ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

আমাদের সাংসদরা বেসরকারি স্কুলে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করানোর কোটা পাবেন।খাসা একটি সিদ্ধান্ত,নির্ভেজাল ডিজিটাল সিদ্ধান্ত।যদিও শেষ মহুর্তে প্রধান মন্ত্রীর হস্তক্ষেপের কারনে এই অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়িত হতে পাবেনি তবে যে সব অর্বাচিন মুর্খরা এই সিদ্ধান্ত নিতে চেয়েছিল তাদেরকে দেশ ও জাতির শত্রু বলা অসমীচিন হবে না। সাংসদরা শুল্কমুক্ত গাড়ী আমদানি করতে পারেন,হোষ্টেলে থাকা ফ্রি,সংসদ কেন্টিনে খাওয়া-দাওয়া ফ্রি,ইচ্ছা হলে চাল-তেল-ঘি সহ যা খুশী বাসায়ও নিতে পারেন। মাসে মাসে নগদ প্রাপ্তিও আছে। ভাব দেখে মনে হয় তাদের প্রবল অনিচ্ছা সত্বেও জনগন তাদেরকে মাথার দিব্যি দিয়ে সংসদে পাঠিয়েছেন দেশ সেবা করার জন্য অতএব তারা দেশকে কি দিল সেটা বড় কথা নয়,দেশ তাদের কি পর্যন্ত দিতে পারল সেটা বড় কথা।তেনারা খুশী না থাকলে জনগন খুশী থাকবে কিভাবে।

স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পরও আমরা কোটার বৃত্ত থেকে বেরোতে পারলাম না।এক মুক্তিযোদ্ধা কোটার নামে আজ পর্যন্ত কত রকমের দুর্নীতি হয়ে যাচ্ছে তার হিসাব কে রাখে?যার বয়স ৫০ পেরোয়নি সেও মুক্তিযোদ্ধা! ১৯৭০সালে এদেশে জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি,তাদের ৯৭ শতাংশ লোক ৬ দফা আন্দোলনের প্রতি সমর্থন দিয়ে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামি লীগকে নিরন্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জিতেয়েছিল।স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এই বিশাল জনগোষ্ঠি কোন না কোন ভাবে,প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং এদের বিশাল সমর্থনের কারনেই এত দ্রুত আমাদের স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব হয়েছিল অথচ ছোট জনগোষ্ঠির সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের “মুক্তিযোদ্ধা সংসদ” নাম দিয়ে,বিশাল জনগোষ্ঠির ক্ষতিগ্রস্ত মুক্তিযোদ্ধাদের আলাদা করে দেওয়া হলো।
মুক্তিযোদ্ধারা কোন কিছু প্রপ্তির আশা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহন করেনি,তারা শুধুমাত্র একটি স্বাধীন দেশের জন্য জীবন বাজি ধরেছিল। সেই স্বাধীনতা তারা পেয়েছে এবং সেই অর্জনের পর প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা তাদের অস্ত্র জমা দিয়ে নিজেদের স্ব স্ব পেশায় ফিরে গিয়েছিল, কোন পুরস্কার বা সার্টিফিকেটের কথা তাদের মাথায় আসেনি অথচ স্বাধীনতার পর পরই শুরু হয়ে গেল মুক্তিযেদ্ধা সার্টিফিকেট বাণিজ্য,দু-একশ টাকা দিলেই একখানা “অরিজিনাল” মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট।এই সার্টিফিকেট বাণিজ্যের সূযোগ নিয়ে কত রাজাকার আল-বদর যে মুক্তিযোদ্ধা হয়ে গেছে তার কি কোন হিসাব আছে?

ভারতের শরনার্থী ও মুক্তিযোদ্ধা ক্যম্পে সদ্য যোগদানকারি ট্রেনিংবিহীন হাজার হাজার মানুষ ১৬ ডিসেম্বরে যখন শুনলো বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেছে তখন যে যেভাবে পারলো অস্ত্র সংগ্রহ করে তা কাঁধে নিয়ে সোজা বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা অভ্যর্থনা কেন্দ্রে,এদের নাম ছিল সিক্সটিনথ বাহীনি।মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে এরাই সবচেয়ে বেশী সুবিধাভোগী।প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের থাক না থাক এদের সবার একখান করে “অরিজিনাল” সার্টিফিকেট আছে।

স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুকে নির্মম ভাবে হত্যা করার পর অসাংবিধানিক ভাবে ক্ষমতার পালা-বদল ঘটার সুযোগে এবং শাসক শ্রেনীর স্বাধীনতা বিরোধীদের সাথে সখ্যতার কারনে মুক্তিযোদ্ধা কোটার ফাঁক গলে হাজার হাজার অমুক্তিযোদ্ধা,স্বাধীনতা বিরোধী মেধাহীন,অযোগ্য ব্যক্তিরা সরকারি প্রশাসন সহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে ঢুকে পড়ে যার কারনে আজ সারা বাংলাদেশে যে যার জায়গায় দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে,সরকারি সমস্ত প্রতিষ্ঠানে তৈরী হয়েছে অদক্ষ মাথা ভারী প্রশাসন।

চেনা মুখ ছাড়া অচেনা মুখের মুক্তিযোদ্ধাদের এখন আর শনাক্ত করা সম্ভব নয়। চেনা মুক্তিযোদ্ধাদেরও শনাক্ত করাও এখন অনেক কঠিন কারন সোনার হরিণ বগলের তলায় নিয়ে তারা সমাজের এমন এক স্তরে উঠে গেছে যেখানে রাজকার মুক্তিযোদ্ধা? “ডিসগাসটিং”!

