ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

আজ ২৬ মার্চ। আমাদের মহান স্বাধীনতা দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিন থেকে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে পরিচিতি লাভ করে। আমাদের এ মহান স্বাধীনতা একদিনে আসেনি। এর জন্য বহু সংগ্রাম করতে হয়েছে। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে বাংলার স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত যাওয়ার পর থেকে শুরু হয় ওপনিবেশিক যুগের। ব্রিটিশরা প্রায় দু্ইশত বছর এ দেশ শাসন-শোষণ করে । ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতীয় উপমহাদেশ স্বাধীন হয় এবং ভারত বিভক্ত হয়ে দু’টি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়।

১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট ভারতবর্ষের যে অঞ্চলগুলোতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট লোক বসবাস করে সেরকম দু’টি অঞ্চল পূর্ব বাংলা এবং পশ্চিম পাকিস্তান মিলে গঠিত হয় পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের। যদিও এ দু’টো অঞ্চলের মধ্যে দূরত্ব ছিল প্রায় দুই হাজার কিলোমিটারেরও বেশী এবং মাঝখানে ভিন্ন একটি দেশ ভারতের অবস্থান। এমনকি দু’টি অঞ্চলের ভাষা এবং সংস্কৃতিও ছিল ভিন্ন।

পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র সৃষ্টি হওয়ার পর থেকেই পূর্ব বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তানের জনগন নানা বৈষম্যের স্বীকার হতে থাকে। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের জনগনের উপর নির্যাতন, নিপীড়ন শুরু করে। তারা এ অঞ্চলের জনগনের উপর জোরপূর্বক তাঁদের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৮ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ঘোষণা দেন পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হবে উর্দু। ভিন্ন একটি ভাষা এ অঞ্চলের জনগনের উপর তিনি চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন। পূর্ব বাংলার জনগন এ সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেনি। শুরু হয় বাংলা ভাষা রক্ষার আন্দোলন। এ আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবসহ অনেকে গ্রেপ্তার হন। তারপরও আন্দোলন সংগ্রাম থেমে থাকেনি। পর্যায়ক্রমে এ আন্দোলন তীব্রতর হতে থাকে। অবশেষে ১৯৫২ সালের ২১ ফ্রেব্রুয়ারি বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবির মিছিলে পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর লেলিয়ে দেয়া পুলিশের গুলিতে শহীদ হন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরসহ অনেকে। পকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী শেষ পর্যন্ত ১৯৫৬ সালে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।

এ অঞ্চলের জনগনের উপর পাকিস্তান শাসক গোষ্ঠীর বৈষম্য, নির্যাতন, নিপীড়ন তখনো থেমে থাকেনি। যখনই এ অঞ্চলের কেউ রাষ্ট্র ক্ষমতায় যেতে চেয়েছে বা সুযোগ পেয়েছে তখনই তার উপর নির্যাতন চালানো হয়েছে এবং নানা টালবাহানায় রাষ্ট্র ক্ষমতায় যেতে দেওয়া হয়নি। এ অঞ্চলের রাজনৈতিক নেতাদেরকে বারবার কারাগারে যেতে হয়েছে। পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী ১৯৫৪ সালের ৩০ মে আওয়ামী মুসলিম লীগের নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রীসভা বাতিল করে দেয় এবং ঐদিনই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে । পরবর্তীতে নানা রকম টালবাহানা করে জেনারেল আইয়ুব খান ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারী করে পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতা দখল করে নেয় এবং দীর্ঘ ১১ বছর সে সেই ক্ষমতা দখল করে রাখে। যেটি এ অঞ্চলের জনগনের জন্যে মোটেই সুখকর ছিলনা।

স্বৈরাচারী আইয়ুব সরকার বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৫৮ সালের ১১ অক্টোবর আবারোও গ্রেপ্তার করে এবং ১৯৬১ সালের ৭ ডিসেম্বর হাইকোর্টে এক রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু কারাগার থেকে মুক্তি পান। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তানের শায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ছয় দফা দাবি পেশ করেন। পরবর্তীতে এই ৬ দফা দাবিকে কেন্দ্র করে স্বায়ত্বশাসন আন্দোলন জোরদার হয়।

ছয় দফা দাবী দেয়ায় বঙ্গবন্ধুসহ আরো কয়েকজনকে আইয়ুব সরকার গ্রেপ্তার করে কারাগারে নিয়ে যায়। (দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী অনেকবারই গ্রেপ্তার করেছে, ক্ষুদ্র পরিসরে এখানে বিস্তারিত উল্লেখ করলাম না।) আইয়ুব সরকার ১৯৬৮ সালের ৩ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ আরোও ৩৫জন সামরিক বেসামরিক ব্যক্তিকে আসামী করে তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে। পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আন্দোলন আরোও জোরদার হতে থাকে। উনসত্তরে গণ-আন্দোলন গণবিস্ফোরণে পরিণত হয়। ২২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুসহ মামলার সকল আসামী মুক্তি পান। আইয়ুব খানের পতন হয় এবং সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে ক্ষমতা দিয়ে সে বিদায় নেয়।

