সুবিধা পাচ্ছেন(যদিও তাদের অনেক কষ্ট স্বীকার করতে হয়)। আমরা সবাই এগুলো জেনে শুনেই আমাদের ইচ্ছে, অনিচ্ছায়, কপালগুণে অথবা কপালদোষে আমরা নিজেরা নিজেদের সার্ভিস বেছে নিয়েছি।

এখন প্রশাসন ক্যাডারের একজন যদি বলেন আমি কেন শুক্র-শনিবার ছুটি পাই না, আমাকে কেন ২৪ ঘন্টা স্ট্যান্ডবাই ডিউটির জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়, আমি কেন প্রাইভেট পড়ানোর সুযোগ নিতে পারব না, আমি কেন পুলিশের মত রেশন পাই না সেটা হবে বাতুলতা মাত্র । কারণ প্রশাসন ক্যাডারের ক্যাডারকে জানা এবং মানা উচিত যে এগুলো বলা তার/তাদের কাজ না। রাষ্ট্র কার কাজ কি কি হবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। ঠিক একইভাবে কেউ দাবী করতে পারেন না যে আমি কেন সচিবের সমান হতে পারছি না। আমি কেন সচিব হইতে পারমু না। ক্যাডারের পদক্রমে সচিব হওয়াটা প্রশাসনের পদক্রমে আছে। মহামান্য আদালত একটা রায় দিয়েছেন যেটা নিয়ে আমাদের অনেক ক্যাডারের বন্ধুগণ অবজ্ঞা করেন নিজেদের অজান্তেই বা জেনেশুনেই যা গর্হিত অপরাধ। কোন ক্যাডারের পদসোপানে যদি সচিব পদ না থাকে তাইলে আপনি কেন শুধু সচিব হইতে পারলাম না, সচিব কেন হইতে পারমু না বললে চেচামেচি করে পরিবেশ নষ্ট করতে হবে? সচিব হবার একান্ত খায়েশ থাকলে সচিব যে ক্যাডারের পদসোপানে আছে সেখানে যোগদান করাই হবে বেশি যুক্তিসংগত। এটা খুবই অন্যায় দাবী যে, সারাজীবন প্রফেশনাল, টেকনিক্যাল এ কাজ করে সকল ধরণের সুযোগ সুবিধা নিয়ে আপনি সচিব হবার জন্য উঠেপড়ে লাগবেন আর আরেকজন দিন রাত কামলা খেটে মরবে আর তাকে আপনি যখন তখন গালাগালি করবেন, দোষারোপ করবেন। দিন রাত কামলা খেটে শেষ বেলায় যদি অন্যদের চেয়ে একজন সচিব বা সিনিয়র সচিব শেষ বয়সে একটু বেশি আশা করেন সেটা নিশ্চই বাড়াবাড়ি হবে না।

