ক্যাটেগরিঃ শিল্প-সংস্কৃতি

 

সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে প্রতিনিয়ত আমাদের ভাষা এবং সংস্কৃতিরও পরিবর্তন হচ্ছে। তবে এসব ক্ষেত্রে আমাদেরকে সচেতন থাকা জরুরি। আমাদের দেশীয় সংস্কৃতি যেন হারিয়ে না যায় সেদিকে সবাইকে খেয়াল রাখতে হবে। ভাষার ক্ষেত্রে যেমন আমরা অনেক বিদের্শী ভাষা গ্রহণ করেছি তেমনি সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও দেখা যায় আমরা কিছু বিদেশী সংস্কৃতি গ্রহণ করেছি। ইদানিং ব্যাপারটা আরো বেশী মাত্রায় হচ্ছে বলে অনেকেই উদ্বিগ্ন। বিদেশী সংস্কৃতিকে উপভোগ করা দোষের কিছু নয় তবে আমাদের মুল দেশীয় সংস্কৃতিকে বাদ দিয়ে নয়। যেমন ধরুন- আগে দেখা যেত কোন বিয়ে বাড়িতে বরকে স্বাগত জানানো হত ফুল দিয়ে শরবত খাইয়ে এবং কোথাও কোথাও দেশীয় গীত গাইয়ে আবার কোথাও ব্যান্ড-বাদ্য বাজিয়ে। এবং বরের কাছ থেকে তো কিছু সেলামী আদায় করা হতই। কিন্তু ইদানিং দেখা যাচ্ছে বরকে স্বাগত জানানো হয় একধরণের স্প্রে ছিটিয়ে যেগুলো থেকে প্রচুর ফেনার সৃষ্টি হয়। এর ফলে সেখানে এক বিরূপ পরিবেশের সৃষ্টি হয়, যেটি আমাদের সমাজে কাম্য নয়। এই তো সেদিনও একটি বিয়েতে গিয়ে দেখলাম একই অবস্থা। এগুলো মোটেও আমাদের দেশীয় সংস্কৃতি নয়।

আজ পহেলা বৈশাখ। বিশাখা নক্ষত্রের নাম অনুসারে বাংলা বর্ষের প্রথম মাসের নাম বৈশাখ। আজ বৈশাখ মাসের তথা বাংলা পঞ্জিকা বর্ষের প্রথম দিন। নববর্ষের প্রথমদিনকে সবাই বেশ ঘটা করে পালন করে। সবাই বাংলা নববর্ষকে উৎসব মূখর পরিবেশ উদযাপন করে। এটা আমাদের সার্বজনীন একটা উৎসবে পরিণত হয়েছে। এদিনটিতে হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ, মুসমান নির্বিশেষে সবাই উৎসব মূখর পরিবেশে পালন করে। এদিন বিভিন্ন জায়গায় মেলা বসে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। কেউ কেউ পান্তা ভাতের সাথে ঈলিশ মাছ খায়। যদিও সাধারণ গরিব মানুষ এখন আর ঈলিশ মাছ খেতে পারেনা, ঈলিশ মাছের আকাশচুম্বি দামের কারণে তাঁদের ঈলিশ কেনার সাধ্য হয় না। শুধু পান্তা ভাত খেতে পারে। এটি যদিও সারাবছরই গরিব মানুষেরা অভাবের তাড়নায় খেতে একধরণের বাধ্যই থাকে। কিন্তু বছরের এই প্রথম দিনটিতে এটি বড়লোকদের কাছে একটি ফ্যাশন খাবার হিসেবে পরিণত হয়, যেটি আমার কাছে মোটেও পছন্দের নয়। তবুও অন্তত একটি দিন এ খাবার খেয়ে হলেও যদি ঐ বড়লোকেরা সাধারণ মানুষের দু:খ-দুর্দশার কথা বিবেচনায় রাখত তাহলে আমাদের দেশের হয়তো আরো অনেক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যেত।

যাক, এবার বাংলা নববর্ষ কেন এবং কবে থেকে এটি শুরু হলো তা আমাদের জানা দরকার। বাংলা উইকপিডিয়ার তথ্য মতে- ‘হিন্দু সৌর পঞ্জিকা অনুসারে বাংলা বারটি মাস অনেক আগে থেকেই পালিত হত। এই সৌর পঞ্জিকার শুরু হত গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় হতে। হিন্দু সৌর বছরের প্রথম দিন আসাম, বঙ্গ, কেরল, মনিপুর, নেপাল, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিল নাড়ু এবং ত্রিপুরার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অনেক আগে থেকেই পালিত হত।এখন যেমন নববর্ষ নতুন বছরের সূচনার নিমিত্তে পালিত একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে, এক সময় এমনটি ছিল না। তখন নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ আর্তব উৎসব তথা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে পালিত হত। তখন এর মূল তাৎপর্য ছিল কৃষিকাজ। প্রাযুক্তিক প্রয়োগের যুগ শুরু না হওয়ায় কৃষকদের ঋতুর উপরই নির্ভর করতে হত।

