ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

 

শুধু মানুষই নয় পানি সকল প্রাণ ও প্রকৃতির অধিকার। এটি প্রকৃতির অংশ, এটা কেউ তৈরি করেনি। তাই পানি আইন ও নীতিমালা প্রণয়নের েেত্র ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থকেই নয় প্রাণ ও প্রকৃতির স্বার্থ-অধিকারকে প্রাধান্য দিয়েই হতে হবে। শুধুমাত্র পানি উৎস ব্যবস্থাপনা কিংবা সরবারহের প্রতি লক্ষ্য রেখে প্রণীত নীতি ও আইন মাধ্যমে আসন্ন পানির সংকট মোকাবেলা সম্ভব নয়। পরিবেশের অন্যতম এই উপাদানটির রায় পুরো পানি চক্রটিকে প্রাধান্য দিয়েই পানি নীতি ও আইন তৈরি করতে হবে। পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের আইনগুলো তৈরি করা হয় সে দেশের প্রয়োজন, ভৌগলিক অবস্থান, সামাজিক অবস্থা, রীতিনীতি ঐতিহ্য ও জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং নিজ স্বার্থের দিকে লক্ষ্য রেখে। গুরুত্বপুর্ণ এ প্রাকৃতিক সম্পদ এবং আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের স্বার্থেই এর যথাযথ সদ্ব্যবহার এবং সংরক্ষণ দরকার ।

দেশের পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে বিশ্ব ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে তৈরি খসড়া পানি আইন আগামী সংসদ অধিবেশনে উত্থাপিত করা হবে। প্রস্তাবিত এ আইনের খসড়ায় পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের প্রস্তাব এনে বিকেন্দ্রীকরণের নীতির আড়ালে পানি ও পানির উৎসসমূহগুলোকে বেসরকারি খাতে সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে। প্রস্তাবিত পানি আইনের প্রসেসিংয়ের বিধানের মাধ্যমে জনগণের অধিকারকে বাণিজ্যিক মোড়কে রূপান্তর করে আইনসিদ্ধ করার চেষ্টা চলছে। লাইসেন্সিংয়ের এ বিধান পানি ব্যবস্থাপনা নয়, নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আইনসিদ্ধ করার প্রচেষ্টা। এর ফলে আইনে প্রাণ ও প্রকৃতির অধিকার উপেক্ষিত হয়েছে। এ আইনের মূল নীতিতে জনগণের সম্পদ পানিতে জনগণের অধিকার অস্বীকার করে সংবিধান ও মানবাধিকারের পরিপন্থী কাজ করা হয়েছে। লিজিংয়ের মাধ্যমে পানিকে বাণিজ্যিক পর্যায়ে না নিয়ে এ পানি আইন ও নীতির মাধ্যমে পানির উপর মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য সরকারের দৃঢ় পদক্ষেপ দরকার। পানিকে বাণিজ্যিক পণ্য এবং রাজস্ব আয়ের উপকরণ হিসেবে না দেখে জননিরাপত্তা ও জনস্বার্থে ব্যবহারে প্রয়োজনীয় সম্পদ হিসেবে আইনে পানিকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন।

