ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

বাসা থেকে ফুরফুরে মেজাজে বের হলাম। পথে এক মধ্যবয়সী মুরব্বী টাইপ লোকের সাথে দেখা। লোকটি আমার পূর্ব পরিচিত। লোকটির সাথে দেখা হলে হরহামেশাই কিছু একটা নিয়ে কথা হয়। কেমন আছি, কোথায় যাচ্ছি, সময় কেমন কাঁটছে- এই ধরনের কথাবার্তা। আমি লোকটিকে বেশ শ্রদ্ধার চোখেই দেখি। লোকটির সাথে সকালবেলা কখনোই দেখা হয়না। আজ দেখা হতেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন- “কোথায় যাচ্ছ?”
আমি বললাম- “ঘুরতে যাচ্ছি”
“ঘুরতে কোথায় যাচ্ছ?”
আমি বললাম- “লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে”
“খুব ভালো। তো কে কে যাচ্ছ? সঙ্গে মেয়ে বান্ধবীও আছে নাকি?”
আমি বললাম- “নাহ্। আমরা ছেলেরা মিলে ক’জন…………….।”
“আরে এ কী বল! মেয়েদের ছাড়া শুধু ছেলেরা মিলে গেলে তো ভ্রমণ জমবেনা। আমরা একবার ছেলে-মেয়ে মিলে একসঙ্গে গিয়েছিলাম। অনেক মজা হয়েছে!”

বরাবরের মতো লাজুক প্রকৃতির এই আমি কথা না বাড়িয়ে লোকটির কাছ থেকে দোয়া চেয়ে বিদায় নিলাম।
মধ্য বয়স পেরুনো লোকটির রসবোধ দেখে আমি বেশ মুগ্ধ হলাম। আসলে আজকাল এরকমটি খুব কমই দেখা যায়। লোকটি বেশ রসিক এবং ভালো। তাই লোকটি আমার বেশ পছন্দের।

যাক, ক’দিন ধরে দূরে কিংবা কাছে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছে হচ্ছিল। সাঙ্গপাঙ্গ ক’জনের সাথে এ ব্যাপারে আলাপ করতেই তাঁরাও রাজী হয়ে গেল। লাউয়াছাড়া জাতীয় উদ্যানের কথা বলতেই সবাই অতি আনন্দের সাথে একমত পোষণ করল। আমাদের সবারই বহুদিনের শখ চিরসবুজ বনাঞ্চল, পাখপাখালি, জীব-জন্তু আর প্রজাপতি পর্যবেক্ষণ করা। সাঙ্গপাঙ্গসহ আমরা মোট ছয়জন। রানা, ফরিদ, জাফর, ইসমাইল আর ছোট ভাই হিসেবে পরিচিত শামীম এবং সঙ্গে আমি তো রয়েছিই। (শামীম ছোট ভাইয়ের মতো হলেও সে খুবই ভদ্র এবং আন্তরিক। সেজন্যে যখনই আমরা কোথাও ঘুরতে যাই তাকে সঙ্গে নেই, কখনোও কোন সমস্যা হয়না।) আমরা ছয়জনের এই দলটি যথারীতি লাউয়াছড়া উদ্যানে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুতি নিলাম।

সিলেট থেকে মাইক্রোবাস যোগে রওয়ানা দিলাম। মৌলভীবাজার হয়ে শ্রীমঙ্গল যাওয়ার পথে রাস্তার দুপাশে ঘন সবুজ চা বাগান এবং রাবার বাগানগুলো যেন আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে। কিন্তু চলন্ত গাড়ী থেকে তো নামার উপায় নেই। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে একসময় লাউয়াছড়া উদ্যানে পৌঁছে গেলাম। পথের মধ্যিখানে অবশ্য এক জায়গায় হালকা নাস্তা সেরে নিলাম। তাও আবার ঘন সবুজ চা বাগান বেষ্টিত ঢালু পাহাড়ের এক কিনারে। ভোজন প্রিয় ইসমাইল বরাবরের মতো এবারও ‘পাঁচ ভাই নামক রেষ্টুরেন্ট’ থেকে তেহারি সঙ্গে নিয়ে এসেছিলো। তেহারিটা ছিল অপূর্ব মজাদার। প্রকৃতির অপরূপ ছায়ানিবিড় পাহাড়ের কিনারে বসে খাওয়াতে এর স্বাদটা অনেকাংশে বেড়ে গেল। এরই ফাঁকে আমরা সবাই কিছু ছবি তুলে ফেললাম। চা বাগানে নাস্তা করা ও কিছু হইহুল্লোড় করে ছবি তোলা ছিল আমাদের কাছে বাড়তি উপভোগ, যেটি আমাদের পূর্ব পরিকল্পনায় ছিলনা। সাবানের সাথে যদি শ্যাম্পু ফ্রি দিতে পারে তাহলে আমরা বাড়তি আনন্দ উপভোগ করলে ক্ষতি কি?

