ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

চা ভালোবাসে না এমন লোক খুব কমই পাওয়া যাবে। চা আমাদের সকলেরই পছন্দের একটি পানীয়। সেই চা বাংলাদেশের যে ক’টি অঞ্চলে ফলে তার মধ্যে সিলেট অন্যতম। সিলেট জেলায় বর্তমানে ২০ টি চা বাগান রয়েছে। সিলেট শহরের খুব কাছাকাছি মালনীছড়া ও লাক্কতুড়া চা বাগান অবস্থিত। ‘এ’ শ্রেণীভুক্ত মালনীছড়া চা বাগান উপমহাদেশের প্রথম চা বাগান, যেটি সিলেট শহরের অতি নিকটেই অবস্থিত। সিলেট শহর থেকে গাড়িতে প্রায় পনের মিনিটের রাস্তা। প্রায় ১৫০০ একর আয়তনের এই চির সবুজ চা বাগানটি ১৮৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে এ বাগানে চা’য়ের পাশাপাশি কমলা ও রাবারের চাষ হয়। এছাড়া নানা ধরনের বৃক্ষ তো আছেই। মালনীছড়া চা বাগানটির পাশেই লাক্কাতুড়া চা বাগান অবস্থিত। এই লাক্কাতুড়া চা বাগানের প্রায় মধ্যিখানেই সিলেট বিভাগীয় স্টেডিয়াম নির্মিত হয়েছে। আমরা আশা করছি এখানে খুব শীঘ্রই আন্তর্জাতিক ম্যাচ শুরু হবে। যাক, অপূর্ব সুন্দর চা বাগান এবং নানা ধরনের ছায়া বৃক্ষের কাছাকাছি বিশাল আয়তনের এই স্টেডিয়ামটি হওয়ায় ভালোই হয়েছে। স্টেডিয়ামে যারা খেলা দেখতে যাবে তাঁরা একই সাথে দু’টি জিনিস উপভোগ করতে পারবে। অনেকটা ‘এক ঢিলে দুই পাখি মারার মতো’। এখানে যেমন ছায়াবৃক্ষে ভরা চা বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করা যাবে আবার একই সাথে কেউ চাইলে স্টেডিয়ামের গ্যালারীতে বসে অথবা কোন একটি টিলার চূড়ায় বসেও খেলা দেখতে পারবে। চির সবুজ সেই চা বাগানের দৃশ্য দেখতে সবারই ভালো লাগে। তাই শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন পড়ন্ত বিকেলে রানা, ফরিদ আর আমি অপরূপ মায়াময় সেই সৌন্দর্য উপভোগ করতে বেরিয়ে পড়লাম।

টমটম গাড়ীতে করে আমরা চা বাগানে পৌঁছে গেলাম। সবুজের দৃশ্যে মোড়ানো চা বাগানের ভেতরের আঁকাবাকা পথ দিয়ে আমরা এগুতে থাকলাম। নানান প্রজাতির গাছ-গাছালি আর বিচিত্র সব উচু-নিচু টিলার দৃশ্য আমাদের কাছে বেশ উপভোগ্য হয়ে উঠল। এখানে আমরা ছাড়াও আরো অনেক পর্যটক এসেছেন। দেখে ভালোই লাগছে। অনেকে তাঁদের প্রিয়জনকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। সবুজ প্রকৃতির সান্নিধ্যে এসে তারা বিচিত্র ধরনের প্রেম-প্রেম খেলায় মেতে উঠেছেন। অনেকে আবার টিলা বেয়ে উপরে উঠছেন। আমরাও তিনজন উচু টিলা বেয়ে উপরে উঠলাম। টিলার উপরে উঠতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু উপরে উঠে যখন অপূর্ব সুন্দর দৃশ্য দেখতে পেলাম তখন সব কষ্ট ভুলে গিয়ে সৌন্দর্য উপভোগ করতেই আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। চারদিকে চা বাগানে ঘেরা সবুজ আর সবুজ। কোথাও আবার সবুজ ঘাসের মাঠ, ফুল পাতাবাহারের ঝাড়, বাংলো ধরণের ঘর, কুলিদের থাকার বসতি, পুকুরে পড়ন্ত বিকেলের সূর্যের আলো, আঁকাবাকা রাস্তা। সে এক অপরূপ দৃশ্য! দেখলে যে কারো ভালো লাগবে।