সরকার সময়ে সময়ে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষকে এক অথবা একাধিক সমন্বিতভাবে পানি সরবরাহ, উন্নয়ন, নিয়ন্ত্রণ, সংরণ, উত্তোলন, পানি নিষ্কাশনের জন্য শুল্ক ধার্য ও আদায়ের মৃত্যু অর্পণ করতে পারবে। শুল্ক ধার্য ও আদায়কারী কর্তৃপক্ষ এ আইনের মাধ্যমে এই ক্ষমতাপ্রাপ্ত হবেন। ব্যবহারের ওপর মূল্য পরিশোধের জন্য মূল্য নীতি ধার্য করতে পারবে। পানির ভিন্ন ভিন্ন ব্যবহারে ভিন্ন ভিন্ন মূল্য ধার্য করা হবে। পানির বন্টনও ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমিতিও কাজ করবে । পানি আইনে পানি ব্যবস্থাপনা সমিতি কর্তৃক মূল্য আদায় করার বিধান রাখা হয়েছে। সরকার যে কোন এলাকায় যে কোন সমিতিকে পানি ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে মূল্য আদায়ের জন্য আদেশ দিতে পারবে। এ কারণে সেই সমিতিকে কমিশন দেয়া হবে। পানি শুধুমাত্র মানুষের সম্পদই নয় প্রকৃতির শৃঙ্খল রায় এর ভূমিকা অন্যতম তাই এ সম্পদের চাহিদা ব্যবস্থাপনা কেবল মার্কেট ক্লিয়ারিং প্রাইস ব্যবহার করা সম্ভব নয়। এর ফলে প্রকৃতির পানি অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে এবং সমাজের নিম্ন আয় ও হত-দরিদ্র যে শ্রেণীটি পানির মূল্য পরিশোধ করতে পারবে না তারা এই মৌলিক সম্পদ থেকে বঞ্চিত হবে। কোম্পানীর পরিবর্তে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে। পানি মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার এবং বেচে থাকার জন্য অন্যতম আবশ্যিক উপাদান হওয়ার পরও খসড়া আইনটিতে কর্তব্য ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানকে বাধ্যবাধ্যকতা করা হয়নি পানি সরবরাহে। খসড়া আইনে সাধারন কাজের সংজ্ঞায় রান্না, খাওয়া, থালা-বাসন, কাপড় ধোয়া, গোসলসহ দৈনন্দিন কর্মকান্ড নিদিষ্ট করা হয়েছে। কিন্তু শহর এলাকার বাইরে সাধারণ কাজের পরিধি বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন। খসড়া আইনে পানিকে জীববৈচিত্র্য রার অন্যতম উপদান স্বীকার ও গুরুত্ব প্রদান করা হলেও দেশের জীববৈচিত্র্যে অন্যতম আধার সুন্দরবন, হাওরঞ্চলের পানির নির্ভর জীববৈচিত্র্য বিষয়টি নিয়ে সুস্পষ্ট ধারনা নেই।

পানির দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদের অর্থনৈতিক ও আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে নির্ণয়ে কথা বলা হয়েছে। যার ফলে অভিজাত এলাকায় গরীব মানুষের পানির বেশি দামে কিনতে হবে। পানির দাম নির্ধারণের দায়িত্ব ব্যবস্থাপনা এলাকার জন্য প্রাপ্ত মতাবলে ধার্য করা কথা বলা হয়েছে। ফলে দায়িত্ব প্রাপ্ত কোম্পানী বিভিন্ন অজুহাতে পানির দাম বাড়াবে।

পানি সরবারহ, পানি উৎস ও পানি ব্যবস্থাপনাসহ সকল ক্ষেত্রে বেসরকারী বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। কোম্পানিকে লাইসেন্স প্রদানের মাধ্যমে পানির সংরক্ষণের বিশেষ ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে যার ফলে পানির দাম বৃদ্ধি, কৃত্রিম সংকটসহ নিয়ন্ত্রণ কোম্পানীর হাতে চলে যাবে এবং পানি বাণিজ্যিক রূপ ধারন করবে। নাগরিকের নূন্যতম পানি সরবারহের ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতায় না থাকায় কিংবা বিনামূল্যে বস্তিবাসী, সুবিধা বঞ্চিত মানুষ পানি অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। পানি সরবরাহে কোম্পানীর সুযোগ বৃদ্ধি করা ফলে রাষ্ট্রীয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আওতা সীমিত হয়ে পড়বে। পানির উপর নিয়ন্ত্রণ কমে যাবে। কোনো ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠান শাস্তির বিরুদ্ধে আপিল করতে চাইলে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে নির্দিষ্ট অংকের ফি জমা দিয়ে পানি সম্পদ কাউন্সিলের নির্বাহী কমিটিতে আপিল করতে হবে। এর ফলে আপিল করার সুযোগ হারাবে।

