ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

গ্রীষ্মকালীন ফল কাঁঠাল আমাদের জাতীয় ফল, এটি কমবেশী আমরা সবাই জানি। কাঁঠাল বা Jackfruit এর বৈজ্ঞানিক নাম হচ্ছে Artocarpus heterophyllus । বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্রই কাঁঠাল চাষ হয়। এছাড়া আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, দক্ষিণ ভারত, বিহার, মিয়ানমার, মালয়, শ্রীলংকা প্রভৃতি স্থানেও কাঁঠাল চাষ হয়।

কাঁঠাল খুব মিষ্টি এবং উপকারী ফল। এর স্বাদের প্রশংসা সর্বত্র শুনা যায়। কাঁঠাল খেতে পছন্দ করে না এমন লোক এই উপমহাদেশে খুব কম পাওয়া যাবে। কাঁঠাল এমন একটি ফল, যে ফলের প্রতিটি অংশই কোন-না-কোন কাজে লাগে।

প্রথমে আসি কাঁচা কাঁঠালের কথায়- কাঁচা কাঁঠালের ছাল দিয়ে খুবই সুস্বাদু তরকারি রান্না করা যায়। কাঁচা কাঁঠালকে বলা হয় এঁচোড়। কাঁচা কাঁঠালের তরকারি যে একবার খেয়েছে সে নিশ্চিতভাবে বারবার খেতে চাইবে।

এরপর আসি পাঁকা কাঁঠালের কথায়- পাঁকা কাঁঠালের রসালো কোষ খেতে খুবই সুস্বাদু। পাঁকা কাঁঠাল বেশ সুগন্ধি এবং মিষ্টি। কাঁঠালের কোষের ভেতরে যে বীচি থাকে সেটিও পরে তরকারী রান্না করে খাওয়া যায়। কাঁঠাল বীচির তরকারী খুবই সুস্বাদু।

পাঁকা কাঁঠালের ছাল গরুর খুবই প্রিয় একটি খাবার। পাঁকা কাঁঠালের ছাল পেলে গরুরা মালিকদের প্রতি বোধ করি খুব খুশি হয়, যেটি তাঁদের খাওয়া দেখে হয়তো উপলব্ধি করা যায়। এ তো গেল কাঁঠাল ফলের কথা, যে ফলটির প্রতিটি অংশই খাবার হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

কাঁঠাল গাছের কচি পাতা ছাগলের খুবই প্রিয় খাবার। কোরবানীর ঈদে অন্যান্য প্রাণীর সাথে কেউ কেউ ছাগলও কোরবানী দিয়ে থাকেন। কোরবানীর ঈদে ছাগল নিয়ে আসা হলে ছোটবেলায় আমি খুব আদর করে ওদেরকে কাঁঠাল গাছের পাতা এনে খাওয়াতাম। সবাই বলতেন ছাগলের প্রিয় খাবার কাঁঠাল গাছের পাতা, সেজন্যে আমিও ছাগলকে কাঁঠাল গাছের পাতা খাওয়াতাম।

কাঁঠাল গাছের কাঠ অত্যন্ত মূল্যবান। এই গাছের কাঠ আসবাবপত্র তৈরীর জন্য বেশ সমাদৃত। বিশেষ করে ফার্নিচার সামগ্রীর জন্য এ গাছের কাঠ খুবই ভালো। এছাড়া, এ গাছটি পরিবেশ সম্মতও বটে।

অতিথি আপ্যায়নেও কাঁঠাল ফল ব্যবহার হয়ে থাকে। কাঁঠাল ফল এখন অতিথি আপ্যায়নের একটা অংশ হয়ে গিয়েছে। বর্তমানে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রীষ্মকালীন ছুটি চলছে। এ সুযোগে আমি আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে যেখানেই যাচ্ছি সেখানেই অন্যান্য খাবারের সাথে সুমিষ্ট এই কাঁঠাল ফলও থাকছে। এর ফলে প্রচুর পরিমাণে কাঁঠাল খাওয়া হচ্ছে। তবে বাজার থেকে কেনা নয়, একেবারে নিজেদের গাছের টাটকা কাঁঠাল ফল। বাজার থেকে যে কাঁঠাল ফল কেনা হয় সেগুলো ওতো সুস্বাদু হয় না। ইদানিং বাজারের প্রায় সব ফলেই প্রচুর পরিমাণে ফরমালিন মিশানো হয়, সে কারণে ফলের আসল স্বাদ থাকে না। এমনকি বাজারের ঐ ফলগুলো স্বাস্থের জন্যেও ভালো নয়।

যে ফলের এতো গুনগান সেই কাঁঠাল ফলের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে নিজে এবং অন্যকে জানানো প্রয়োজন। তাই বাংলা উইকিপিডিয়া থেকে সংগৃহিত কাঁঠালের পুষ্টিগুন সম্পর্কে কিছু তথ্য শেয়ার করলাম।

