ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

ইউনির্ভাসিটি পড়ুয়া আমার এক বন্ধুর রুমে সকালবেলা গেলাম। আমার বন্ধুটি ইউনিভার্সিটির হলে থাকে। সে আমাকে একবার বলেছিল- বন্ধু একদিন আমার হলে এসো, তাহলে দেখবে আমি সেখানে কিভাবে থাকি। গিয়ে দেখতে পেলাম তার রুমের খাট-বিছানা সব তছনছ অবস্থায় একেক জায়গায় একেক জিনিস পড়ে আছে। জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে? তোমাদের হলে আজ পুলিশী তল্লাশী হয়েছে নাকি? হলে মাঝেমধ্যে নানা কারণে পুলিশী তল্লাশী হয়। বন্ধুটি আমাকে বলল- না বন্ধু, ওসব কিছু না। আমি আবারো জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে কি কোন দলীয় নামধারী সন্ত্রাসী ক্যাডাররা এসে তোমাদের রুম তছনছ করে দিয়েছে? বন্ধুটি এবারো বলল- নাহ্ বন্ধু, ওসব কিছু না, আসলে…………..। সে আর কিছু বলার আগেই আমি আবারো তাকে জিজ্ঞেস করলাম- তাহলে তোমার রুমের এই অবস্থা কেন? আর তোমাকে তো কীরম বিমর্ষ দেখাচ্ছে।

অবশেষে বন্ধুটি আমাকে জানালো তার এ করূণ কাহিনী। সে বলল-“বন্ধু, সারাদিনের ক্লান্তিতে আমি গতরাতে একটু আগে-বাগেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুমানোর কিছু্ক্ষণের মধ্যেই আমি টের পেলাম আমাকে কে যেন খাটের নীচ থেকে সুঁই দিয়ে গুঁতো মারছে। গুঁতো সহ্য করেও আমি দু-চারবার খাটের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে ওলট-পালট করে শুয়ে থাকলাম। এরপরও দেখি ওগুলো থামছে না। একপর্যায়ে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। ঘুম থেকে ওঠে রহস্য উদঘাটন করতে চারদিকে খোঁজাখুজি শুরু করে দিলাম। খোঁজাখুজির সময় দেখতে পেলাম একটি ছারপোকা দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। দেখামাত্র আমি তাকে মেরে ফেললাম। এতক্ষণে বুঝতে পারলাম, আমাকে তাহলে এতক্ষণ ওরাই কামড় দিয়েছে আর তাদের যন্ত্রণায় আমি ঘুমোতে পারিনি। এসময় দেখলাম আরো ক’টা ছারপোকা খাটের ফাঁকে লুকিয়ে আছে। আমার মেজাজটা তখন আরো গরম হয়ে গেল। আমি ওদের সবাইকে মেরে ফেলতে তীব্রভাবে ঝাপিয়ে পড়লাম। প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলাম, যেভাবেই হোক আমি ওদের সবটাকে মেরে ফেলব। কারণ ওরা আমাকে শান্তিতে ঘুমোতে দেয়নি। কিন্তু সবটাকে মারব কিভাবে, ওরা যেই চালাকের চালাক। ওরা খাটের বিভিন্ন প্রান্তে লুকিয়ে আছে। খাটের ফাঁকের চিপায় যেগুলো লুকিয়ে আছে সেগুলোকে কিছুতেই মারতে পারছি না। রাগের মাথায় একপর্যায়ে আমি নিজের খাটটাই ভেঙ্গে ফেললাম। আর সে জন্যেই তুমি এখন এরকম তছনছ অবস্থায় দেখতে পাচ্ছ। যাক, ওদের হাত থেকে তো মুক্তি পেলাম!”
আমি বললাম- “ও, তাই বুঝি। বন্ধু, মাথায় ব্যথা করলে, মাথা কেটে ফেলতে হয় নাকি? নাকি মাথা ব্যথার চিকিৎসা করাতে হয়।”
বন্ধুটি আমাকে বলল- “বন্ধু আমার সাথে ফান করছ। এখানে তুমি মাথা ব্যথার সম্পর্ক কোথায় দেখলে?”
আমি বললাম- “না বন্ধু, তুমি তো সামান্য ছারপোকার জন্য তোমার খাটটাই ভেঙ্গে ফেললে। সামান্য ছারপোকার জন্য তুমি এ কী কান্ড ঘটালে? হি.হি.হি…………………..!”

এ তো গেল ক’বছর আগের একটা ঘটনা। এবার বলি আরেকটি ঘটনা। আমি যখন মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়তাম তখন পড়ার টেবিলে হেলান দিয়ে প্রায়ই ঘুমিয়ে পড়তাম। এজন্যে কত যে বকুনি খেয়েছি! পড়ার টেবিলে হেলান দিয়ে ঘুমানোর এ ধরণের অভ্যাস বোধ করি কমবেশী সবারই ছিল। যাক, এটা কোন ব্যাপার না। আসল ঘটনা হলো- একদিন পড়ার সময় ঘুম ধরলে আমি চেয়ারে বসে টেবিলে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। কী শান্তির ঘুম! কিন্তু শান্তিতে কি আর ঘুমানো হলো!