পূর্বানুমতি ছাড়া বিনোদন কাজে ব্যবহার করার উপর নিষেধসহ বেশ কিছু বিধি নিষেধ এই আইনে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। পানি আইনের নামে আবহমানকাল থেকেই এদেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত পানির উপর মানুষের যে দাবি তা কোনমতেই খর্ব করা যাবে না। কারণ দৈনন্দিন জীবনে নদী-নালা, খাল-বিল থেকে বাংলার মানুষ পানি ব্যবহার করে আসছে। দৈনন্দিন জীবনের পানির এ ব্যবহারে কোনো সঙ্কট সৃষ্টি করেনি। এরকম অসংখ্য জনস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত আর ত্রুটি নিয়ে পানি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন, ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও সংরক্ষণের লক্ষ্যে পানি আইন হচ্ছে। পানি আইনে বারোটি পরিচ্ছেদ রয়েছে। উপরোক্ত বিষয়গুলো ছাড়াও এ আইনে পানি নিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণ, আর্থিক অনুবিধি, পানি ব্যবহারকারী সমিতি, নদ-নদী প্লাবন, জলাধার সংরক্ষণ ইত্যাদি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পানি ব্যবহারে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে আইনি কাঠামো গড়ে তুলে পানির বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধ করতে হবে এবং জোরদার করতে হবে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা ও তদারকি। এর বদলে পানিকে বাণিজ্যিকীকরণ করা হলে তা সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না।

পৃথিবীর যত পানি তার শতকরা প্রায় ৯৭.৫ ভাগই সমুদ্রের নোনা। এই পানি ধারণ করে আছে জানা-অজানা অনেক সম্পদ। বাকি শতকরা ২.৫ ভাগের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি জমে আছে বরফ হয়ে, যা জলবায়ুর ভারসাম্য রায় গুরুত্বপূর্ণ। বাকি পানির তিন-চতুর্থাংশই ভূগর্ভস্থ পানি, যা এই পৃথিবীকে শুধু বাঁচিয়ে রাখেনি, তাকে অবিরাম সৃজনশীল রেখেছে। বাকি অর্থাৎ শতকরা মাত্র ০.৩ ভাগ পানি আছে নদী, খালবিল, জলাশয় ইত্যাদিতে। অতএব পৃথিবীর মোট পানির শতকরা ১ ভাগেরও কম পানযোগ্য। এই সামান্য পরিমাণ ব্যবহার উপযোগী পানিকে বিভিন্নভাবে ব্যবহার অনুপযোগী করে তোলা হচ্ছে৷

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পানির অবস্থা

কেনিয়ার উত্তরাঞ্চলে খাবার পানি সংগ্রহের জন্য প্রতিদিন মাইলের পর মাইল হাঁটতে হয়। একেক জনকে দিনে ৫ ঘণ্টা এই কাজে ব্যয় করতে হয়। ভারত-পাকিস্তানে বহু অঞ্চল আছে যেখানে একটি জলাশয় বা কূপ থেকে পানি সংগ্রহের জন্য দূর-দুরান্ত থেকে মানুষ আসে, এর কোন বিকল্প নেই। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এখন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে সমুদ্রের পানি থেকে লবণ দূর করে সুপেয় পানির যোগান দিচ্ছে। একই দেশের অভ্যন্তরেও বিভিন্ন প্রদেশ বা রাজ্যের মধ্যে পানি নিয়ে বিরোধের নজির রয়েছে৷ কর্নাটক এবং তামিলনাড়– রাজ্যের মধ্যে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিরোধে বড় ধরনের দাঙ্গা পর্যন্ত সংগঠিত হয়েছিল।