লাউয়াছড়া উদ্যানে পৌঁছেই আমরা প্রবেশ টিকেট সংগ্রহের জন্য কাউন্টারে গেলাম। কাউন্টারের সামনে কয়েকজন পর্যটকের চিৎকার চেচামেচি দেখে জিজ্ঞেস করলাম- কি হয়েছে? তারা জানালেন- উদ্যানে ঢোকার রাস্তায় আমরা আক্রমণের স্বীকার হলাম। আমরা জিজ্ঞেস করলাম- “কিসের আক্রমণ, বাঘ-ভাল্লুক নাকি কোন দস্যুর আক্রমণ? ”

“নাহ্। আমাদেরকে মৌমাছি কামড় দিয়েছে। এই যে দেখেন কী অবস্থা……….! এখানকার গাইড আমাদেরকে এ ব্যাপারে কোন তথ্য দেয়নি। আচমকা মৌমাছি এসে আমাদের সবাইকে কামড় দিয়ে দিলো।” মৌমাছির কামড়ে মেয়েদের চোখের জল দেখে আমাদেরও দু:খ হচ্ছিলো, কিন্তু কিছুই করার ছিল না।

পাশ থেকে জাফর বলল- “তাহলে বাবা আমাদেরকে এখন সেদিকে ঢোকার দরকার নেই।”
শামীম বলল- “আমাকে একবার একটা মৌমাছি কামড় দিয়েছিল। ব্যথায় কী যে অবস্থা হয়েছিলো………..! সঙ্গে তিনদিন পর্যন্ত জ্বরও ছিল।”
তাই কিছুক্ষণ পরে আমরা উদ্যানের ভিতরে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নিলাম।

শ্রীমঙ্গলের মিষ্টি আনারসের সুনাম সর্বত্রই শুনা যায়। উদ্যানের সম্মুখেই সারি সারি আনারস নিয়ে বিক্রেতারা বসে আছে। কেউ খেতে চাইলে সেখানেই ব্যবস্থা রয়েছে। অভ্যাস অনুযায়ী আমরা দরদাম করতে থাকলাম। প্রতি জোড়া আনারসের আকাশচুম্বী দাম শুনে আমরা আঁতকে উঠলাম। যেখানে আনারস ফলে সেখানেই কি-না এতো চড়া দাম। চড়া দাম শুনে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন সুন্দরী যুবতী মহিলা বিক্রেতাকে বলে উঠলেন- “আরে কি বলেন? এগুলোর হালি তো মাত্র বিশ টাকা।” কিছু না বুঝেই আমি বিক্রেতাকে বললাম- “এই দাওনা। ভাবী বলেছেন তো ওগুলোর হালি বিশ টাকা, তাহলে তো একজোড়ার দাম…………………..!”

সুন্দরী যুবতী মহিলাটি আমার দিকে অপলক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন অথচ কিছুই বললেন না। মনে হলো আপন কেউ, অথচ পর। আসলে বাঙ্গালী যেখানেই যায় না কেন কাউকে আপন করে ভাবতে সময় লাগেনা।

আনারস বিক্রেতার সাথে দরাদরিতে না হওয়ায় এ যাত্রায় আনারসের মিষ্টি স্বাদ উপভোগ করা গেল না।

