ক্যাটেগরিঃ নাগরিক মত-অমত

ঈদ এসেছে আমাদের দোর গোড়ায়। আর কয়দিন পরই দেশে আর প্রবাসে আমরা সবাই মেতে উঠবো ঈদের আনন্দে। মেতে উঠবো বললে পুরোপুরি সঠিক বলা হয় না। আমরা তো এর মধ্যেই ঈদের শপিং আর অগ্রিম শুভেচ্ছা বিনিময়ে মেতে উঠেছি। ঈদের আগমনী বার্তায় আমরা অনেকেই আমাদের শৈশব আর কৈশোরে ফিরে যাই আনন্দে, উচ্ছ্বাসে। কিন্তু আমাদের শৈশব আর কৈশোরের ঈদের লৌকিকতাটুকু আর সেভাবে ফিরে পাইনা। অধুনা পরিবর্তনের জোয়ারে আমাদের চিরচেনা ঈদও তার আঙ্গিক বদলেছে অনেকটাই।

সেই ছোটবেলা থেকেই ঈদকে কেবল ধর্মাচার হিসেবেই নয়, দেখে এসেছি একটি সার্বজনীন সামাজিক উৎসব হিসেবেও। ঈদের নামাজ শেষে আত্মীয়-স্বজন আর বন্ধু –বান্ধবদের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছি, তারাও এসেছেন। ঈদ পরিনত হয়েছে বর্ধিত পরিবার (এক্সটেন্ডেড ফ্যামিলি) আর বন্ধু-বান্ধবদের সামাজিক মিলনমেলায়। জেনেছি এটাই ঈদের শিক্ষা। প্রবাসে জন্ম নেয়া আর বেড়ে উঠা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকেও এই শিক্ষাই দেয়ার চেষ্টা করেছি। আমরা যারা পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে বাস করি, তাদের ঈদের দিনে ব্যক্তিগত ভাবে ছুটি নিতে হয় (যদি ঈদ শনি বা রবিবারে না হয়)। কর্মদিবসে ছুটি নিয়ে আমরা দেশি আমেজে ঈদ উদযাপন করি, সামাজিকতাকে লালন করি আর পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ঈদের ধর্মীয় আর সামাজিক আবেদনটি তুলে ধরতে সচেষ্ট হই।

কিন্তু হালে টিভিতে আর অনলাইন মিডিয়াতে দেশে ঈদ প্রস্তুতি আর পরিকল্পনা দেখে মনে হচ্ছে আমরা আমাদের সন্তানদের ঈদ উদযাপনের যে ঐতিহ্য শিখিয়েছি তা এখন সাবেকি হয়ে গেছে। সংবাদপত্র, টিভির রিপোর্টিং আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর কল্যানে, সেলিব্রেটিদের সাক্ষাতকারে, বন্ধুদের পোষ্ট পড়ে জানতে পারি দেশে (বিশেষ করে ঢাকা চট্টগ্রামে) এখন ঈদ উদযাপিত হয় ভিন্ন মাত্রায়। নামাজ শেষে ‘লম্বা ঘুম’ দেয়া এখন রেওয়াজে পরিনত হয়েছে। ঈদের দিনে ছেলেমেয়েরা বেড়াতে যাচ্ছে ফ্যান্টাসি কিংডমে কিংবা শিশু পার্কে। বর্ধিত পরিবার বা বন্ধু-বান্ধবদের সাথে সামাজিক আতিথেয়তা বিনিময়ের কথাটি আর তেমন শোনা যায় না। ঈদের প্রধান আকর্ষণ ঘুমানো কিংবা ফ্যান্টাসি কিংডমে বেড়াতে যাওয়া। এই প্রথাটি যে কেবলমাত্র সেলিব্রেটি কিংবা বিশেষ একটি শ্রেনীর মধ্যেই প্রচলিত তা নয়। আমার প্রখ্যাত এবং অখ্যাত সব বন্ধুদের সাথে কথা বলে জেনেছি এটাই এখন রীতি।

