ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

একদিন এক মৌলভী সাহেবের কাছে বশীর নামের একজন মাদ্রাসা ছাত্র এসে বলল- “অর্থের অভাবে আমার বাবা আমাকে লেখাপড়া ছেড়ে দিতে বলছেন। আমি নাকি সংসারের বোঝা হয়ে গেছি। লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে এখন আমাকে সংসারের জন্যে আয়-উপার্জন করতে হবে। আমি লেখাপড়া চালিয়ে যেতে চাই।”

ছেলেটি বেশ মেধাবী এবং পরিশ্রমী তা তিনি আগে থেকেই জানতেন। সেজন্যে মৌলভী সাহেবের দু:খটা আরোও বেড়ে গেল। মৌলভী সাহেব পাড়ার করিম সাহেবের সাথে এ ব্যাপারে আলাপ করলেন। করিম সাহেব সব শুনে বললেন- “বশীর যদি রাজী থাকে তাহলে আমার বাড়ীতে থেকে সে লেখাপড়া করতে পারবে। আমি ওর লেখাপড়ার যাবতীয় খরচ চালিয়ে নেবো।”

মৌলভী সাহেব বশীরকে একদিন সকালে করিম সাহেবের বাড়ীতে দিয়ে আসলেন। বশীর যথারীতি তার লেখাপড়া শুরু করে দিল। লেখাপড়ার পাশাপাশি বশীর করিম সাহেবের ঘরের টুকটাক কাজে সহযোগিতা করে থাকে। বশীর এখন করিম সাহেবের পরিবারেরই একজন হয়ে গেছে। করিম সাহেবকে সে ‘চাচা’ বলে ডাকে। করিম সাহেবের অতি আদরের মেয়ে জোছনাও বশীরকে অতি আপনজন ভেবে শ্রদ্ধা করে।

বশীর এতোদিনে তার মাদ্রাসার লেখাপড়া শেষ করে চাকরী-বাকরীর জন্য অপেক্ষা করছে। দেশে চাকরীর আজকাল যেই অবস্থা! মামার জোর না থাকলে সহজে চাকরী হয়না। টাকা-পয়সা উপার্জন করতে না পারলে মা-বাবার দারিদ্রপীড়িত সংসারে গিয়ে লাভ নেই, তাই সে করিম সাহেবের বাড়ীতে থেকেই চাকরীর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

করিম সাহেবের মেয়ে জোছনা সদ্য ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা শেষ করল। মেয়ে বড় হয়েছে তাই মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দেবার জন্যে সবাই বলাবলি করছে। পাড়ার ছেলেরাও প্রায়ই জোছনাকে উত্ত্যক্ত করে। এসব দেখে বশীরের খুব একটা ভালো লাগেনা।

একদিন পূর্ণিমা রাতে জোছনাকে সে রাতের জোৎস্না পর্যবেক্ষণ করতে দেখেছিল। জোৎস্নার আলোর মতো সুন্দর বলেই কিনা মা-বাবা তার নাম জোছনা রেখেছিলেন, কে জানে। জোছনা যখন রাতের সৌন্দর্য্ উপভোগ করছিল ঠিক সেই সময় বশীর কী একটা কাজে ঘর থেকে বের হচ্ছিলো। ঘর থেকে বেরিয়ে জোছনাকে দেখতে পেয়ে তার অন্যরকম অনুভূতি হলো। জোৎস্নার আলোয় জোছনাকে অপূর্ব সুন্দর লাগছিলো। জোছনার রূপ যেন আলোয় ঝলমল করছিলো। মনে হলো যেন জোছনাকে আজ সে প্রথম দেখছে। বশীর কিছুক্ষণ জোছনার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল। তারপর সে তার কাজে চলে গেল। বশীরকে দেখে জোছনাও মুচকী হাসি হেসে ঘরের ভেতর চলে গেল। সেই থেকে বশীর জোছনাকে একটু অন্য চোখে দেখে। তাঁর অন্যরকম ভালো লাগে। জোছনাকে কথাটি সে কখনোই জানাতে পারেনি। পথের ছেলেরা যখন জোছনাকে উত্ত্যক্ত করে তখন তার ভীষণ কষ্ট লাগে। জোছনাকে যে সে অতি আপন করে ভাবে তা কখনো কাউকে বুঝতে দেয়নি।

এদিকে করিম সাহেবের অতি আদরের মেয়ের বিয়ে নিয়ে সবাই বলাবলি করছে, পথের ছেলেরাও উত্ত্যক্ত করছে। তাই করিম সাহেব এবার মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত নিলেন। করিম সাহেব একদিন বশীরকে ডেকে বললেন- “তোমার জানাশুনা কোন ভালো পাত্র থাকলে খবর দিও। ভালো পাত্র পেলে জোছনাকে বিয়ে দিয়ে দেব।”
বশীর মনে মনে বলে-“পাত্র তো হাতের কাছেই আছে, তো কি করে বলি!” বশীর এ যাত্রায়ও সাহস করে বলতে পারলোনা।

