ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

‘তুমি রবে নিরবে হৃদয়ে মম’। রবীন্দ্রনাথের দর্শনে এভাবেই অস্তিত্বের সরব উপস্থিতি ঘটেছে নিরবতার আবরনে। নিরবতাই হয়ে উঠেছে সরবতার আভরন।

মানুষের অভিব্যক্তি প্রকাশের যতোগুলো ভঙ্গী আছে প্যারাডক্সিকেলি হলেও নিরবতা তার অন্যতম। শুধু তাই নয়, কখনো কখনো নিরবতাই যথার্থ বা সর্বোকৃষ্ট প্রতিকৃয়া। আমাদের তরুন বয়সটি অবশ্য এই দর্শনের ধারে কাছেও ছিল না। আমরা যারা বাংলাদেশের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছি, তাদের তারুন্য ছিল দ্রোহে ভাস্বর। সমাজের বিরুদ্ধে, প্রথার বিরুদ্ধে, অনিয়মের নিয়মের বিরুদ্ধে কিংবা প্রচলিত রাজনৈতিক স্রোতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা এবং তার সরব প্রকাশ আমাদের অনেকের ছাত্রজীবনকেই বৈশিষ্ট্যমন্ডিত করেছে। তার রেশ ধরে অনেকেই আবার জীবনের বিগত মধ্যাহ্নেও অনেক বিষয়েই দ্রোহকে ধারন করেন/ করি। আমরা যেসব পরিস্থিতি কিংবা অভিমতের সাথে একমত পোষন করতে পারিনি তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছি, সাহস নিয়ে মোকাবেলা করেছি। যারা রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলাম তাদের অনেকেই স্ব স্ব দলের নেতৃত্বের বিরুদ্ধেও রুখে দাঁড়িয়েছি সময়ে সময়ে। সব সময়ে যে আমাদের সেই প্রতিবাদ বা বিদ্রোহ যৌক্তিক এবং সঠিক ছিল তেমন নয়। কখনো কখনো ভ্রান্তিটা আমাদের দিক থেকেই ছিল। কিন্তু নিজেদের বিবেকের কাছেআমরা বরাবরই পরিষ্কার ছিলাম। বিবেক যাকে সঠিক বলে সায় দেয়নি তা মেনে নেইনি, তা যদি সপক্ষের কারো দিক থেকেও এসে থাকে। যদি ভুল করে প্রতিবাদ করে থাকি বা রুখে দাঁড়িয়ে থাকি, তবে সেই ভুল আমাদের ব্যক্তিস্বত্ত্বার ছিল না, সেই ভুল ছিল আমাদের বুদ্ধিমত্তার এবং বিবেচনার। কিন্তু যা বলেছি সঠিক ভেবেই বলেছি।

তবে কখনো কখনো আমরা রায়প্রবণ (জাজমেন্টাল)ও ছিলাম। রায়প্রবণ মানসিকতা অবশ্য আমাদের বাঙালি চরিত্রের অনিবার্য বৈশিষ্ট্য। আমরা প্রায় সব কিছুকেই ভালো এবং মন্দ এই দুই ভাগে ভাগ করে ফেলি। ভাবি, যা আমার কাছে মন্দ তা পৃথিবীর সবার কাছেই মন্দ হতে বাধ্য। আমরা একটি ঘটনা বা বক্তব্য বিবেচনায় নিয়েই একজন মানুষের সামগ্রিকতা বিচার করে ফেলি। তারুন্যের সরব দিনগুলোতে আমাদের এই রায়প্রবণ মানসিকতার জন্য আমরা যেমন মিত্র পেয়েছি অফুরান, ঠিক তেমন কাউকে কাউকে এমন ভাবে কোনায় ঠেলে দিয়েছি যে তাদের পক্ষে আমাদের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠা যারা আর কোন বিকল্প থাকেনি। নিরবতা যে প্রতিপক্ষ কিংবা ভিন্নমতকে জয় করার এবং বিবাদ মিমাংসার হাতিয়ার হতে পারে তারুন্যের উত্তাল দিনগুলোতে আমাদের সে ধারনা ছিল না। ছাত্রজীবন এবং তারুন্যের শেষে আমরা জীবনের অনেক মৌলিক অনুষঙ্গই শিখেছে। এখনো শিখছি। জীবনতো নিজেই একটি চলমান শিক্ষা। সেই সূত্রেই শেখা হয়েছে, ‘কখনো কখনো নিরবতাই সর্বোৎকৃষ্ট প্রতিকৃয়া’। অবশ্য এই উপলব্ধিটি সহজবোধ্য হলেও তার চর্চা করা কিন্তু মোটেও সহজ নয়, বিশেষ করে আমাদের মতো মুখর জাতির পক্ষে।

