ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

সংসদ সদস্যদের কথিত দূর্নীতি নিয়ে মাননীয় তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর সাম্প্রতিক মন্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বিতর্কের ঝড় বয়ে যাচ্ছে। সেই বিতর্ক যতোটানা প্রবল তারচেয়ে প্রবলতর হয়েছে সেই মন্তব্যের প্ররিপ্রেক্ষিতে সাংসদদের তোপের মুখে তার প্রতিক্রিয়া, ভূমিকা ও অবস্থান এবং সেই প্রেক্ষিতে জাসদের অন্য অংশের ভূমিকা, বিবৃতি ও প্রতিক্রিয়া। জাসদের উভয় পক্ষের কিছু কিছু নেতার ভূমিকায় আপামর নেতা কর্মীদের হৃদয়ের রক্তক্ষরন শতগুনে বৃদ্ধি পেয়েছে তা বলাই বাহুল্য।

জাসদ তাদের দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাসে যে বিষয়গুলো নিয়ে গর্ব করতে পারে তার একটি হচ্ছে প্রতিকূলতা ও চাপের মুখেও সত্য বলার সাহস এবং স্পর্ধা। মূলতঃ রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা পরিত্যাগ করে রাজপথে নেমে আসা নেতা কর্মীদের হাতেই জাসদের জন্ম। জাসদ নিজেদের ভুল পদক্ষেপের জন্য যেমন জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে পিছ পা হয়নি, তেমনি ন্যায় সত্যের সপক্ষে মাথা তুলে দাঁড়ানোর ঔদ্ধ্যত নিয়েও কখনো বিব্রত হয়নি। কিন্তু সেই গৌরব আজ বিপন্নতার মুখে।

তথ্যমন্ত্রী যা বলেছেন তা যে অসত্য নয় সেটা বাংলাদেশের মানুষ মাত্রই জানেন। এটা মূলত ওপেন সিক্রেট। তিনি শুধু প্রতিষ্ঠিত সত্যটিই পূনর্ব্যক্ত করেছেন মাত্র। এমনকি তিনি এই অভিযোগটি ঢালাও ভাবেও করেন নি। তিনি বলেছেন, এমপিরা চুরি করে। তবে এটাও বলেছেন যে সব এমপিরা করে না। এতে কি তার দায়মুক্তি হয় না? তিনি সরকারের একজন মন্ত্রী হয়ে প্রকাশ্যে এই মন্তব্য করতে পারেন কিনা তা একটি পদ্ধতিগত বিষয় হতে পারে। কিন্তু তার বক্তব্যে অসত্যটা কোথায়? তিনি যদি সবাইকে চোর বলতেন তাহলে অবশ্যই আপত্তির বিষয় থাকতো। তিনি তা করেন নি। কিন্তু দেখা গেল মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সহ পুরো সংসদ এই ঘটনায় জনাব ইনুর প্রতি আক্রমনাত্মক ভূমিকা নিয়েছেন। এবং তাকে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয়েছে। কিন্তু কেন? বঙ্গবন্ধুও কি তার আশেপাশে চাটার দলের কথা বলেন নি? তাঁকে তো ক্ষমা চাইতে হয়নি। আর তথ্যমন্ত্রীতো এই বক্তব্যটি সংসদের অধিবেশনেও রাখেন নি।

jasod

কিন্তু সত্য কথনের জন্য তিনি ক্ষমা চাইলেন কেন? ক্ষমা না চাইলে কী হতো? তার বক্তব্যে কেউ আঘাত পেলে তিনি দুঃখ প্রকাশ করতে পারতেন এই বলে যে, তিনি কাউকে ব্যক্তিগত ভাবে আঘাত করতে চাননি। কিন্তু বক্তব্য প্রত্যাহার করে ক্ষমা চাওয়া মানেইতো তিনি অন্যায় স্বীকার করলেন। তিনি কি আসলেই অন্যায় করেছেন? একজন সংসদ সদস্যকে সত্য কথনের জন্য কেউ বাধ্য করতে পারে? বড়জোর তাকে মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করতে হতো, এমনকি সংসদ থেকেও পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হতো হয়তো। কিন্তু তাকে ক্ষমা চাইতে কেউই বাধ্য করতে পারতোনা। তিনি সেই সংগঠনের নেতা যেই সংগঠনের কর্নেল তাহেরকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখেও কেউ ক্ষমা চাইতে বাধ্য করতে পারে নি। তথ্য মন্ত্রীর এই পশ্চাদপসারন জাসদের সেই গর্বিত ঐতিহ্যের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে এ কথা বলাই বাহুল্য। জাসদের উভয় অংশের এবং শিবিরনিরপেক্ষ সাধারন কর্মী সমর্থকদের মুখে এ এক প্রচন্ড চপেটাঘাত। দলের বিভক্তর পর যারা ইনু – শিরীন অংশকে সমর্থন করেননি তারাও এতে হতাশ। কারন, মাননীয় মন্ত্রীর পশ্চাদপসারন কোন অংশ বিষেশের পরাজয় নয়, সমগ্র জাসদ পরিবারের জন্যই হতাশা ও লজ্জার। এমনকি তার শত্রুরাও কখনো তার বিরুদ্ধে দূর্নীতির কোন প্রমানযোগ্য অভিযোগ দাঁড় করাতে পারেনি। তবুও কেন তার পশ্চাদপসারন? তিনি যদি ক্ষমা না চাইতেন তবে কেউ তাকে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করতে পারতোনা। হয়তো সাময়িক মূল্য দিতে হতো। কিন্তু তিনি নিজেকে এবং তার দলকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারতেন। তিনি সে সুযোগটি হাতছাড়া করলেন।