অনেক সম্বন্ধ আসছে কিন্তু পাত্র তো মনের মতো হচ্ছে না। অনেক খোঁজাখুজির পর একদিন ঘটক মধ্যপ্রাচ্য ফেরত এক পাত্রের সন্ধান নিয়ে আসলেন। ঘটক এসে করিম সাহেবকে বললেন-“পাত্র দেখতে সুন্দর, আচার-ব্যবহারও ভালো। পাত্রের বাবা বিপুল সম্পদের অধিকারী। আপনার মেয়ের কোন সমস্য হবেনা। আপনি চাইলে ভেবে দেখতে পারেন।”

প্রস্তাবটি বিবেচনায় নিয়ে করিম সাহেব মেয়েকে বিয়ে দেবার জন্যে রাজী হয়ে গেলেন। জোছনা প্রথমে বিয়েতে রাজী ছিল না। পরে অবশ্য বাবা-মা’র মুখের দিকে তাকিয়ে বিয়েতে রাজী হয়ে গেল। ধুমধামে বিয়ের সব আয়োজন করা হলো। আত্মীয়-স্বজন সবাইকে নিমন্ত্রণ জানানো হলো। এদিকে জোছনাও তার বন্ধু-বান্ধবীদের নিমন্ত্রণ জানালো। অবশেষে বিয়ের দিন উপস্থিত হলো। সবাই বিয়েতে আসল। বিয়ের বাদ্যযন্ত্র বেজে উঠল। বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে বাড়ীতে এক আনন্দঘন পরিবেশের সৃষ্টি হলো। সবাই অনেক আনন্দ-ফূর্তি করতে থাকল।

এদিকে বরকে স্বাগত জানানোর জন্যে সবাই ফুল হাতে অপেক্ষা করছে। একসময় সাঙ্গোপাঙ্গসহ বিশাল বহর নিয়ে রঙ্গিন সাঁজে বর আসলেন। সবাই অতি আনন্দের সাথে তাকে স্বাগত জানালেন। হইহুল্লোড় করতে করতে সবাই বরকে তাঁর জন্যে প্রস্তুকৃত মঞ্চে বসালেন। টক-ঝাল-মিষ্টি শরবতও খাওয়ানো হলো। শরবত পানের পর বরের তেতো মুখ দেখে বুঝা গেলো শরবতে হয়তো কেউ ইচ্ছে করেই লবণ একটু বেশী দিয়েছে। বরের সাথে আসা যুবকদের সাথে কনে পক্ষের সুন্দরী মেয়েদের আড্ডাটা বেশ জমে উঠেছে। এসময় মঞ্চের পেছন দিক থেকে একজন বরকে সুঁই দিয়ে গুতো মারল। সুঁইয়ের গুতো খেয়ে বর লাফ দিয়ে উঠতেই শ্যালক-শ্যালিকাসহ উপস্থিত সবাই খিলখিল করে হেসে উঠল। যুবক-যুবতীদের প্রাণোবন্ত, প্রাণোচ্ছল আড্ডাটা সবাই বেশ উপভোগ করছিল।

এরইমধ্যে কাজী সাহেব এসে বিয়ে পড়াবার জন্যে প্রস্তুতি নিলেন। এসময়ই ঘটল আসল বিপত্তি। হঠাৎ পাত্রের বাবার গলার আওয়াজ শুনা গেল- “এই ঘটক সাহেব, পাত্রকে যে মটর সাইকেল দেয়ার কথা ছিল,
সেটি কোথায়? দেখছি না যে।”

ঘটক সাহেব পাত্রের বাবাকে বুঝাবার চেষ্টা করলেন- “আস্তে কথা বলুন, লোকে শুনতে পাবে তো। মেয়ের বাবা মটর সাইকেলটি কিছুদিন পরে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আগে বিয়েটা শেষ হয়ে যাক, তারপর আমরা এ ব্যাপারে তার সাথে কথা বলব।”

কানাঘুষা কথাবার্তা শুনে পাত্র মঞ্চ থেকে তার বাবাকে ডেকে বলল- “কী শুনছি ওসব, বাবা- আমি কিন্তু মটর সাইকেল না পেলে কিছুতেই কবুল বলব না। আগে আমার মটর সাইকেলটি চাই-ই-চাই। অনেক দেখেছি- মেয়ের বাবা পরে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আর দেয় না।”
ঘটক এবং মেয়ের বাবা মিলে পাত্রের বাবা এবং পাত্রকে অনেক চেষ্টা করেও রাজী করাতে পারলেননা, বুঝাতে সক্ষম হলেননা। উপস্থিত অনেকে তদবীর করেও যৌতুক লোভী পাত্রকে বিয়েতে রাজী করাতে পারলেননা।

বিয়ে বাড়ীতে তুমুল গোলযোগ বেধে গেল। আনন্দঘন বিয়ে বাড়ীটিতে এখন দু:খের সুর বেজে উঠল। ভেতরে কনের মা এবং নিকটাত্মীয়দের মাঝে কান্নার রোল পড়ে গেল। সবাই দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল। চারিদিকে রব উঠে যায়- কি হলো, কি হলো? এখন কি হবে?

