ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

আজ সেই ২৯ শে এপ্রিল এর ভয়াল রাত। মনে পড়ে সেই রাতের কথা। আমি তখন এসএসসি পরীক্ষার্থী। পড়াশোনায় ব্যস্ত ছিলাম সারাদিন। বিকাল বেলা একটু ছাদে গেছি দেখলাম পশ্চিম আকাশ টুকটুকে লাল। কিছুক্ষন তার সৌন্দর্য দেখলাম তখনও জানিনা কি বিভীষিকা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। নীচে নেমে টিভির সামনে বসতেই দেখলাম ৫ নম্বর বিপদ সংকেত। কিন্তু তেমন আতঙ্কিত বোধ করলাম না। শুধু চিন্তা হতে লাগলো বড় ভাইয়ের জন্য কারন সে সকালেই আনোয়ারা গেছিলো। মোবাইলের যুগ ছিলোনা তাই অপেক্ষা করা ছাড়া গতি নেই। সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত হতে থাকলো সাথে বাড়তে থাকলো বিপদ সংকেত এর মাত্রা। ভাইয়ের জন্য বেশী বেশী চিন্তা হতে লাগলো সবার। অবশেষে ভাই এলো রাত ১০ টার দিকে। তখন বাইরে শো শো বাতাস। কিন্তু তেমন চিন্তিত মনে হলো না কাউকে। রাতের খাওয়া সেরে সবাই শুয়ে পড়েছে। শুধু আমি জেগে আছি এসএসসির পড়া নিয়ে। যাইহোক বাতাস ধীরে ধীরে বাড়ছে কিন্তু আমার মনে হতে লাগলো ঘূর্ণিটা হয়তো শেষ মুহূর্তে ঘুরে বার্মা বা ভারতের দিকে চলে যাবে যেটা প্রায় হয়। রাত বারোটার দিকে শুয়ে পড়লাম এবং তৎক্ষণাৎ ঘুম। হঠাত মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলো একটা আর্তচিৎকারে। সঙ্গে সঙ্গে মশারী তুলে খাট থেকে নামতেই পা চলে গেলো এক হাঁটু পানির নীচে। বিদ্যুৎ নেই। থাকলে ডাইনিং রুমের বাতিটা জ্বলত। চারিদিক অন্ধকার খুব ঘাবড়ে গিয়ে পানি ঠেলে চিৎকারের উৎস বড় বোনের রুমের দিকে ছুটে উপলদ্ধি করি সে বিছানায় বসে কান্না করছে। ততক্ষনে মা, বাবা আর বড় ভাই ঊঠে হতম্ভব হয়ে গেছে। আমি কোনোমতে রান্নাঘরে গিয়ে দিয়াশলাই খুজে নিয়ে একটা মোমবাতি ধরাই। সারাঘর পানিতে ডুবে গেছে। একটা জানালা খুলে দেখি বাড়ীর পাশের মাঠের নারকেল গাছগুলো ১০ হাত অন্তর দুলছে। জানালা খোলাই যাচ্ছিল না এমন বাতাস। বাতাসের গতি ছিলো ঘন্টায় ৩০০ কিমি এর উপরে যা পরে জেনেছিলাম। বাবা গিয়ে দরজা খুলে পাশের বাসায় নক করে ওদের ঘুম ভাঙ্গালো। আমরা যতটুক সম্ভব সব কাপড় চোপর এবং অন্যান্য জিনিষ উপরের দিকে উঠিয়ে রেখে দোতলায় বাড়ীওয়ালার বাসায় যাই। ওরাও ঘুমুচ্ছিলো। উঠে এসব দেখে পুরো হতম্ভব। ধীরে ধীরে সকালের আলো ফুটলো ততক্ষনে বাতাসের গতিবেগ মোটামুটি কমে গেছে। সবাই মিলে ছাদে গেলাম। আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলো বিস্ময়। ছাদে ঊঠেই চারিদিকে দেখলাম বিধ্বস্ত অবস্থা। পেছনের টিনের চালের ঘর গুলো কোনোটারই চাল নেই। সব উড়ে গেছে। যতদুর চোখ যায় উপড়ানো গাছপালা আর বিধ্বস্ত ঘরবাড়ী।

