ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

আমাদের গ্রামীন জনপদে ভিলেজ পলিটিক্স নামে একটা কথা প্রচলিত আছে। যাঁরা গ্রামে বসবাস করেন, অথবা যাঁদের জন্ম গ্রামে, এখন শহরে বসবাস করছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই এই শব্দগুচ্ছের সাথে পরিচিত। ভিলেজ পলিটিক্সের ফাঁদে পড়ে অনেক লোক নি:স্ব হয়েছেন এমনকি কাউকে কাউকে গ্রাম পর্যন্ত ছাড়তে হয়েছে। এই ভিলেজ পলিটিক্সের ফাঁদে পড়ে বহু নারী প্রতিয়িনত নির্যাতিত হচ্ছেন।

ভিলেজ পলিটিক্সের নেপথ্যে সাধারণত গ্রামের দুষ্টু লোকেরাই থাকেন। তাঁরা এতই চতুর যে, মারাত্মক অপরাধ করেও সবসময় তারা ধরাছোয়ার বাইরে রয়ে যান। তাঁদের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করতে পারে না। কেউ প্রতিবাদ করতে গেলে তাকেই উল্টো ফাঁদে পড়তে হয়, বিপদে পড়তে হয়।

যাঁরা এই ভিলেজ পলিটিক্সের নায়ক তাঁরা সবসময় সমাজের কাছে ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিতি লাভ করতে চান। অনেক সময় সেই চেষ্টায় তাঁরা সফল হন। গ্রামের সবাই তাঁদেরকে সামনে-সামনে সম্মানের চোখে দেখে, কিন্তু প্রকৃতভাবে ভিলেজ পলিটিক্সের নায়কদেরকে কেউই সম্মানের চোখে দেখে না।

ভিলেজ পলিটিশিয়ানরা নানা ছলচাতুরি করে নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধি লাভ করতে চান। নিজেদের স্বার্থ লাভের জন্য তাঁরা সবকিছুই করতে পারেন। এই ভিলেজ পলিটিশিয়ানরা যদি দেখেন, গ্রামে আর কেউ তার চেয়ে উপরে উঠে যাচ্ছে বা ধন-সম্পদে তার চেয়ে বেশী হয়ে যাচ্ছে, তাহলেই নানা ছলচাতুরি করে তাকে বিপদে ফেলেন। তাকে যেভাবেই হোক সর্বসান্ত করার চেষ্টা করেন। গ্রামে কোন লোককে ধন-সম্পদে বা শিক্ষায়-দীক্ষায় উন্নতি করতে দেখলে, তাকে কিভাবে বিপদে ফেলে ধন-সম্পদ খোয়ানো যায় সেই চেষ্টা করতে থাকেন ঐ ভিলেজ পলিটিশিয়ানরা। অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা সফলও হন।

গ্রামে আরো একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে- “চোরকে বলে চুরি কর, আর গৃহস্থকে বলে সজাগ থাকিস।” এটা ভিলেজ পলিটিশিয়ানরাই করে থাকেন। গ্রামে সবসময়ই একজনের সাথে আরেকজনের দ্বন্দ বা ঝামেলা বাধিয়ে দিয়ে ভিলেজ পলিটিশিয়ানরা নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করেন। যেমন ধরুন: একজন চোরকে আরেকজন গৃহস্থের বাড়িতে চুরি করতে পাঠিয়ে চোরকে বলেন, নিশ্চিন্তে চুরি কর, ধরা পড়লে আমি দেখব। আর গৃহস্থকে বলেন, শুনেছি আজ তোমার বাড়িতে চুরি হবে, তুমি সজাগ থেকো। ঐ ভিলেজ পলিটিশিয়ান তখন উভয়ের কাছেই উপকারী লোক হিসেবে গণ্য হন। আসলে তার উদ্দেশ্য কি ভালো? চোর যখন ধরা পড়ে, তখন চোরকে বাঁচাতে গিয়ে ঐ ভিলেজ পলিটিশিয়ান তার কাছে থেকে উপঢৌকন আদায় করেন।

এ তো গেল একটি ঘটনা। গ্রামে আরো অনেক ঘটনাই তো ঘটে। যেমন: গ্রামে কোন সুন্দরী মেয়ের দিকে ভিলেজ পলিটিশিয়ানদের কু-দৃষ্টি পড়লে তো তার আর রক্ষা নেই। যেভাবে হোক তিনি তার ফাঁয়দা হাসিল করতে চাইবেন। আর না পারলে, ঐ সুন্দরী মেয়েকে নানা কৌশলে সমাজের কাছে দুশ্চরিত্রা বানান। বিস্তারিত ঘটনা সবাই জানেন। তাই লিখলাম না। আমাদের সমাজে এরকম ঘটনা অহরহ শুনা যায়।

এরকম আরো বহু কুকর্ম করেন আমাদের ভিলেজ পলিটিক্স এর নায়কেরা। যেগুলো কমবেশী সবারই জানা। সংক্ষিপ্ত পরিসরে সব উল্লেখ করা সম্ভব নয়। প্রশ্ন উঠতে পারে, আমি আজ এ নিয়ে কেন লিখছি?

