ক্যাটেগরিঃ স্যাটায়ার

বৈদ্যুতিক কৃত্রিম আলোয় ব্যাডমিন্টন খেলা চলছে। এরমধ্যে হঠাৎ বিদ্যুত চলে গেল। চারিদিকে অন্ধকার। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। খানিকটা গরমও লাগছে। খেলা শেষে হয়তো ফ্যানের নীচে বসে কিছুটা হিমেল বাতাসের পরশ নেওয়া যেত। কিন্তু তা কী আর নেওয়া হলো! আজকাল বিদ্যুতের যে অবস্থা! কখন যে বিদ্যু চলে যায় আবার কখন যে বিদ্যুত আসে বলা মুশকিল। দিনদিন বিদ্যুতের এই আসা-যাওয়ার পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে। ইদানিং তো কেউ কেউ মজা করে একটা প্রবাদ চালু করে দিয়েছেন- “এখন বিদ্যুত যায় না, মাঝেমধ্যে আসে।” সেদিন তো একজনকে বলতে শুনলাম- “এই বিদ্যুত সাহেব এসেছেন, ঠিকমতো আদর-আপ্যায়ন কর, না হলে তিনি আবার চলে যাবেন!”

রসিকপ্রিয় বাঙ্গালীরা সবসময়ই তাঁদের দু:খ-কষ্টকে রসিকতা করে জয় করার চেষ্টা করে। তাই বিদ্যুত নিয়ে এরকম রসিকতা প্রায়ই শুনা যায়।
ক’দিন আগে ফেইসবুকে আমার এক রসিক বন্ধুর পাঠানো একটি রম্য ধরণের লেখা পড়ে বেশ মজা পেলাম। লেখাটি ছিল এরকম-
‘এক আড্ডায় একজন অন্যজনকে জিজ্ঞেস করছে- “১৯৯৫ সালের দিকেও কি বিদ্যুতের এরকম অবস্থা ছিল?”
জবাবে অন্যজন বলছে- “নাহ! তখন বিদ্যুত মাঝেমধ্যে যেত।”
“তাহলে এখন? মানে ২০১২ সালে কী হচ্ছে?”
“২০১২ সালে এসে তো দেখা যাচ্ছে- মাঝেমধ্যে বিদ্যুত আসে। কিংবা কখনো দেখা যায়- এক এলাকায় বিদ্যুত থাকলে অন্য এলাকায় থাকে না।”
“আর ২০১৫ সালে কী হবে?”
“২০১৫ সালে হয়তো দেখা যাবে এক বিভাগে বিদ্যুত থাকলে অন্য বিভাগে থাকবে না।”
“তাহলে ২০২২ সালে তো অবস্থা আরো খারাপ হবে, তাই না?”
“হ্যাঁ। ২০২২ সালে হয়তো ‘বিদ্যুত’ শব্দটি একটি রুপকথা হয়ে যাবে, কেউ হয়তো বলবে- শুনেছি বিদ্যুত আগে কোন একসময় ছিল!”
“আর ২০২৫ সালে?”
“২০২৫ সালের দিকে এসে হয়তো দেখা যাবে- কোন এক বিদেশী অতিথি এসে জিজ্ঞেস করছেন, এই যে ভাই- আপনার বাসায় বিদ্যুত আছে? তখন লোকটি হয়তো বলবে- এই ভাই আমাকে আপনি গালি দিলেন না-কি?” ‘

রম্যটি হয়তো পুরোপুরি বাস্তবিক নয়। আর এমন পর্যায়ে হয়তো কখনোই যাবে না। এবং ‘বিদ্যুত’ শব্দটিও হয়তো কখনোই একটি গালির মতো হবে না, কারণ সেটি আমরা কেউই কামনা করি না। আর বিদ্যুত পরিস্থিতি নিয়ে আমি এখনই হতাশ হতে চাই না। বিদ্যুত নিয়ে আমাদের সরকার অনেক আশার বাণী শুনিয়েছেন, দেখি না কী হয়। আশা নিয়েই তো আমাদেরকে এগিয়ে যেতে হবে।

যাক, বিদ্যুত নেই তাই অন্ধকার খোলা আকাশের নীচে মাঠের সবুজ ঘাসের উপর ফরিদ, ইসমাইল, রানা আর আমি বসে আছি। ক্লান্তি ততক্ষণে কিছুটা হলেও দূর হয়েছে। অন্ধকারের মধ্যে একে-অপরকে ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না, তবুও আমাদের মধুর আড্ডাটা বেশ জমে উঠেছে। একেকজন একেক স্বাদের গল্প বলছে। গল্প বলায় সবাই যেন বেশ ওস্তাদ, সেটি চাপামার্কা গল্প হোক আর সত্যি সত্যি গল্পই হোক।

