ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 


সপ্তাহ খানেক আগে “স্কুল শিক্ষার্থীর হাতে পর্ণোভিডিও, দায়ি কে?” শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম। তাতে স্কুল শিক্ষার্থীদের মাঝে পর্নোভিডিও’র অবাধ প্রসারের কারন ও চলমান অবস্থা থেকে পরিত্রানের উপায় সমন্ধেও আলোচনা করা হয়েছিল। আমি সমাধান হিসেবে কৈশর বয়স থেকেই প্রাতিষ্ঠানিক ও পারিবারিক ভাবে যৌন শিক্ষা চালুর কথা বলেছি। অধিকাংশই আমার বক্তব্যকে সাধুবাদ জানিয়েছেন, কেউ কেউ ভিন্নমত পোষন করেছেন। বলেছেন, ধর্মীয় অনুশাসনই পারে স্কুল শিক্ষার্থীদের রক্ষা করতে।

জনৈক ব্যক্তি ধর্মীয় অনুশাসনের স্বপক্ষে বেশ কিছু বক্তব্য দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন। আমি ইসলাম, হিন্দু ও খৃষ্টান ধর্মে যৌনতা ও নারীকে কেমন ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তার কয়েকটা উদাহরন দিলাম। প্রতি মন্তব্য করার পর- কেউ কেউ আমাকে নাস্তিক ঘোষনা করলেন, মুরতাদ বলেও কুরআনের আয়াত সম্বলিত মেইল করেছেন। আল্লাহ তায়ালার এক প্রিয় বান্দা তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে অতি আবেগী হয়ে পড়েন। গালি সৈনিকের ভূমিকায়ও অবতীর্ন হন। ব্লগ টিম তার বক্তব্য সেন্সর করে। ভদ্রলোক তবুও ক্ষান্ত হননি। পাঁচ লাইনের গালি সাহিত্য প্রেরণ করেন আমার মেইল এড্রেসে!

যাই হোক, ভদ্রলোকের গালাগালির প্রতি সম্মান রেখেই হোক আর নিজের নাগরিক দায়িত্বের বদৌলতেই হোক আজকের লেখাটি কৈশোরে কেন যৌন শিক্ষা প্রয়োজন, সে বিষয়কে কেন্দ্র করেই লিখছি এবং আশা করছি, গালাগালবাদীরা কিছুটা হলেও যৌন শিক্ষার প্রয়োজনের কথা তারা বুঝবেন।


ধরা যাক, মেয়েটির নাম আয়েশা খাতুন। সে চাঁপাইনবাবগঞ্জের একটি মাদ্রাসায় পঞ্চম শ্রেনীতে পড়ে। অল্প বয়স, অথচ এরই মধ্যে দেহে ডাগর ডাগর ভাব এসেছে। চেহারা সুরত মাশাল্লাহ ! পড়াশুনায় খুব মেধাবী হওয়ায় ধর্মপরায়ন বাবা মোতালেব হোসেন মেয়েকে নিয়ে গর্ব বোধ করেন।

হঠাৎ করেই একদিন ক্লাস চলাকালীন সময়ে তার নারীত্বের নিদর্শন প্রকাশ পায়। পাঠদানরত শিক্ষক আব্দুল হালিম বিষয়টি লক্ষ্য করেন। কিন্তু, তাকে বাড়িতে না পাঠিয়ে মাদ্রাসার টয়লেটে যেতে বলেন। মেয়েটি বুঝে ওঠে না তার কি হয়েছে এবং কি করা উচিত। ভাবে হয়তো তার কোন রোগ হয়েছে, যার কারনে তার এই লক্ষন প্রকাশ পাচ্ছে। সেদিনের মত সে বাসায় চলে যায়।

সপ্তাহ খানেক পরে ক্লাস শেষে শিক্ষক আব্দুল হালিম আয়েশাকে থামতে বলেন। সহপাঠীরা চলে গেলে হালিমের লোভাতুর চোখ দেখে সে ভয় পেয়ে যায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আয়েশা ধর্ষিত হয়। কয়েকদিন পর সে গর্ভবতী হয়ে পড়ে। বয়:সন্ধি এবং ধর্ষন সম্পর্কে মেয়েটির কোন ধারনা না থাকায় কি হয়েছে সে বোঝে না। কিন্তু সে বুঝেছে যা হয়েছে তা লজ্জার কথা কাউকে বলা যাবে না।