পেছন ফিরে দেখি একঝাঁক সুন্দরী মেয়েদের দল টিলার উপরে উঠার চেষ্টা করছে। সেই কখন থেকে ওরা আমাদের পিছু নিয়েছে। যখন আমরা এ বাগানে প্রবেশ করি তখন থেকেই দেখছি ওরা আমাদের অনুসরণ করে এগিয়ে চলেছে। তাঁরাও শেষ পর্যন্ত টিলার উপরে উঠতে পেরেছে। টিলার উপরে উঠেই একজন সুন্দরী মেয়ে লাফালাফি শুরু করে দিল আর অন্যরা ফিসফিস করে হাসাহসি করতে থাকল। উঁচু-নীচু টিলার কোল ঘেষা সবুজ প্রকৃতি দেখে সে সম্ভবত দিশেহারা হয়ে গেছে। আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে সে নিজের অজান্তেই টিলার উপর থেকে এক গহীন খাদে পড়তে যাচ্ছিল। এসময় রানা জোর গলায় তাকে ডেকে বলল- “এই পড়ে যাচ্ছেন তো!” মেয়েটি তখন বলল-“ও, ঠিক তো! আর একটু এগুলেই তো পড়ে যেতাম। বেঁচে গেলাম। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।” এসময় ফরিদ পাহাড়ের ঐ কিনারে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল- “আমি এবার নীচের ঐ খাদে লাফ দিব, দেখি আমাকে কেউ আটকায় কি-না!” ঐ গহীন খাদে কেউ পড়লে তাঁর মৃত্যুর সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ নিশ্চিত। রানা এবার আর ফরিদকে বাঁচাতে এগিয়ে এলো না বা নিষেধ করল না। কারণ কী? অভিমানি ফরিদ কি এবার সত্যি সত্যি ঐ গহীন খাদে পড়ে যাবে? কেউ তাকে পাত্তা দিচ্ছে না। ফরিদ সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করে- “আমি কিন্তু সত্যি সত্যি নীচের দিকে লাফ দিলাম।” অনেক্ষণ ধরেই সে এ কথা বলছে কিন্তু লাফ দিচ্ছে না। আমি এগিয়ে গিয়ে বললাম- “এতো ঢংয়ের দরকার নাই। আমিই বরং তোমাকে একটু ধাক্কা দিই, যাতে তুমি সহজে নীচে পড়তে পারো।” এ কথা বলতেই ফরিদ এবার দৌড় দিয়ে ঐ কিনার থেকে সরে এসে বলল- ” না-না, আমি তো এমনি মজা করছিলাম!”
আমি বললাম- “আমরাও তো মজা দেখছিলাম!”

আর দু’ পা ফেললেই হয়তো সে না ফেরার দেশে চলে যেত, তখন সবার সব আনন্দ ধুলোয় মিশে যেতো কি-না কে জানে। সুতরাং পাহাড়ের উপরে উঠলে সতর্কতা অবলম্বন জরুরি।

পহাড়ের চূড়া থেকে দাঁড়িয়ে যথারীতি আমরা চারদিকে তাকিয়ে সৌন্দর্য উপভোগ করছি। যতদূর চোখ যায় ততদূর পর্যন্ত বিস্তির্ণ এলাকা জুড়ে সবুজ চা বাগান দেখা যাচ্ছে। চায়ের নতুন কুঁড়ি যেন এক অন্যরকম রূপ ধারণ করেছে। দৃশ্যটা খুবই সুন্দর এবং মায়াময়। এক কথায় অপূর্ব। না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবেনা। আমাদের ঘরের কাছেই এতো সুন্দর নয়নাবিরাম দৃশ্য রয়েছে ভাবতেই ভালো লাগে। আসলে কাছের অনেক সুন্দর সুন্দর রহস্যময় জিনিস হয়তো আমাদের অদেখাই রয়ে গেছে। কবিতার সেই লাইনগুলোই এখন মনে পড়ছে- ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া/ ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া/ একটি ধানের শিষের উপর/ একটি শিশির বিন্দু…………’। এখানে ঘুরতে এসে আমরা অনেক কিছুই দেখছি।

