ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

এক বীর মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী মজিদা খাতুন। যার স্বামী দেশ স্বাধীন করার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণ করেছিলেন- যাদের জন্যে আমরা স্বাধীনভাবে আজ স্বাধীন এ বাংলাদেশে চলাফেরা করতে পারছি, কথা বলতে পারছি। সেই মুক্তিযোদ্ধার এক সন্তান আসিফ ইকবাল মিল্টন। সে অন্যান্য বন্ধুদের সাথে পশ্চিম বঙ্গের কুচবিহারে একটি সাংস্কৃতিক অনূষ্ঠান দেখতে গিয়েছিল। সবকিছুই ঠিকঠাক ছিল। অনুষ্ঠান দেখা শেষে বাড়ি ফেরার পথেই ঘটল আসল বিপত্তি। তার এবং তার পরিবারে নেমে এলো মারাত্মক বিপর্যয়। ২০০০ সালে দেখতে যাওয়া ঐ অনুষ্ঠানে আসিফ ইকবাল মিল্টন বাংলাদেশের বর্ডার অতিক্রম করেছিল কোন ধরণের ভিসা বা পাসপোর্ট ছাড়াই। আর সে কারণেই আসিফ ইকবাল মিল্টন ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বি.এস.এফ এর হাতে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী জনিত অপরাধে ধরা পড়ে যায়। বৈধ ভিসা বা পাসপোর্ট না নিয়ে যাওয়াটা নিশ্চয়ই তার অপরাধ ছিল। আর তার সে অপরাধের শাস্তি হিসেবে আদালত কর্তৃক তাকে ৬১ দিনের সাজা প্রদান করা হয় এবং সেই সাথে সামান্য পরিমাণ (সম্ভবত ৩০০/- টাকা) অর্থদন্ডও দেওয়া হয়, অনাদায়ে যথারীতি আরও ক’দিন সাজাভোগ করতে হবে। নিয়ম অনুযায়ী আসিফ ইকবাল মিল্টন ঐ ৬১ দিনের সাজা ভোগ শেষে এবং অর্থদন্ড পরিশোধ করে ছাড়া পাওয়ার কথা। সাজা ভোগ শেষে মিল্টন বাড়ি ফিরবে। তার প্রিয় মা-বোনের কাছে যাবে, অসুস্থ বীর মুক্তিযোদ্ধা বাবার কাছে বাড়ি ফিরে যাবে বুক ভরা আশা নিয়ে শেষ দিনটি পর্যন্ত সে কুচবিহারের একটি কারাগারে নিরবেই কারাভোগ করেছিল। কিন্তু না, ছাড়া পওয়ার দিনই আসল গল্পের সূচনা ঘটে। এবার নিজের “মিল্টন” নামটাই তার জন্যে কাল হয়ে দাঁড়ালো। সেখানকার পুলিশ এই “মিল্টন” নামে একজন কুখ্যাত সন্ত্রাসীকে দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা চালিয়েও গ্রেপ্তার করতে পারছে না। আসলে সেই কুখ্যাত সন্ত্রাসীর নাম ছিল মিহির দাস ওরফে মিল্টন দাস। পুলিশ আসল মিহির দাস ওরফে মিল্টন দাসকে ধরতে না পেরে সেই বাংলাদেশী যুবক আসিফ ইকবাল মিল্টনকে আবার (ঐ কুখ্যাত সন্ত্রাসী মনে করে) গ্রেপ্তার করে। কলেজের ১ম বর্ষ পড়ুয়া ছাত্র আসিফ ইকবাল মিল্টনের নতুন করে কারাভোগ শুরু হয়। আর এবার যে কারণে সে কারাভোগ করতে শুরু করল সেটির জন্যে সে মোটেই প্রস্তুত ছিলনা, কারণ এর জন্যে সে মোটেই দায়ী নয়। সম্পূর্ণ নিরপরাধ মিল্টন দীর্ঘ ১২ বছর ধরে কারাভোগ করে আসছে। এদিকে আসিফ ইকবাল মিল্টনের বাবা-মা তাকে ছাড়িয়ে আনার জন্যে নানান জায়গায় ধরনা দিয়েও কাজ হয়নি। আসিফের মুক্তিযোদ্ধা বাবা তাঁর সহায়-সম্বল, জায়গা-জমি বিক্রি করে ছেলেকে কারাগার থেকে ছাড়াবার আপ্রান চেষ্টা চালিয়েছেন, তবুও পারেননি। আসিফ ইকবাল মিল্টনের বাবা কিছুদিন আগে ছেলের অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে মারাও গেছেন। ছেলেকে ছাড়িয়ে আনতে না পারার আক্ষেপটা তার রয়েই গেল। মিল্টনের মা কাঁদতে কাঁদতে দিনাতিপাত করছেন। তার বুকফাটা কান্না দেখে প্রতিবেশীরাও কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। এতদিনে হয়তো চোখের জলে তার বুক ভেসে গেছে। স্বামীহারা মজিদা খাতুন এখন কার কাছে যাবেন ছেলেকে ছাড়িয়ে আনতে? নিরপরাধ আসিফ ইকবাল মিল্টন কি আদৌ ছাড়া পাবে? ছাড়া পেলেও মিল্টন কি তার সেই ১২ টি বছর ফিরে পাবে? সে কি ফিরে পাবে তার সেই কলেজ জীবন? এরকম আরোও অনেক প্রশ্নের জবাব হয়তো আমাদের এ সমাজ মিল্টনকে দিতে পারবেনা।

