ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

২০১২ সালে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের পরিমাণ ১৪০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে যা সর্বকালের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে।বাংলা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সিংহভাগ এবং অর্থনিতির গতিশীলতা এই রেমিটেন্সের উপর নির্ভরশীল।বাংলাদেশ উদ্বৃত্ত জনসংখ্যার দেশ। এই উদ্বৃত্ত জনশক্তি যদি বিদেশে রপ্তানি করা না যেত তাহলে তাদের কর্মসংস্থান করা বাংলাদেশের পক্ষে কোন ভাবেই সম্ভব হতো না।কারন রপ্তানিকৃত এই জনশক্তির ৯০ভাগ অদক্ষ এবং অক্ষরজ্ঞানহীন অথবা সল্প শিক্ষিত।যে দেশে উচ্চ শিক্ষিত লোকের কর্মসংস্থান নেই সে দেশে সল্প শিক্ষিত লোকদের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। পরিসংখ্যানের হিসাবে প্রবাসীদের সংখ্যা ৮৫ লাখ।এটা একটা বৈধ ও মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক হিসাব অর্থাৎ যারা ব্যুরো অব ম্যানপাওয়ার থেকে বহির্গমন ছাড়পত্র নিয়ে গেছেন তাদের হিসাব।এর বাইরে নিজস্ব উদ্যগে বিশাল যে জনশক্তি বহির্গমন ছাড়াই ইউরোপ,আমেরিকা ও আফ্রিকা গিয়েছেন তাদের কোন হিসাব সরকারের কাছে নেই। এই বিশাল জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলির কৃতিত্ব শতকরা ৯৯.৯৯ ভাগ, বাকিটুকু সরকারের! ১৯৭৩ সালে মধ্যপ্রাচ্য তেলের দাম বাড়িয়ে দিলে রাতারাতি মধ্যপ্রাচ্যে অর্থনৈতিক অবস্থা এবং সঙ্গত কারনেই তাদের সামাজিক দৃষ্টি ভঙ্গিতেও পরিবর্তন ঘটে। সৌদি আরবের এই পরিবর্তন,পরবর্তিতে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের নিয়ামক হয়ে উঠে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর সৌদি আরব বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলে ১৯৭৬-৭৭ সাল থেকে সৌদি আরবে জনশক্তি প্রেরনের মাধ্যমে জনশক্তি রপ্তানি শুরু হয়।তখন থেকেই তৎকালিন সরকার স্বীকৃত ভাবে জনশক্তি প্রেরনের জন্য রিক্রুটিং লাইসেন্স দেওয়া শুরু করে।জনশক্তি রপ্তানি বেসরকারিকরন ছিল তৎকালিন সরকারের একটি দুরদর্শী সিদ্ধান্ত।

মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ যখন বিভিন্ন দেশ থেকে,যেমন ভারত,পাকিস্তান,ফিলিপাইন প্রভৃতি দেশ থেকে অদক্ষ কর্মি আমদানি শুরু করে তখন এই রিক্রুটিং এজেন্সীর মালিক ও মধ্যসত্বভোগীরা বিভিন্ন ভাবে লবিং ও দেন-দরবার করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন কেম্পানির মালিককে ঐসব দেশ থেকে শ্রমিক না এনে বাংলাদেশ থেকে সিংহভাগ কর্মি নিতে রাজী করায় যার ফসল এই ১৪০০ কোটি ডলারের রিজার্ভ যা একক ভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতির শিরা-উপশিরায় রক্ত সঞ্চালন চালিয়ে যাচ্ছে। এই ১৪০০ কোটি ডলারের রিজার্ভে বাংলাদেশ সরকারের অবদান এক সেন্ট পরিমানেরও নয়। বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সী ও অন্যান্য দেশী-বিদেশী মধ্যসত্বভোগীদের প্রচেষ্টার না থাকলে সরকারের পক্ষে কোনদিন এত অধিক সংখ্যক অদক্ষ জনশক্তি বিদেশ প্রেরন সম্ভব হতো না।

কারন স্বাধীনতার পর থেকে অদ্যাবধি সরকার কল-কারখানা থেকে শুরু করে যত রকমের ব্যবসা নিজের হাতে নিয়েছে তা শেষ পর্যন্ত লুটপাটের স্বর্গরাজ্যে পরিনত হয়েছে।

বিশাল এই জনশক্তি রপ্তানিকে কেন্দ্র করে আশির দশকের মধ্যভাগ থেকে বাংলাদেশে আরেকটি বিশাল অপ্রচলিত পণ্য রপ্তানি বাজার গড়ে উঠে এই মধ্যসত্বভোগিদের হাত ধরে।গামছা,লুঙ্গি, গেন্জি,চিরা-মুরি,শাক-সবজী হেন কোন জিনিস নাই যা মধ্যপ্রাচ্য সহ বাঙালি অধ্যুষিত দেশ গুলিতে রপ্তানি হচ্ছে না!প্রতিদিন এই রপ্তানি তালিকায় যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন জিনিস।

