ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

১৯৬৯এর গন আন্দোলনে স্কুল পড়ুয়া যে কিশোর ছেলেটি ১১ দফার ফেষ্টুন কাঁধে নিয়ে মিছিলে যোগ দিতো,৭০এর ৬ দফা ও নির্বাচনি মিছিলে নৌকায় ভোট দাও বলে হাজার কন্ঠের শ্লোগানের সাথে কন্ঠ মেলাতো,৭১এর অগ্নিঝরা দিনগুলোতে লক্ষ মানুষের মিছিলে মিশে যেতো, সে বুঝতো না কেন সে তা করছে,তবে বুঝতো এসব করতে তার ভালো লাগে।
১৯৭১এর ১৬ই ডিসেম্বর শরীরের সমস্ত শক্তি গলায় এনে, গলার সমস্ত শিরা-উপশিরা ফুলিয়ে একা একাই সে চিৎকার দিয়ে উঠেছিলো জয়য়য়য়য়য়য়য়য় বাংলা। বুঝেছিলো সে স্বাধীনতা এসেছে।

স্বাধীনতার বয়স বাড়ে। বাড়ে ছেলেটির বয়স। কিন্ত স্বাধীন বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনার কারন সে বুঝতে পারেনি।বুঝতে পারেনি বাংলার শ্লোগান,বাঙালির শ্লোগান,স্বাধীনতার শ্লোগান ‘জয় বাংলা”র কেন কন্ঠরোধ করা হয়েছিল।

আ স ম আবদুর রব ও মহাতাত্বিক সিরাজুল আলম খান মিলে কেন রাজনৈতিক দল” জাতীয় সামাজতান্ত্রিক দল” এবং সসস্ত্র “গনবাহীনি” গঠন করে যুদ্ধ বিধ্বস্ত ,কপর্দকশুন্য একটি দেশকে পুনর্গঠনের জন্য বঙ্গবন্ধুর হাতকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে পদে পদে তাঁর বাধা হয়ে দাঁড়ালো। রাজাকার-আলবদরের পরিবর্তে একজন মুক্তিযোদ্ধা সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে কেন প্রতি বিপ্লবীর ভূমিকায় অবর্তীর্ন হলো সেই আ স ম রব যাকে বঙ্গবন্ধুর পরবর্তী নেতা হিসাবে ভাবা হতো।

স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ে যার নাম কেউ শুনেছে কিনা সন্দেহ সেই সিরাজ শিকদারও অস্ত্র কাঁধে নিয়ে নেমে পড়লো সর্বহারার রাজত্ব কায়েমের জন্য রাজাকারের ভূমিকায়।
১৯৭৫ এর ১৫ই আগষ্ট নির্মম ভাবে সপরিবারের নিহত হলেন বঙ্গবন্ধু।বঙ্গবন্ধুকে যে নির্মম ভাবে হত্যা করা হলো,জেলখানায় যে ভাবে চার জাতীয় নেতাকে হত্যা করা হলো,শেখ মনি সহ তার অন্তসত্বা স্ত্রীকে যে ভাবে হত্যা করা হলো তা নিছক হত্যা কান্ড মনে হয়নি, মনে হয়েছে কি যেন এক জিঘাংসা চরিতার্থ করার জন্য এই হত্যাকান্ড।স্বাধীনতার সপক্ষ শক্তিকে নিশেষঃ করার জন্যই কি এই হত্যাকান্ড?পাকিস্তান ফিরে পাওয়ার আশায়।

বাংলার শেষ নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা মোহম্মদী বেগের ছুরিকাঘাতে নিহত হয়ে সিঁড়িতে পড়েছিলেন,বাংলাদেশের স্হপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান বন্দুকের গুলিতে নিহত হয়ে সিঁড়িতে পড়ে রইলেন। বাংলার স্বাধীনতা বার বার ভূলন্ঠিত হয় কখনও মীরজাফর কখনও খন্দকার মোশতাকের মত বেঈমানদের হাত ধরে লর্ড ক্লাইভ ও জিয়াউর রহমানের মত সেনাপতিদের কাছে।
৭ই নভেম্বর। দৃশ্যপটে জিয়াউর রহমান।তার হাতে নিহত হলেন দুঃসাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধা খালেদ মোশারফ,হুদা,হায়দর সহ অনেক মুক্তিযোদ্ধা।কর্ণেল তাহেরকে প্রহসনমূলক বিচারের মাধ্যমে ফাঁসীতে চড়ালেন। সামরিক উর্দি পরা সামরিক প্রশাসক হয়ে গেলেন সাফারি পরা বেসামরিক দেশ শাসক। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারিদের বিচার না করে উপহার দিলেন,বিদেশে জাঁকজকমের সাথে পুনর্বাসন করা হলো বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারিদের। দেশে পুনর্বাসন করা হলো স্বাধীনতা বিরোধিদের।এমন কি ভবিষতে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারিদের বিচার রুদ্ধ করার জন্য পাশ করা হলো ইনডেমনিটি আইন। জিয়াউর রহমান একজন মুক্তিযোদ্ধা ও সেক্টর কমান্ডার। রাজাকার ও পাকিস্তানের দালালের ভূমিকায় একজন মুক্তিযোদ্ধা। বিভ্রান্ত সদ্য যৌবনে পা দেওয়া সেই কিশোরটি। এটা কি দৈবাৎ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে পাকিস্তান বিভক্তির পাপ মোচন? আচরন তো সেই দিকে আঙ্গুল তোলে!

