ক্যাটেগরিঃ চারপাশে

গতরাত থেকে একটা বিষয় নিয়ে আমি বারবার ভাবছি। কিন্তু এর কোন সঠিক ব্যাখ্যা আমি খুঁজে পাচ্ছি না। আপনারা কি কেউ এর ব্যাখ্যা জানেন? আমরা তো স্বাধীন দেশের নাগরিক। তাহলে আমরা কেন স্বাধীনভাবে নির্ভয়ে চলাফেরা করতে পারছি না? ঘর থেকে বের হলেই- কেন আমরা হঠাৎ করেই অতর্কিত হামলার স্বীকার হচ্ছি? আমরা এ কোন দেশে বসবাস করছি? এ দেশে কি আমরা নিশ্চিন্তে রাস্তা-ঘাটে চলাফেরা করতে পারব না? আমরা সাধারণ জনগণ কেন যেকোন হরতাল কর্মসূচীর আগের দিন কিংবা পরের দিন কিংবা হরতালের দিন অতর্কিত হামলার স্বীকার হচ্ছি? কেন যাত্রীবাহী গাড়িতে ভাংচুর, জ্বালাও-পোড়াও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে?

এখানে বলে রাখি অধিকার আদায়ের বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক যেকোন আন্দোলন কর্মসূচীর বিরুদ্ধে আমি কখনোই নই। এমনকি শান্তিপূর্ণ হরতালের বিরুদ্ধেও নই। কিন্তু যে হরতাল বা আন্দোলন কর্মসূচী মানুষের জান-মালের জন্য আতংক জনক এবং মানুষের জান-মালের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় আমি সবসময়ই এসবের বিরূদ্ধে।

হরতালকে কেন্দ্র দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষের খবর আমরা হরহামেশাই শুনছি। টেলিভিশনের খবর অনুযায়ী কিছুদিন আগের একটি হরতালের আগের দিন একটি যাত্রীবাহী গাড়িতে অগ্নি সংযোগের ঘটনায় একজন লোক মারাও গেছেন। ২২ তারিখের হরতালের আগের রাতেও রাজধানীতে গাড়িতে অগ্নি সংযোগের ঘটনায় একজন চালক মারা গেছেন। এরকম হয়ত এ পর্যন্ত আরো বহু লোক নিহত বা আহত হয়েছেন। এরকম ঘটনা আমরা প্রায় সব হরতালের সময় দেখতে পাই। হরতালের দিন বা হরতালের আগের এবং পরের দিনগুলোতে মানুষজন বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হতে চান না। কেন? ভয়ে এবং আতংকে।

মানুষ তো জান-মালের ভয়ে ঘর থেকে বেরই হতে চান না। ঘর হতে বের হলেই তো কেউ-না-কেউ আক্রমণের স্বীকার হন। কেউ-কেউ আহত অথবা নিহত হন। আর যারাই এ ধরণের হামলার স্বীকার হন তাঁরা সবাই নিরপরাধ। যারা অতর্কিত হামলার স্বীকার হন, তাঁদের অপরাধ কি? হরতালকারীরা কি এর জবাব দিতে পারবেন?

২২ এপ্রিলের হরতালকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে গাড়ী ভাংচুরের খবর আমরা শুনতে পাচ্ছি। গতদিন সিলেটের দক্ষিণ সুরমা এলাকায় একটি যাত্রীবাহী গাড়িতে অগ্নি সংযোগ এবং গাড়ী ভাংচুরের খবর টেলিভিশনের পর্দায় দেখতে পেলাম। সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এরকম আরো বহু আক্রমণ এবং যাত্রীবাহী গাড়ী অগ্নিসংযোগ, ভাংচুরের খবর আমরা প্রায়ই শুনতে পাচ্ছি। এরকম একটি হামলার কবলে আমি নিজেও গত রাতে পড়েছিলাম। রাত আনুমানিক সাড়ে দশটার দিকে আমি সিলেটের আম্বরখানা নামক স্থান থেকে সিএনজিচালিত অটোরিক্সা যোগে বাসায় ফিরছিলাম। গাড়িতে আমিসহ আরো পাঁচজন ছিলাম। পাঠানটুলা নামক স্থান অতিক্রম করার পথেই হঠাৎ লাঠিসোটা নিয়ে কয়েকজন আমাদের চলন্ত গাড়িতে আমরা কিছু বুঝে উঠার আগেই ভাংচুর শুরু করে দিল। ড্রাইভারসহ সামনের সিটে বসা তিনজন আহতও হলেন। পেছনের সীটে বসা আমরা তিনজন সাথে সাথে নেমে দৌড় দিয়ে প্রাণে বাঁচলাম। তবে ভাঙচুরকৃত গ্লাসের টুকরোর আঘাতে কারো কারো সামান্য জখম হল। এমনকি দৌড় দিতে গিয়েও কেউ কেউ খানিকটা আঘাত পেল। বাসায় ফিরে দেখি আমারও ডান হাতের একটি আঙ্গুল থেকে রক্ত বের হচ্ছে। গ্লাসের টুকরোয় হয়ত আঙ্গুলের কিছু অংশ কেটে গেছে। কিন্তু আমাদের গাড়ির অন্য যাঁরা আহত হলেন শেষপর্যন্ত তাঁদের কী হলো? জানি না। পরে দেখলাম হামলাকারীরা আরো কয়েকটা গাড়ী ভাংচুর করেছে। হামলাকারী এরা কারা? নেমে যখন হেটে আসছিলাম তখন পথে এক ভদ্রলোক প্রশ্ন রাখলেন- কী হয়েছে? বুঝলাম না। এরা কি ডাকাত নাকি ছিনতাইকারী? আরেকজন বললেন- এরা হরতাল পালনকারী। এটা কি হরতাল পালনের নমুনা? আরেকজন বললেন- আমাদের অপরাধ কি ছিল? বুঝলাম না। একজন পঞ্চাশোর্ধ লোক বললেন- দেশে কী শুরু হলো- আমরা কি নিশ্চিন্তে রাস্তা-ঘাটে চলাফেরাও করতে পারব না?

