ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

আজ ১৩ জুলাই ২০১২। রোজ শুক্রবার। ছুটির দিন। বাসায় শুয়ে-বসে কাঁটাচ্ছি। তবে একেবারেই যে অলস সময় কাঁটছে, তা নয়। খবরের কাগজ এবং বই পড়ছি। টেলিভিশনের অনুষ্ঠানও টুকটাক দেখছি। তবু কেন যেন খুব একটা ভালো লাগছে না। কেননা আজ দূরে কোথাও ঘুরতে যাবার কথা ছিল। একেবারে যমুনা পেড়িয়ে বগুড়ায়। যেটি প্রায় দু’মাস পূর্বে আমরা বন্ধুরা মিলে পরিকল্পনা করেছিলাম, বঙ্গবন্ধু সেতু দিয়ে যমুনা পেরিয়ে ওপারের দর্শনীয় স্থানসমূহ দেখতে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হলো না। সিলেটসহ সারাদেশের বিভিন্ন স্থানে বন্যা হয়েছে। যমুনা পাড়েও বন্যা হয়েছে। বন্যার্ত মানুষ কষ্টে দিনাতিপাত করছে আর এ সময়ে আমরা আনন্দ-ফুর্তি করতে ঘুরতে যাবো, সেটা হয় না। তার চেয়ে বরং বন্যার্ত মানুষের পাশে গিয়ে তাঁদের দু:খ কিছুটা ভাগাভাগি করে নেয়া হবে উত্তম কাজ। তাই বন্ধুরা সবাই মিলে ১৩ জুলাই’২০১২ তারিখ শুক্রবারের ভ্রমণসূচি আপাতত স্থগিত রাখলাম।

আজ আরেকটা জায়গায় যাবার কথা ছিল। আর সেটি হলো নৌকা ভ্রমণে। তাও আবার মেঘনায়। তিন-চারদিন পূর্বে জানতে পেরেছিলাম প্রথম আলো ব্লগার কর্তৃক নৌকা ভ্রমণের আয়োজন করা হয়েছে। প্রথম আলোর সব ব্লগার বন্ধুদের সেখানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। নৌকা ভ্রমণ আমার খুব ভালো লাগে। আর প্রথম আলো ব্লগার কর্তৃক আয়োজিত নৌকা ভ্রমণ তো আরো জমজমাট হবে তাই আমি মেঘনায় নৌকা ভ্রমণে যাবার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলাম দু-তিন পূর্বেই। কিন্তু একই তারিখে ঘনিষ্ট একজনের বিয়ের নিমন্ত্রণ পাওয়ায় ব্লগার বন্ধুদের সাথে মেঘনায় নৌকা ভ্রমণে যাবার সিদ্ধান্ত বাতিল করে দিলাম। ফলে নৌকা ভ্রমণেও যাওয়া হলো না।

এদিকে গতরাতে আরেক বন্ধু ফোন করে বলল, আকস্মিকভাবে তার বিয়ের দিন ঠিক হয়েছে ১৩ জুলাই’২০১২ রোজ শুক্রবার। যেভাবেই হোক তার বিয়েতে যেতে হবে। তার মানে একই তারিখে দু’টি বিয়ের নিমন্ত্রণ। দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম, দু’জনই তো আমার ঘনিষ্টজন, আমি কার বিয়েতে যাবো? এক জনের বিয়েতে গেলে আরেকজন শুনে যদি কষ্ট পায়? অবশেষে কারো বিয়েতেই যাওয়া হলো না।

ছুটির দিন থাকায় আজ ঘুম থেকেও একটু দেরীতে উঠেছি। ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে নাস্তা সারতেই দেখি দুপুর বারোটা বেজে গেছে। প্রথম আলো পত্রিকা হাতে নিয়ে খানিক্ষণ পড়লাম। বিস্তারিত পড়ার সময় নেই তাই শিরোনামগুলোই শুধু পড়লাম। খুব একটা ভালো সংবাদ চোখে পড়ল না। ভেতরের পাতায় ‘মাছ কুড়ানির দল’ শীর্ষক একটি লেখা পড়ে ভালোই লাগল। লেখাটি ছিল এরকম- বড়রা যখন কোন একটি জায়গা সেচে মাছ শিকার করা শেষ করে চলে যায় তখন ছোটরা মানে ‘মাছ কুড়ানির দল’ মাছ ধরার জন্য সেখানে নামে। অনেক কষ্টে-পিষ্টে যখন তারা একটা-দু’টা ছোট মাছ পায় তখন তাঁদের কী যে আনন্দ! আরো কত কী!