আমি বহু বছর ধরে শহরে বসবাস করি। শহরে ভিলেজ পলিটিক্স কেউ করে না। তবে এখানে অন্য ধরণের পলিটিক্স হয়। যেটাকে আমরা ডার্টি পলিটিক্স বা নোংরা রাজনীতি বলে থাকি। যাক, এ নিয়ে আজ আর কিছু লিখছি না। মূল প্রসঙ্গে আসি। দু-একদিন পূর্বে আমি পাড়ার এক দোকানে সদাই কিনতে গিয়েছিলাম। বৃষ্টি চলে এলো। ছাতাও সঙ্গে নেই। তাই দোকানেই বসে থাকা ছাড়া উপায় ছিল না। এই বৃষ্টি ভেজা রাতে দোকানে নানান কিসিমের লোক এসে বসেছেন। নানান ধরণের কথাবার্তা বলছেন। নিজের কান তো বন্ধ করে রাখা যায় না। আমি শুনছি। কেউ কেউ বলছেন- দূনীতির জন্য বিশ্ব ব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্প বাতিল করেছে, এটা ঠিক নয়, বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্প বাতিল করেছে অন্য কারণে। তারা একটি শক্তিধর দেশের কথা বুঝাতে চাচ্ছেন। তাঁদের ধারনা, কোন এক বিশেষ ব্যক্তির কারণে ঐ শক্তিধর দেশ বিশ্বব্যাংকের উপর চাপ সৃষ্টি করে পদ্মা সেতু প্রকল্প বন্ধ করে দিয়েছে, এ সরকার ষড়যন্ত্রের স্বীকার। আবার কেউ কেউ বলছেন- আমওয়ামীলীগ সরকারের দূর্ণীতির কারণে বিশ্ব ব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্প বাতিল করেছে ইত্যাদি ইত্যাদি।

কথার ফাঁকে একজন মুরব্বী এসে দোকানের ভেতরে ঢুকলেন। সবাই চেয়ার থেকে দাঁড়িয়ে তাকে বসার জন্য অনুরোধ জানালো। আমি অবাক হলাম, ঐ মুরব্বীর বসার জন্য একটি চেয়ার দরকার অথচ সবাই দাঁড়িয়ে বসার জন্য বলছে। মনে হচ্ছে লোকটির যেন সবগুলো চেয়ারই লাগবে। যাক, এটা আমার আলোচনার বিষয় নয়। তবে ঐ মুরব্বী লোকটি যে ধরণের কথাবার্তা বলছিলেন সেটা নিয়েই আমার আপত্তি। আমি লোকটির কথাবার্তার মধ্যে ভিলেজ পলিটিক্সের গন্ধ পেলাম। বিস্তারিত উল্লেখ করলাম না। মুরব্বী লোকটি দোকানীসহ আরো দু’জনকে কিছু পরামর্শ দিলেন। পরামর্শ শুনে আমি যেটা বুঝতে পারলাম, তাতে মনে হল, ঐ লোকটি কারো সাথে কোন গন্ডগোল লাগানোর পরামর্শই দিচ্ছেন। সেখানে তার কি লাভ? সেটা হয়তো তিনি নিজেই জানেন।

মুরব্বী লোকটি চলে গেলে আমি দোকানীকে বললাম- আমার মতে ঐ মুরব্বীর পরামর্শ পালন করা ঠিক হবে না, এখণ পালন করবেন কি-না এটা আপনার বিবেচনার বিষয়। দোকানী শেষ পর্যন্ত কি করেছেন, জানি না।

অতএব, যেকোন ষড়যন্ত্র থেকে নিজেকে রক্ষার দায়িত্ব নিজের। কাজেই যেকোন ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় নিজে সতর্ক থাকুন অন্যকেও সতর্ক করুন। আর যাঁরা আমার এ লেখা পড়বেন তাঁরা দয়া করে “ভিলেজ পলিটিক্স” শব্দটিকে জাতীয় রাজনীতি’র সাথে মিলাবেন না। মনে রাখবেন- রাজনীতি খুবই ভালো, যদি সেই রাজনীতি ভালো মানুষ করে। সবাই ভালো থাকুন, নিরাপদে থাকুন।