এটা কোন গল্প বা সিনেমার কথা নয়। এটা একটি বাস্তব ঘটনা। কুচবিহার কারাগারে আটক এক বাংলাদেশী যুবক মিল্টনের গল্প। কাল রাতে আমি খবর শুনতে টেলিভিশন অন করে চ্যানেল ঘুরাতে থাকলাম। এরই ফাঁকে ভারতীয় টিভি চ্যানেল CTVN AKD Plus TV এর পর্দায় দেখতে পেলাম- “বাংলাদেশী মিল্টনের গল্প” শীর্ষক লেখাটি। লেখাটি পড়ে আমার নিজের আগ্রহ হলো এবং দেখতে বসলাম। অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার হচ্ছিল। অনুষ্ঠানের উপস্থাপক বললেন- ‌’আজ আমরা শুনাবো একজন বাংলাদেশী হতভাগা যুবক মিল্টনের গল্প। তার ভাষায় মিল্টন ষড়যন্ত্রের স্বীকার। সে এখানে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে সাজা ভোগ করেও ছাড়া না পেয়ে অন্য একজন কুখ্যাত সন্ত্রাসীর অপরাধের দায় মাথায় নিয়ে দীর্ঘ ১২টি বছর ধরে কারাভোগ করছে।’ মিল্টনের পরিবারের উপর একটি সচিত্র প্রতিবেদনও দেখানো হয়। মিল্টনের মা-বোনের কান্না-আহাজারি দেখে আমি নিজেও চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না। এ হৃদয় বিদারক দৃশ্য দেখে শুধু আমি কেন? অনুষ্ঠানটি দেখে অনেকেই কেঁদেছেন, সেটি বুঝা গেল- যারা সরাসরি টেলিফোনে তাঁদের প্রতিক্রিয়া ও মতামত জানাচ্ছিলেন তাঁদের কান্না জড়িত কন্ঠ শুনে। উপস্থাপকের ভাষ্য অনুযায়ী জানা গেল- আসল সন্ত্রাসী মিহির দাস ওরফে মিল্টন দাস একবার গ্রেপ্তার হয়ে ছাড়াও পেয়ে গেছে, তাহলে নিরপরাধ বাংলাদেশী যুবক আসিফ ইকবাল মিল্টন এখনও ছাড়া পেল না কেন? উপস্থাপক আক্ষেপ করে বলেছেন- ‘এ লজ্জা আমরা রাখবো কোথায়?’ টেলিফোনে অংশ নেওয়া একজন দর্শক তার মতামতে বলেছেন- যারা নিরপরাধ মিল্টনের ১২টি বছর নষ্ট করার পেছনে জড়িত তাঁদের যাবজ্জীবন কারদন্ড হওয়া উচিত এবং ভারত সরকারের উচিত মিল্টনের সহযোগিতার জন্য হাত বাড়িয়ে দেওয়া। এর পরিপ্রেক্ষিতে উপস্থাপক বলেছেন- ‘আসিফ ইকবাল মিল্টন হয়তো কারোও কাছে সাহায্য চাইবে না কিন্তু সে এবং তার পরিবার এ ঘটনার সুবিচার চেয়েছে, আমরা কি সুবিচার নিশ্চিত করতে পারবো?’

আমি জানিনা বাংলাদেশ সরকার এ ব্যাপারে অবগত আছেন কি-না? এবং বাংলাদেশের কোন গণমাধ্যমে এর আগে এ সংক্রান্ত কোন খবর প্রকাশিত হয়েছে কি-না? আমি বিনীতভাবে সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ জানাবো যে, তারা যেন এ ব্যাপারে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। আসিফ ইকবাল মিল্টন যদি নিরপরাধ হয়ে থাকে তাহলে তাকে কারাগার থেকে ছাড়াবার যেন ব্যবস্থা করেন। আসিফ ইকবাল মিল্টনের মা’য়ের বুকফাঁটা কান্না বন্ধ করতে কি কেউ এগিয়ে আসবেন না? আপনি আপনার নিজের বিবেককে দয়া করে প্রশ্ন করুন- বিনা কারণে, বিনা দোষে যদি আপনিও ১২ বছর বা তারও বেশী কারাভোগ করতেন, তাহলে কেমন লাগত? গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদেরকেও আমি সবিনয়ে অনুরোধ করছি- আপনারা আসিফ ইকবাল মিল্টনের ব্যাপারে একটু খোঁজ খবর নিয়ে তাকে কারাগার থেকে ছাড়াবার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করুন। সরকারকেও এ ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য বিনীত আহবান জানাচ্ছি।