এরই মধ্যে ত্রিশ মিনিটের মতো সময় পার হয়ে গেছে। আমরা টিকেট সংগ্রহ করে ভিতরে প্রবেশ করলাম। প্রবেশ পথেই নানান জাতের সারিসারি গাছ এবং পাখির কিচিরমিচির শব্দে আমাদের প্রাণ ভরে গেল। চিরসবুজ এই বনে বড় বড় গাছের মধ্যে রয়েছে লোহাকাট, জারুল, গর্জন, চাপালিশ, সেগুন, শিশু, চম্পা, সুন্দরীসহ নাম না জানা আরও বহু গাছ। বড় গাছের পাশাপাশি ছোট ছোট গাছও বেড়ে উঠছে। এসব ছোট-বড় গাছ আর ঘন সবুজ বনে জঙ্গলটি যেন পুরো ঢেকে গেছে। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো মাটিতে পড়ে খুবই সুন্দর এক মায়াময় পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। এখনও এতো সুন্দর সুন্দর নানান প্রজাতির গগণচুম্বি সারিসারি গাছ দাঁড়িয়ে আছে ভাবাই যায় না। নিত্যদিনই তো বন্যদসুদের খবর শুনা যায়। প্রায়ই শুনা যায় বনদস্যুরা প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় বন উজাড় করে গাছ বিক্রি করছে। রাতারাতি কোটিপতি হয়ে যাচ্ছে। সবাই গাছ কেটে ফেললে আমরা অক্সিজেন পাবো কোথায়? পশু-পাখিরা কোথায় নিশ্চিন্তে বসবাস করবে? বনের উপাদান গাছ কেটে ফেললে আমরা কি এভাবে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবো? নিজেদের এবং সকলের স্বার্থেই বন রক্ষা করা জরুরি। আশা করি সকলেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষার ব্যাপারে সজাগ এবং সতর্ক থাকবেন।

আরোও সামান্য ভিতরে যেতেই চোখে পড়ল বনের মাঝখান দিয়ে কোন এক অজানার উদ্দেশ্যে চলে গেছে রেল লাইন। সবুজ বনের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলা রেললাইনের দৃশ্য অপূর্ব লাগছিলো। রেললাইনের ধারে আমরা ক’জন ছবি উঠালাম। ছবি উঠানো শেষে আমরা সবাই মিলে কোমল পানীয় পান করতে করতে আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে জঙ্গলের ভিতরের দিকে এগিয়ে চললাম। শান্ত পায়ে হেটে নিরবে এদিক-সেদিক তাকিয়ে তাকিয়ে এগুতে থাকলাম। পশু-পাখির কোলাহলপূর্ণ শব্দে আমরাও বেশিক্ষণ নিরবে থাকতে পারলাম না। হরেক প্রজাতির পশু-পাখি আর অপরূপ গাছ-গাছালি দেখে দেখে একেকজন একেক বিশ্লেষণ শুরু করে দিলো। সবুজ প্রকৃতির সান্যিধ্যে এসে সবাই যেন মহাপণ্ডিত হয়ে উঠেছে। শুনেছি প্রেমে পড়লে নাকি মানুষ কবি হয়ে যায়। এখানেও এর ব্যতিক্রম হলো না। প্রকৃতির প্রেমে কেউ কেউ কবিতা বানাতে শুরু করে দিলো। জাফর তো বলেই উঠল- “পড়ে না চোখের পলক, কী তোমার গাছের ঝলক।” পাশ থেকে আমি শুনে এটাকে আরেকটু পরিবর্তন করে বললাম- “পড়ে না চোখের পলক, কী অপরূপ প্রকৃতির ঝলক…………….।” আমাদের কবিতা শুনে পাশ দিয়ে হেটে চলা সুন্দরী মেয়েরা হাসছে নাকি উপভোগ করছে বুঝা গেল না। তবে প্রিয়জনকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে আসা ছেলে-মেয়েদের বেশ প্রাণবন্ত মনে হচ্ছিল। চিরসবুজ এই প্রকৃতিতে প্রেমিক যুগলের সরব প্রাণোচ্ছল উপস্থিতি সত্যিই মনোমুগ্ধকর। তাদের সরব উপস্থিতি দেখে রানা বলে উঠল- পরেরবার আমি একা আসব না। “একা আসবে না মানে? এখন কী তুমি একা এসেছো? আমরা আছি না!” রানা আমাদের বুঝাবার চেষ্টা করে- “আরে নাহ্! আমি আসলে বলতে চেয়েছি……………….! তোরা রাগ করিস না।” ইসমাইল বলল- আচ্ছা ঠিক আছে, ঠিক আছে। এসময় আমরা দেখতে পেলাম- পথের ধারে ঝুলে থাকা একটা গাছের লতা ধরে ফরিদ ‘টারজানের’ মতো করে ঝুলছে। দেখে ভালোই লাগছিল। তবে পাঞ্জাবী পরা মৌলভী সাহেবকে গাছের লতা ধরে ঝুলতে দেখে নূপুর পায়ে হেঁটে চলা সুন্দরী মেয়েরা খিলখিল করে হাসাহাসি করছিল। বনের পাখির কিচিমিচির শব্দের সাথে মেয়েদের নূপুরের ছন্দ এবং তাঁদের প্রাণোচ্ছল হাসি অপরূপ লাগছিলো। এদিকে বেচারা ফরিদ উঠার সময় ঠিকই উঠেছে কিন্তু নামতে পারছে না। যাক, সকলের সহযোগিতায় শেষ পর্যন্ত সে নামতে পেরেছে। নামার পর তাঁর হুংকার দেখে কে! “কেউ পেরেছো? আমি পেরেছি! আমি টারজান……, হি হি হি…………….!” পরে অবশ্য তাঁর দেখাদেখি আরেকজন উঠার চেষ্টা করেও উঠতে পারেনি।