আমাদের বাসাটা ছিলো তখন পশ্চিম বাকলিয়ার মৌসুমী বিল্ডিং এর পেছনে। সকালে বাড়ীওয়ালার বাসায় নাস্তা সেরে প্রতিবেশী আমার কলেজিয়েট স্কুলের বন্ধু শান্তুকে নিয়ে বের হলাম শহর দেখতে। প্রথমেই গেলাম আমার মাসীর বাসায় সাত্তার কলোনীতে। গিয়ে দেখি তারা পাশের বিল্ডিং এ অবস্থান করছে, তাদের বাড়ীর টিন উড়িয়ে নিয়ে গেছে। ঘরদুয়ার তছনছ। যতটুক পারলাম গুছিয়ে দিয়ে আবার বের হলাম দুজন।

যুদ্ধের পর একটা শহর যেমন ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়, ২৯ শে এপ্রিল ঘূর্ণিঝড়ের পর চট্টগ্রাম শহর ঠিক তাই ছিল। পথের পাশে পড়েছিল ইতস্তত বিক্ষিপ্ত লাশ, রাস্তা জুড়ে ছিল উপড়ে পড়া গাছ, বিদ্যুতের খুঁটি, ঘর-বাড়িগুলো দুমড়ানো-মুচরানো, আর লাশের পঁচা গন্ধ থেকে থেকে বাতাসটাকে ভারী করে তুলছিল। মানুষ যতনা ঝরে মারা গিয়েছিলো তার চেয়ে বেশী মারা গিয়েছিলো জলোচ্ছ্বাসে। পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত থেকে প্রায় ৪/৫ মাইলের মধ্যে কোনো মানুষ জীবিত ছিলোনা ২৫/২৬ ফুট জলোচ্ছ্বাসে। মানুষ ৩ তলায় অবস্থান করেও পানির হাত থেকে রক্ষা পায়নি। এর আগে একবার ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখানো হয়েছিলো কিন্তু সেটা ছিলো ফলস তাই এই সময়ে অনেকে ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত মানেনি এবং সাইক্লোন সেনটারেও যায়নি। প্রায় এক লক্ষ চল্লিশ হাজার লোক মারা গিয়েছিলো এই দিনে।

সদরঘাট পর্যন্ত ঘুরে আমরা বাসায় ফিরে এলাম। সন্ধ্যা নামতেই চট্টগ্রাম শহর পরিনত হয়েছিলো ভুতুরে নগরীতে। বিদ্যুৎ ছিলোনা প্রায় একমাস। পরদিন আমাদের পাড়ায় ইডেন ক্লাবের উদ্যেগে শুরু করলাম বাড়ীতে বাড়িতে রিলিফ সংগ্রহ। এসএসসি পরীক্ষা পিছিয়ে কোথায় গেছে তখন আর খবরই নিলাম না। টানা দুইদিন রিলিফ সংগ্রহের পর আমরা দুটো ট্রলার ভাড়া করে রওয়ানা দিলাম বাঁশখালির দিকে। কিছুদুর গিয়ে আনোয়ারা এলাকায় দেখলাম নদীর পাড়ে এদিক ওদিক লাশ পরে আছে। দুই পাশে লাশ রেখে আমরা এগুতে লাগলাম ক্ষুদারথ মানুষের দিকে। লাশের গন্ধে বাতাস ভারী। আমাদের জন্য খাবার ছিলো সেদ্ধ ডিম আর পাউরুটি। সেদ্ধ ডিমের গন্ধটা লাশের গন্ধের মতো মনে হতে লাগলো। খেতে পারলাম না। একসময় আমরা পৌছে গেলাম বাশখালীর বাহারছড়ায়। ভীড় করে ক্ষুদারথ মানুষ নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের দেখেই চিৎকার শুরু করলো। আমরা নদীর পাড়ে ট্রলার ভীড়ালাম। চিড়া আর গুড় বিতরনের জন্য সবাইকে লাইনে দাঁড়াতে বললাম। কিন্তু বিতরন শুরু হওয়ার সাথে সাথে ভীড় হুমড়ি খেয়ে পড়লো আমাদের উপর। আমরা সবাই তখনও সবাই নামিনি। পরিস্তিতি দেখে যারা নেমেছিলো সবাই চিড়া আর গুড়ের বস্তা ফেলে দৌড়ে ট্রলার উঠলো। ট্রলার ছাড়ার পর দেখা গেলো মিল্টন নামে আমাদের এক বন্ধু তখনও উঠতে পারেনি। সে নদীতে ঝাপ দিলো। সাতার কেটে অবশেষে ট্রলারে উঠলো। হাসবো না কাঁদবো বুঝতে পারছিলাম না। যাইহোক ওখানে আর পুরান কাপড় বিতরন করা হলো না। দুর্গত এলাকায় এরকমই হয়। ওরা জানে রিলিফ সব ওদের দেওয়া হবে না। তাই ক্ষিদারথ মানুষগুলো খাবারসহ সব ছিন্তাই করতে চেয়েছিলো। আমাদের সাথে কিছু অভিজ্ঞ মুরুব্বীও ছিলেন। তারাই ট্রলার ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