নিরবতার মানে সব সময় এই নয় যে, আমরা কোন একটি ঘটনা বা পরিস্থিতিকে উপেক্ষা করছি অথবা আমরা একটি মতামতের পক্ষে কিংবা বিপক্ষে। মৌনতা সব সময় সম্মতির লক্ষনও নয়। কখনো কখনো মৌনতার মানে এই হতে পারে যে দু’টি পরষ্পর বিরোধি বক্তব্য বা ধারনার মধ্যে কোনটিই উত্তমতর বা অধমতর নয়। নিরবতার মানে এমনও হতে পারে যে দু’টি পরষ্পর বিরোধি ধারাকে নিজেদের পার্থক্য দূর করার জন্য সময় দেয়া অথবা যথার্থ এবং পরিমিত প্রতিকৃয়া নির্ধারনে বা সমস্যা সমাধানে নিজে সময় নেয়া। যথাযথ বিচার বিশ্লেষন ছাড়া ত্বরিত প্রতিকৃয়া প্রকাশের প্রবণতা অনেক সময়ই আমাদের অনিভিপ্রেত ফলাফলের মুখোমুখি করেছে। আরো কিছুটা সময় অপেক্ষা করে মতামত দিলে হয়তো আমরা অভিপ্রেত ফলাফল পেতে পারতাম। কখনো কখনো চিন্তা ভাবনার অবকাশ ছাড়া ত্বরিত মতামত প্রকাশের জন্য আমাদের বিব্রতও হতে হয়েছে। পক্ষান্তরে, প্রতিকৃয়া প্রকাশের আগে আমরা যদি সব সময় একটু সময় নিয়ে ভেবে নিতে পারি তবে তবে আমাদের প্রতিকৃয়া কিংবা তার প্রকাশভঙ্গী ভিন্ন হতে পারে। তাতে বিরোধ থাকলেও তার তীব্রতা হ্রাস পায়। নিরবতার মাধ্যমে সময় নিয়ে প্রতিকৃয়া প্রকাশ করলে সে প্রতিকৃয়া প্রায়শই পরিপক্ক এবং প্রয়োগসিদ্ধ (প্র্যাগমাটিক) হয়। ফলশ্রুতিতে মারাত্মক বিবাদমান পরিস্থিতি এড়ানো কিংবা প্রশমিত করা সম্ভব হয়। সময়ক্ষেপনের মাধ্যমে যদি প্রতিকৃয়া প্রকাশে পরিমিত হওয়া যায় তবে সে প্রতিকৃয়া অনেক সময় প্রতিপক্ষের কাছেও গ্রহনযোগ্য ও প্রয়োগসিদ্ধ হয়ে উঠতে পারে।

কোন বিষয়ে মৌনতা মানেই দায়িত্বে অবহেলা কিংবা নিরপেক্ষতা নয়। কখনো কখনো মৌনতা মানে দু’টি বিবাদমান ধারাকে সমন্বয় বা নিষ্পত্তির সুযোগ দেয়া। অনেক সময়ই আমরা মতামত প্রকাশে রায়প্রবণ (জাজমেন্টাল) হয়ে পড়ি। যদি আশা করি অন্যরা আমার প্রতি নন-জাজমেন্টাল হোক, তবে আমার নিজেরও অন্যদের প্রতি নন-জাজমেন্টাল হওয়া প্রয়োজন। এই গুনটি রপ্ত করতে হলেও সাময়িক নিরবতার চর্চা করা আবশ্যক। কারণ, নিরবতাই আমাদের আত্মোপলব্ধির সুযোগ দেয়।

তার মানে এই নয় যে জীবনের সর্বক্ষেত্রে সব সময় মৌনতা আবশ্যিক। মোটেও না। সরবতাই আমাদের চুড়ান্ত প্রকাশ মাধ্যম। নিরবতা তার সাময়িক পাথেয় মাত্র। তবে গুরুত্বপূর্ণ পাথেয়। নিরবতায়ও সরব থাকা সম্ভব। সেই পথটিই অধিকতর পরিপক্ক, অধিকতর প্রহনযোগ্য।