না, আজ কেউ এসে বকুনি দেয়নি। চেয়ারের তলা থেকে কে যেন কিছুক্ষণ পরপর গুঁতো মারছে। গুঁতোর যন্ত্রণা অনেকটা সুঁইয়ের গুঁতোর মত মনে হচ্ছে। ওঠে খোঁজাখুজি করে দেখতে পেলাম ছারপোকারা চিপায় চিপায় লুকিয়ে আছে। মারার চেষ্টা করে দু-একটা মারতে পারলাম। বাকীগুলোকে মারতে পারলাম না। পরের দিন চেয়ারটি ভালো করে ধুয়ে রোদে রাখলাম। এরপর থেকে ঐ চেয়ারে যতদিন বসেছি আর কোনদিন ছারপোকারা আমাকে যন্ত্রণা করেনি এবং আমিও আর কখনো পড়ার টেবিলে হেলান দিয়ে ঘুমাইনি।

আসলে মাঝেমধ্যে ছারপোকারা ভালো কাজ করে, এই যেমন ধরুন: কেউ পড়ার টেবিলে ঘুমিয়ে পড়লে তাকে গুঁতো মেরে ঘুম থেকে জাগিয়ে দেয়।

এ তো গেল বাসা-বাড়ি কিংবা ইউনিভার্সিটির হলের কথা। কিন্তু ছারপোকারা কি শুধু বাসা-বাড়িতেই বসবাস করে। ছারপোকারা তো যেখানেই সুযোগ পায় সেখানেই বসবাস শুরু করে দেয়। এমনকি সুযোগ পেলে তারা রেষ্টুরেন্টে কিংবা গাড়ীতেও বসবাস শুরু করে দেয়।

এই তো সেদিন একজন ভদ্রলোককে একটি রেষ্টুরেন্ট থেকে চিৎকার-চেচামেচি করে বেরিয়ে আসতে দেখলাম। আমি ভদ্রলোকটিকে (নাম: কন্টু মিয়া) জিজ্ঞেস করলাম- ভাই কি হয়েছে?
তিনি জানালেন- “ছারপোকাদের কামড়ের যন্ত্রণায় ওখানে বসতেই পারলাম না। বাপরে বাপ্! একেকটা যেই গুঁতো মারে, মনে হয় যেন কেউ সুঁই দিয়ে গুঁতো মারছে।”
আমি রেষ্টুরেন্ট মালিক ‘আক্কেল মিয়া’কে ডেকে বললাম- “আপনার রেষ্টুরেন্টের চেয়ার-টেবিলে এতো ছারপোকা কেন? মানুষজন তো ওখানে বসতে পারছে না। ছারপোকাদের মেরে ফেলুন। না হলে তো আপনার রেষ্টুরেন্টে বসে কেউ কিছু খাবে না।”

রেষ্টুরেন্ট মালিক আমাকে মজা করে বললেন-“আমি তো মারতে চাই। কিন্তু ছারপোকাদের মারতে গেলে যদি তারা বলে ফেলে- আমাদের স্ত্রী সন্তানের দিকে তাকিয়ে হলেও অন্তত আমাদেরকে মারবেন না, আমাদেরকে মেরে ফেললে তো ওরা কাঁদবে! আমাদের এ পৃথিবীতে নিরাপদে বাঁচতে দিন। আমাদেরকে স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা দিন। তখন কি করব?”
তার কথা শুনে পাশের লোকজন হি.হি.হি…………. করে হাসতেই থাকলেন।

কিন্তু আসলেই তো। পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীরই তো নিরাপদে বাঁচার অধিকার আছে। তবে অন্যের ক্ষতি সাধন করে নয়। তাই না? আর প্রতিটি প্রাণীই তো স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা চাইতে পারে।

এখানে বলে রাখি, ছারপোকা সিমিসিডে গোত্রের একটি পরজীবী পতঙ্গ যা মানুষ ও অন্যান্য উষ্ণ রক্ত বিশিষ্ট পোষকের রক্ত খেয়ে বেঁচে থাকে। ইংরেজিতে এর নাম হল Bedbug অর্থাৎ বিছানার পোকা। ছারপোকাদের পছন্দের আবাসস্থল হচ্ছে: ম্যাট্রেস, সোফা, চেয়ার-টেবিল এবং অন্যান্য গৃহস্থালী আসবাবপত্র। ইদানিং ট্রেন, বাস কিংবা লঞ্চেও এর উপদ্রব দেখা যায়। পুরোপুরি নিশাচর না হলেও ছারপোকা সাধারণত রাতেই সক্রিয় থাকে।