ক্যাটেগরিঃ চারপাশে

 

গত শুক্রবার থেকে মায়ানমারে শুরু হয়েছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। হামলা-লুটপাট-খুন চলছে রাখাইন প্রদেশের সর্বত্র। রাখাইন-রোহিঙ্গাদের মধ্যে শুরু হওয়া এ দাঙ্গায় ঠিক কতজন নিহত হয়েছে এটা সঠিক জানা না গেলেও একটি সংবাদ মাধ্যম ১৭ জন নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে। তবে লাশের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে জানা গেছে। কারন, অসংখ্য রোহিঙ্গা গুম খুনের শিকার হয়েছে, কয়েক হাজার আহতও হয়েছে। এর বাইরে নিখোঁজ রয়েছে অগণিত।

সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত রাখাইন প্রদেশে জরুরী অবস্থা জারি করা হয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এক বার্তায় দুই সম্প্রদায়কে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। এই দাঙ্গা চলছে চট্রগ্রাম-কক্সবাজার সীমান্তবর্তী এলাকায়। ফলে স্বভাবতই এর প্রভাব পড়ার কথা বাংলাদেশেও। প্রশ্ন উঠেছে, দাঙ্গার প্রভাব বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা আসলে কতটুকু?

গত মাসে এক বৌদ্ধ নারীকে ধর্ষণ ও হত্যার পর রাখাইন প্রদেশের তাংগোক শহরে বৌদ্ধদের হামলায় ১০ মুসলিম নিহত হয়। কিন্তু নিহতরা কেউ রোহিঙ্গা ছিল না। তারপর থেকে উত্তেজনা চলে আসছিল। এরই এক পর্যায়ে গত শুক্রবার রোহিঙ্গারা ঘটনাকে মুসলিম নিধন মনে করে রাখাইনদের একটি গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়। এর পরই সংখ্যালঘু মুসলিম ও বৌদ্ধদের মধ্যে দাঙ্গা বাঁধে।

জীবন বাঁচাতে প্রতিদিন অসংখ্য রোহিঙ্গা শরনার্থী হয়ে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আসছে। চট্রগ্রাম-কক্সবাজার এলাকায় পূর্ব থেকেই কয়েক লাখ রাখাইন-রোহিঙ্গা বসবাস করে। ফলে সীমান্তের ওপারের সংঘাত এপারেও ছড়িয়ে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। ইতিমধ্যে, রাখাইন সম্প্রদায় দাঙ্গাকে আন্তর্জাতিক রূপ দিয়েছে। রাখাইন হ্যাকাররা বেশ কয়েকটি ওয়েবসাইট হ্যাক করেছে। তার মধ্যে বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের ওয়েবসাইটও হ্যাকিংয়ের শিকার হয়েছে।

রাখাইনদের আদিনিবাস মায়ানমারের আরাকান রাজ্য। তারা ধর্মীয়ভাবে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। ১৮ শতকে মায়ানমারের জাতিগত দাঙ্গায় তারা প্রথমে কক্সাবাজার এলাকায় আসে। পরে চট্রগ্রাম, পটুয়াখালি এলাকায় তারা ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে, মায়ানমারের আরাকান রাজ্যের আরেকটি উলেখযোগ্য নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী হলো রোহিঙ্গারা। এরা ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত। রোহিঙ্গাদের আলাদা ভাষা থাকলেও অধিকাংশই বাংলা ভাষায় কথা বলে। মায়ানমারের আকিয়াব, রেথেডাং, বুথিডাং এলাকায় এদের বাস। মায়ানমার ছাড়াও প্রায় ৫ লক্ষের অধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে বসবাস করে।