মুক্তিযোদ্ধা কোটা ছাড়াও গত চল্লিশ বছর হরেক রকম কোটার দেখা মিলেছে।সরকারি প্রতিষ্ঠান গুলিতে তৃতীয় শ্রেনীর কর্মচারিদের নিয়ে গঠিত শ্রমিক সংগঠন সি বি এর দাপটে বড় বড় কর্মকর্তারাও তটস্হ থাকে।ড্রাইভার,পিয়ন পর্যন্ত যখন তখন কোন অনুমতি ছাড়া তার বড়কর্তার কক্ষে ঢুকে তাদের চাহিদা মত কাজ করিয়ে নেয়।এদের কিছু বলা যাবে না কারন তাদের একটি রাজনৈতিক সাইনবোর্ড আছে আর সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতা এদের কথার মূল্য দিতে সদা প্রস্তুত।এই সি বি এ দের কোটা পুরন না করলে বড়কর্তারাই বোঁটা থেকে ঝরে যায়।

সারা বাংলাদেশে তিন শত সাংসদের সংশ্লিষ্ট এলাকা তাদের কোটার অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশ তিনশত কোটা এলাকায় বিভক্ত।নামি-দামি স্কুল-কলেজ,প্রতিষ্ঠান,কল-কারখানা সব জায়গাতেই তাদের কোটা।রাজা যায় রাজা আসে, কোটা সদা বিদ্যমান।

আজকে সরকারি প্রশাসনে,সরকার নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান সর্বত্র এই কোটারিদের রাজত্বের কারনেই এত স্থবিরতা এবং দুর্নীতির জোয়ার,যার দায় বহন করতে হচ্ছে এদেশের সাধারন জনগনকে।
১৯৯১-২০১২ বাংলাদেশে গনতন্ত্রের স্বর্নযুগ,এই স্বর্নযুগের ২২টি বছরে চারটি গনতান্ত্রিক সরকার, বিদ্যুৎ, গ্যাস আর পানির চুরিই বন্ধ করতে পারেনি অন্য সব দুর্নীতি সামলাবে কিভাবে। এই তিন খাতের কর্মকর্তা-কর্মচারিরা তো বটেই পিয়ন, মিটার-রিড়াররা পর্যন্ত ঢাকা সহ বড় বড় শহরে ২/৪ খানা বাড়ীর গর্বিত মালিক। সবই কোটার ফসল।গত ২২ বছরে শুধু এই তিনটি খাতে যে পরিমান ডাকাতি হয়েছে তা দিয়ে সারা বাংলাদেশকে চার লেনের রাস্তা দিয়ে ঢেকে দেওয়া যেতো,পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-বুড়িগঙ্গা-কর্ণফুলির উপর দিয়ে কয়েকখান করে সেতু তৈরি হতো,ঢাকা শহরকে ফ্লাইওভার দিয়ে মুড়ে দেওয়া যেতো অথচ আমাদর রাজনীতিবিদদের দেশের উন্নয়নের চেয়ে এসব কোটারিদের উন্নয়নে অত্যাধিক আগ্রহ।কোটার মহাত্ম!

এদেশে রাজনৈতিক নেতাদের মদদ ছাড়া কোন প্রকার দুর্নীতি আদৌ কি সম্ভব? দশ মাথাওয়ালা রাবণের পক্ষেও সম্ভব নয়।

আমরা এখন আর পদ্মা সেতু চাই না,ফেরীতে করে পদ্মা পারাপার আমাদের কাছে ডাল-ভাত।বিদ্যুৎ আমাদের দরকার নেই,অন্ধকারে বসবাস করা আমাদের জন্য পান্তা ভাত।চার লেনের রাস্তা আমাদের নিষ্প্রয়োজন ঝাঁকি খেতে খেতে চার ঘন্টার রাস্তা দশ ঘন্টায় পার হওয়া পাবলিকের কাছে চুড়ুই ভাত।ঢাকা শহরের রাস্তার জ্যামতো আমাদের কাছে দুধ ভাত।

আপনাদের আল্লাহর দোহাই,আপনাদের বাল-বাচ্চার দোহাই শুধু আপনাদের দুর্নীতিটা বন্ধ করুন,আমাদের জন্য কিছু করার দরকার নেই শুধু দরকার দুর্নীতিমুক্ত একটি গনতান্ত্রিক বাংলাদেশ।
সব কিছু সয়ে গেছে আমাদের শুধু রাজনীতিবিদদের দুর্নীতিটা সইতে পারছিনা আমরা হা-ভাতরা।