ক্যাটেগরিঃ চারপাশে

 

কয়েক বছর আগে একটি নৌ দুর্ঘটনায় মা-বাবাকে হারিয়ে ছোট্ট ইয়াসমিন স্মৃতিভ্রষ্ট, ঠিকানাবিহীন হয়ে পড়েছিল। দুর্ঘটনার পর একজন পুলিশ তাকে উদ্ধার করে কয়েকটি লাশ দেখালেন। পরে ইয়াসমিনের গলায় পরিহিত লকেটের ছবি দেখে পুলিশ চিনতে পারলেন- ঐ লাশগুলোর মধ্যে ইয়াসমিনের বাবা-মায়ের লাশও রয়েছে। ঐ পুলিশ ইয়াসমিনকে জানালেন- ‘তোমার বাবা-মা মারা গেছেন, এই দেখো তোমার বাবা-মায়ের লাশ’। তারপর তিনি আহত ইয়াসমিনকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন। দুই-তিন দিন তাঁর কাছে রেখে চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেন। একসময় ঐ পুলিশ হয়তো ভাবলেন- ‘ইয়াসমিন তাঁর কাছে একটা বোঝা হয়ে গেছে। শুধু শুধু ওকে তাঁর কাছে রেখে ঝামেলা বাড়িয়ে লাভ কি? এরচেয়ে কোনভাবে বিদায় করতে পারলেই বাঁচি।’

ইয়াসমিনকে তাঁর স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার তাগিদ তিনি অনুভব করলেন না। বরঞ্চ তিনি তাকে বললেন, এখানে চোর-ডাকাত বেশি, তাই তার গলায় পরিহিত লকেটটি যেন তার কাছে সে দিয়ে দেয়। ইয়াসমিন তার গলায় পরিহিত লকেটটি খুলে পুলিশের কথামতো দিয়ে দেয়। তারপর ঐ পুলিশ গাড়িতে করে বাইরে নিয়ে গিয়ে রাস্তায় তাকে একটি চিপস্ হাতে ধরিয়ে দিয়ে মোবাইলে কথা বলতে বলতে চলে গেলেন। আর ফিরলেন না। এরপর আশ্রয়হীন হয়ে ইয়াসমিনকে রাস্তায় ঘোরা ছাড়া উপায় ছিল না। মা-বাবাহারা আশ্রয়হীন ইয়াসমিনকে তখন ঢাকার মোহাম্মদপুরের রাস্তা থেকে মো. সাহেদ তুলে আনেন নিজের কুঁড়েঘরে। শুরু হয় ইয়াসমিনের নতুন এক জীবন (দ্বিতীয় জীবন)। আস্তে আস্তে ইয়াসমিন সাহেদের পরিবারের একজন সদস্য হয়ে উঠে। সাহেদের মাকে মা, দুই ভাইকে বড় ও ছোট ভাই বলে ডাকে ইয়াসমিন। স্কুলে ভর্তি করানো হয় ইয়াসমিনকে। এরই মধ্যে সে সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত পাট শেষ করে ফেলে। সাহেদদের সংসারে সে ভালোই বড় হয়ে উঠছিল। একসময় আরেকটি দুর্ঘটনায় ইয়াসমিন স্মৃতি ফিরে পায় এবং দুর্ঘটনা-পরবর্তী গত কয়েক বছরের স্মৃতি সে ভুলে যায়। পুরোনো স্মৃতি ফিরে পেয়ে ইয়াসমিন তাঁর স্বজনদের কাছে যেতে চায়।

এটি বানানো কোন গল্প নয়। এটি ২০০৫ কিংবা ২০০৬ সালে ঘটে যাওয়া একটি লঞ্চ দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া ইয়াসমিনের গল্প। যেটি ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১২ তারিখে দৈনিক প্রথম আলোর “ছুটির দিন” সংখ্যায় ইয়াসমিনের “দ্বিতীয় জীবন” নামে একটি প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছিল।

অনেকেই এখন ইয়াসমিনকে তার স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।কিন্তু প্রশ্ন হলো পুলিশ কি ঐ সময়ে দায়িত্ব নিয়ে তার স্বজনদের খোঁজে বের চেষ্টা করতে পারত না? কিংবা ঐ লকেটটা সংগ্রহে রেখে চেষ্টা করতে পারত না? যেটিতে তার বাবা-মায়ের ছবি ছিল। সময়মত এ ব্যাপারে দৃষ্টিপাত করা গেলে হয়তো আজ ইয়াসমিনকে আর স্বজনদের কাছে ফিরে যাবার জন্য আহাজারি করতে হতো না। যে দায়িত্ব পুলিশ নেয়নি সে দায়িত্ব (একজন সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক) সাহেদ নিয়েছেন। সেজন্যে সাহেদকে অনেক অনেক ধন্যবাদ এবং সবাই তাকে ধন্যবাদ জানাবেন বলে আমার বিশ্বাস।

গত সপ্তাহে মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় মেঘনা নদীতে আরেকটি মর্মান্তিক লঞ্চ দুর্ঘটনায় প্রায় শতাধিক লোক নিহত হয়েছেন। এর জন্য আমি গভীর শোক প্রকাশ করছি। যাঁরা মর্মান্তিক এ লঞ্চ দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন তাঁদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি এবং তাঁদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। এখনো যাঁরা নিখোঁজ রয়েছেন তাঁদেরকে যথাশীঘ্র উদ্ধারের চেষ্টা চালানোর জন্য আমি সংশ্লিষ্টদেরকে সবিনয়ে অনুরোধ জানাচ্ছি। আর যাঁরা আহত হয়েছেন তাঁদেরকে চিকিৎসা ব্যবস্থা করার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি। বিশেষ করে কোন শিশু যদি আহত থাকে তাহলে তাদের প্রতি সুদৃষ্টি দিয়ে সুচিকিৎসা নিশ্চিত করে তাঁদের স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেবার ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আমি সংশ্লিষ্টদের প্রতি জোর দাবী জানাচ্ছি। যাতে ইয়াসমিনের মতো আর কোন শিশুকে তার স্বজনহারা হতে না হয়।

আর কোন ইয়াসমিনকে যাতে আশ্রয়হীন হয়ে অসহায়ের মতো রাস্তায় ঘোরতে না হয় সেদিকে সংশ্লিষ্ট সবাই সুদৃষ্টি রাখবেন বলে আমি আশা রাখি।

পরিশেষে বলব, আর কোন লঞ্চ দুর্ঘটনায় শত শত লোক কেন একটি লোকও নিহত হোক সেটি আমরা চাইনা। এরকম আর কোন লঞ্চ দুর্ঘটনা যেন না হয় সেদিকে সংশ্লিষ্ট সকলেই সুদৃষ্টি রাখবেন। এটা আমি, আমরা সকলেই কামনা করি।