ইয়াহিয়া খান শেষ পর্যন্ত ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচন দেয়ার ঘোষণা দেয়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাদীন আওয়ামীলীগ ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বরের নির্বাচনে পূর্ববাংলার ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭ টি আসন লাভ করে এবং ১৭ ডিসেম্বরের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে ৩০০টি আসনের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামীলীগ ২৮৮টি আসন লাভ করে।
তখন সেনা শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান বাঙ্গালীদের হাতে শাসন ক্ষমতা না দেবার জন্যে নানান টালবাহানা শুরু করে দেয়। বাঙ্গালীদের উপর তার নির্যাতন, নিপীড়ন তখনো চলতে থাকে। এদিকে বাঙ্গালী জনগন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আন্দোলন করতে থাকেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু এক বিশাল জনসমাবেশে ঘোষণা করেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের। এবং সেই থেকে এদেশের সর্বস্তরের জনগন স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্যে প্রস্তুতি নিতে থাকে। পরবর্তীতে ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর লেলিয়ে দেয়া সেনাবাহিনী এদেশের নিরীহ জনগনের উপর আক্রমণ চালিয়ে বহু লোককে নির্বিচারে হত্যা করে, যেটি তারা পরবর্তীতেও অব্যাহত রাখে। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষনা দেন। এরপরই বাংলাদেশ নামক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম হয়। ঐ রাতেই বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান শাসক গোষ্ঠী কর্তৃক গ্রেফতার হন। ২৬ মার্চ চট্রগ্রাম বেতার কেন্দ্রের কয়েকজন কর্মকর্তা ও স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতা এম এ হান্নান প্রথম বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রটি মাইকিং করে প্রচার করেন। এবং এর পরের দিন ২৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে মেজর জিয়াউর রহমান চট্রগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে পুনরায় স্বাধীনতার ঘোষণাটি পাঠ করেন। শুরু হয় আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। আমরা পাই আমাদের মহান স্বাধীনতা এবং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র।

এই মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের প্রায় ত্রিশ লক্ষ লোক শহীদ হয়েছেন এবং প্রায় তিন লক্ষ মা-বোন তাঁদের সম্ভ্রম হারিয়েছেন। এ মহান মুক্তিযুদ্ধে কিছু লোক ব্যতীত পুরো বাঙ্গালী জাতির অবদান রয়েছে, যা কখনোই অস্বীকার করা যাবেনা। যাঁদের জন্যে আমরা আজ স্বাধীন তাঁদের সবার প্রতি আমাদের সবসময়ই শ্রদ্ধা আছে এবং থাকবে।

আমাদের মহান স্বাধীনতা অর্জনে বিভিন্ন সময়ে যাঁরা অবদান রেখেছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন তাঁদের প্রত্যেককেই আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। সর্বোপরি আমাদের শহীদ মুক্তিযুদ্ধা এবং জীবিত মুক্তিযুদ্ধাদের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ, শ্রদ্ধা এবং কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।

আসুন এবারের স্বাধীনতা দিবসে জাতির শ্রেষ্ট সন্তান মুক্তিযুদ্ধাদেরকে আন্তরিকভাবে ভালোবাসার প্রতিজ্ঞা করি, শ্রদ্ধা করি, যাঁরা দেশটাকে ভালোবেসে যুদ্ধ করে এ দেশ স্বাধীন করেছেন, নিজের প্রাণ উৎসর্গ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশটাকে গড়তে সবাই অঙ্গীকারবদ্ধ হই। নিজের দেশটাকে আন্তরিকভাবে ভালোবাসতে শিখি, যেমনটি ভালোবেসেছিলেন আমাদের প্রিয় মুক্তিযুদ্ধারা।

আমাদের মহান এ স্বাধীনতা দিবসে সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।

এখানে আমি ছোট একটি উদাহরণ দিয়ে ইতি টানতে চাই। ধরুন- একজন কবি দীর্ঘ পরিশ্রম করে তাঁর মেধা, প্রজ্ঞা খাটিয়ে একটি কবিতা রচনা করলেন। সেই কবিতাটি কোন একজায়গায় তিনি নিজেই জনগণকে শুনালেন। কিন্তু দেশের সকল জনগণ হয়তো একযোগে সেই কবিতাটি শুনতে পেল না। কবিতা আবৃতিকারেরা হয়তো কবির পক্ষ হয়ে দেশের সকল জনগণকে কবিতাটি আবৃতি করে শুনালেন। তাই বলে এখানে আবৃতিকারেরা কি বলতে পারেন কবিতাটি তাঁদের নিজেদের রচিত? কিংবা অধিকার রাখেন কি কবিতাটি নিজেদের রচিত বলে দাবী করার?
তবে কবির পক্ষ হয়ে কবিতাটি আবৃতি করে দেশের জনগণকে শুনানো মোটেও দোষের নয়। বরং কবির পক্ষ হয়ে কেউ আবৃতি করে শুনালে সেটি হবে একটি উত্তম কাজ। এতে করে কবির কবিতাটি দেশের সকল জনগণ শুনে হয়তো উপকৃত হবে এবং হয়েছেও। তাই এখানে আবৃতিকারও প্রশংসা পাবার যোগ্য। কিন্তু কবিতা রচনার কৃতিত্ব সর্বাগ্রে কবির।

তথ্য সহায়তা:
http://bn.wikipedia.org/wiki/Liberation_War_of_Bangladesh
http://www.molwa.gov.bd/index.php?option=com_content&task=view&id=245&Itemid=417