একপর্যায়ে লজ্জায়, ঘৃনায় জোছনা বেরিয়ে এসে বলল- “বাবা, আমি যৌতুক লোভী ঐ কাপুরুষটাকে কিছুতেই বিয়ে করবনা। ও তো আমাকে বিয়ে করতে আসেনি। এসেছে মটর সাইকেল নিতে। আমার চেয়ে ওর কাছে মটর সাইকেলটাই বেশী দামী। তাই ওকে কিছু টাকা ভিক্ষে দিয়ে বিদায় করে দাও, হাট থেকে সে একটা মটর সাইকেল কিনে নিবে।”

চারদিকে নিস্তব্ধ, নিরবতা, কেউ কিছু বলছে না। আসলে কেউ কিছু বলতে পারছেনা। সবাই চুপচাপ নিজ নিজ আসনে বসে আছেন। এসব দেখে সবার যেন ভাষা হারিয়ে গেছে।

জোছনার কথা তখনো শেষ হয়নি। সে সবার উদ্দেশ্যে বলল- “এখানে উপস্থিত কেউ কি আমাকে বিয়ে করতে রাজী আছেন? রাজী থাকলে সম্মতি সূচক হাতটি উপরে উঠান। যে রাজী হবেন- তাকে আমি এক্ষুণি বিয়ে করব।”

নিস্তব্ধ, নিশ্চুপ এই বিয়ে বাড়ীতে কেউ কিছুই বলছেন না। কেউ জোছনার আবেদনে সাড়া দিচ্ছেন না। জোছনা অবাক দৃষ্টিতে সকলের দিকে তাকিয়ে থাকে, অথচ কারোও কোন সাড়া শব্দ নেই। সে ভেবে পায় না, সে এখন কি করবে? লজ্জায়, ঘৃণায় এবার কি তাহলে তাকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হবে? এবারও কি যৌতুকের বলি হবে আরেকজন নারী?

হঠাৎ একজন পাঞ্জাবী পরিহিত লোককে দেখা গেল তার হাত দিয়ে মাথায় কি যেন করছে। মনে হয় মাথা চুলকাচ্ছে। জোছনা দেখতে পেয়ে বলল- “এই, কে ওখানে? রাজী থাকলে ঠিকমতো আপনার সম্মতিসূচক হাত উপরে উঠান। ভয় পাবেন না। কথা যখন দিয়েছি, আপনি যেই হউন না কেন আমি বিয়ে করব।”
আসলে ওটা ছিল বশীরের হাত। এ সুযোগে বশীর মনে মনে বলে- এতোদিন যে কথাটি আমি জোছনাকে বলার সাহস বা সুযোগ কোনটাই পাইনি তাহলে আজ এ সুযোগে আমি বলেই ফেলি। যা হবার হবে। “আমি রাজী।”
করিম সাহেব বশীরের দিকে অপলক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন আর বললেন- “তুমি কি সত্যি বলছ। আমি কি সত্যি শুনছি, বশীর…….!”
“হ্যাঁ, আমি সত্যি বলছি”
“আচ্ছা ঠিক আছে, জোছনা সবার সম্মুখে যখন কথা দিয়েছে তাই কথা তো রাখতেই হবে।”
করিম সাহেব কাজী সাহেবকে ডেকে বশীরের সাথে জোছনার বিয়ে দিয়ে দিলেন। অত:পর তারা আজ অবধি সুখে শান্তিতে বসবাস করছেন।

সত্যি বলছি, নামগুলো সব কাল্পনিক। তবে এটি হয়তো আমাদের সমাজে ঘটে যাওয়া কোন একটি ঘটনা। এরকম ঘটনা কি ঘটতেই থাকবে? এখানে সবগুলো নামই ছদ্মনাম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। কারোও নামের সাথে মিলে গেলে আন্তরিকভাবে দু:খ প্রকাশ করছি।

যৌতুক দেয়া এবং নেয়া থেকে বিরত থাকুন। যৌতুকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলুন।
পরিশেষে রবিন্দ্রনাথের গানের দু’টি লাইন দিয়ে শেষ করছি-
তোরা পাবার জিনিস হাটে কিনিস,
রাখিস ঘরে ভরে।