জাপানের রেড় আর্মিরা যখন একটি বিমান হাইজ্যাক করে ঢাকা বিমান বন্দরে নামালো সেই সন্কটের সূযোগে সামরিক অভূথ্যনে নিহত হলো কয়েক ডজন মুক্তিযোদ্ধা বিমান বাহীনির ও অন্যান্য সামরিক অফিসাররা।

১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান সাহেবও নিহত হলেন।আগমন ও নির্গমন দুটোই রক্তাক্ত।জিয়াউর রহমানের হত্যাকারি সন্দেহে নিহত হলেন জেনারেল মন্জুর।একজন মুক্তিযোদ্ধা।
বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর থেকে জিয়াউর রহমানের মৃত্যু পর্যন্ত যেখানে যেভাবেই একজন সামরিক অফিসার নিহত হয়েছে সে একজন মুক্তিযোদ্ধা, কোন পাকিস্তান ফেরা সামরিক অফিসার বা রাজাকার-আলবদর নয়।

জিয়াউর রহমান এবং তার গঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল স্বাধীনতার নেতৃত্ব থেকে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামিলীগকে মুছে ফেলার জন্য জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার কসরত এখনও চালিয়ে যাচ্ছে।অথচ জিয়াউর রহমান স্বয়ং নিজের জীবদ্দশায় এ কথাটি বলার সাহস করেন নি। খালেদা জিয়া নিজের জন্মতারিখ পরিবর্তন করে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুদিনকে নিজের জন্মদিন পালন করে।একজন মানুষের নৈতিকতার কতটুকু অবক্ষয় হলে এটা সম্ভব? একজন মুক্তিযোদ্ধা ও তার স্ত্রীর পাকিস্তান প্রীতী চরম বিস্ময়কর!
বেগম খালেদা জিয়া পৃথীবির একমাত্র আদম সন্তান যিনি দুই দিন জন্মগ্রহন করেছিলেন।

২০০১ সালে জিয়াউর রহমানের সূযোগ্য পুত্র যখন এদেশের অঘোষিত যুবরাজ দৃশ্যপটে এলেন, শুরু হলো উত্তরাধিকারের খেলা। ২০০৪ সালে দশ ট্রাক অস্ত্র ধরা পড়া, ২১ এ আগষ্ট স্বাধিনতার সপক্ষ শক্তি আওয়ামি লীগকে নেতৃত্ব শুন্য করার জন্য গ্রনেড হামলা করে দেশ অস্হীতিশীল করার পাঁয়তারা, তারই প্রমান।

৭ই নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লব,সিপাহি হিসাবে জিয়াউর রহমানকে পাওয়া গেলেও জনতা লা-পাত্তা।

বেগম খালেদা জিয়া ভারত সফর করলেন ৭ই নভেম্বরের প্রাক্কালে। সারা জীবন ভারত বিরোধীতা করে জীবন ও রাজনৈতিক সায়াহ্নে ভারতের সাথে বন্ধুত্বপূর্ন সম্পর্ক গড়ে তুলে মনে হয় পাকিস্তান ফিরে পাওয়ার স্বপ্নদ্রষ্টা জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা বিরোধি কর্মকান্ড ও মনোভাবের পাপমোচন করতে চাইছেন।

যদি তাই হয়,বেগম খালেদা জিয়া,আপনি, আপনার দলের নেতা কর্মি,সমর্থক সবাই মিলে শরীরের সমস্ত শক্তি গলায় এনে,গলার সমস্ত শিরা-উপশিরা ফুলিয়ে চিৎকার করে উঠুন জয়য়য়য়য়য়য়য়য়য়য়য় বাংলা।

এটা ৭ই নভেম্বরের শ্লোগান নয়,এটা আমাদের স্বাধীনতার শ্লোগান।
সেই কিশোর এখন প্রৌঢ়।১৬ ই ডিসেম্বর এলে এখনও সে শরীরের সমস্ত শক্তি গলায় এনে, গলার শিরা-উপশিরা ফুলিয়ে একা একা শ্লোগান দেয়, স্বাধীনতার শ্লোগান। জয়য়য়য়য়য়য়য় বাংলা।