এরপর আমরা পৌছলাম প্রেমাশিয়া নামক অখ্যাত গ্রামে। অবাক হলাম নীরিহ মানুষগুলোকে দেখে। আমরাই নাকি প্রথম এলাম রিলিফ দিতে। লাইন করে দাড়ালো সবাই। একে একে সবাইকে চিড়া, গুড় আর পানির ক্যান দিলাম। এক মুরুব্বী গ্রামের অভ্যন্তরে গিয়ে উদ্ধার করলেন যে, অনেক বেঁচে যাওয়া নারী ঘূর্ণিঝড়ের পর ভেঙ্গে যাওয়া ঘর থেকেই বের হন নাই শুধু গায়ে কাপড় নেই বলে। উনি এসেই কাপড়ের বস্তা বের করতে বললেন এবং কিছু মহিলাকে ডেকে কাপড় দিয়ে বললেন তাদেরকে দিয়ে আসতে। ওরা কাপড় পরে ক্ষুদার মুখেও হাসির ঝিলিক দিয়ে রিলিফ নিতে এলো। নিজেদের রিলিফ বিতরন ধন্য মনে হলো। যাই হোক কাউকে পাওয়া গেলো না যার ঘর ভাঙ্গেনি, যার পরিবারের কেউ এই জলোচ্ছ্বাস এ মারা যায়নি। তারা এমনভাবে মরে যাওয়ার কথা বলছিলো যে এটা তেমন কোনো ব্যাপার না। এক পিতা বলছিলো তার চার ছেলেই মারা গেছে স্ত্রীসহ। কিন্তু সে নারিকেল গাছ ধরে প্রানে বেঁচে যায়। এমন অনেক ঘটনা।

রিলিফ সেই গ্রামেই সব শেষ করে অবশেষে বাড়ী ফেরার পালা। পথে প্রচন্ড ঝড় উঠলো। ট্রলার তীরে ভীড় করলো ঝড়ের কারনে। একটানা দু ঘন্টা ওখানে আটকে ছিলাম আমরা। সবাই আল্লাহকে ডাকতে লাগলো। আমি চোখ বন্ধ করেছিলাম। অবশ্য তেমন ভয় লাগছিলো না। বেশীর বেশী আর কি হবে। হয়তো মরে যাবো। যেখানে এক লক্ষ চল্লিশ হাজার লোক মারা গেছে, পথে পথে লাশ পরে আছে সেখানে মৃত্যুকে অপরিচিত মনে হলো না। অবশেষে ঝড় থামল। আমরা নিরাপদে বাড়ী ফিরে এলাম। পেছনে রেখে এলাম ঘরবাড়ী, সহায় সম্বলহীন এক জনপদ। সামান্য রিলিফ দেওয়ার বেশী আর কিই বা করতে পারি আমরা। যেখানে প্রবল জোয়ারের রাতে ভেসে গেছে হাজার হাজার গৃহ পালিত পশু। পানির নীচে তলিয়ে গেছে হাজারো ঘরবাড়ি। বিধ্বস্থ হয়েছে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন রাস্তঘাট।

সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিলো চট্টগ্রাম জেলার বিচ্ছিন্ন দুটি দ্বীপ মহেশখালী ও কুতুবদিয়া উপজেলা। এই দু’উপজেলায় ১৯৯১ ও ১৯৯৭ সালের ভয়াবহ ঘুর্ণিঝড়ের আঘাতে বেড়িবাঁধের অবস্থা নড়বড়ে হলেও সংস্কার নেই র্দীঘ এক যুগ ধরে। এই এলাকার জনগণ বেড়ি বাঁধ সংস্কার করার জন্য র্দীঘ দিন ধরে দাবি জানিয়ে আসলেও কোন কাজে আসেনি। যার ফলে এলাকার জনগণের মাঝে হতাশা বিরাজ করছেন। ১৯৯১ সালের ভয়াবহ ঘুর্ণিঝড়ের পর ২২ বছর অতিক্রম হয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত টেকসই ভাবে উপকুলীয় এলাকা গুলোতে এখনো পর্যন্ত কোন টেকসই বেড়িবাধ নির্মাণ না হওয়ার ফলে চরম আতংকে দিন কাটাচ্ছে উপকুলীয় এলাকার জনগণ।