রাজনীতিকরা তো হরতাল দেন মানুষের কল্যাণের কথা বলে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় প্রতিষ্ঠার দাবীতে। ভয় এবং আতংক দেবার জন্য নয়। এমনকি মানুষজন আহত বা নিহত হবার জন্য নয়। এটা কোন ধরণের রাজনীতি? এটা কোন ধরণের জনকল্যাণমুখী কর্মসূচী? এটা কোন ধরণের ন্যায় প্রতিষ্ঠার দাবী?

আমার প্রশ্ন হচ্ছে আজকের এ আক্রমণে আমরা হয়ত পুরুষলোক ক’জন থাকায় মারাত্মক কিছু হয়নি। শুধু তিনজনের সামান্য মাথা ফেটে রক্ত বেরিয়েছে এবং আমাদের কারো কারো হয়ত সামান্য জখম হয়েছে। চিকিৎসায় হয়ত এগুলো ভালো হয়ে যাবে। কিন্তু ঐ গাড়িতে যদি কোন বৃদ্ধ রোগী থাকতো কিংবা ছোট শিশু থাকতো কিংবা কোন মেয়েলোক থাকতো কিংবা সন্তান সম্ভব কোন মহিলা থাকতো- তাহলে তাঁদের কি হত? তাঁরা কি আমাদের মত দৌড়ে প্রাণ বাঁচাতে পারতো। আর যদি হতাহত হত- এরজন্য কারা দায়ী হত? আর এ অসহায় মানুষগুলোর উপর যারা হামলা করেছে তাঁরা তো ঐ হামলাকারীদেরই মা-বোন বা বৃদ্ধ বাবা অথবা রোগী বাবা হতে পারতো, বা তারই সন্তান সম্ভবা স্ত্রীও হতে পারতো এমনকি ঐ গাড়িতে তার সন্তানও হয়ত থাকতে পারতো। এতে হয়ত তারা হতাহত হতে পারতো। তাহলে কি তাঁরা এগুলো সহ্য করতে পারতো? তখন তাঁদের কেমন লাগত?

আর এখানে গাড়ির ই-বা দোষ কি ছিল? গাড়িটি হয়ত কোন এক গরীব লোকের সহায় সম্বল বিক্রি করা টাকায় কেনা। এই গাড়িটিই হয়ত তার শেষ সম্বল ছিল। যার গাড়িটি ভাঙ্গল- সে তার ক্ষতি কিভাবে পুষিয়ে নিবে? আর এভাবে চলন্ত গাড়িতে আক্রমণ করার মানে কি? এ প্রশ্নগুলোর জবাব কে দেবে?

আমরা এ কোন রাষ্ট্রে বসবাস করছি যেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে নির্ভয়ে রাস্তাঘাটে চলাফেরা করতে পারেনা। এর থেকে আমরা কি পরিত্রাণ পাবো না?

আমাদের রাজনীতিবিদেরাই চাইলে আমাদেরকে এর থেকে হয়ত পরিত্রাণ দিতে পারবেন। কাজেই আমাদের রাজনীতিবিদদের কাছে আকুল আবেদন মানুষের যদি উপকার করতে নাও পারেন দয়া করে অন্তত মানুষকে স্বাধীনভাবে নির্ভয়ে চলাফেরা করার সুযোগ দিন। হরতাল কর্মসূচী যেন সবসময় শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হয় সেটা সরকার এবং সকল রাজনৈতিক দলের কাছে আমরা কামনা করি। আর কোন নিরপরাধ মানুষ যেন এসব কর্মসূচীতে হতাহত না হয় সেদিকে সবাই এখনই দৃষ্টি দিন। কারণ হরতালের এসব পরিস্থিতির জন্য কোন অবস্থাতেই সাধারণ জনগণ দায়ী নয়। কোন হরতালই যেন ভয়ের কারণ না হয়ে দাঁড়ায়। হরতাল যেন ভয়তাল কর্মসূচী হয়ে না যায় সেদিকে সবাই খেয়াল রাখবেন বলে আমি এবং আমরা সাধারণ জনগণ সবাই প্রত্যাশা করি। আমরা কি নিরাপদে নিশ্চিন্তে রাস্তাঘাটে চলাফেরা করার এ সামান্য নিশ্চয়তাটুকু সংশ্লিষ্ট মহলের কাছ থেকে পেতে পারি না?