ক্যাটেগরিঃ চারপাশে

সেদিন সিএনজি চালিত অটোরিক্সাযোগে বাড়ি যাচ্ছিলাম। চালক গাড়ীটি চালাচ্ছেন আর আমরা রাস্তার দু’পাশের দৃশ্য দেখে দেখে গন্তব্যের দিকে যাচ্ছি। গাড়ীতে আমিসহ আরোও পাঁচজন ছিলাম। চালকের উপর ভরসা রেখেই আমরা একে অন্যের সাথে গল্প করছিলাম। একসময় হঠাৎ চালকের দিকে দৃষ্টি পড়তেই দেখা গেল চালকের চোখ বন্ধ। প্রথমে মনে হলো চালক হয়তো সচেতনভাবে এমনি এমনি কিছুক্ষণের জন্য চোখ বন্ধ করে রেখেছেন। কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না যে, চালক ঘুমিয়ে পড়েছেন। চালক যদি সত্যি ঘুমিয়ে পড়েন তাহলে আমরা তো এবার রাস্তার পাশের কোন খাদে পড়ব, অথবা বিপরীতমূখী অন্য গাড়ীর সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারাব। নাহ্, এভাবে সবাইকে আত্মবিসর্জন করতে দিতে পারিনা। তাই আমি পেছন থেকে চালকের কাঁধে আলতো করে টোকা দিয়ে বললাম- “এই ড্রাইভার সাহেব কি করছেন, ঘুমুচ্ছেন না-কি?” চালক থতমত খেয়ে খানিকটা গাঁ ঝাড়া দিয়ে উঠে বললেন- “আসলে সারাদিনের ক্লান্তিতে আমার চোখে একটু ঘুম এসে পড়েছিল, ওসব ঠিক হয়ে যাবে, আপনারা কোন চিন্তা করবেন না, আমি আছি তো!”

চালকের কথা শুনে আমাদের সকলের চোখ কপালে উঠার মতো অবস্থা হয়ে গেল। তাহলে চালক সত্যি সত্যি ঘুমিয়ে পড়েছিল। আমরা কি এবার একটি মারাত্মক দূর্ঘটনা থেকে বেঁচে গেলাম? এদেশের আরোও ক’জন লোক কি তাহলে প্রাণে রক্ষা পেল অথবা পঙ্গুত্ব বরণ থেকে রক্ষা পেল? পরে গাড়ীটি থামিয়ে আমরা চালককে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে বললাম এবং চা পান করালাম, যাতে ঘুমের ভাবটা দূর হয়ে যায়। এরপর যথারীতি আমরা গাড়ীতে চড়ে গন্তব্যের দিকে রওয়ানা হলাম। যেতে যেতে চালকের সাথে এ ব্যাপারে আলাপ হলো। তিনি জানালেন, গতরাতে তিনি ঠিকমতো ঘুমুতে পারেননি এবং যার কারণে আজ চলন্ত গাড়ীতেই ঘুমের এই অপচেষ্টা। আলাপের মাধ্যমে জানতে পারলাম তার কোন বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স নাই। আর ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকবে কীভাবে, তিনি তো স্বীকৃত কোন প্রতিষ্ঠান থেকে গাড়ী চালানো শিখেননি। সাত থেকে আটদিন তিনি কোন এক ওস্তাদের কাছে গাড়ী চালানো শিখেছেন। যিনি শিখিয়েছেন তার নিজেরও বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স নাই। সুতরাং বুঝাই যায় এই চালক কতটুকু গাড়ী চালানো শিখেছেন। আর যাত্রীদের প্রতি তো তার দায়িত্ববোধ আশা করাই যায়না। এ চালকের কি বুঝার ক্ষমতা আছে যে, একটি দূর্ঘটনায় যাঁরা আহত বা নিহত হন, বেঁচে থাকার জন্যে তাঁদের কত আকাংখা ছিল বা বেঁচে থাকাটা কত জরুরি ছিল? চালকরা কি বুঝতে সক্ষম থাকেন যে, দূর্ঘটনায় যাঁরা আহত বা নিহত হন তাঁদের সাথে সাথে একটি পরিবার তথা অনেকগুলো মানুষের আশা আকাংখারও মৃত্য ঘটে।
চলন্ত গাড়ীতে চালকদের ঘুমিয়ে পড়ার এটি হলো একটি বাস্তব উদাহরণ। এরকম ঘটনা কি অহরহ ঘটছে না? এগুলো অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