আড্ডার মাঝখানেই টিং টিং করে একটি মোবাইল ফোন বেজে উঠল।
পাশ থেকে ইসমাইল বলল- “নিশ্চয়ই রানাকে কেউ ফোন করেছে!”
কিন্তু না, আসলে ফরিদের মোবাইলে কল এসেছে। বিদ্যুত চলে গেলে সাধারণত ফরিদের কাছেই কেউ-না-কেউ ফোন করে। কেন? জানি না।
রানা জানতে চাইল- “কে ফোন করেছে?”
ফরিদ নরম গলায় আস্তে করে বলল- “ভাবি ফোন করেছেন, ভাবি………!”
রানা: “কোন ভাবি?”
ফরিদ: “ওই, আছে একজন! তোরা চুপ থাক। আমাকে কথা বলতে দে।”
রানা: “আচ্ছা, ঠিক আছে।”
ফরিদের আবার পাড়াভর্তি ভাবি আছে। পাড়ার প্রায় সব ভাবিদের সাথে তাঁর বেশ সুসম্পর্ক রয়েছে। তবে সেই সম্পর্ক কতদূর পর্যন্ত? কে জানে। ভাবিরাও তাকে বেশ পছন্দ করেন। কেন? জানিনা।
ভাবির ফোন পেয়ে ফরিদ এতক্ষণে হয়তো আমাদেরকে ভুলেই গেছে। ভাবির সাথে কথা বলতে দেখে ইসমাইল বেশ কৌতুহলী হয়ে উঠল। ভাবীর সাথে ফরিদের কী কথা হচ্ছে ইসমাইল সেটি শুনতে চায়। কিন্তু ফরিদ সেটি শুনাতে আগ্রহী নয়। ইসমাইল এবার ফরিদের মোবাইল ঝাপটে ধরে মোবাইলের লাউড স্পীকার অন করে দিল। এখন আমরা ওপাশের সব কথা শুনতে পাচ্ছি। ওপাশ থেকে ভাবী বলছেন- “এই শুনো না, তোমার ভাইও বাসায় নেই, আর আমি অন্ধকারে একা একা বসে আছি। কিছুই ভাল লাগছে না। তুমি কি আসতে পারবে? আর আসলে সঙ্গে মোমবাতি নিয়ে এসো। অন্ধকারের মধ্যে কিছুই দেখা যাচ্ছে না।”

এসব শুনে ফরিদ হয়তো লজ্জা পাচ্ছে তাই সে এবার মোবাইলের লাউড স্পীকার অফ করে দিল এবং পরে আরো কতক্ষণ ভাবির সাথে তার কথা হলো। কি কথা হলো? জানি না। তবে তার চেহারায় কী এক আনন্দের অনুভূতি লক্ষ্য করা গেল।

ভাবির সাথে কথা বলা শেষে ফরিদ বলল-“ভাবি গরু মাংস রান্না করেছেন আর আমাকে দাওয়াত করেছেন। তোরা আমাকে দশ মিনিটের জন্য যেতে দে আমি বিশ মিনিটের মধ্যে চলে আসব।”
ইসমাইলের মতো ফরিদও বেশ ভোজনপ্রিয়। খাবারের কথা শুনলে- সে ক্ষিধে থাকলেও খেতে পারে আবার ক্ষিধে না থাকলেও খেতে পারে। তবে কোন কিছু খাওয়ার সময় তার হুড়োহুড়ি করে খাওয়ার দৃশ্যটা বেশ মনোমুগ্ধকর।
যাক, ইসমাইল এ যাত্রায় ফরিদকে ভাবির বাসায় দাওয়াত খেতে যেতে দিচ্ছে না।
সে বলছে- “যেতে হলে আমাদেরকে সঙ্গে নিয়ে খেতে যেতে হবে।”
কিন্তু ফরিদ বুঝাবার চেষ্টা করছে-“ভাবি তো আমাকে দাওয়াত করেছেন। সুতরাং আমাকে একা যেতে হবে।”
রানা ফরিদের কথায় সম্মতি দিয়ে বলল- “ফরিদ তো ঠিকই বলছে। আমরা বিনা দাওয়াতে কারো বাসায় খেতে যাবো না। প্রয়োজনে আমার বাসায় গরু মাংস এনে আমরা নিজেরা রান্না করে খাবো এবং অনেক মজা করব। কারণ আজ আমি ছাড়া আর কেউ বাসায় নেই।”
আমি বললাম- “কিন্তু রান্না করবে কে?”
এবার ফরিদ বলল-“আমরা সবাই মিলে রান্না করব। সবসময় তো মহিলারা রান্না করেন, এবার দেখি আমরা রান্না করতে পারি কি-না?”
পাশ থেকে ইসমাইল ফরিদকে বলল- “তাহলে কি তুমি ভাবির বাসায় খেতে যাচ্ছ না?”
ফরিদ: “না। যাচ্ছি না।”
ফরিদের সিদ্ধান্ত শুনে সবাই বেশ খুশী হলো। এবার গরু মাংস আনার জন্য ইসমাইলকে বাজারে পাঠানো হলো। বাজার থেকে গরু মাংস নিয়ে ইসমাইল রানার বাসায় আসতেই
ফরিদ বলল- “ইসমাইল- এতো দেরী হলো কেন?”
ইসমাইল:-“গাড়ী পেতে দেরী হয়েছে তাই আসতে একটু দেরী হয়ে গেছে। আমি সরি।
ফরিদ: “তুমি কি তোমার মটর সাইকেল নিয়ে যাওনি?”
ইসমাইল: “ট্রাফিক সপ্তাহ চলছে। তাই মটর সাইকেল নেইনি। কারণ আমার গাড়ীর লাইসেন্স আছে কিন্তু ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। রাস্তায় যদি ধরে ফেলে!”
রানা: “সবকিছুর কি লাইসেন্স লাগে?”
ইসমাইল: “হ্যাঁ। সবকিছু্রই লাইসেন্স লাগে। লাইসেন্স না থাকলে তো সেটি হবে অবৈধ।”
ফরিদ: “ধন্যবাদ, ইসমাইল। একটা ভালো জিনিস জানলাম। এখন থেকে সতর্ক থাকবো।”

