ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

আসছে খুশীর ঈদ। তাই প্রিয়জনদের সাথে খুশী ভাগাভাগি করতে সবাই বাড়ি যাবে। এ নিয়ে সবার যত প্রস্তুতি। মাস খানেক আগে থেকেই কেনাকাটা শুরু হয়ে গেছে। প্রিয়জনদের জন্য প্রিয় পোশাক কেনা থেকে শুরু করে নিজের জন্যেও পোশাক কিনছে সবাই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবাই বাড়ি যেতে পারবে তো? এ নিয়ে টেনশনের শেষ নেই।

সৌরভ ঢাকায় চাকরি করে। বাড়িতে যাওয়া হয়নি বেশ ক’মাস হলো। মা’কে দেখতে ভীষণভাবে তার মন চাইছে। যেই মাকে ছাড়া সে একটি রাতও ঘুমোতে পারত না, আজ সে কিনা ঢাকায় একা একা থাকে। না থেকে উপায় আছে? চাকরির সুবাধে কয়েক বছর ধরে তাকে একা ঢাকায় থাকতে হচ্ছে। সৌরভ যে বেতন পায়, সেটি দিয়ে মা সহ পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে ঢাকায় থাকা সম্ভব নয়। জিনিষপত্রের যেই গগণচুম্বি দাম, তাতে নিজের থাকাটাই এখন দায়। তার উপর বাড়ি ভাড়াও দিনকে দিন বেড়েই চলেছে।

চাকরির সুবাধে সৌরভ ঢাকায় থাকলেও তার মনটা পড়ে থাকে বাড়িতে, মা’য়ের জন্যে তার মন ভীষণ কাঁদে। বাবা মারা গেছেন সেই ছোট বেলায়। মা’ই তাকে লালন-পালন করে মানুষ করেছেন। তাই সুযোগ পেলেই সে বাড়ি ছুটে যায়, মা’য়ের কাছে। কিন্তু সবসময় সামর্থ্যে কুলোয় না, তাই সবসময় ছুটি পেলেও সে বাড়ি যেতে পারে না। অবশ্য সে প্রতিমাসেই খরচের জন্যে মা’কে টাকা পাঠায়। মা সেই টাকা দিয়ে টানাটুনি করে সংসারের খরচ চালান। সৌরভরা দুই ভাই এক বোন। সৌরভ সবার বড়।

ছোট ভাই-বোন অপেক্ষা করছে বড় ভাই ঈদের জামাকাপড় নিয়ে বাড়ি আসবে। একসাথে অনেক মজা করবে। গ্রামের সব বন্ধুদেরকে তাঁরা গল্প করে বেড়াচ্ছে, তাঁদের সৌরভ ভাই জামাকাপড় নিয়ে বাড়ি ফিরবে। একসঙ্গে ঈদ করবে। অনেক মজা হবে।

মা ফোন করে বললেন, বাবা সৌরভ বাড়ি আসছিস তো? গতবার ঈদে তো বাড়ি আসতে পারলে না। সৌরভ মা’কে বলল, হ্যাঁ মা, চেষ্টা করছি বাড়ি আসতে। এখন ট্রেন বা বাসের টিকেট পেলেই হলো। কিন্তু তুমি মোবাইল ফোন পেলে কোথায়? মা বললেন, এটা পাশের বাড়ির তোর করিম চাচার মোবাইল ফোন। সৌরভ বলল, ঠিক আছে মা, কৌশিক এবং কুসুম কেমন আছে? মা বললেন, ভালো। ওরা তোর অপেক্ষা করছে তুই আসলে একসঙ্গে ঈদে মজা করবে বলে, তুই ভালো থকিস বাবা। বলেই মা ফোনটি রেখে দিলেন।

গতবার ঈদের সময় রাস্তাঘাটের অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। তাই অনেকেই বাড়ি যেতে পারেনি। কেউ কেউ প্রতিবাদ সরূপ শহীদ মিনারে গিয়ে ঈদ করেছে। এছাড়া, টিকেটের সংকট তো আছেই। সৌরভও এজন্যে গতবার ঈদে বাড়ি যেতে পারেনি। তাই সৌরভ এবার আগে-বাগেই টিকেট সংগ্রহের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে।

