ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

ভোর ৪টা ৫০ মিনিট। ঘড়ির অ্যালার্মের কর্কশ শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল। দ্রুত তৈরি হতে হবে আমাকে একা। ৫টা ৪৫ মিনিটে  গাড়ি ছেড়ে যাবে। মিস হলে যাওয়ার কোনো ধরনের উপায় নেই।

হ্যালোউইন নাইট হওয়ায় থামেল এখনো জাগ্রত। অলিগলি থেকে বের হয়ে লোকজন ঢলতে ঢলতে মাত্রই ঘুমোতে যাচ্ছে। অচেনা শহর হলেও নিরাপদ মনে হয়েছে। গন্তব্যের গলিতে ঢুকব এমন সময় গার্ড থামিয়ে দিয়ে বললেন, “আপ কাহা যারেহে হো?”

ও আচ্ছা! এখনো তো বলা হয়নি কোথায় যাচ্ছি!

১২ ঘন্টা আগে ফিরছিলাম অন্নপূর্ণা বেইজক্যাম্প মিশন কমপ্লিট করে পোখারা থেকে কাঠমান্ডুতে। নির্দিষ্ট সময়ের একদিন আগে ট্রেকিং শেষ হয়ে যাওয়ায় হাতে আছে পুরো ২৪ ঘন্টা। কী করা যায় এমন আলাপে তিন ভবঘুরের হরেক প্ল্যানের মাঝে হঠাৎ মাথায় চাপল লাফ দেয়ার ভূত। অবশ্য এ প্ল্যানে আর কেউ রাজি নয়।

ট্যুর গ্রুপ বিডির (টিজিবি) কর্ণধার ইমরান ভাই শেষ মুহূর্তে ইমেইলে রেজিস্ট্রেশন করে কনফার্ম করে দিয়েছিলেন। বাঞ্জি আর সুইং দিতে দ্যা লাস্ট রিসোর্টের থামেল অফিসে গিয়ে যখন রিপোর্টিং করি সময় তখন ভোর ৫টা ৪১ মিনিট। দেখি আমিই প্রথম। একে একে প্রায় ২৫ জনের মত ছেলে-মেয়ে আসল। সবাইকে নিয়ে বাস ছাড়ল ভোর ৬টার দিকে। পথিমধ্যেও আরো কয়েকজন উঠল।

জানালার পাশ দিয়ে ঘুমন্ত নেপালের জেগে উঠা দেখছিলাম। সূর্য মামা উঁকি দিল। হঠাৎ ভাবনায় এলো- আবেগ নিয়ে তো বলে দিয়েছিলাম লাফ দিব, আর সে উদ্দেশ্যে বেরিয়েও পড়েছি কিন্তু এ বিষয়ে কোনো ভিডিও দেখা কিংবা পড়া এখনো হয়নি।

‘যা হবার হোক’ ভেবে ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করি কিন্তু ভাবনা আর ছাড়েনা। এদিকে গাড়ি যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। টিম লিডার সন্তোস দাঁড়িয়ে ঘোষণা করল- “তিন ঘন্টা বাকি হ্যাঁয়, আপলোগ ব্রেকফাস্ট কার লিজিয়ে, টোয়েনটি ফাইভ মিনিট তোমহারা টাইম হ্যাঁয়।”

ঝুলন্ত আকৃতির রেস্টুরেন্টের সামনে বাস থামল। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে খরস্রোতা পাথুরে নদী। আরেক পাশে উঁচু পাহাড়। একজন ইশারা দিয়ে বলল, নাস্তা নিজেকে গিয়ে আনতে হবে।

পরে নাস্তার টেবিলে আলাপকালে জানতে পারলাম মেয়েটি বাংলাদেশের রংপুর মেডিকেল কলেজে পড়ে। বাড়ি নেপাল। অংশগ্রহণকারীর তালিকায় বাংলাদেশ দেখে আগ বাড়িয়ে তাই কথা বলা।

এভাবে আরো কিছু বন্ধু জুটে গেল। গানের সাথে সাথে গাড়ি ছুটে চলল। ১০টা ১০ মিনিটে একদম তিব্বত-নেপাল বর্ডারে দ্যা লাস্ট রিসোর্ট সম্মুখে গাড়ি থামল।

রাস্তার ওপারে রিসোর্ট। মধ্যখানে ঝুলন্ত ব্রিজ। এ ব্রিজেই অ্যাক্টিভিটি চলছে। মাত্রই একজন সামনের দিকে ঝাঁপ দিল। পরে জানতে পারলাম এটি ক্যানিয়ন সুইং। নরমালি হাঁটতেই এ ব্রিজে ভয় করছে।

বিভিন্ন নির্দেশকের মাধ্যমে দেখতে পেলাম পুরো রিসোর্টের কোন দিকে কী তা দেওয়া আছে। প্রথমকাজ হিসেবে হাতের ডান পাশে রেজিস্ট্রেশন বুথে গেলাম। বাংলাদেশ সার্কভূক্ত দেশ হওয়ায় চড়া দামে রেজিস্ট্রেশন করতে হল।

