ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে তাই এক হার্ডওয়্যারের দোকানের ভেতরে গিয়ে বসলাম। একজন মুরব্বী টাইপ লোক দোকানে এসে ঢুকলেন। হাতে একটি টেবিল ফ্যান। তিনি জানালেন- বেশ কয়েকদিন ধরে ফ্যানটি চলছে না, প্রচন্ড গরম পড়েছে, বউমা বারবার তাগিদ দিচ্ছে ফ্যানটি ঠিক করানোর জন্য, তাই তিনি ফ্যানটি দোকানে নিয়ে এসেছেন। উদ্দেশ্য ফ্যানটি যদি এখানে ঠিক করানো যায়। দোকানীকে জিজ্ঞেস করলেন- “ফ্যানটি কি ঠিক করানো যাবে?” দোকানদারের জবাব- “অবশ্যই যাবে!” বলেই সে ফ্যানটি হাতে নিয়ে দেখল, তেমন কোন সমস্যা নেই। ক্যাবলের একজায়গা থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে মাত্র।

দোকানদার মুরব্বী লোকটিকে বলল- “আপনার ওটাতে তো বেশ জটিল সমস্যা আছে, আজকে রেখে দিই, আমি ঠিক করে রাখব, আগামীকাল আপনি এসে নিয়ে যাবেন।” মুরব্বী লোকটি সরল মনে ফ্যানটি রেখে চলে গেলেন। পরেরদিন তিনি ফ্যান নিতে আসলে ঐ দোকানদার ফ্যান মেরামত বাবত একটি বিল ধরিয়ে দিয়ে বলল- বিল পরিশোধ করে তবেই ফ্যান নিতে হবে। মুরব্বী লোকটি দেখলেন, দোকানদার ফ্যান মেরামত বাবত যে মজুরী দাবী করছে, তারচেয়ে কম টাকায় এ ধরনের একটা নতুন ফ্যান কেনা যাবে। মুরব্বী লোকটি বললেন- “এখন কি আর করব, ফ্যান যেহেতু ঠিক করিয়েছে, তাই মজুরী দিতেই হবে।” মুজরী পরিশোধ করে তিনি ফ্যানটি নিয়ে গেলেন। মুরব্বী লোকটি চলে যাবার পর দোকানদারে খেয়াল হলো- বিলটি আসলে অন্য একজনের ছিল, ভুল করে ঐ মুরব্বীর কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হয়েছে। কিন্তু এরকম ভুল করা কি সমীচিন?

আরেকটি ঘটনা বলি। শহরে ফুটবল খেলার মাঠের সংকট রয়েছে, এটা সবাই জানেন। তবুও সুযোগ পেলেই ছেলেরা ফুটবল খেলতে চায়। আমাদের পূর্বতন পাড়ার শেষ মাথায় একটি বদ্ধ পুকুর রয়েছে। পুকুরটি সরকারি। আর এজন্যেই হয়তো পুকুরটির প্রতি কারো যত্ন নেই। প্রচুর কচুরিপানা, লতাপাতা জমে আছে। বিষাক্ত বিষাক্ত সাঁপও নাকি আছে। পাশ দিয়ে গেলে বিচ্ছিরি একটা দূর্গন্ধ নাকে লাগে। কেউ এই পুকুরের পানি ছুঁয়েও দেখে না। এই পুকুরের পাশেই একটা সরকারি জায়গা খালি পড়ে আছে। খেলাধুলার জন্য জায়গাটি পর্যাপ্ত না হলেও কমবয়সী ছেলেরা ছোট গোলপোস্ট দিয়ে ফুটবল খেলে। একদিন খেলতে খেলতে বলটি গিয়ে পড়ল ঐ পুকুরের মধ্যিখানে। এ বদ্ধ পুকুর থেকে ফুটবলটি তোলে আনার কারো সাহসে কুলালো না। খেলা বন্ধ। সবাই বাসায় ফিরে এলো।

