ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

এইসব শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দেবে কে?

মুসলিমরা ইসলামকে বিভিন্ন উপমা দিয়ে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে চান। বলেন, ইসলাম মহান ও পবিত্র, ইসলাম সুন্দর- শ্বাশত, ইসলাম পৃথিবীর একমাত্র শান্তির ধর্ম, ইসলামের চেয়ে উপযুক্ত ধর্ম পৃথিবীতে আর নাই, ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা ইত্যাদি।

ধরা যাক, সব কিছুই মেনে নেয়া হলো, সব উপমা স্বীকার করে নেয়া হলো। কিন্তু শান্তির ধর্ম ইসলামের শিক্ষা গুরুদের ক্রমাগত অপরাধ বৃদ্ধি, বিশেষ করে যৌন হয়রানির মত গুরুতর যৌন অপরাধে জড়িয়ে পড়া কিভাবে মেনে নিতে পারি আমরা? বিশ্বাস কিংবা অবিশ্বাস নিয়ে কোন আলোচনায় আমি যাব না। সেটা মুসলিমদের ব্যক্তিগত ব্যপার। শুধু প্রশ্ন যে, ইসলামকে পবিত্র ও শান্তিপূর্ন বলে যারা আলোড়ন তুলেছেন, তারা ধর্মীয় শিক্ষা গুরুদের যৌন অপরাধ কিভাবে দেখছেন?

মাদ্রাসা শিক্ষকদের কয়েকটি যৌন অপরাধের ধরন দেখি:

মাদ্রাসা শিক্ষক যখন সমকামি!

“ছাত্রকে আটকে রেখে যৌন নির্যাতন চালানোর অভিযোগে পুলিশ এক মাদ্রাসাশিক্ষককে গ্রেপ্তার করেছে। তাঁর নাম জাকির হোসেন (৪০)। আজ বুধবার দুপুরে আদালতের মাধ্যমে তাঁকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। শিক্ষক জাকির গত রোববার আরও একটি ছেলেকে বলৎকার করে বলে স্বীকার করেছেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার কুতুবপুরে।” ১৩ জুলাই ২০১১, দৈনিক প্রথম আলো।

মাদ্রাসা শিক্ষক যখন ধর্ষক!

“মাদারীপুর সদর উপজেলার ঝাউদি ইউনিয়নের হোগল পাতিয়া হাফেজিয়া মাদ্রাসার এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত ওই শিক্ষকের নাম আব্বাস আলী। ফেলে যাওয়া জাতীয় পরিচয়পত্র থেকে জানা গেছে তার বাড়ি বরিশালের মেহেদীগঞ্জ। অভিযোগের পরপরই তিনি পালিয়ে গেছেন।” বাংলানিউজ, ৪ সেপ্টেম্বর ২০১০।

মাদ্রাসা শিক্ষক যখন বহুগামী!

“কক্সবাজারের উখিয়ায় নূরানী মাদ্রাসার দুই ছাত্রীকে শিক্ষক কর্তৃক ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়রা তাকে গণধোলাই দেয়।” দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৩ জুন ২০১১।

মাদ্রাসা শিক্ষক যখন অপহরনকারী!

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলা থেকে অপহরণের পর এক শিশুকে ধর্ষণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় শিশুটির বাবা বাদী হয়ে ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। দৈনিক প্রথম আলো, ১১ জুলাই ২০১১।

বাংলাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষকদের যৌন অপরাধ নতুন নয়। ঐতিহাসিকভাবেই এই প্রবনতা লক্ষ্যনীয়। তারা কখনও সমকামি রুপে, কখনও ধর্ষক রুপে, কখনও বহুগামী, কখনও বিকৃত যৌনাচারী হিসেবে সমাজের সামনে নিজেদের মুখোশ উন্মোচন করেছেন। সেটা পত্রিকার পাতা উল্টালেই দেখতে পাওয়া যায়। এসব দেখে সচেতন মহলের প্রশ্ন- ওরা শিক্ষক নাকি নরপিশাচ?