রাখাইনরা বৌদ্ধ ধর্মালম্বী হওয়ায় মায়ানমারে থাকতেই তারা বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করে। এ কারনে বাংলাদেশে রাখাইনদের সংখ্যা রোহিঙ্গাদের তুলনায় অনেক কম। রোহিঙ্গাদের সংখ্যা বাড়তে থাকে নব্বইয়ে মায়ানমারে রোহিঙ্গা-রাখাইন দাঙ্গার শুরু হওয়ার পর। ওই সময় থেকেই মায়ানমারের প্রশাসন ও রাখাইন গোষ্ঠী- রোহিঙ্গারা বাঙালী জাতির অংশ এমন প্রচারনা চালিয়ে তাদেরকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়ার চেষ্টা চালায়। দমন-নিপীড়ন-নির্যাতনের মাধ্যমে জোর করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পাঠানো হতে থাকে। কেউ কেউ বিজিবি’র হাতে ধরে পড়লে, পুশব্যক করে তাদের ফেরত পাঠানো হয়। তবে অধিকাংশই সীমান্ত পার হয়ে এপারে চলে আসতে সক্ষম হয়। এদের অনেকেই এখন বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে বসবাস করছে।

রোহিঙ্গাদের অধিকাংশই জীবন জীবিকা নির্বাহ করতে এখন অপরাধ কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত হয়ে পড়ছে। সীমান্তে মাদক চোরাচালানের কাজে মূলত এরাই ব্যবহৃত হয়। জীবিকার তাগিদে এরা নির্বিচারে দেশের বনাঞ্চল বন সম্পদ ধ্বংস করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। নিয়ন্ত্রণহীন এসব রোহিঙ্গারা স্থানীয় শ্রমবাজার হাতিয়ে নেওয়ার ফলে দেশের কর্মহীন মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দুই তৃতীয়াংশ অসচ্ছল পরিবারকে দৈন্যদশায় দূর্বিষহ জীবন যাপন করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অপরাধ প্রবনতা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে আইন শৃংখলা রক্ষায় পুলিশকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। রোহিঙ্গারা জড়িয়ে পড়ছে পতিতাবৃত্তি, খুন, ডাকাতি,ছিনতাই সহ নানা অপরাধে রোহিঙ্গাদের এহেন কর্মকাণ্ডে শংকিত হয়ে পড়েছে স্থানীয় জনগন।

গত শুক্রবার থেকে মায়ানমারে দাঙ্গা শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশে কিছু মুসলিম মৌলবাদী অনলাইন এক্টিভিস্ট ঘটনাকে মুসলিম নিধন হিসেবে প্রচারনা চালানো শুরু করেছে। ফেসবুক ও কমউনিটি ব্লগের মাধ্যমে তারা বিষয়টাকে মুসলিমদের ওপর বৌদ্ধদের আঘাত বলে মতামত গঠনের চেষ্টা করছে। এ নিয়ে বেশ কয়েকটি ফেসবুক গ্রুপ গঠিত হয়েছে। তাদের পোস্টগুলোতে উস্কানিমূলক কথাবার্তায় বাংলাদেশে বসবাসকারী রাখাইন সম্প্রদায় ও বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের ওপরে আক্রমনের আহ্বান জানানো হচ্ছে।

বাংলাদেশে আপাতত দাঙ্গার সেরকম কোন প্রভাব না পড়লেও চট্টগ্রামে বসবাসকারী বৌদ্ধ ধর্মালম্বীরা আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাছেন। সীমান্তের ওপারের সংঘাত এপারেও ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে তারা আশঙ্কা করেছেন। সংখ্যালঘু হওয়ায় তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তারা মনে করছেন, রোহিঙ্গারা মুসলিম হওয়ায় বাংলাদেশের মুসলিম মৌলবাদী রাজনৈতিক দলগুলোর সহায়তার মাধ্যমে তাদের উপর হামলা হতে পারে।

বাংলাদেশের মানুষ ধর্মভীরু। তাদের ধর্মান্ধতার সুযোগে এক শ্রেনীর মৌলবাদী ফায়দা লোটার সুযোগ নিতে পারে। এজন্য রোহিঙ্গা শিবির ও রাখাইন এলাকাগুলোতে নজর রাখাটা জরুরী। একইসাথে মুসলিম মৌলবাদী দলগুলোর কর্মকাণ্ডের ওপরও দৃষ্টি রাখা আবশ্যক। কেননা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির যে সুনাম আমাদের রয়েছে তা নষ্ট হলে আমাদেরই ক্ষতি, মৌলবাদী গোষ্ঠীর নয়।