চা বাগানের ভেতরেই চা শ্রমিকদের বসতি। তাঁদের বিচিত্র জীবন-যাপন যে কারো নজর কাড়বে। চা বাগানের মহিলা শ্রমিকদের সারি বেঁধে মাথায় ঝুড়ি নিয়ে চা আহরণের দৃশ্যটাও অপূর্ব। এরা যেন সবুজ প্রকৃতির সাথে মিশে গিয়ে চা’র সবুজ কুঁড়ি তুলে। এরপর সেই কুঁড়ি কাঁধে ঝুড়িতে করে বাগান মালিকের প্রতিনিধির কাছে বুঝিয়ে দেয়। এখানে তাঁদের মধ্যে সততার কোন অভাব পরিলক্ষিত হয় না। তারা অতি আন্তরিকতার সাথে তাঁদের কাজ করে থাকে। যদিও তুলনামূলকভাবে তাঁদের পারিশ্রমিক খুবই সামান্য।

পড়ন্ত বিকেলের সূর্যের আলো তখন ধীরে ধীরে কমে আসছে। আমরা চা বাগান এবং রাবার বাগান পর্যবেক্ষণ শেষে লাক্কতুড়া বাগানের প্রায় মধ্যিখানে অবস্থিত সিলেট বিভাগীয় স্টেডিয়ামের অতি নিকটে একটি উচু টিলার চূড়ায় বসলাম। স্টেডিয়ামে তখনো ক্রিকেট খেলা চলছিল। স্থানীয় কোন দলের খেলা হয়তো হচ্ছে। এখানে বসে খেলা দেখছি আবার একই সাথে খানিকটা বিশ্রামও নিচ্ছি। আমাদের পাশেই একটি প্রজাপতি উড়াউড়ি করছিল। এক পর্যায়ে প্রজাপতিটি চা গাছের একটি কুঁড়ির উপর গিয়ে বসল। ফরিদ চিৎকার দিয়ে বলল- “এই দেখ, কী সুন্দর প্রজাপতি!”
রানা বলল- “তো কী হয়েছে?”
আমি বললাম- “প্রজাপতি কি তোমার খুব পছন্দের?”
ফরিদ বলল-“হ্যাঁ। প্রজাপতিকে আমি খুব পছন্দ করি। খুব ভালোবাসি। আমি যদি প্রজাপতিটাকে ছুয়ে দেখতে পারতাম! আমি কি ওর সাথে একটি ছবি উঠাতে পারি?”
রানা বলল- “এখানে ছবি উঠানোর কী হলো!”
কারো উৎসাহ না দেখে বেচারা ফরিদের একটু হলেও মন খারাপ হলো।
ঐ মেয়েরাও তখন এখানে এসে বসেছে। বিশ্রাম নিচ্ছে। আমাদের এসব কথাবার্তা শুনে তাঁরা খিলখিল করে হাসাহাসি করছে। তাঁদের মধ্য থেকে একজন সুন্দরী মেয়ে একটি চা গাছ ধরে ছবি উঠাচ্ছে। মেয়েটি খুবই সুন্দর। দেখতে মাঝারি সাইজের শরীর তবে বেশ লম্বা এবং ফর্সা। পরনে বর্ণিল জামা। কপালে প্রজাপতি আঁকা টিপ। মাথা ভর্তি ঘন কালো চুল এদিক-সেদিক ঝুলছে। দু’ চারটা চুল মুখের উপর গিয়ে পড়েছে। সবুজের সমারোহে তাঁর সৌন্দর্যটা যেন আরোও অনেকখানি বেড়ে গেছে। ফরিদের ছবি উঠানোর কথা শুনে সেও কেন জানি হাসছে। কারণটা বুঝা গেল না। তাঁরা নিজেরা অনেক আনন্দ করছে। তাঁদের আনন্দ দেখে আমরাও মজা পাচ্ছি। কেন? জানিনা।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে যে মেয়েটি ছবি উঠাচ্ছিল তাকে তাঁর বান্ধবীরা ডেকে বলল- “এই প্রজাপতি- চলে আয়। আমরা বাসায় ফিরে যাবো।”
আমরা একটু হতবম্ভ হয়ে গেলাম। ঐ সুন্দরী মেয়েটির নামই কি তাহলে …………!
অবশেষে ওদের হাসাহাসির কারণটা হয়তো বুঝা গেল। ফরিদ ওর নাম শুনে অবাক দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকল। আমি পেছন থেকে ফরিদের কাঁধে টোকা দিয়ে বললাম- “আকাশের দিকে তাকিয়ে ওর কথা ভেবে লাভ নেই। সন্ধ্যা হয়েছে, বাসায় ফিরতে হবে।”
“না ভেবে কি পারা যায়?”
অবশেষে আমরাও বাসায় ফিরে এলাম। তবে ভাবনা তো থেকেই গেল। আর কি দেখা হবে!……