সুপেয় পানির যখন এরকম সংকট, তখন তা আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে উন্নয়ন নামের আগ্রাসী তৎপরতার কারণে। পানির প্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় জীববৈচিত্র্য নষ্ট হয়ে পানি-মাটি অতঃপর প্রকৃতি বিপর্যস্ত হচ্ছে। পানি দূষণ ও অপব্যবহারের সৃষ্ট সংকটের সুযোগ নিয়ে মানুষের পানি দখলে নিচ্ছে কোম্পানি। আশির দশকের শুরু থেকেই উন্নয়নের নামে জগতের সবকিছু ব্যক্তিমালিকানা, বাণিজ্য আর মুনাফার কর্তৃত্বে আন বার উন্মাদনা সৃষ্টি করা হয়। সড়ক, রেলপথ, বিমান বন্দর, চিকিৎসা, বিদ্যুৎসহ পানিও এই আগ্রাসনের অধীনস্ত হয়। এই কাজে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো পানির বাণিজ্যিকীকরণে সবচাইতে অগ্রণী। বাংলাদেশের এডিবির ভূমিকাও সক্রিয়।

পানি বেসরকারীকরণের অভিজ্ঞতা

পৃথিবীব্যাপী যেখানেই পানিকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া হয়েছে,সেখানেই পানির দাম বেড়ে গেছে কয়েকশ গুন। ১৯৯০ সাল থেকে বিভিন্ন দেশে পানিকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়ার পালা শুরু হয়। আর এর পিছনে মদদদাতা হিসেবে কাজ করছে বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ। বিভিন্ন দেশে ঋণ সহায়তা এবং উন্নয়ন সহায়তার আড়ালে তারা রাস্ট্রীয় পানি সেবা ব্যবস্থাপনাকে বেসরকারি খাত ছেড়ে দেয়ার জন্য চাপ সৃস্টি করে। আফৃকায় এ সমস্যাটি রীতিমত ভয়াবহ৷ সেখানে পানি যেন দুর্লভ৷ সেখানকার কোনো কোনো দেশে প্রাকৃতিক উৎস থেকে প্রাপ্ত পানিও জনগণকে কিনে পান করতে হচ্ছে৷ আর এর পেছনে কলকাঠি নাড়ছে বিশ্ব দাপিয়ে বেড়ানো আর্থিক সংগঠনগুলো৷ শর্তসাপে ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে ঘানা সরকার দেশের হতদরিদ্র মানুষের কাছে তাদের নিজস্ব উৎসের প্রাপ্ত বিশুদ্ধ পানি ব্যবহারের ওপরও ট্যাক্স বসিয়েছিল৷

বিশ্বব্যাংকের ঋণের শর্তানুযায়ী বলিভিয়া নববই দশকের শেষেই পানি বাণিজ্যিকীকরণ করবার নীতি গ্রহণ করে। সেই মোতাবেক মার্কিন কোম্পানি বেখটেল বলিভিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম শহর কোচাবাম্বার সব পানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর কর্তৃত্ব লাভ করে। এমনকি বৃষ্টির পানিও তাদের কর্তৃত্বের আওতায় আসে। পানির দাম পরিশোধে ব্যর্থ হলে নাগরিকদের ঘরবাড়ি বাজেয়াপ্ত করারও অধিকার দেওয়া হয় এই মার্কিন কোম্পানিকে। রাস্তায় প্রতিরোধ তৈরি করে। ক্রমে পানি-গ্যাসসম্পদ রার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বলিভিয়ায় বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনই সংঘটিত হয়। পানির ওপর সবার অধিকার, গ্যাস সম্পদের ওপর জনগণের মালিকানা এখন স্বীকৃত।

অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে পানির ওপর বিখ্যাত পানি কোম্পানী সুয়েজের নিয়ন্ত্রণ স্থাপনের পরই পানিদূষণ বৃদ্ধি পায়। কানাডার অন্টারিওতে পানি দূষণে কমপক্ষে ৭ জন মৃত্যুবরণ করে, কেননা তাদের প্লান্ট ও টেস্ট প্রক্রিয়া তারা গোপন বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি হিসেবে গোপন রেখেছিল। মরক্কোর মানুষ কাসাব্লাঙ্কায় পানির দাম তিনগুণ বৃদ্ধির মধ্যেই বাণিজ্যিকীকরণের মর্ম বুঝতে পেরেছিলেন। আর্জেন্টিনার পানির কর্তৃত্বও পেয়েছিল সুয়েজ। এর ফলে পানির দাম দ্বিগুণ হয়েছিল কিন্তু এর গুণগত মানের অবনতি হয়েছিল। মানুষের প্রতিবাদে, বিল পরিশোধে অস্বীকৃতি জানানোয় পরে কোম্পানি দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। একই কারণে ব্রিটেনেও পানির দাম বেড়ে যায়। পানির বাণিজ্যিকীকরণের প্রতিবাদে নিউজিল্যান্ডের মানুষকেও রাস্তায় নামতে হয়। দক্ষিণ আফ্রিকাতেও পানি বাণিজ্যিকীকরণে সুয়েজ কর্তৃত্ব পেয়েছিল। কিছুদিনের মধ্যেই পানি এমন বিষাক্ত হয়েছিল যে, কলেরা মহামারির আকার নেওয়ায় পানি সংযোগ অনেকদিন বিচ্ছিন্ন থাকে। ইরাক ধ্বংসযজ্ঞের পর বেখটেল ও এসব কোম্পানির জন্য সোনায় সোহাগা হয়। ঘানা এবং উরুগুয়েও এই পথে গিয়েছিল, পরে তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে জনবিক্ষোভ তৈরি হয়। ২০০৪ সালে গণভোটের মাধ্যমে এই দুই দেশে পানির ব্যক্তি বাণিজ্যিকীকরণ নিষিদ্ধ হয়। নেদারল্যান্ডও একই বছর গণপানি সরবরাহ ব্যক্তি করণ নিষিদ্ধ করে আইন পাস করে।

আর বিপুল আধারের মধ্যে থেকেও বাংলাদেশের মানুষের প্রাকৃতিক পানি পাওয়ার অধিকার ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। যতদিন যাচ্ছে ততো পানিদূষণ বাড়ছে, বোতল পানির বাজারও সম্প্রসারিত হচ্ছে। পানি সরবরাহ, ব্যবস্থাপনার নানা প্রকল্পের মধ্য দিয়ে বিদেশী কোম্পানির আগ্রাসন ল্য করা যাচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় ভিওলিয়া, সুয়েজ মত লুণ্ঠনকারী পানি কোম্পানী ইতিমধ্যেই হাজির হয়েছে এদেশে। দেশবাসীকে সুপেয় পানি দিতে হলে এবং ভূ-পৃষ্ঠের উপরি ভাগের পানি ব্যবহারের জন্য জলাধার সুরা করতে হলে জনমানুষের মতামতের ভিত্তিতেই খসড়া পানি আইন করে জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করতে হবে।

‘সংবিধানের ১৮(১) অনুচ্ছেদে জনস্বাস্থ্যের উন্নতিসাধনকে রাষ্ট্রের অন্যতম কর্তব্য গণ্য করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে রাষ্ট্রকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। সংবিধানের ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদে জীবনের অধিকারের (Right to life) কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বিশুদ্ধ পানি ছাড়া জীবনধারণ অসম্ভব। তাই জীবনের অধিকার বলবৎ করতে চাইলে অবশ্য বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। বিশুদ্ধ ও জীবাণুমুক্ত পানি পাওয়ার অধিকারকে তাই পরোক্ষভাবে বলা যায়, জনগণের সাংবিধানিক অধিকার। সে অধিকার বাস্তবায়নে সরকার সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা দেখাবে এবং উপযুক্ত পদক্ষেপ নিবে এটাই এখন জনগণের প্রত্যাশা।