জুমআ’র নামাজের সময় হয়ে গেছে তাই মসজিদে চলে গেলাম। ফেরার পথে দেখি, আমাদের ভার্সিটি ক্যাম্পাসের আশেপাশে যে খালি জমিতে বৃষ্টির পানি জমে আছে, সেখানে লোকজন মাছ ধরছে। কিছু সময় দাঁড়িয়ে সে দৃশ্য দেখলাম। অপূর্ব লাগলো। ক’দিন ধরেই দেখছি, বৃষ্টি হলেই জমিতে বেশ পানি জমে যায়। তখন লোকজন এসে জাল দিয়ে মাছ ধরা শুরু করে দেয়। একজন দু’জন নয় অনেকজনই এই কাজটি করে। আর জমির পানি একটু কমে গেলেই সেচ দিয়ে জমির পানি শুকিয়ে মাছ ধরে। এরকম কান্ড প্রতিনিয়তই হচ্ছে। আমি ভেবে পাই না, প্রতিদিন ঐ জমি থেকে কোন-না-কোনভাবে ওরা মাছ ধরছে, এতো আসে কোত্থেকে? তবে এখানে মাছ শিকার করে তারা যে আনন্দ উপভোগ করছে, সেটা দেখে আমারও ভালো লাগল।

বাসায় ফিরে দুপুরের খাবারটা সেরে নিলাম। এবার কি করা যায়? কোথাও যখন যাওয়া হলো না তখন বই পড়ে সময় কাঁটানোটাই উত্তম। এখন কোন বইটি পড়া যায়। আমি কবিতার বই খুব একটা পড়ি না। তবুও আজ কেন যেন মনে হলো কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার বই পড়ি। সেলফ থেকে নজরুলের বই হাতে নিয়ে পড়তে লাগলাম। পড়ে ভালোই লাগল। নজরুলের বই আমি এই প্রথমবার যে পড়ছি, তা নয়। তবুও আজ অন্যরকম লাগল।

বাইরে ঝিরঝির বৃষ্টি হচ্ছে। ফ্যানও চলছে। শীতল একটা পরিবেশ। তাই ঘুম চলে আসাটা স্বাভাবিক। বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘন্টা খানেক পর ঘুম ভেঙ্গে গেল। ঘুম থেকে উঠে আমি সিলেটের ডাক পত্রিকাটি নিয়ে পড়া শুরু করলাম। একটা সংবাদ দেখে রীতিমত আবেগ-আপ্লুত হয়ে পড়লাম। ছবিসহ ছাপা হয়েছে আমাদের শিক্ষামন্ত্রী সিলেট এমসি কলেজ ছাত্রাবাস পরিদর্শনে এসে রীতিমত কেঁদে ফেলেছেন। তিনি তার আবেগ ধরে রাখতে পারেন নি। তিনি এ কলেজেরই ছাত্র ছিলেন। ছাত্র অবস্থায় তিনি এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে থেকেছেন, সময় কাঁটিয়েছেন। তার শৈশবের অনেক মধুর স্মৃতিই তো সেখানে। কাজেই ঐতিহ্যবাহী শতবর্ষী ছাত্রাবাসটি পুঁড়তে দেখে কেঁদে ফেলাটাই অস্বাভাবিক কিছু নয়। ছাত্রাবাসটি পুঁড়ে তিনি যেমন দু:খ পেয়েছেন তেমনি আমিও দু:খ পেয়েছি। কেননা আমিও তো এ কলেজেরই ছাত্র ছিলাম। ঘটনার পরদিনই আমি এ নিয়ে লিছেছিলাম- ‘সিলেট এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে আগুন, সিলেটবাসী ব্যথিত’। আসলে ঐতিহ্যবাহী শতবর্ষী ছাত্রাবাসটি পুড়ে যাওয়ায় পুরো সিলেটবাসী কেন দেশবাসীই ব্যথিত। সবাই খুব কষ্ট পেয়েছেন। আমিও কষ্ট পেয়েছি। আরো বেশী কষ্ট পেয়েছি যখন শুনেছি ছাত্রাবাসটি পুঁড়িয়েছে একই কলেজের ছাত্ররাই। নিজেরা নিজেদের অমূল্য সম্পদ কিভাবে ধ্বংস করতে পারল?

মাননীয় অর্থমন্ত্রী এবং মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী কলেজ ছাত্রাবাসটি পরিদর্শন শেষে বলেছেন, দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা হবে। আমরাও দাবী করছি দায়ীদের যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা হয়। সে যেই হোক, এমনকি সরকারী দলের কেউ হলেও।

যাক, আজ কোনকিছুই যেন পরিকল্পনা মাফিক হচ্ছে না। সবকিছুই যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। তবে দিনটি ভালো-মন্দের মিশেলেই কাঁটছে, সেটি বলা যায়। আজ ১৩ তারিখ বলেই কিনা এরকম হচ্ছে, আল্লাহই জানেন। অনেকেই তো আবার এ সংখ্যাটিকে বলে থাকেন ‘আনলাকি থার্টিন’। অনেকেই বিশ্বাস করেন বা বলেন, ‘আনলাকি থার্টিন’ তারিখটি শুভ নয়। তবে আমি সেরকমটি মনে করি না। ঘটনাক্রমেই হয়তো দিনটি আমার এরকম কাঁটছে। তবে সামনে হয়তো ভালো কিছু অপেক্ষা করছে। সেই অপেক্ষায় থাকলাম। সবাই ভালো থাকবেন।