বাঞ্জি আর ক্যানিয়ন সুইং এর জন্য ১১২০০ রুপি আর এ দুটির ভিডিও আর টিশার্টের জন্য ৩৮০০ রুপি অর্থাৎ মোট ১৫০০০ নেপালি রুপি গুণতে হলো। ১০০ রুপি ফেরতযোগ্য ভাবে লকার নিতে হয়।

ইংরেজি আর হিন্দি ভাষায় ব্রিফিং শুরুর  আগে ওয়েলকাম জুস দেওয়া হলো। ওজন মেপে সবার হাতে সংখ্যাটা বসিয়ে তিনটি ভাগ করা হলো। ৪০-৬০, ৬০-৮০ এবং ৮০-১০০। আমার অবস্থান দ্বিতীয় দলে।

প্রথম গ্রুপকে ডাকা হলো। আমি দ্বিতীয় গ্রুপ হলেও ক্যানিয়ন সুইং দেওয়ার জন্য সবার আগে ডাক পেলাম।  ভাবলাম কয়েকটা দেখলে সাহস হবে তারপর লাভ দেব, কিন্তু সে সুযোগ আমাকে দেওয়া হলো না।

সেফটি হার্নেস বেঁধে আমাকে প্রস্তুত করা হলো। ইতোমধ্যে প্রথম গ্রুপের একজন বাঞ্জি দিতে প্রস্তুত হওয়ায় তাকে সামনে নিয়ে গেল। সব প্রস্তুত। তিন-দুই-এক  জাম্প! কিন্তু না সে  মূর্তির মত দাঁড়িয়ে আছে। আরো পাঁচ সেকেন্ড ভেবে দেখে যে জাম্প দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই তখন সাহস করে দিয়ে দিল।

সহজ ভেবে আমিও সামনে গেলাম। ভিডিও বার্তায় দেশবাসীসহ ফ্রেন্ডদের সাথে আনন্দের মুহূর্ত শেয়ার করলাম। ফাইনাল স্পটে গিয়ে দেখি দম তো সাথে নেই। পাশে ক্যামেরা অন আছে তাই ঠিক করে নিলাম, ভিতরে যাই ঘটুক লাফ দিতে হবে হাসি মুখে। তিন-দুই-এক … দম নিয়ে লাফ দিয়েই দিলাম।

কী হচ্ছে কয়েক সেকেন্ড বুঝতে পারছিলাম না। শুধু এটুকুই মনে আসছিল নিজেকে এভাবে শেষ করে দিলাম! তারপরই বুঝতে পারলাম ঠিক আছি। ক্যামেরা তাক করা আছে দেখে ভাবে ফিরলাম দ্রুত। দোল খেতে খেতে হাতের গ্রোপ্রো ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নানা কথা বলতে থাকলাম।

এক সময় শিষের দিয়ে ইশারায় একটি রশি পাঠানো হলো। এটি টেনে নিরাপদ স্থানে গিয়ে বাঁধন থেকে নিজেকে মুক্ত করলাম। এবার এখান  থেকে উপরের ব্রিজে উঠতে ৪০ মিনিটের মত লাগবে। আবার ট্রেক শুরু।

গ্রুপ-২ এর সাথে বাঞ্জি দিতে লাইন দিলাম। এবার সবার শেষে। নিজেকে প্রস্তুত করলাম। একটি দিয়ে ফেলায় বাঞ্জি দিতে মনে এখন অনেক সাহস। এখন চিন্তা কতটা সুন্দরভাবে দেওয়া যায়।

সময় এসে গেল। এবার সাহস ধরে রাখলেও লাফ দেওয়ার মুহূর্তটা ব্যাপক কষ্টের। তাও একটু স্টাইল করে লাফটা দিয়েই দিলাম। সুপারম্যানের মত লাভ দিতে পারায় সন্তুষ্টি ছিল মনে। মাথা নীচু করে উপরে পা দিয়ে ঝুলছি। ইশারায় বেল্ট খুলে দিলাম। মাথা উপরে উঠে গেল। ১৬০ মিটার নীচ থেকে মেশিনের সাহায্যে এবার ব্রিজে উঠিয়ে নিল। উপরে উঠতেই  ‘নাইস জাম্প’ বলে কুশল বিনিময় করলো স্টাফরা।

দুপুরে বুফ্যে লাঞ্চ শেষে আড্ডায় মশগুল। ইতোমধ্যে ভিডিওগুলো ব্রিফিং রুমে চলে এসেছে। ভয়ে একেকজনের মুখের কি বিচিত্র চেহারা হয়েছিল তা দেখা গেল।

ভিডিও সাথে সাথে নেওয়া যায় না বলে ইমেইল এড্রেস দিয়ে দিলাম। তিন দিন পর মেইলে পাঠিয়ে দিবে বলে আশ্বাস দিল। বাঞ্জি নেপাল থেকে দুটো জাম্পের জন্য দুটি গেঞ্জিও উপহার দিল।

বেলা বয়ে বিকেল। ৪টা ৪৫ মিনিটে রওয়ানা হলাম কাঠমান্ডুর উদ্দেশ্যে। গাড়িতে উঠেই  সবাই  হাতে পেয়ে গেলাম সাহসিকতার সনদ।