ভারতবর্ষে মুঘল সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরী পঞ্জিকা অনুসারে কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করত। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সাথে মিলত না। এতে অসময়ে কৃষকদেরকে খজনা পরিশোধ করতে বাধ্য করতে হত। খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের লক্ষ্যে মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তিনি মূলত প্রাচীন বর্ষপঞ্জতে সংস্কার আনার আদেশ দেন। সম্রাটের আদেশ মতে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌর সন এবং আরবি হিজরী সনের উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ই মার্চ বা ১১ই মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ই নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়।

আকবরের সময়কাল থেকেই পহেলা বৈশাখ উদ্‌যাপন শুরু হয়। তখন প্রত্যেককে চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে হত। এর পর দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতেন। এ উপলক্ষ্যে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হত। এই উৎসবটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয় যার রুপ পরিবর্তন হয়ে বর্তমানে এই পর্যায়ে এসেছে। তখনকার সময় এই দিনের প্রধান ঘটনা ছিল একটি হালখাতা তৈরি করা। হালখাতা বলতে একটি নতুন হিসাব বই বোঝানো হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে হালখাতা হল বাংলা সনের প্রথম দিনে দোকানপাঠের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া। গ্রাম, শহর বা বাণিজ্যিক এলাকা, সকল স্থানেই পুরনো বছরের হিসাব বই বন্ধ করে নতুন হিসাব বই খোলা হয়। হালখাতার দিনে দোকনদাররা তাদের ক্রেতাদের মিষ্টান্ন আপ্যায়ন করে থাকে। এই প্রথাটি এখনও অনেকাংশে প্রচলিত আছে, বিশেষত স্বর্ণের দোকানে।

আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। প্রথম মহাযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পহেলা বৈশাখে হোম কীর্ত্তণ ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর ১৯৩৮ সালেও অনুরূপ কর্মকান্ডের উল্লেখ পাওযা যায়। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৭ সনের আগে ঘটা করে পহেলা বৈশাখ পালনের রীতি তেমন একটা জনপ্রিয় হয় নি।

নতুন বছরের উৎসবের সঙ্গে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কৃষ্টি ও সংস্কৃতির নিবিড় যোগাযোগ। গ্রামে মানুষ ভোরে ঘুম থেকে ওঠে, নতুন জামাকাপড় পড়ে এবং আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের বাড়িতে বেড়াতে যায়। বাড়িঘর পরিষ্কার করা হয় এবং মোটামুটি সুন্দর করে সাজানো হয়। বিশেষ খাবারের ব্যবস্থাও থাকে। কয়েকটি গ্রামের মিলিত এলাকায়, কোন খোলা মাঠে আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলার। মেলাতে থাকে নানা রকম কুঠির শিল্পজাত সামগ্রীর বিপণন, থাকে নানারকম পিঠা পুলির আয়োজন। অনেক স্থানে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়ার ব্যবস্থা থাকে। এই দিনের একটি পুরনো সংস্কৃতি হলো গ্রামীণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন। এর মধ্যে থাকে নৌকাবাইচ, লাঠি খেলা কিংবা কুস্তির। বাংলাদেশে এরকম কুস্তির সবচেয়ে বড় আসরটি হয় ১২ বৈশাখ, চট্টগ্রাম-এর লালদিঘী ময়দান-এ। এটি জব্বারের বলি খেলা নামে পরিচিত।’

বাংলা নববর্ষ অনুষ্ঠান সারাদেশের ন্যায় আমাদের শাবিপ্রবি ক্যাম্পাসেও উৎসবমূখর পরিবেশে পালিত হচ্ছে। বাংলা নববর্ষের এই দিনটি সবার জন্য আনন্দময় হউক। কৃষকদের জন্য আনন্দের হউক। কৃষকরা যেন ঠিকমতো তাঁদের ফসল প্রাপ্তির অনুষ্ঠান উদযাপন করতে পারে সেটা কামনা করি। কৃষকদের এবং আমাদের সকলের সারাবছর কাটুক অতি আনন্দে, সুখে-শান্তিতে। এটাই হউক আজকের কামনা। আসুন আমরা আমাদের দেশীয় সংস্কৃতিকে অক্ষুন্ন রেখে এ দিনটি সার্বজনীনভাবে সবাই পালন করি।

বাংলা নববর্ষে সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। সবাইকে শুভ নববর্ষ-১৪১৯।

তথ্য সহায়তা:http://bn.wikipedia.org/wiki/