ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

আমাদের অপরাজনীতির সংস্কৃতিতে নতুন এক উপসর্গের নাম পোষ্টারবাজি। অবশ্য এই উপসর্গটি একেবারে নতুন তাও বলা যাবেনা। নব্বইয়ের গণ আন্দোলনের পর আমাদের রাজনৈতিক পরিমন্ডলে যে অবক্ষয় বিকাশমান হয়েছে তার অনুষঙ্গ হিসেবেই এসেছে পোষ্টারবাজি। তবে এই অনুষঙ্গটি একেবারে আলাদা কিছু নয়, সন্ত্রাস আর চাঁদাবাজির একটি হাতিয়ার হিসেবেই এর উদ্ভব এবং বিকাশ।

 

প্রশ্ন উঠতে পারে, ‘পোষ্টারবাজি’ জিনিষটি আবার কি?

একটি উদাহরন দিয়েই শুরু করি। এক উপজেলা শহরে বেড়াতে গিয়েছিলাম কিছুদিন আগে। একটি রঙ্গিন পোষ্টারে দৃষ্টি আটকে গেল। জনৈক ছাত্রনেতার(!) বিশাল ছবি দিয়ে করা পোষ্টারে তাকে সেই উপজেলা ছাত্রলীগের সহ-প্রচার সম্পাদক নির্বাচিত করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আন্তরিক অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানানো হয়েছে। পোষ্টাররের উপরে খুব ছোট করে বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা আর সজীব ওয়াজেদ জয়ের ছবি। বাকি অংশে সেই সহ-প্রচার সম্পাদকের হাস্যোজ্জল এক বিশাল ছবি। আর নিচে প্রচারে তার কয়েকজন ভক্ত অনুরক্তের নাম। আহা, সহ-প্রচার সম্পাদক! অভিনন্দন জানানোর ধরন দেখে মনে হয় যেন শেখ হাসিনা এই সব উপজেলা ছাত্রলীগের কমিটি নিজে নির্বাচন করেন আর এই অভিনন্দন যেনো উনি দেখতে পাবেন। এই উপজেলাটি শেখ হাসিনার দেশের অভ্যন্তরে চলাফেরা করার নিয়মিত রুটের মধ্যে পড়েনা।তা ছাড়া কৃতজ্ঞতা যদি জানাতেই হয় তার জন্য দলীয় ফোরামের মাধ্যমেই ব্যবস্থা থাকার কথা। সুতরাং,শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো কিংবা তার দৃষ্টি আকর্ষন করা যে এই পোষ্টারের উদ্দেশ্য নয় তা বলাই বাহুল্য। এই পোষ্টেরের অন্য একটা উদ্দেশ্য আছে। সবাইকে জানান দেয়া হলো যে এলাকায় একজন নতুন (স্বঘোষিত) ছাত্রনেতার (!) আবির্ভাব হয়েছে। আপনি মানুন কিংবা না মানুন, চিনে রাখুন ইনি এই এলাকার আগামী দিনের ত্রাস, আগামী দিনের ভূমি দস্যু, নব্য চাঁদাবাজ। আপনার যাতে উনাকে চিনতে ভুল না হয়, যাতে চাঁদা দিতে কোন টাল বাহানা না করেন সে জন্যই এত বিপুল অর্থ ব্যায়ে বহুরঙ্গা পোষ্টারে ঢাকা হয়েছে সমগ্র শহর। বলাবাহুল্য, এই পোষ্টারও যে চাঁদার টাকায় ছাপা হয়েছে তা অনুমান করার জন্য আপনাকে আইনষ্টাইন বা রবিঠাকুরের মতো মেধাবি না হলেও চলবে।

 