অথচ এই রিক্রুটিং এজেন্সি গুলো বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রায় নিস্ক্রিয় ও স্থবির হয়ে পড়ে আছে বর্তমান প্রবাসী মন্ত্রীর অদুরদর্শী নীতির কারনে। যদিও এই মন্ত্রী দাবী করেন বর্তমান সরকারের আমলে গত চার বছরে ২০ লক্ষ শ্রমিক বিদেশে গিয়েছে।এই ২০ লক্ষ শ্রমিক বিদেশে যাওয়ার পিছনে মন্ত্রী সাহেবের বিন্দুমাত্র কৃতিত্ব দাবি করার সূযোগ আছে কি? এর পুরো কৃতিত্ব দাবি করতে পারে রিক্রুটিং এজেন্সী ও মধ্যপ্রাচ্য সহ অন্যান্য দেশে দীর্ঘদিন কর্মরত শ্রমিকরা যারা বিভিন্ন ভাবে দেন দরবার করে ২/৪ টা করে ভিসা যোগাড় করে দেশ থেকে কোন স্বজন বা পরিচিত জনকে নিয়ে যায়,যার যোগফল ২০ লক্ষ,যেখানে মন্ত্রি সাহেবের চার বছরের কৃতিত্বের যোগফল শুন্য।গত বিশ বছরে অত্যন্ত তিন লক্ষ কর্মি দক্ষিন আফ্রিকা চলে গিয়েছে সম্পূর্ন অবৈধ উপায়ে এবং সেখানে যাওয়ার পর তারা বৈধ ভাবেই অবস্থান করার অনুমতি পেয়ে গেছে অথচ আমাদের সরকার একবারও কি এই শ্রম বাজারটি ধরার চেষ্টা করেছে? বিস্ময়করভাবে সরকার বা মন্ত্রি সে চেষ্টার ধারে কাছেও যাননি!মন্ত্রি সাহেব অভিযোগ রিক্রুটিং এজেন্সীরা কর্মির কাছ থেকে টাকা বেশী নেয় কিন্ত যে প্রক্রিয়ায় এদেশে ভিসা আসে তাতে বেশী টাকা ছাড়া বিদেশ যাওয়ার উপায় আছে কি ? যদি এর চেয়ে দ্বিগুন টাকা দেওয়া হয় দেশে কি এদের কর্মসংস্থান করা যাবে?বাংলাদেশে কয়টা চাকরি হয় আরও অধিক অধিক টাকা ছাড়া!

মন্ত্রি সাহেব জনশক্তি রপ্তানিকারকদের দালাল,প্রতারক,জালিয়াত বলে প্রায়শই উল্লেখ করেন।কিন্ত এই দালাল-প্রতারকদের মাধ্যমেই বিদেশে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশীদের জন্য বিশাল এক শ্রম বাজার গড়ে উঠে যা সাপে-বর হয়ে বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনীতি তথা সর্বক্ষেত্রের চালিকা শক্তি হয়ে উঠেছে।

এটা ঠিক, প্রতারনা,জালিয়াতি এরা কম করেনি কিন্ত এদের বেশীর ভাগ লোকই ভিসা পাওয়ার জন্য টাকা দিয়ে দেন-দরবার করতে গিয়ে টাকা ও ভিসা দুইই হারিয়ে পথে বসেছে। এ ছাড়া এমনও আছে বিদেশী মালিক টাকা নিয়ে চাহিদাপত্র দিয়েও পরে তা বাতিল করে দিয়েছে কোন কোন ক্ষেত্রে এসব চাহিদা পত্র সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস কতৃক সত্যায়িত করা থাকলেও সমস্যা সমাধানে দূতাবাস কোন ভূমিকা রাখতো না।
তারপরও বলতে হবে প্রচুর প্রতারনা হয়েছে তবে কতটা প্রচুর। যুবক,ডেসটিনি,হলমার্ক,সোনালি ব্যাংক এর তুলনায় তা কতটুকু?

মন্ত্রি সাহেবের কথা অনুযায়ী রিক্রুটিং এজেন্সী টাকা বেশী নেয় তাই সরকারি ভাবে বিদেশে কর্মি পাঠানো হবে।মালয়শিয়ায় ৩৪ হাজার কর্মি পাঠানো হবে,প্রথম কিস্তিতে ১১ হাজার,বাকীগুলো পরে। খরচ মাত্র ৪০ হাজার টাকা।বর্তমানে ১১০০০ কর্মি পাঠানোর ক্রিয়া কর্ম চলছে সারা বাংলাদেশে। গমনেচ্ছু লক্ষ লক্ষ কর্মিদের নাম নিবন্ধন করা হচ্ছে, তাদের আবার লটারির মাধ্যমে ভাগ্য নির্ধারিত হবে।মাত্র ১১ হাজার কর্মি মালয়শিয়া পাঠানোর জন্য মন্ত্রি সাহেব যত জোরে ঢাক-ঢোল পেটাচ্ছেন আওয়াজটা কেমন জানি কানে বাজে। ১১ হাজার কর্মি প্রেরনের জন্য এত জোরে ঢাক-ঢোল পেটানোর তো কথা নয়!!

বর্তমান পৃথিবী মুক্ত বাজার অর্থনীতির পৃথিবী।যেখানে ভালবাসার জন্যও পুঁজি বিনিয়োগ করতে হয়,যেখানে মাতৃজঠরে সন্তানের আগমন থেকে শুরু করে কবরে যাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি মানুষ নিজের অজান্তেই পণ্যে পরিণত হয়ে যাচ্ছে সেই পৃথিবীতে আমাদের জনশক্তি রপ্তানিকারক কতৃপক্ষ পুরোপুরি অচল। বাস্তব থেকে অনেক দুরে আছেন তারা এই কর্পোবেটিয় পৃথিবীতে।

পাদটীকাঃ আওয়ামি লীগ একটি আবেগধর্মী দল। বাস্তবধর্মী নয়।