ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার, হুমায়ূন আহমেদ স্মরণে

গতকাল আমি লিখেছিলাম- আজ আমার মন ভালো নেই। আর আজ। আমার মনে হয় আজ আমিসহ আমাদের সারা দেশবাসীর মন ভালো নেই। বিশ্বের কোটি কোটি বাঙ্গালীর মন ভালো নেই। বই প্রেমিকদের মন ভালো নেই। নাটক প্রেমিকদের মন ভালো নেই। চলচ্চিত্র প্রেমিকদের মন ভালো নেই। হুমায়ুন ভক্তদের মন ভালো নেই। এককথায় হুমায়ুন আহমেদকে যাঁরা চেনেন তাঁদের কারোরই মন ভালো নেই। থাকার কথা নয়। কারণ আমাদের সকলের খুবই প্রিয় মানুষ কিংবদন্তি লেখক হুমায়ুন আহমেদ মারা গেছেন। তিনি আর আমাদের মাঝে নেই। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আমরা তাঁর আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। তাঁর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করছি। আমরা এই কিংবদন্তি লেখকের মৃত্যুতে গভীর শোকাহত।

হুমায়ুন আহমেদের এ অসময়ে মৃত্যু বাংলা সাহিত্য জগতের এক অপূরনীয় ক্ষতি, এটা নিশ্চয়ই সকলে স্বীকার করবেন। সাহিত্য জগতের সব ক্ষেত্রেই তাঁর বিচরণ ছিল। সফলও হয়েছিলেন। স্বীকৃতিসরূপ তিনি বাংলা একাডেমী পদক, একুশে পদকসহ নানা পদকে ভূষিত হয়েছিলেন। হুমায়ুন আহমেদ আরো কিছুদিন বেঁচে থাকলে জাতি হয়তো আরো সৃষ্টিশীল বেশকিছু লেখা উপহার পেত। কিন্তু হলো না। তাঁর এ মৃত্যুতে জাতি একজন মেধাবী, গুনী লেখককে হারালো। বাংলা সাহিত্য জগতের এক প্রবাদপুরুষকে হারালো। একজন কথার জাদুঘরকে হারালো। হুমায়ুন আহমেদ যেমন জনপ্রিয় লেখক ছিলেন তেমনি তিনি আপাদমস্তক একজন ভালো মানুষ ছিলেন, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। হুমায়ুন আহমেদ নিজে যেমন হাসতে জানতেন তেমনি অন্যকেও হাসাতে জানতেন। আমার নিজের দেখা একটা ঘটনা বলি। আজ থেকে পনের-ষোল বছর আগে তিনি একবার সিলেটে এসেছিলেন। তিনি এর আগে এবং পরে বহুবার সিলেটে এসেছিলেন। কিন্তু সেবার আমি তাকে সরাসরি দেখার এবং তাঁর কথা শুনার সৌভাগ্য হয়েছিল। তিনি সিলেটের মুসলিম সাহিত্য সংসদে আসবেন। তাই তাঁর অগনিত ভক্ত-শুভানুধ্যায়ী সেখানে অপেক্ষা করছেন। আমিও সেখানে ছিলাম। তাঁর আসতে একটু দেরি হচ্ছিল। কারণ তিনি সুনামগঞ্জ থেকে এসে সুরমা পারে কিছুক্ষণ নিজ পায়ে হেঁটে সময় কাটিয়ে তারপর আসবেন, সেটা তিনি আগেই জানিয়েছিলেন। সুরমা পারের নিজ পায়ে হাঁটার উদ্দেশ্য, সুরমা পারের মানুষের জীবনধারা স্বচক্ষে পর্যবেক্ষণ করা। এদিকে আমরা সবাই মুসলিম সাহিত্য কেন্দ্রে বসে অপেক্ষা করছি। একপর্যায়ে তিনি আসলেন। এসেই প্রথমে সবার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিলেন। বললেন, দেরি করে আসার জন্যে আমি খুবই দু:খিত, এর জন্য এখন চাইলে আপনারা আমাকে সরাসরি গালি দিতে পারেন। উপস্থিত সবাই শুনে তাতেই বেজায় খুশি। সবাই হাসিমুখে তাঁকে বরণ করে নিল। এরপর হাস্যরসে ভরপুর তাঁর মূল্যবান কথাবার্তা আমরা অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলাম আর শুনলাম। উপভোগ করলাম। ভক্তদের অনুরোধে তিনি অনুষ্ঠানের মাঝখানেই অটোগ্রাফ দিলেন। সেদিনের অনুষ্ঠান খুবই প্রাণোচ্ছল ছিল। হাস্যরসে ভরপুর ছিল। পনের-ষোল বছর আগের সেই অনুষ্ঠানের কথা আমি আজও ভুলতে পারিনি।

হুমায়ুন আহমেদ যেমন একজন বই লেখক, বই প্রেমিক ছিলেন তেমনি একজন বৃক্ষ প্রেমিকও ছিলেন। তার প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর নিজ হাতে গড়া নুহাশপল্লীটি দেখে। কয়েকদিন পূর্বেই আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে তাঁর নিজ হাতে গড়া নুহাশপল্লীতে গিয়েছিলাম। তিনি কী সুন্দর করে গড়ে তুলেছেন রহস্যে ভরপুর নুহাশপল্লী। না দেখলে বোঝার উপায় নেই। সেখানে ওষুধি গাছ থেকে শুরু করে ফল-ফুল সব ধরণেরই গাছ আছে। দেখে প্রাণ ভরে গিয়েছিল।

হুমায়ুন আহমেদ নিজে স্বপ্ন দেখতেন, অন্যকেও স্বপ্ন দেখাতেন। জাতির সংকটকালীন মূহুর্তে পত্রিকায় কলামের মাধ্যমে নানা দিকনির্দেশনা দিতেন। আর নানা ধরণের বইয়ের মাধ্যমে তো আছেই। সেটা হয়তো কেউ শুনতো আবার কেউ হয়তো শুনতো না, হয়তো ভবিষ্যতে কেউ সেটা পড়বে, শুনবে ।

হুমায়ুন আহমেদ বেঁচে নেই ঠিকই, কিন্তু তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন তাঁর কালজয়ী সৃষ্টি কর্মের জন্যে। তাঁর লেখা বই-নাটক পড়ে আমরা অনুপ্রাণিত হবো, যুগ যুগ ধরে নতুনেরা অনুপ্রাণিত হবে।

হুমায়ুন আহমেদ আমাদের মাঝ থেকে চলে গেছেন কিন্তু রেখে গেছেন যত কথা, যত কল্পনা, যত স্বপ্ন। হুমাযূন আহমেদকে হয়তো আমরা আর পাবো না কিন্তু তাঁর লেখা বইয়ের মাধ্যমেই তাঁকে আমরা খোঁজে পাবে।

হুমায়ুন আহমেদরই একটা কথার সূত্র ধরেই বলছি- “মানুষের জীবন এতো ছোট ক্যানে?” তিনি একবার বলেছিলেন, মানুষের জীবন এতো ছোট ক্যানে? একটা কচ্ছপ যদি তিনশত বছর বাঁচতে পারে তাহলে মানুষ এতো কম বাঁচবে কেন? আসলে এই রহস্য একমাত্র আল্লাহই জানেন।

হুমায়ুন আহমেদের প্রতি আবারো শ্রদ্ধা, ভালোবাসা জানাচ্ছি। আবারো তার আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। সবার জীবন মঙ্গলময় হোক, এই কামনা করি।