ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

বিএনপির কেন্দ্রিয় নেতা ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সিলেটের চার জেলায় বিএনপি ঘোষিত হরতাল পালিত হচ্ছে। হরতালের সপক্ষে মানুষের জনসমর্থন আছে কি-না সেটা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও হরতাল ঠিকই পালিত হচ্ছে। স্বত:স্ফুর্তভাবে মানুষ এ হরতালে অংশ গ্রহণ না করলেও হরতাল কিভাবে পালিত হচ্ছে তা নিয়ে যে কেউ প্রশ্ন রাখতেই পারে। আজকাল হরতালের পক্ষে জনসমর্থন আছে কি-না এটা ব্যাপার নয়। যে কেউ একটা হরতাল ঘোষণা করে দিলেই (হরতালটি ব্যক্তি স্বার্থে হোক আর সমষ্টিগত স্বার্থেই হোক) সেটি পালিত হয়ে যায়। আর হরতাল পালিত হবেই না কেন- মানুষ তো ভয়েই ঘর থেকে বের হয় না। রাস্তায় বেরুলেই যদি নির্যাতনের স্বীকার হতে হয়, সেটি পুলিশি নির্যাতনও হতে পারে আবার হরতাল ঘোষণাকারীদের দ্বারা নির্যাতনও হতে পারে। হরতালের দিন মানুষের মধ্যে একটা আতংক বিরাজ করে। দুপুরের দিকে আমাদের পাড়ার একটি দোকানে গিয়ে কিছুক্ষণ বসলাম। পাড়ার দোকান বলেই কি-না আমার বন্ধু ফরিদ একটু সাহস করেই দোকানের একটি সাটার খুলে ভিতরে বসে আছে। উদ্দেশ্য হয়তো হরতাল পর্যবেক্ষণ করা এবং কিছু ব্যবসাপাতি করা। তাই আমি এবং আরো ক’জন ফরিদের দোকানে মধুর আড্ডায় বসে পড়লাম। হঠাৎ একজন (নাম- শাহ আলী) আতংকিত স্বরে বলল- মারামারি শুরু হয়ে গেছে, ওরা দোকানপাট ভাংচুর করছে। এবং সাথে সাথে আমরাও আতংকিত হয়ে উঠে পড়লাম। একপর্যায়ে দোকানটি বন্ধ করে দেয়া হলো। অবশ্য মারামারির জের এতোদূর পর্যন্ত আসেনি। আসলে দূরে কোথাও কিছু একটা ঘটছিল এবং আতংকিত হয়ে মানুষজন ছুটোছুটি করছিল। এতেই মানুষের মধ্যে কী ভয় এবং আতংক!

আবার কেউ গাড়ী নিয়ে বেরুলেই তো অবস্থা আরো খারাপ। গাড়ী দেখলেই পিকেটাররা প্রথমেই হয়তো যাত্রীসহ গাড়ীতে আগুন দেয় নয়তো গাড়ী ভাংচুর করে। মনে হয় যেন সব দোষ ঐ গাড়ীটির। একজন বিদেশ যাত্রীকে দেখলাম একটি সিএনজি চালিত অটোরিক্সা নিয়ে এয়ারপোর্টের দিকে রওয়ানা হয়েছেন। অটোরিক্সাটির সামনে লাল পতাকাসহ লেখা আছে বিদেশ যাত্রী। উদ্দেশ্য- বিদেশ যাত্রী শুনেও যদি হরতালকারীরা গাড়ী ভাংচুর এবং নির্যাতন না করে। শেষপর্যন্ত শেষ রক্ষা হয় কি-না কে জানে। অবশ্য আমাদের মনে রাখতে হবে এই প্রবাসীদের রোজগারের পাঠানো অর্থেই আমরা সমৃদ্ধ হই। যারাই হরতাল আহবান করে তারা জনস্বার্থ রক্ষার্থে হরতাল পালনের কথা বলে উল্টো জনগণসহ জনগণের স্বার্থ এবং সম্পদ নষ্ট করে। এটা কি কাম্য হতে পারে? এরকম চলতে থাকলে মানুষ ঘর থেকে বের হবে কেন? আর না বেরিয়েও কি উপায় আছে? জীবিকা নির্বাহের তাগিতে হয়তো অনেকে ঘর থেকে বের হয় এবং ভয়াবহ বিপদেরও সম্মুখীন হয়। বিশেষ করে দিনমজুর, যারা দিন আনে দিন খায়। একদিনের উপার্জন বন্ধ হলে তাঁদের না খেয়ে থাকতে হয় অথবা ধার করে ঐ দিনের খরচ চালাতে হয়, যেটি পরের দিনগুলোর উপার্জন থেকে পুষিয়ে নিতে হয়। ফলে অভাব তাঁদের পিছু ছাড়ে না। এ দায় কার?

হরতালের কারণে দোকানপাট, মার্কেট সবই প্রায় বন্ধ থাকে। ফলে ব্যবসায়ীরা প্রচুর ক্ষতির সম্মুখীন হন। এবং পরোক্ষভাবে এ ক্ষতির ভাগ সমাজের সর্বত্র গিয়ে পড়ে। কারণ পরিশেষে এসব ব্যবসায়ী আমাদের সমাজেরই কেউ না কেউ। আবার দোকানপাট, মার্কেট বন্ধ থাকলে আগের এবং পরের দিনগুলোতে জিনিসপত্রেরও দাম বেড়ে যায়। এর খেসারত দিতে হয় সাধারণ মানুষসহ সমাজের সবাইকে। কাজেই সমাজের তথা গণমানুষের ক্ষতি হোক এটা কেউই চান না। ব্যবসায়ীরাও চান না। তাহলে ব্যবসায়ীরা কেন তাঁদের দোকনপাট বন্ধ রাখেন বা ব্যবসা বন্ধ রাখেন। কারণ দোকানপাট খোলা রাখলেই তো হরতালকারীরা ভাংচুর, জ্বালাও-পোড়াও করবে। এতে ব্যবসার এবং সম্পদের ক্ষতি হবে। ব্যবসার ক্ষতি এবং তাঁদের সম্পদের ক্ষতি হলে ব্যবসায়ীরা কেন দোকানপাট খোলা রাখবেন?

তাহলে ঘটনা কি দাঁড়ালো? হরতালের দিন মানুষজন নির্যাতনের ভয়ে ঘর থেকে বের হন না, গাড়ীওয়ালারা তাঁদের গাড়ী ভেঙ্গে ফেলবে এই ভয়ে গাড়ী বের করেন না, ব্যবসায়ীরা দোকানপাট ভাংচুরের ভয়ে দোকানপাট খুলেন না।

তাহলে দেখা যাচ্ছে হরতালের দিন মানুষ ভয়ে, আতংকে ঘর থেকে বের হয় না। তাহলে কি স্বত:স্ফূর্তভাবে হরতাল পালিত হয় না? আর সেটিই যদি না হয়, তাহলে আমরা এটিকে কি হরতাল কর্মসূচী না বলে ভয়তাল কর্মসূচী বলতে পারি না?