আমার এক বন্ধু ডাকসাইটে সরকারি আমলা। সম্প্রতি কোন এক ঈদে সপরিবারে গিয়েছিলেন প্রতিবেশী একটি দেশে বেড়াতে। তার সঙ্গে কথা হয়েছিল বাঙালির ঈদের সামাজিক আবেদন আর ঐতিহ্য নিয়ে। তিনি যুক্তি দেখিয়ে বলেছেন, ঈদ হচ্ছে একমাত্র সময় যখন পরিবারের সবাই একসঙ্গে ছুটি ভোগ করতে পারে। একই সময়ে বাচ্চাদের স্কুল আর বাবা মায়ের অফিস বন্ধ থাকে। পরিবারের সবাইকে নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর এটাইতো একমাত্র সময়। তাছাড়া ঢাকা এখন যান্ত্রিক শহর। সামাজিকতার মাধ্যম মোবাইল ফোন আর ফেইসবুক। আতিথেয়তা বিনিময় খুব একটা হয়ে ওঠে না। সুতরাং যারা কাঠমন্ডু, ব্যাংকক বা সিঙ্গাপুরের ফ্লাইট না ধরেন তাদের জন্য ঘুমানো কিংবা ফ্যান্টাসি কিংডমে বাচ্চাদের নিয়ে যাওয়া ছাড়া বিকল্প আর কীইবা আছে! বন্ধুটির যুক্তি অকাট্য। কিন্তু এই সত্যিটি ইঙ্গিত দেয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমাদের বর্ধিত পরিবারের বন্ধনটি এমনভাবে ভেঙ্গে পড়ছে যে ঈদেও আমরা তাদের কিংবা বন্ধুদের সাহচর্যের সুযোগ পাচ্ছিনা। বাঙালির ঈদ তার ঐতিহ্যগত সামাজিক আবেদনটি হারাতে বসেছে।

যান্ত্রিকতার আবরনে ঢাকার ঈদ তার প্রথাগত ঐতিহ্য হারাতে বসেছে বটে কিন্তু শতগুনে বেশি যান্ত্রিকতার মেলবোর্ণ, সিডনি, নিউইয়র্ক, টরন্টো আর লন্ডনে সহস্র বছরের ক্রিসমাস তার সামাজিক আর পারিবারিক আবেদনটি আজো হারায়নি। এটা ঠিক যে ক্রিসমাসেরও অবধারিত বানিজ্যিকরণ হয়েছে, তবুও আজো তা পারিবারিক আর সামাজিক আতিথেয়তা বিনিময়ের দিনই রয়ে গেছে।

তবে কি বছরের অন্য সময়ে পরিবারের সবাই একসাথে ছুটি না পাওয়ার কারণেই ঈদে কেউ যান শিশু পার্কে আর কেউ যান দেশের বাইরে? ব্যাঙ্কক কিংবা কাঠমন্ডুতে ঈদের জামাত খুঁজে পেতে তাদের নিশ্চয়ই কিছুটা হলেও কষ্ট হয়। বছরেরে একটি নির্দিষ্ট সময়ে ছুটি ভোগ করার অধিকার সব সরকারি বেসরকারি কর্মকর্তা কর্মচারিদেরই থাকা উচিত। পরিবারের সদস্যরা যাতে ঈদ বাদে বছরের অন্য একটা সময় অন্তত (শীত বা গ্রীষ্মকালীন স্কুল ছুটির সময়) একসঙ্গে ছুটি কাটাতে পারেন তার ব্যবস্থা করা কি একেবারেই অসম্ভব? যদি তা করা সম্ভব না হয় তবেতো ঈদ আসবে ঘুমে, ফ্যান্টাসি কিংডমে কিংবা ব্যাঙ্ককের ফ্লাইটে।

আর কয়দিন পরই সামাজিক যোগাযোগের মধ্যমগুলো সয়লাব হয়ে যাবে ঈদ উদযাপনের ছবিতে। সেসব ফ্রেমে যতোনা থাকবে বর্ধিত পরিবার কিংবা বন্ধুদের সাথে সনাতনী ঈদ আড্ডা আর সামাজিকতার ছবি, তার চেয়ে ঢের বেশি থাকবে ফ্যান্টাসি কিংডম, নীলগিরি, ব্যাঙ্কক সিঙ্গাপুরে ঘোরাফেরার ছবি। জীবন বাজি রেখে যারা অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই লঞ্চে ষ্টীমারে ট্রেনে বাসে ঢাকা থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছুটে যান প্রিয় মানুষদের কাছে, আমি তাদের কথা বলছিনা। তাদের  বাংলাদেশ আর ঘুমিয়ে কিংবা পাত্যায়ার সৈকতে ঈদ উদযাপনকারীদের বাংলাদেশটা আলাদা। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা একটি বাংলাদেশই চেয়েছিলাম। চেয়েছিলাম একমুখি সমাজ, একমুখি শিক্ষা ব্যবস্থা, সমতা ভিত্তিক সামাজিকতা। সেই এক বাংলাদেশ আর এখন নেই। পঞ্চান্ন হাজার বর্গ মাইল বসতে এখন বহু বাংলাদেশের অবস্থান। আমি সেলিব্রেটির বাংলাদেশের কথা বলছি, পর্বতসম ধনাঢ্যের বাংলাদেশের কথা বলছি, সোনার হরিন পাওয়া এলিট উচ্চ-মধ্যবিত্তের বাংলাদেশের কথা বলছি। এমনকি ঈদও আমাদের চেতনাকে সমতলে আনতে পারেনা। আমাদের বাংলাদেশ ঈদেও খণ্ড-বিখণ্ড হয়।