আমাদের আশা ছিল সংসদে দাঁড়িয়ে অন্তত তার নিজের অংশের অপর এমপি শিরীন আখতার জোড়ালো বক্তব্য দেবেন তার সমর্থনে। আমরা তাও দেখলাম না। এই নিয়ে জাসদের অপর অংশের এমপি’দের ভূমিকাও সমধিক হতাশা ব্যঞ্জক। এটা ঠিক যে তারা এখন ভিন্ন শিবিরে অবস্থান করেন। দলের বিভক্তির পর তাদের অনেককেই অন্য অংশের কেউ কেউ অশালীন ভাষায় আক্রমন করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মন্তব্য করেছেন। তাদের হয়তো ক্ষোভ থাকতেই পারে। কিন্তু তারাতো দীর্ঘ দিনের পোড় খাওয়া রাজনৈতিক নেতা। তারাত এধরনের ব্যক্তিগত রাগ অনুরাগ আর ক্ষোভের উর্ধে উঠতে পারতেন। হাসানুল হক ইনু যা বলেছিলেন তাতে কোন অসত্য ছিল না। জনাব মাঈনুদ্দিন খান বাদল সব জাসদের অন্য অংশের এমপিরা ব্যক্তি ইনুকে না হোক তার সত্য কথনকে অন্তত ডিফেন্ড করতে পারতেন। এই বক্তব্যের সপক্ষে দাঁড়ালে তারা জাসদের সত্যভাষনের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারতেন। তাতে জাসদের উভয় অংশের সাধারন কর্মী সমর্থকদের মধ্যে তাদের প্রতি নতুন করে আস্থা ও সম্মান তৈরি হতো। তারা দল ও দেশের রাজনীতিতে উঠতে পারতেন অসামান্য উচ্চতায়। তারাও সেই সুযোগটি নষ্ট করলেন।

অনেকেই বলছেন, যেহেতু তথ্যমন্ত্রী নিজেই তার বক্তব্য প্রত্যাহার করে সংসদে ক্ষমা চেয়েছেন তাই তাকে ডিফেন্ড করা কঠিন। হয়তো তাই। কিন্তু জাসদের দুই অংশের এমপিরাই যদি হাসানুল হক ইনুর ক্ষমা চাওয়ার আগে তার বক্তব্য ডিফেন্ড করে বক্তব্য রাখতেন তাহলে পরবর্তী পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারতো। তাছাড়া সংসদের বাইরেতো তার বক্তব্য ডিফেন্ড করার সুযোগ ছিলই। কিন্তু তার বদলে জাসদের অন্য অংশের দেয়া বিবৃতিটি সাধারন কর্মী সমর্থকদের আরো বেশি হতাশ করেছে। তারা এই বিবৃতিটি এভাবে না দিলে উভয় পক্ষের কর্মী সমর্থকদের মধ্যে আর একটু বেশি গ্রহনযোগ্য থাকতেন।

এক নেতার সত্য থেকে পশ্চাদপসারন ও ক্ষমা প্রার্থনা আর অন্য কোন কোন নেতার এই অবস্থাকে ভর করে রাজনৈতিক পয়েন্ট স্কোরিংয়ের প্রবণতা কারো জন্যই লাভজনক হতে পারেনা। তারা আত্মসম্মান বিসর্জন দিতে পিছ পা না হলেও কর্মীরা তাদের আত্মসম্মান কতটুকু বিসর্জন দিতে চাইবেন সেটাই ভাবার বিষয়। কিছু কিছু নেতাও তাদের আশেপাশের বিভেদকামীদের নিম্নগামী প্রতিযোগিতায় সাধারন কর্মীরা জিম্মি। অথচ তাদের সামনে এখনো নতুন উচ্চতায় উঠার হাতছানি ছিল।

শুভবুদ্ধি উদয়ের সময়ও অতিক্রান্ত প্রায়।