এখানে বলে রাখি লাউয়াছড়া উদ্যানের পূর্বতন নাম ছিল পশ্চিম ভানুগাছ সংরক্ষিত বন। এটি মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত। ঢাকা থেকে এর দূরত্ব প্রায় ২০০ কি:মি: এবং সিলেট থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৭০ কি:মি:। চিরসবুজ এ উদ্যানে বাস, ট্রেন উভয় মাধ্যমেই যাওয়া যায়। পশ্চিম ভানুগাছ সংরক্ষিত মিশ্র চির-হরিৎ এই বনের একটি অংশকে ১৯৭৪ সালের বন্যপ্রানী (সংরক্ষণ) (সংশোধন) আইন অনুযায়ী ১৯৯৬ সালে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এ উদ্যানে ৪৬০ প্রজাতির জীব বৈচিত্র্যের মধ্যে ১৬৭ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৪ প্রজাতির উভচর, ৬ প্রজাতির সরীসৃপ, ২৪৬ প্রজাতির পাখি এবং ২০ প্রজাতির স্তন্য প্রাণী রয়েছে। এছাড়া, মায়া হরিণ এবং বিলুপ্ত প্রজাতির বানর বাস করে যাদের মধ্যে উল্লুক, মুখপোড়া হনুমান ও কলু বানর অন্যতম।

প্রকৃতির প্রেমে হারিয়ে গিয়ে কখন যে আমাদের সময় পার হয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চললেও আমাদের খাওয়া তখনও বাকী। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী আমাদের এখানকার স্থানীয় কোন হোটেলে মধ্যাহ্নভোজ করার কথা। কিন্তু বিকেল হওয়াতে মধ্যাহ্নভোজের পরিবর্তে আমরা ফল এবং সাথে হালকা কিছু খাবার খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। ইসমাইল শুরু থেকেই আনারস খাওয়ার জন্য আবদার করে আসছিল। তাই তার কথামতো আবারোও ঐ আনারস বিক্রেতার কাছ থেকে একটু চড়া দামেই আনারসের মিষ্টি স্বাদ নিলাম। দাম একটু বেশী হলেও আনারস বেশ মিষ্টি। পেটের ক্ষিধে কিছুটা হলেও মিটেছে।

সবাইকে নিয়ে গাড়িতে উঠে বাসায় ফিরার জন্য প্রস্তুতি নিলাম। ১২৫০ হেক্টর আয়তনের অপরূপ লাউয়াছড়া উদ্যান ছেড়ে যেতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। ছেড়ে যেতে না চাইলেও আমাদেরকে ছেড়ে যেতে তো হবে। তবু সঙ্গে নিয়ে তো যাচ্ছি যত নতুন অভিজ্ঞতা। লাউয়াছড়া উদ্যানে এসে আমাদের অনেক মজার মজার অভিজ্ঞতা হলো। চিরসবুজ এ বনাঞ্চলে না এলে হয়তো আমরা অনেক কিছু থেকেই বঞ্চিত হতাম।