দুইদিন পরে শৈবাল নামের একটা ছেলে এসে বলল- বলটি সে পুকুর থেকে উঠাতে পারবে। বিনিময়ে তাকে কিছু টাকা দিতে হবে। আমরা বললাম- “ঠিক আছে। তুমি যা চাইবে তা-ই দিব।” সে বলটি উঠালো। বলটি হাতে দিয়ে বলল- “দেন আমার টাকা দেন।” বললাম- “কত?” সে বলল- “পাঁচশত টাকা দেন।” আমরা শুনে অবাক! এই বলের দামই তো মাত্র পাঁচশত টাকা। জিজ্ঞেস করলাম- “তুমি কি রসিকতা করছ?” সে বলল- “নাহ্। রসিকতা করব কেন? আমি ঠিকই বলছি। আপনারা বলেছিলেন না, বলটি উঠালে আমি যা চাইব তা-ই দিবেন। এখন এরকম করছেন কেন? আমার টাকা দেন।” ঘটনা বহুদূর গড়ানোর আগেই আমরা তাকে পাঁচশত টাকা দিয়ে বিদায় করলাম আর সবাই পণ করলাম পরবর্তীতে কাউকে দিয়ে কিছু করাতে হলে দরদাম করে নেব। আসলে আমরা ভুল করেই তাকে বলে ফেলেছিলাম- বলটি উঠাতে পারলে সে যা চাইবে তা দিব।

যাত্রা পথের আরেকটি ঘটনা বলি। একদিন আমি এবং ফরিদ বাসে করে ঢাকা যাচ্ছি। বাসটি পথের মধ্যিখানে বিশ মিনিটের যাত্রাবিরতি দিল। দীর্ঘ ভ্রমণে ভীষণ ক্ষুধা লেগেছে। তখন দুপুরের খাবারেরও সময় হয়ে গেছে। আমরা নেমে একটা রেষ্টুরেন্টে বসে দুপুরের খাবার খেলাম। খাবার শেষে রেষ্টুরেন্ট থেকে যে বিল দাবী করল, তা দেখে আমাদের চোখ কপালে উঠার মত অবস্থা হয়ে গেল! যে মানের খাবার খেয়েছি তারচেয়ে মনে হয় বিশ গুন বেশী বিল দাবী করেছে। আমরা আপত্তি জানালে আশপাশের আরো লোকজনের মধ্যস্থতায় বিষয়টি সুরাহা হলো। আমরা উপযুক্ত বিলই পরিশোধ করলাম। তবে বেশ ঝামেলার সম্মুখীন হতে হলো। পরে জানতে পারলাম রেষ্টুরেন্ট বয় ভুলক্রমে পাশের টেবিলের বিল আমাদের হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল।

এবার ভূতুড়ে টেলিফোন বিলের কথা বলে শেষ করব। ভূতুড়ে বিলের কথা কমবেশী আমরা সবাই জানি। অনেকেই হয়তো এই ভূতুড়ে বিলের খপ্পরে পড়েছেন। মাঝেমধ্যে দেখা যায়, কোন একমাসে কারো নামে বিদ্যুত বিল চলে এসেছে পঞ্চাশ হাজার টাকা। অথচ সেই মাসে তার নামে বড়জোর একহাজার টাকা বিদ্যুত বিল আসতে পারত। অনেক চেষ্টা তদবির করে শেষপর্যন্ত হয়তো সঠিক বিলই পরিশোধ করা যায়। কিন্তু ততক্ষণে অনেক ঝামেলার সম্মুখীন হতে হয়। ভূতুড়ে ধরণের বিদ্যুত বিল কিংবা টেলিফোন বিল মাঝেমধ্যে ভুলবশত চলে আসে, আবার কখনো কখনো বিদ্যুত কর্মীরা ইচ্ছাকৃতভাবেই লম্বা বিল ধরিয়ে খামোখাই লোকজনকে ঝামেলায় ফেলেন।

আমাদের বাসায়ও একবার ভূতুড়ে ধরণের বিদ্যুত বিল এসেছিল। একবার বিদ্যুত কর্মীরা আমাদের বাসায় বিশ হাজার টাকার বিদ্যুত বিল জমা দিল (একমাসের বিল)। অথচ আমাদের বাসায় প্রতি মাসে গড়ে বিদ্যুত বিল আসে সাতশত থেকে আটশত টাকা। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম ভুলক্রমে বিদ্যুত কর্মীরা অতিরিক্ত বিল দিয়েছিল। সে যাত্রায় অবশ্য আমরা ভূতুড়ে বিলের খপ্পর থেকে রক্ষা পেয়েছিলাম। কিন্তু সবসময় এই ভূতুড়ে বিলের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায় না।

সুতরাং ভূতুড়ে বিল থেকে সাবধান।