ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

আজকাল রাস্তায় বের হলেই জটিল জটিল জিনিস দেখা যায় । হকারের চিৎকার, ভিক্ষুকের আহাজারি, যানবাহনের বিকট হর্নের সাথে ট্রাফিক জ্যাম সরকার থেকে একেবারে ফ্রি(!)। মাঝে মাঝে পকেট খোয়া যাওয়া কিংবা সুদর্শন (!) যুবকের অস্ত্রের কাছে নতি স্বীকার করে ওয়ালেট, হাতঘড়ি, ভ্যানিটি ব্যাগ তুলে দেয়ার অভিজ্ঞতায় আমরা এখন সমৃদ্ধ জাতি । সরকারি অফিসে ঘুষের লাইন দেখে, মাস্তানদের চোখ রাঙানির বিনিময়ে আমরা দিই ভুবন ভোলানো বাংলালিংক হাসি(!) । ইভটিজিং কিংবা পরিমল জয়ধরের যৌন হয়রানির গল্প শুনে এবং জাতীয় দৈনিকগুলোতে এইসব মুখরোচক সংবাদ ছাপানোর প্রতিযোগিতা দেখে আমরা খুবই পুলকিত(!) হয়। রাত জেগে ফোনে কুটুর কুটুর প্রেমালাপের মাধ্যমে বিদেশি কোম্পানিকে দেশের অর্থ হরিলুট করতে সহায়তা করি।

ঝালকাঠির নিরিহ লিমন কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাদেরের সাথে পুলিশের প্রেম (!) দেখে আমরা যতটা না মর্মাহত তারচেয়ে বেশি আনন্দিত এই ভেবে যে, ভিকটিমটা আমি না ! জাতীয় সম্পদ রক্ষার্থে আন্দোলনরত দেশপ্রেমিক টোকাইদের উপর রাষ্ট্রিয় ভাবে সন্ত্রাসীদের বুটের আদরে(!) পিষ্ট করা দেখে আমরা নিরব থাকতে অতিশয় পছন্দ করি । আমরা স্বার্থপর মন মানসিকতার মাঝে থাকতে থাকতে ক্রমশই নিষ্প্র্রভ জাতিতে পরিনত হচ্ছি, এটা কি একবার ভাবছি ?

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে উপবৃত্তির টাকা পেতে অসহায় দরিদ্র শিশুর অভিভাবক গড়ে ২০% হারে শিক্ষককে ঘুষ দেয়। ধনীর দুলাল-দুলালীরা পড়ে ইন্টারন্যাশনাল কিন্ডার গার্টেনে। তারা ২০ টাকা হারে ঘুষ দেন না কিন্তু দশ হাজার টাকা দিয়ে প্লে তে ভর্তি করতে কুন্ঠাবোধ করেন না, সন্তানের বৃটিশ ভবিষ্যৎ গড়ার আশায়।

অপরদিকে সরকারি স্কুলগুলোতে বেহাল আবস্থা। শিক্ষক নাই, ক্লাস হয় না । রাজনৈতিক নেতার নির্দেশে স্কুল কলেজ চালানো হয়। বইয়ে পড়ানো হয় ভুল ইতিহাস। ক্লাস টেনের শিক্ষার্থীকে স্বাধীনতার ঘোষক কে প্রশ্ন করলে আমার দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করে আমি কোন দলের লোক ! বিশ্ববিদ্যালেয়ের ক্যাম্পাসগুলো এখন মূল্যবোধ অবক্ষয়ের স্থান । অসচ্ছল পরিবারের মেধাবীরা স্বপ্ন জলাঞ্জলি দেয় এসব দেখে। গুটি কয়েক আসলেও , লাশ হয়ে বাড়ি ফেরার আতঙ্কে দিন কাটায়। ভোর বেলা তাদের ঘুম ভাঙ্গে অস্ত্রের ঝনঝনানিতে। “শিক্ষার আর্থিক দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে” এই দাবিকে এখন প্রাগৈতিহাসিক যুগের পাগলের প্রলাপ মনে করে সাম্রাজ্যবাদী সরকার। তাই বিশ্বব্যাংকের মোড়লিপনা নির্দেশে মুরগির ছোট ছোট খোপে(!) প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নামক বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। এখানে শিক্ষকরা বোঝে টাকা, আমাদের শিক্ষার্থীদের বোঝানো হয় সনদ!