গাড়ীতে উঠে আমরা যথারীতি সিলেটের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। সারাদিনের ক্লান্তি আর পেটের ক্ষুধায় গাড়িতে উঠে কিছুক্ষণ চলার পর হিমেল বাতাসের পরশে কেউ কেউ ঘুমিয়ে পড়ল। হঠাৎ ভোজন রসিক ইসমাইল ঘুম থেকে খাবো খাবো বলে চিৎকার দিয়ে উঠল। বেচারা ইসমাইলের কী হলো ? সবার দৃষ্টি এখন তার দিকে। আসলে সে ঘুমের মধ্যেই ছিলনা। এমনি এমনি চোখ বন্ধ করে হেলান দিয়ে ঘুমের ভান করে শুয়েছিল। এটা ছিল সবার নজরে আসার জন্য তার একটা প্রচেষ্টা। পাশ থেকে জাফর বলল- “আজ আর খাওয়া হবেনা। সিলেট পৌঁছে তবেই খাবো। শুধুই খাওয়া আর খাওয়া। এসব আমার ভালো লাগে না।” ফরিদ বলল- “আমি ইসমাইলের পক্ষে। আমিও খাবো।” শামীমও এতে সায় দিলো। ফলে এই দলে এখন তিনজন। অপর পক্ষে জাফর, রানা আর আমি। ভোটাভুটিতে উভয়পক্ষে সমান সংখ্যক ভোট পড়ায় এ ব্যাপারে কোন সুরাহা হচ্ছেনা। এবার কি হবে? আমি বললাম- “ড্রাইভারকেও এখানে ভোটাধিকার দেওয়া উচিত। তাহলে আমরা একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারবো।” এবার ড্রাইভার এবাদকে যার যার দলে ভোট দেবার জন্যে তদবীর চালাচ্ছে। সুবিধাবাদি এবাদও কম যায় না। দরকষাকষিতে পটু ড্রাইভার এবাদের কাছে ভোট চাইতেই সে এবার নড়েচড়ে বসল। এবার তার ভোটটি বড্ড দামী হয়ে উঠল। সে বলল- “আমি ভোট দিলে- আমাকে কে কী বাড়তি সুবিধা দিবে?” জাফর বলল- “আমার ভাগের অর্ধেকটা তোমাকে দিয়ে দিব।” পাশ থেকে ইসমাইল বলল- “আমি যা পাবো তার পুরোটাই তোমাকে দিয়ে দিব। তবুও আমাদের পক্ষে তোমার ভোটটি দাও।” অবশেষে সুবিধাবাদি ড্রাইভার এবাদ ইসমাইলদের পক্ষেই ভোট দিলো এবং সবাই একসাথে মধ্যাহ্নভোজের খাবার সন্ধ্যায় খেলাম। (সারাদিনের ক্লান্তিতে আমাদের সকলেরই কিছু খাওয়ার দরকার ছিল। আসলে প্রকৃতি দেখতে দেখতে আমরা খাওয়ার সময়ই পাইনি।) এদিকে সুবিধাবাদি এবাদকে কেউ কিছুই দিলো না। কেউ কথা দিয়ে কথা রাখল না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে কি এরকম দেখা যায়? ক্ষমতায় যাওয়ার আগে কাউকে দলে ভিড়াতে সবকিছুই দিয়ে দেবার প্রতিশ্রুতি দেয় আবার ক্ষমতায় গেলে কিছুই দেয়না।

খাবার শেষে আবারোও আমরা গাড়িতে চড়ে রওয়ানা দিয়ে অনেক হইহুল্লোড় করতে করতে একসময় সিলেটে পৌঁছে গেলাম। আর সঙ্গে নিয়ে এলাম যত মধুর স্মৃতি। অজানাকে জানলাম। অদেখাকে দেখলাম। নতুন নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করলাম। আবার কবে দেখা হয়…………..!

ভ্রমণ করুণ, আনন্দ করুন, সুস্থ থাকুন, সুখে থাকুন, নিজে জানুন এবং অন্যকে জানান।