যোগাযোগ মন্ত্রীও বলেছেন, এবার বাড়ি যেতে কারো কোন সমস্য হবে না। রাস্তাঘাট সবই ঠিক আছে। কোন টিকেট কালোবাজারী হবে না। সবাই নিজেদের টিকেট সংগ্রহ করতে পারবে। ঈদ উপলক্ষে বাড়তি ট্রেন এবং বাসেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে।

কাজেই যোগাযোগ মন্ত্রীর কথায় সৌরভ বেশ আশ্বস্ত হলো। যাক, বাবা এবার বাড়িতে নিশ্চিন্তে যাওয়া যাবে।

এদিকে রেল ষ্টেশন কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দিল, ঈদের দু’সপ্তাহ আগে থেকে ট্রেনের অগ্রিম টিকেট ছাড়া হবে, আগ্রহীরা টিকেট সংগ্রহ করতে পারবেন। সৌরভ সুযোগ হারাতে চাইল না। সে প্রথম সুযোগেই ট্রেনের টিকেট সংগ্রহের জন্যে ষ্টেশনে চলে গেল। ষ্টেশনে গিয়ে দেখল হাজার হাজার মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে আছে, টিকেটের জন্যে। ষ্টেশন কর্তৃপক্ষ নাকি জানিয়েছে, পরের দিন টিকেট দেওয়া হবে, আগে আসলে আগে পাবেন ভিত্তিতে। কাজেই বাসায় ফিরে যাওয়া যাবে না। সে লাইনেই দাঁড়িয়ে থাকলো। তাঁর সঙ্গে আরো হাজার হাজার মানুষ টিকেটের জন্যে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলো। উদ্দেশ্য, তবুও যদি ট্রেনের টিকেট নামক সোনার হরিণ পাওয়া যায়। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এলো। সবার মধ্যে ক্লান্তি চলে এলো। ক্লান্তি দূর করতে কেউ কেউ গান-বাজনা শুরু করল। কেউ কেউ গাইতে শুরু করল- তোরা যে যা বলিস ভাই/আমার সোনার হরিণ চাই। সঙ্গে যোগ করছে, আমার টিকেট যেন পাই, আমার বাড়ি যাওয়া চাই। এভাবেই সৌরভসহ ষ্টেশনের অন্য সবাই গল্প-গুজব, গান আর আড্ডায় রাত কাঁটিয়ে দিল। মাঝে অবশ্য তাঁরা রেষ্টুরেন্ট থেকে খাবার এনে খেয়েছে।

সকাল আটটা থেকে টিকেট দেওয়ার কথা। টিকেট দেওয়া শুরু হলো। কিছু লোক টিকেট পেল। কিন্তু সবাই পেল না। যাঁরা পেল তাঁরা বিজয়োল্লাস করল। মনে হলো যেন তাঁরা ট্রেনের টিকেট নামক সোনার হরিণ পেয়েছে।

এদিকে কাউন্টার থেকে টিকেট প্রত্যাশী বাকীদের বলা হলো, টিকেট নেই। নেই মানে, টিকেট শেষ হয়ে গেছে। এতো তাড়াতাড়ি টিকেট শেষ হয়ে যায় কিভাবে? কেউ সেটা মেনে নিতে পারছে না। হয়তো এখানে কোন লুকোচুরি আছে। হয়তো কালোবাজারিদের হাতে টিকেট দিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রতিবাদ জানালো টিকেট পাওয়া থেকে বঞ্চিত যাত্রীরা। শুরু হলো হট্টগোল। ষ্টেশন ম্যানেজারের হস্তক্ষেপে আরো কিছু লোক টিকেট পেল। তারপরও সবাই টিকেট পেল না। এতো টিকেট গেল কোথায়? যোগাযোগ মন্ত্রী তো বলেছিলেন, টিকেট কালোবাজারী হবে না। নিশ্চয়ই ভূতের কোন কান্ডকারখানা নয়। এরকম অনেক কথার ফুলঝুরি এখন সবার মুখে মুখে। কিন্তু কারো কোন কথা বা প্রতিবাদেও কাজ হলো না। সবাই ফিরে এলো। অন্যান্যদের মতো সৌরভও টিকেট পেল না। সেও বাসায় ফিরে এলো। অন্য কোন পন্থায়, অন্য কোন যানবাহনে বাড়ি যাওয়ার ব্যবস্থা করা যায় কিনা, সৌরভ এখন সে চেষ্টাই করবে।