যৌন গবেষকদের তথ্যানুযায়ী মেয়েদের বয়ঃসন্ধি ঘটে সাধারণত বারো থেকে তেরো বছর বয়সে। । কিন্তু দিন দিন এই বয়সের ধারাটি কমে আসছে ক্রমাগত ভাবে। নয় কিংবা দশ বছর বয়সেও কেউ কেউ নিজের বয়:সন্ধিকালে পৌঁছে যায়। বাংলাদেশে এই ধরণের যৌন অকালপক্কতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যৌন স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে পশ্চাদপদ। অনেক স্কুল ও অভিভাবক ছাত্রছাত্রীদের যৌন শিক্ষা দেয়ার ব্যাপারে এখনো রক্ষণশীল মনোভাব পোষণ করছে। ফলে বয়ঃপ্রাপ্ত হবার সময় অনেক ছেলেমেয়ে এ ব্যাপারে অসহায় হয়ে পড়ে এবং তাদের মধ্যে অনেক মনস্তাত্ত্বিক সমস্যাও দেখা দেয়।

উদ্বেগের ব্যাপার হচ্ছে এই যে, এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশের যুবকযুবতী ও কিশোরকিশোরীদের মধ্যে অপরাধীদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে অথবা তারা অপরাধের শিকার হচ্ছে। এদের মধ্যে কিশোর-তরুনদের সংখ্যার অনুপাত খুবই বেশী।

যদি আয়েশা নামের শিশুটি শৈশবেই যৌন শিক্ষা লাভ করত। পরিবার যদি এ সর্ম্পকে তার সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করত, মেয়েটা বয়:সন্ধির পুরো ব্যপারটা বুঝতে পারত। সে সাবধান হওয়ার সুযোগ পেত। ধর্ষনের শিকার হওয়ার পরও যদি পরিবারকে জানাত ৭২ ঘন্টার মধ্যে তার গর্ভধারন রোধ করা যেত।

কিন্তু, দু:খজনক ঘটনা হলেও সত্য যে, মেয়েটির এ সম্পর্কে পূর্ব ধারনা ছিল না। ধারনা না থাকার দরুন তাকে অকালেই গর্ভবতী হতে হলো।

অনেকে যৌন শিক্ষাকে প্রাকৃতিক শিক্ষা ভাবেন। কিন্তু এটা আপনা আপনি শেখার কোন বিষয় নয়। এটার প্রাতিষ্ঠানিক ও পারিবারিক শিক্ষার বিষয়। এটা ঠিক যে, দেহে প্রাকৃতিক ভাবেই একটি পরিবর্তন আসে। তার মানে এই নয় যে, হাসের বাচ্চা যেমন নিজে থেকেই সাতার শিখে ফেলে, তেমনি মানুষের বাচ্চাও হঠাৎ করে সাতার শিখে ফেলবে।

যৌন শিক্ষা না থাকার কারণে করুন পরিণতি বরন করেছেন অনেকে। ভুল ধারনা কিংবা অগতার কারনে অকালেই কেউ গর্ভবতী হয়েছেন, কেউ আত্নহত্যা করেছেন, কেউবা আজীবনের জন্য তার যৌনশক্তি হারিয়েছেন। কেউ কেউ বিজ্ঞানভিত্তিক যৌন শিক্ষা না দিয়ে, শুধু নৈতিক শিক্ষার কথা বলেন। কেউ কঠোর অনুশাসন করে এ বয়সী ছেলে-মেয়েদের সুস্থ, সুন্দর বন্ধুত্ব ও বন্ধুত্বের সীমানা সম্পর্কে সচেতন করার কথা বলেন। কিন্তু, ভেবে দেখেন না, এই বয়সের স্বভাবজাত প্রবৃত্তির কথা।

যৌন শিক্ষার মানে এই নয় যে, শুধু শারিরীক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করতে হবে। বিভিন্ন বয়সী মানুষের যৌন শিক্ষা বিভিন্ন রকম। কিশোরদের যৌন শিক্ষা হবে কিশোরদের মত। তাদের জানাতে হবে, তাদের জন্মরহস্য। ধারনা দিতে হবে লক্ষন দেখা দিলে কি করণীয়।

মানুষ সামাজিক জীব। সঠিকভাবে বোঝানো হলে শিশুরাও বুঝবে। বাবা মায়েরা যদি সন্তানের বয়:সন্ধি কালে তাদের বন্ধু হতে পারেন, কাছাকাছি আসতে পারেন; তবে বেঁচে যাবে অনেক তরুন তরুণীর তাজা প্রান। তাতে দেশ-জনগন সকলেই উপকৃত হবেন।

শিশুর সাথে পিতা-মাতার খোলাখুলি সম্পর্ক রাখতে হবে। একইসাথে যৌন শিক্ষার ক্ষেত্রেও সহজ ও সাবলিল আচরন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, গোপনীয়তাই সর্বনাশ ডেকে আনে।