এটি কোন বিচ্ছিন্ন ঘটোনা নয় কিংবা কেবল ছাত্রলীগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আওয়ামী লীগ, বিএনপি আর জাতীয় পার্টি ও তাদের অঙ্গ এবং সহযোগী সংগঠন গুলোর জেলা , উপজেলা এমনকি মহল্লা পর্যায়ের নেতা(!)রাও নিজেদের বিশাল ছবি সহ পোষ্টার ছাপিয়ে সারা দেশ ছেয়ে ফেলেছে। যে কোন উপলক্ষের অজুহাতে এই সব ভূঁইফোড় নেতারা নিজেদের ছবি সহ পোষ্টার, বিলবোর্ডে পুরো এলাকা ঢেকে ফেলে। তাদের পোষ্টার বৈধ (?) করতে উপরে খুব ছোট করে বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা, জয়, জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া, তারেক রহমান কিংবা এরশাদের ছবি থাকে। কিছু দিন পর এই সব নেতারা পবিত্র ঈদ উপলক্ষে এলাকাবাসীকে শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া এমনকি এরশাদের ঈদ শুভেচ্ছা জানিয়ে নতুন নতুন পোষ্টার এবং বিলবোর্ড লাগাবেন। যেন শেখ হাসিনা বা খালেদা জিয়া নিজেরা দেশবাসীকে ঈদ শুভেচ্ছা জানাতে অপারগ। যেন তারা এই সব ব্যাক্তিদের দায়িত্ব দিয়েছেন তাদের পক্ষ থেকে সবাইকে ঈদ শুভেচ্ছা জানানোর। এই সব পোষ্টার ছাপানো আর বিলবোর্ড লাগানোর খরচ আবার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আসে স্থানীয় ব্যাবসায়ী কিংবা জনগনের উপর বাধ্যতামূলক চাঁদা ধার্য করে। অর্থাৎ হাসিনা, খালেদা বা এরশাদের ঈদ শুভেচ্ছা ভায়া মিডিয়ায় পেতেও জনগনকে নিজের গাঁটের টাকা খরচ করতে হবে। হায়রে ঈদ শুভেচ্ছা!

 

তাজউদ্দিন, জিল্লুর রহমান, রাজ্জাক, তোফায়েল, মতিয়া, মেনন প্রমুখনেতা হয়েছিলেন আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। তাদের পরিচিতির জন্য নিজেদের ছবি সম্বলিত কোন পোষ্টার বা বিলবোর্ড লাগাতে হয়নি। আজ রাজনীতি নে্‌ই, যথাযথ আন্দোলন সংগ্রাম নেই, আদর্শের সংঘাত নেই। আজ নেতা হতে হলে জনগনের চাঁদার টাকায় নিজেদের ছবি দিয়ে পোষ্টার ছাপাতে হয়। বিরাজনীতি করণের বাংলাদেশের রাজনীতি আজ নব্য চাঁদাবাজ নব্য মাস্তান আর তাদের পৃষ্ঠপোষকদের কাছে বন্দি।

 

যারা রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রকৃয়া ছাড়া নেতৃত্বের আসনে বসে বা বসতে চায় তারাই এই সব পোষ্টারবাজ, নব্য চাঁদাবাজ, নব্য সন্ত্রাসী। রাজনীতির বৃহত্তর স্বার্থেই প্রধান রাজনৈতিক দল গুলোর উচিত এই সব উঁচু শব্দ করা শুন্য কলস গুলি ভেঙ্গে ফেলা। এম্পটি ভেসেল সাউন্ডস মাচ। এরা সবাই অন্তঃসার শুন্য।

 

নেতানেত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে কিংবা তাদের পক্ষে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে এই ধরনের সস্তা ব্যাক্তি প্রচারনা আইন করে বন্ধ করে দেবার সময় এসেছে। কারো যদি হাসিনা খালেদা কে ধন্যবাদ বা অভিনন্দন জানাতেই হয় তাইলে তিনি তার নেত্রীকে সরাসরি জানালেই পারেন, পোষ্টার ছাপাতে হবে কেন?আর দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানানোর জন্য হাসিনা খালেদা এবং তাদের প্রচার মাধ্যমইতো যথেষ্ট। জনগনকে চাঁদার টাকা দিয়ে অন্য কারো কাছে এই শুভেচ্ছা কিনতে হবে কেন?