ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

১।
ঢাকা শহরের এক নামি স্কুলের নবম শ্রেনীর ছাত্র সাব্বির(ছদ্মনাম)। গত বার্ষিক পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করার পর বাবা ছেলেকে পুরস্কার হিসেবে কি দেবেন, তা জানতে চেয়েছিলেন। উত্তরে ছেলে বলেছিল, একটা মাল্টিমিডিয়া মোবাইল ফোনের কথা। বাবা প্রথমে দিতে রাজি হননি। এত কম বয়সের ছেলেকে মোবাইল ফোন দিবেন, তাও আবার দামি ফোন- তার বিবেক সম্মতি দিচ্ছিল না। কিন্তু ছেলে বোঝালো, তার বন্ধুদেরও মোবাইল ফোন আছে। তাদের বাবা মা দিয়েছেন। আর এখন তো ছেলে-বুড়ো সবার কাছেই ফোন থাকে। সবারই দরকার হয়।

বাবা ছেলের সাথে তর্কে জড়ালেন না। অগত্যা ১৮ হাজার টাকা দিয়ে শোরুম থেকে একটা দামি মোবাইল সেট কিনে দিলেন। মেমোরি কার্ড, ব্লু টুথ, এমপি থ্রি, এমপি ফোর, ব্রাউজার কি নেই তাতে! সাথে একটা সিমও কিনে দিলেন। সাব্বির খুশি হয়ে যায়। পরদিন বন্ধুর বাসায় গিয়ে কম্পিউটার থেকে আট গিগা মেমোরি কার্ডের পুরোটাই পর্নো ভিডিওতে পূর্ণ করে নিয়ে আসে। রাতভোর ঘরের দরজা লাগিয়ে কানে হেডফোন দিয়ে বাসায় দেখে। নতুন ভিডিও সংগ্রহের জন্য ক্লাসে বন্ধুদের তাগাদা দেয়। ক্রমেই পর্নোগ্রাফির প্রতি আকর্ষন আসক্তিতে রূপ নেয়। ক্লাসরুমের পেছনে, স্কুল মাঠে ঝোপের আড়ালে, পার্কে, খেলার মাঠে বসে বন্ধুরা একসাথে দেখে। মজা পায়, পুলকিত হয়।

একদিন টিফিনের সময় ক্লাসরুমে কয়েকজন বন্ধু মিলে নতুন আনা এক দেশী পর্ণোভিডিও দেখছিল। শিক্ষক ক্লাস নিতে আসলেও তারা খেয়াল করেনি। মাথা নিচু করে দেখতে থাকায় স্যারের সন্দেহ হলে হাতে নাতে ধরা পড়ে সাব্বির ও তার পাঁচ বন্ধু। প্রধান শিক্ষকের নিকট পাঠানো হয় তাদের, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে মোবাইল ফোনটি জব্দ করেন। একইসাথে, বিদ্যালয়ে কোন শিক্ষার্থী মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারবে না এই মর্মে নোটিশ জারি করেন। কিন্তু তার পরেরদিনও শিক্ষার্থীদের ব্যাগ সার্চ করে স্কুলে সত্তরটি মোবাইল ফোন পাওয়া যায়। প্রত্যেকটি মেমোরিকার্ডে ছিল দেশি-বিদেশি পর্নোভিডিও’র ভাণ্ডার।

২।
উপরের ঘটনাটি কল্পিত নয়, সত্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অবস্থিত একটি স্কুলে এমন ঘটনার সৃষ্টি হয়েছে। এটি একটি নমুনা মাত্র, দেশের অধিকাংশ স্কুল পড়ুয়াদের মাঝে এই ধরনের প্রবণতা দেখা যায়। কম বয়সে বিস্তারিত জানাকে তারা এ্যাডভেনটেজ মনে করে। ক্লসে যে যতো বেশি জানবে, আড্ডাতে সে অধিক জনপ্রিয়। বড় থেকে ছোট, ক্রমে ক্রমে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে আজ সর্বত্র।

একজন কিশোর, যার হয়তো যৌনতা সম্পর্কে হালকা ধারণা আছে, কিন্তু এর ভিজুয়ালিটি সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। সে খুব স্বাভাবিক ভাবেই পর্নো ছবির প্রতি কৌতূহলী হবে। সঙ্গত কারনেই কোমলমতি আঠারো বছরের কম বয়সী শিশুরাই সবচেয়ে বেশি পরিমানে পর্নো ভিডিও’র প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এটাই হল বাস্তবতা। কিন্তু এর জন্য দায়ি কে? পরিবার, রাষ্ট্র, সমাজ, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং মানসিকতা সবাই দায়ী।