সড়ক দূর্ঘটনার আরোও অনেক কারণ রয়েছে, যেমন: গাড়ী চালানোর সময় চালককে হঠাৎ অন্য গাড়ীকে প্রতিদন্ধী মনে করা। এক গাড়ীর সাথে অন্য গাড়ীর প্রতিদন্ধীতামূলক মনোভাবের কারণে চালকেরা বেপরোয়া গাড়ী চালান। বেপরোয়া গাড়ী চালানোর ফলে কখনো কখনো মারাত্মক দূর্ঘটনা ঘটে এবং বহু লোক হতাহত হন। ইদানিং চালকদেরকে চলন্ত গাড়ীতে মো্বাইল ফোন ব্যবহার করতে দেখা যায়। চলন্ত গাড়ীতে মোবাইল ফোনে কথা বলার সময় তার ধ্যান-ধারণা অনেকসময় যার সাথে তিনি কথা বলছেন সেখানে চলে যায়, তার ধ্যান-ধারণা তখন ঠিকমতো গাড়ী চালানোতে থাকেনা। ফলে মারাত্মক দূর্ঘটনা ঘটে বহু লোক হতাহত হন এবং বিপুল সম্পদেরও ক্ষতি সাধিত হয়। সড়ক দূর্ঘটনার অন্যতম আরোও একটি কারণ হলো যখন তখন ওভারটেকিং করা। সর্বোপরি দেখা যায় যে, চালকদের অদক্ষতা এবং অসাবধানতায়ই সড়ক দূর্ঘটনার মূল কারণ। এগুলো অবশ্যই দূর করতে হবে। চালকদের বৈধ প্রশিক্ষণধারী এবং লাইসেন্সধারী হতে হবে। চালকদেরকে দায়িত্বশীল হবার এবং মানতাবোধের প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

আমাদের দেশে অপরিকল্পিত উপায়ে আঁকাবাকা রাস্তা নির্মাণ এবং রাস্তার ধারে যেখানে সেখানে হাট-বাজার গড়ে উঠার ফলেও সড়ক দূর্ঘটনা ঘটে থাকে। রাস্তার ধারে যেসব হাট-বাজার বা প্রতিষ্ঠান রয়েছে সেখানকার রাস্তায় গাড়ীর গতি নিয়ন্ত্রণ করে চলার জন্য পরিকল্পিত উপায়ে গতিরোধক বাঁধ নির্মাণ করে দিলে কিছুটা হলেও দূর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব। তাই জনবহুল এলাকা চিহ্নিত করে পরিকল্পিত উপায়ে গতিরোধক স্থাপন করতে হবে। আবার সেটা যেন যত্রতত্র না হয় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। যেমন ধরুন- ৩০ মার্চ ২০১২ তারিখের দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় দেখলাম “৬৬ কিলোমিটার মহাসড়কে অবৈধ গতিরোধক ২৫টি”। এগুলোর সবকটির আদৌ প্রয়োজন আছে কি-না তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার কোথাও দেখা যাচ্ছে যে, প্রয়োজন থাকলেও কোন গতিরোধক নেই। যেমন ধরুন- আমাদের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সম্মুখ রাস্তায় (সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক) কোন গতিরোধক বাঁধ নেই। অথচ এখানে প্রতিদিন প্রতিমূহূর্তে হাজার হাজার শিক্ষাথীসহ জনসাধারণকে রাস্তা পারাপার করতে হচ্ছে তাঁদের নিজ দায়িত্বে। যেকোন সময় হয়তো কোন দূর্ঘটনা ঘটতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও হয়তো কোন দূর্ঘটনা ঘটার পর এখানে গতি রোধক বাঁধ স্থাপন করতে উদ্যেগী হবেন। কিন্তু আমার জোর দাবী হচ্ছে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখে অতি শীঘ্রই এখানে গতি রোধক বাঁধ স্থাপনের ব্যবস্থা করুন।

সড়ক দূর্ঘটনায় প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ হতাহত হচ্ছে, হাজার হাজার কোটির টাকার সম্পদ বিনষ্ট হচ্ছে। তাহলে এভাবে কি সড়ক দূর্ঘটনা চলতে থাকবে? এভাবে চলতে দেয়া যায় না। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই এ ব্যাপারে মনযোগী হতে হবে। প্রকৃত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চালকরাই যাতে গাড়ী চালান সেদিকে নজর রাখতে হবে। আর যারা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নন, তাঁদেরকে অতি শীঘ্র প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। না হলে আমাদের দেশের সড়ক দূর্ঘটনা হয়তো এভাবে চলতেই থাকবে এবং হাজার হাজার আশা আকাংখার মৃত্যু ঘটবে। আমরা কি বারবার সড়ক দূর্ঘটনার মর্মান্তিক খবর শুনতে থাকব? সড়কদূর্ঘটনায় আমরা কি আমাদের প্রিয় স্বজনদের হারাতেই থাকব?