সরকারি হাসপাতালে ১০০ টাকা ফি দিয়ে চিকিৎসা নিতে হয় অথবা প্রাইভেট চেম্বারের ভিজিটিং কার্ড হাতে ধরানো হয়। রোগী ঔষধ চাইলে দেয়া হয়না। কিন্তু সেই ঔষধই রোগীকে আর্থের বিনিময়ে কিনতে হয় দোকান থেকে। কারন হাসপাতেলের নার্স কিংবা পিওন পূর্বেই সরকারি ঔষধ বিক্রি করে আসে।আমরা যে বস্তিতে থাকতাম সেখানেই আছি। অবৈধ কালো টাকার জোরে বস্তির পাশে কিংবা বস্তির জমি দখল করে বিশাল অট্টালিকা তৈরি করলেও আমদের মাঝে সেটার ছিঁটেফোঁটাও পড়ে নাই। আমরা বস্তিবাসী শোষন করতে জানিনা, শুধু শোষিত হতে জানি।

দেশ স্বাধীন হয়েছে চল্লিশ বছর। প্রতিনিয়ত বিপদের প্রহর গুনতে গুনতে আমরা ক্রমশই অনুভূতিহীন যন্ত্রতে পরিনত হচ্ছি। রাজনৈতিক সহিংসতা,ক্ষুধা, দারিদ্র্য থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারিনি। দেশ পরিবর্তন হয়েছে তিনবার, সরকার পরিবর্তন হয়েছে বারবার, কিন্তু জনগনের কোন উন্নয়ন হয়নি। সাধারন মানুষের অনুভুতির কোন মূল্যই নেই তথাকথিত জননেত্রী-দেশনেত্রীর কাছে। যে কোন মূল্যে ক্ষমতায় আরোহণের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত তারা । অর্থের বিনিময়ে তাদের দালাল হিসেবে প্রক্রিয়াধীন অলি-কাদের সিদ্দিকী-কামাল-ইবরাহিম-বি. চৌধুরীরা। জনগনের মুক্তির সনদ বাহাত্তরের সংবিধান একদল কাটা ছেড়ায় ব্যস্ত, আরেকদল ছুঁড়ে ফেলার জন্য উন্মত্ত। সমাজতন্ত্র-প্রকৃত গণতন্ত্র সুদূর পরাহত। ইজারা সিস্টেম গণতন্ত্রে বারবার দেশ সংকটাপন্ন অবস্থায় গেলেও আমরা সেটা থেকে বের হয়ে আসতে পারিনি।

প্রতিদিন এতকিছুর পরও আমরা কিছু স্বপ্নবাজ দেখি সোনার বাংলার গড়ার স্বপ্ন। নজরুল-সুকান্তের রক্তগরম কবিতায় প্রতিবাদের স্পৃহা পায়। জাহানারা ইমামের মত আমরাও পথে নেমে চিৎকার করে বলি,”রাজাকার নিপাত যাক”। বাংলাদেশ ক্রিকেট টিম অন্য দেশকে হারালে আমরা আনন্দে ভেসে যায়। লাইলি-মজনু, শিরি-ফরহাদের মত আমরাও প্রেমে হাবুডুবু খায়। মার্কস-মাও সে তুং-লেলিনের সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন দেখি । দস্যুবৃত্তি-মাস্তান তন্ত্র-দুর্নীতির চাপেও আমরা একটুখানি হাসি যখন মুসা ইব্রাহীম এভারেস্টের চূড়ায় আরোহন করে বাংলাডেশের পতাকা উত্তোলন করে। আমরা সবই পারি। দেশের যত সমস্যা আছে সবগুলোই দূর করতে পারি,যদি একাত্তরের মত আরেকবার ছাত্র-যুব-জনতার ঐক্যের হুংকার দেয়া সম্ভব হয়। যে ঐক্য সমাজ পরিবর্তনের ডাক দিবে। বুড়িগঙ্গার পানি কালো হয়েছে, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা এখনো স্বচ্ছ। কালো টাকার মানুষগুলোকে সেই স্বচ্ছ জলে স্নান করানো প্রয়োজন এবং সেটা আমাদের গুরুদায়িত্ব। স্বপ্নজয়ী বাঙালীর কাছে কোন কিছুই অসম্ভব নয়।

০১ লা আগস্ট, ২০১১ সকাল ১১:১২