কথা বলতে বলতে আমাদের রান্নার কাজটাও এগিয়ে চলেছে। কেউ পিয়াজ-মরিচ কাঁটছে, কেউ মাংস কাঁটছে, কেউ মসল্লা তৈরী করছে আবার কেউবা পাতিল ধুঁয়ে পরিষ্কার করছে। রান্না করতে কেমন লাগে এবার সবাই হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। রান্না ওতো সহজ কাজ নয়। মা-বোনরা তো সবসময় রান্না করে খাওয়ান তাই আমরা সেটা টের পাই না।

রান্নার প্রাক-প্রস্তুতি শেষে মাংস-মসল্লা মিশ্রিত পাতিলটি চুলোয় বসানো হলো। এবার অপেক্ষার পালা, কখন রান্না শেষ হবে আর সবাই হইহুল্লোড় করে খাবে। এরইমধ্যে কিছুক্ষণের জন্য বিদ্যুত এসে আবার চলেও গেছে। আকাশে বিজলী চমকাচ্ছে। চারিদিকে কী রকম একটা পরিবেশ, যেন বৃষ্টি বৃষ্টি ভাব। মনে হয় বৃষ্টি হবে। আকাশে মেঘের গর্জন শুনে ফরিদ বলল- “আজ যদি বৃষ্টি হয় তাহলে আমি ভিজব।”
বৃষ্টিতে ভিজতে ফরিদের খুব ভালো লাগে। বিশেষ করে রাতের বেলা বৃষ্টি হলে তো সে প্রায়ই ভিজে আর কোথায় কোথায় জানি ফোন করে।

রান্না শেষে আমরা খেতে বসলাম। মাংস রান্নাটা খারাপ হয়নি। তবে গতানুগতিক রান্না করা মাংস তরকারীর মতো নয়, বলতে পারেন- এটি একটি ভিন্ন স্বাদের মাংস রান্না।
মোমবাতির আলোয় আমাদের খাওয়া প্রায় শেষ হয়ে এলে তারপর বিদ্যুত আসল। কিন্তু কাজের সময় আসল না, এটা কি বিরক্তিকর নয়?
বিদ্যুত আসতেই আবারো টিং টিং করে মোবাইল বেজে উঠল।
সবাই একে অন্যের দিকে তাকিয়ে সমস্বরে বলল- “কার মোবাইল বাজল? এখন কে-ই-বা ফোন করল?”
হ্যাঁ। এবারো ফরিদের মোবাইলে কল এসেছে। তবে কোন ভাবির কাছ থেকে নয়। ফরিদ এটা আমাদেরকে নিশ্চিত করল। তারপর মোবাইল ফোনে কিছুক্ষণ কথা বলে-আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাসায় চলে গেল। আমরাও নিজ নিজ বাসায় চলে এলাম। এবং সঙ্গী হলো কয়েক ঘন্টার আনন্দমাখা মধুর স্মৃতি।