“কাঁঠালে আছে থায়ামিন, রিবোফ্লাভিন, ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম, আয়রন, সোডিয়াম, জিঙ্ক এবং নায়াসিনসহ বিভিন্ন প্রকার পুষ্টি উপাদান। অন্যদিকে কাঁঠালে প্রচুর পরিমাণে আমিষ, শর্করা ও ভিটামিন থাকায় তা মানব দেহের জন্য বিশেষ উপকারী।

১. কাঁঠালে চর্বির পরিমাণ নিতান্ত কম। এই ফল খাওয়ার কারণে ওজন বৃদ্ধির আশংকা কম।
২. কাঁঠাল পটাশিয়ামের উৎকৃষ্ট উৎস। ১০০ গ্রাম কাঁঠালে পটাশিয়ামের পরিমাণ ৩০৩ মিলিগ্রাম। যারা পটাশিয়াম উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে। এ জন্যে কাঁঠালে উচ্চ রক্ত চাপের উপশম হয়।
৩. কাঁঠালে প্রচুর ভিটামিন এ আছে, যা রাতকানা রোগ প্রতিরোধ করে।
৪. কাঁঠালের অন্যতম উপযোগিতা হল ভিটামিন সি। প্রাকৃতিকভাবে মানবদেহে ভিটামিন “সি” তৈরি হয় না। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি দাঁতের মাড়িকে শক্তিশালী করে ভিটামিন “সি”।
৫. কাঁঠালে বিদ্যমান ফাইটোনিউট্রিয়েন্টস- আলসার, ক্যান্সার, উচ্চ রক্তচাপ এবং বার্ধক্য প্রতিরোধে সক্ষম।
৬. কাঁঠালে আছে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা আমাদের দেহকে ক্ষতিকর ফ্রির‌্যাডিকেলস থেকে রক্ষা করে। এছাড়াও আমাদেরকে সর্দি-কাশি রোগের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে।
৭. টেনশন এবং নার্ভাসনেস কমাতে কাঁঠাল বেশ কার্যকরী।
৮. বদহজম রোধ করে কাঁঠাল।
৯. কাঁঠাল গাছের শেকড় হাঁপানী উপশম করে। শেকড় সেদ্ধ করলে যে উৎকৃষ্ট পুষ্টি উপাদান নিষ্কাশিত হয় তা হাঁপানীর প্রকোম নিয়ন্ত্রণে সক্ষম।
১০. চর্মরোগের সমস্যা সমাধানেও কাঁঠালের শেকড় কার্যকরী। জ্বর এবং ডায়রিয়া নিরাময় করে কাঁঠালের শেকড়।
১১. কাঁঠালে আছে বিপুল পরিমাণে খনিজ উপাদান ম্যাঙ্গানিজ যা রক্তে শর্করা বা চিনির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
১২. কাঁঠালে বিদ্যমান ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়ামের মত হাড়ের গঠন ও হাড় শক্তিশালী করণে ভূমিকা পালন করে।
১৩. কাঁঠালে আছে ভিটামিন বি৬ যা হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।
১৪. কাঁঠালে বিদ্যমান ক্যালসিয়াম কেবল হাড়ের জন্য উপকারী নয় রক্ত সংকোচন প্রক্রিয়া সমাধানেও ভূমিকা রাখে।
১৫. ছয় মাস বয়সের পর থেকে মায়ের দুধের পাশাপাশি শিশুকে কাঁঠালের রস খাওয়ালে শিশুর ক্ষুধা নিবারণ হয়। অন্যদিকে তার প্রয়োজনীয় ভিটামিনের অভাব পূরণ হয়।
১৬. চিকিৎৎসা শাস্ত্র মতে প্রতিদিন ২০০ গ্রাম তাজা পাকা কাঁঠাল খেলে গর্ভবতী মহিলা ও তার গর্ভধারণকৃত শিশুর সব ধরনের পুষ্টির অভাব দূর হয়। গর্ভবতী মহিলারা কাঁঠাল খেলে তার স্বাস্থ্য স্বাভাবিক থাকে এবং গর্ভস্থসন্তানের বৃদ্ধি স্বাভাবিক হয়। দুগ্ধদানকারী মা তাজা পাকা কাঁঠাল খেলে দুধের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।
১৭. এই ফল আঁশালো বিধায় কোষ্ঠকাঠিণ্য দূর করে।
১৮. কাঁঠালে রয়েছে খনিজ উপাদান আয়রন যা দেহের রক্তাল্পতা দূর করে।”

সুতরাং সর্বদিক দিয়ে মূল্যবান আমাদের জাতীয় ফলের গাছ ‘কাঁঠাল গাছ’ বেশী বেশী করে লাগান। কাঁঠালের এ মৌসুমে বেশী করে টাটকা কাঁঠাল খান এবং নিজে উপকৃত হন।

পরিশেষে বলব- যারা মানব খাদ্যে বিষাক্ত ফরমালিন মিশায় তাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হউন, প্রতিরোধ গড়ে তুলুন। যারা ফরমালিন মেশায় তাঁদের বিরুদ্ধে আমাদের মানব প্রেমিক সরকার কঠোর ব্যবস্থা নিবে বলে আমি এবং আমরা সবাই আশা করছি।

তথ্য সহায়তা:http://bn.wikipedia.org