একজন শিশু তো দূরে থাক, একজন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রকেও পরিবার থেকে যৌনতা সম্পর্কে কোন ধারনা দেয়া হয় না। রাষ্ট্রীয়ভাবে পাঠ্য পুস্তকেও যৌনতা সম্পর্কে কোন বিশেষ শিক্ষার ব্যবস্থা নেই। কেবলমাত্র উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেনীর জীববিজ্ঞানে “মানবদেহ” নামক একটি অধ্যায় রয়েছে। সেখানে, দৈহিক অঙ্গের বিবরন, বয়:সন্ধিকালের লক্ষন, করণীয় সমন্ধে ধারনা দেয়া রয়েছে। কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য, অধিকাংশ কলেজেই অধ্যায়টি পড়ানো হয়না। কারন, শিক্ষক-শিক্ষিকারা অধ্যায়টি পড়াতে লজ্জা বোধ করেন। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শুধুমাত্র মেডিকেল ও জুয়োলজি বিভাগের শিক্ষার্থীরা এ সম্পর্কে কিছু শিক্ষা লাভ করে থাকেন। অন্য বিষয়ের শিক্ষার্থীরা যৌন শিক্ষা লাভের কোন সুযোগই পান না। ফলে কেবলমাত্র বন্ধু-সহপাঠীদের মাঝেই কিশোর যুবকরা এ সম্পর্কে ধারনা লাভ করে। কিন্তু পরিপূর্ণ শিক্ষা না হওয়ায় তার কুপ্রভাব পড়ে স্বাভাবিক জীবনে। নেশার মত আসক্ত হয়ে পড়ে পর্নো ভিডিও’র প্রতি। ফলশ্রুতিতে স্কুল পড়ুয়াদের কেউ কেউ কৌতূহলী হয়ে পতিতালয়েও যায়!

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন তার এক জরিপে তথ্য প্রকাশ করেছে যে, রাজধানীতে ৭৭ শতাংশ কিশোর পর্নো ভিডিওতে আসক্ত। এই হার শুধু আমাদের আতঙ্কিতই করে না, সামাজিক সহিংসতা বেড়ে যাওয়া আশঙ্কা স্পষ্ট বুঝিয়ে দেয়। তাই পর্নো ভিডিও প্রতিরোধ করা এখন জরুরী হয়ে উঠেছে। এক্ষেত্রে চীন আমাদের কাছে বড় উদাহরন হতে পারে। সেখানে পাঠ্যপুস্তকে যোগ হয়েছে যৌন শিক্ষা। কিন্তু ইন্টারনেট পর্নোগ্রাফি পুরোদমে নিয়ন্ত্রিত। যার কারনেই সেখানে শিক্ষার্থীরাও যেমন যথেষ্ট সচেতন, তেমনি সামাজিক সহিংসতাও কম।

রাজধানীতেই পর্নো ভিসিডি নির্মাণ হচ্ছে, এটা পুরোনো গল্প। বিক্রি হচ্ছে, এটা ওপেন সিক্রেট। আইন করেও পর্নোগ্রাফি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও কর্মকাণ্ডগুলো এখন অবাধে চলছে। মাদকের পাশাপাশি অশ্লীলতাও যদি সমাজে ভাইরাস আকারে ছড়িয়ে পড়ে, তা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুফল বয়ে আনবে না। এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে সরকারকে। প্রয়োজনে ইন্টারনেট পর্নোগ্রাফিও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কারণ, এখন ঘরে বসেই অশ্লীল ছবি প্রদর্শন সহজলভ্য।

গরীব দেশের জন্য ক্ষুধা ও দারিদ্রতার মাঝে পর্নো আগ্রাসন এক মারাত্মক অভিশাপ। এই অভিশাপ প্রতিরোধ করতে না পারলে দেশের তরুন সমাজের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। এই অন্ধকার দূর করতে যুবকদেরই এগিয়ে আসতে হবে। একইসাথে রাষ্ট্রকে পর্ণো আগ্রাসন রোধে সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা তৈরীর পাশাপাশি ব্যপক হারে সচেতনতা সৃষ্টির করতে হবে। নতুবা অদূর ভবিষ্যতে সামাজিক সহিংসতার কারনে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে, যা কারোই কাম্য নয়।

censor