ঘ) একজন বিস্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ৩ বছরের মাথায় প্রথম প্রমোশন পান। অন্যদিকে সিভিল সার্ভিসের একজন লেকচারার তিন বছরের নিজের প্রথম প্রমোশনের কথা চিন্তাই করতে পারে না। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে প্রায় একই পজিশন এ শিক্ষায় কাজ করেও সিস্টেমের কারণে বলি আর যেভাবেই ব্যাখা করি শিক্ষকদের মাঝেই বঞ্ছনা আছে, বৈষম্য আছে। আমি গত কয়েকদিনের টকশো গুলো দেখলাম সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাদা বেতন কাটামো নিয়ে কথা বলছেন। বলি আপনারা তো সিভিল সার্ভিসের ঐ লেকচারারদের বা শিক্ষকদের কথা কিছু বলছেন না! তো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন স্কেল শিক্ষকদেরই কি আবারো বিভাজনের দিকে ঠেলে দিবে না? এরকম হাজার হাজার বৈষম্য বলি বিভাজন বলি তা সার্ভিস বেধে পাওয়া যাবে। গ্রেড নিয়ে অনেকে আন্দোলন করছেন। সেদিন এক স্যার টকশোতে বললেন যে তিনি যখন সচিন ছিলেন তখন প্রফেসররা ডেপুটি সেক্রেটারির সমান ছিলেন। এখন তো দিন দিন বাড়ছে। আমার এক সহকর্মী জুয়েল আমাকে তথ্য দিল যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) সূত্র জানায়, দেশের ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার। এর মধ্যে অধ্যাপক তিন হাজার ৯০০, সহযোগী অধ্যাপক এক হাজার ৬০০, সহকারী অধ্যাপক এক হাজার ৮০০ এবং প্রভাষক আছেন প্রায় ছয় হাজার। প্রভাষক পদে যোগদানের পর সহকারী অধ্যাপক হতে সময় লাগে তিন বছর। সহকারী থেকে সহযোগী অধ্যাপক হতে সময় লাগে পাঁচ বছর। তবে পিএইচডি ও প্রকাশনা না থাকলে সময় লাগে ছয় থেকে সাত বছর। সহযোগী থেকে অধ্যাপক হতে সময় লাগে কমপক্ষে চার বছর। তবে পিএইচডি ও প্রকাশনা না থাকলে সময় লাগে পাঁচ থেকে ছয় বছর। যদি একজন শিক্ষকের যথাসময়ে পিএইচডি ও সব ধরনের প্রকাশনা থাকে, তাহলে তিনি সর্বনিম্ন ১২ বছরে প্রভাষক থেকে অধ্যাপক হতে পারেন। তবে এভাবে অধ্যাপক হওয়া শিক্ষকের সংখ্যা হাতে গোনা। সাধারণত অধ্যাপক হতে গেলে ১৪ থেকে ১৬ বছর সময় লেগে যায়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট অধ্যাপকের এক-চতুর্থাংশ সিলেকশন গ্রেড পায়। সাধারণত অধ্যাপক হওয়ার ১৫ থেকে ১৬ বছরের আগে শিক্ষকদের সিলেকশন গ্রেড পাওয়ার সুযোগ খুবই কম। আর এখন সব বিশ্ববিদ্যালয়ে সিলেকশন গ্রেডপ্রাপ্ত সিনিয়র অধ্যাপকের সংখ্যা ৯৬২।

অন্যদিকে প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর একজন কর্মকর্তার উপসচিব হতে সময় লাগে কমপক্ষে ১২ বছর যদি তিনি ও.এস.ডি না হন। আর চাকরি জীবনের ১৮ বছর পার করার পরই যুগ্ম সচিব হতে পারেন তারা। আর অতিরিক্ত সচিব পার হয়ে সচিব হতে সময় লাগে চাকরি জীবনের কমপক্ষে ২৮ বছর। এখন সরকারের সিনিয়র সচিব ও সচিবের পদ রয়েছে ৭৮টি। এ থেকে বুঝাই যায় একজন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাকে কতটা জটিল এবং কণ্টকাকীর্ণ পথ বেয়ে উপরে উঠতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষকদের মনে রাখা দরকার ৫৯ বছর হলে আমলারা অবসরে যান কিন্তু শিক্ষকগণ অবসরে যাবেন ৬৫ বছরে। শেষ ৬ বছরে আপনি আমলাদের চেয়ে কত টাকা বেশী বেতন পাবেন; হিসাবটা একবার কষলেই অনেক কিছু সহজ হয়ে যায়!!!সুতরাং মর্যাদা বাড়া বা কমার প্রশ্ন এখানে আসা অযৌক্তিক ।

‪#‎সর্বশেষঃ‬ আমি মনে করি ভারতের মত করে সিভিল সার্ভিস কে আমাদের ঢেলে সাজানো যেতে পারে। এতগুলো ক্যাডার থাকার যৌক্তিকতা নিয়ে আমাদের আবার নতুন করে ভাবা যেতে পারে। বাংলাদেশ এডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস, বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস, বাংলাদেশ ফরেন সার্ভিস আর ক্ষেত্রবিশেষে আরো দুই একটা সার্ভিস নিয়ে সিভিল সার্ভিস এর সংস্কার করা যায় কি না ভেবে দেখা যেতে পারে। শিক্ষা, প্রকৌশল, চিকিৎসার ক্ষেত্রে আলাদা কমিশন করা যেতে পারে এবং যেহেতু এ সংক্রান্ত বিষোয়গুলো অনেক বেশি সাবজেক্ট ওরিয়েন্টেড সেজন্য এদের রিক্রুট্মেন্ট প্রসেস হবে সম্পূর্ণ বিষোয়ভিত্তিক দক্ষতার মাপকাঠিতে। দরকার হয় প্রত্যেকে সার্ভিসের জন্য আলাদা বেতন স্কেল চিন্তা করা যায় ভবিষ্যতে।