বাংলাদেশে শিক্ষকরূপী এইসব যৌন অপরাধীদের তৎপরতা মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রকট আকার ধারন করেছিল। ইতিহাসবিদদের মতে মুক্তিযুদ্ধে প্রায় দুই লাখ নারী ধর্ষিত হয়েছিলেন। সেসময় জামায়াত নেতা ও জামায়াত ইসলামীর সাথে জড়িত শিক্ষকদের বাঙালি নারীদেরকে ধর্ষন করার প্রমান পাওয়া যায়। অতীতের সেই প্রবনতা আজ শুধু জামায়াতি শিক্ষকদের মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই, ছড়িয়ে গেছে সাধারণ শিক্ষকদের মাঝেও, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। ফলে যে শিক্ষার্থীরা একটি সুন্দর জীবন গড়ার প্রত্যাশা নিয়ে মাদ্রাসায় যেত, তারা এখন মাদ্রাসা যেতে শঙ্কা বোধ করে নিরাপত্তার অভাবে।

মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার অভাব কতটা? তাদের নিয়ে সরকারের পর্যবেক্ষনটাই বা কি ? আমরা ভিকারুন্নেসার পরিমলের ক্ষেত্রে যতটা তৎপরতা দেখিয়েছি, যতটা কঠোর হয়েছি; মাদ্রাসা শিক্ষকদের যৌন অপরাধের ব্যপারে আমরা ঠিক ততটাই নিরবতা পালন করেছি। এর কারন কি? শিক্ষাগুরু রূপী ঐসব যৌন অপরাধীদের গোপন কথা ফাঁস হয়ে যাবে বলে? ইসলামের সুনাম নষ্ট হবে বলে? নাকি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাবে বলে?

মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার করেন শিক্ষকরা, এটা এখন ওপেন সিক্রেট। বিশেষ করে আবাসিক শিক্ষার্থীদেরকে হুজুরদের একান্ত বাধ্যগত হয়ে চলতে হয়। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, এই আবাসিক শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি যৌন নির্যাতনের শিকার হন।

সাধারণত যৌন হয়রানির শিকার শিক্ষার্থীরা কোন সঠিক বিচার পাননা। অধিকাংশ মাদ্রাসা গ্রামে হওয়ায় ফতোয়া দেয়া হয় অথবা ভিক্টিম নারী হলে দু’জনকেই বিয়ে দেয়া হয়। ৫০ বছর বয়স্ক শিক্ষকের সাথে শুধুমাত্র ধর্ষিত হওয়ার অপরাধে বার বছর বয়স্ক শিশুকে বিবাহ দেয়া হয়েছে-এরকম ঘটনা আজকাল হরহামেশাই ঘটছে। ঐ শিশুটির ভবিষ্যৎ কি? এই পৃথিবীতে এসে একটা নরপশু’র সাথে বিবাহিত হওয়াই কি তার পুরস্কার ছিল?

মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী তার দায়িত্ব নিয়ে বেশ তৎপর বলেই মনে হয়। তবে দেশের মাদ্রাসার শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে তার পরিকল্পনাটা কি সেটা এখনও পরিস্কার নয়। মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীরা ধর্ষক শিক্ষক থেকে কতটা নিরাপদ-সেটাও স্পষ্ট নয়।

দেশে ৫২৫০টি মাদ্রাসায় তাকমিল বা কামিল পর্যায়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা ১৬০০০, ফযিলত বা ফাজিল স্তরে শিক্ষার্থী সংখ্যা কমপক্ষে ৮৩০০০, সানাবিয়া উলইয়া বা আলিম স্তরে ৯২০০০, মুতাওওয়াসসিতাহ বা নিম্নমাধ্যমিক স্তরে ১২০,০০০, ইবতিদাইয়াহ স্তরে কমপক্ষে ৫৭৭,০০০ এবং হিফযুল কোরআন বা সর্বনিম্ন স্তরে ৪,৭০,০০০ শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত।

এর বাইরে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী সংখ্যা আরো কয়েক লাখ। এত বিপুল পরিমান শিক্ষার্থী যৌন হয়রানির ঝুঁকিতে রয়েছে। এদের নিরাপত্তা দেবে কে? প্রশ্নটি পাঠকের কাছেই রাখলাম।