ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার দায়ে ইসলামি জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমকে সম্প্রতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। খুব স্বস্তি-দায়ক খবরটি। এখন আমরা মুক্ত! বলতেই পারি—এখন আর কোনো ব্লগারকে খুন হতে হবে না মুক্ত মত প্রকাশের দায়ে। এটি নিঃসন্দেহে স্বস্তি-দায়ক।

আনসারুল্লাহ বাংলা টিমকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখা থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এতে বলা হয়েছে, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকায় ২০১৩ সালের সন্ত্রাস-বিরোধী আইনে তাদের নিষিদ্ধ করা হলো। সরকারের এমন একটি পদক্ষেপে আমরা যারা লেখালেখির সাথে সম্পৃক্ত, তাঁরা খুশি না হয়ে কী পারি?

স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বেশ গর্বের সাথে বলেছেন, ‘তাদের (আনসারুল্লাহ বাংলা টিম) কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ ওঠায় এবং পুলিশের পক্ষ থেকে সংগঠনটি নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব আসায় আমরা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি’।

এই জঙ্গি সংগঠনটি লেখক, ব্লগার ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের হত্যা করছে, হুমকি দিচ্ছে। গত বুধবারও এরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ চার শিক্ষক, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা, গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্রসহ ১০ জনের নাম উল্লেখ করে তাঁদের প্রাণনাশের হুমকি দেয়ার পর সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এটি বড় সুখকর বিষয়। কেন না, সরকারের বোধোদয় হয়েছে। তাঁরা বিরাট কাজের কাজ করেছে, সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করে।

এই উগ্রপন্থী সংগঠনটি নিষিদ্ধর ফলে এখন আর কোনো ব্লগারকে জীবন দিতে হবে না। আমরা এখন দু’হাত খুলেই লিখতে পারব, প্রকাশ করতে পারব জাগতিক সব ভাবনা। সরকার আমাদের কথা ভেবে সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করেছে—এতে আমরা অখুশি হতে পারি? মোটেই আমরা অখুশি নই। আমরা সরকারের এমন সাহসী সিদ্ধান্তে বগল বাজিয়ে আনন্দ-উল্লাস করছি, স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছি আর তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছি।

এই জঙ্গি সংগঠনটি নিষিদ্ধ হওয়ায় যার পর নাই আনন্দিত, উদ্বেলিত আমরা। আমরা এখন গাইতেই পারি—‘আ-হা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে’। সেই সাথে সরকারের এমন সাহসী পদক্ষেপের জন্য বিরাট আয়োজন করে একটা ধন্যবাদ দেয়া যেতে পারে। বাহবা দেয়া যেতে পারে এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে।

তবে সরকারের এই উদ্যোগের পরও কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়। আশঙ্কা থেকে যায় আমাদের। সংগঠনটি নিষিদ্ধর ফলে সত্যি কী আমরা শঙ্কামুক্ত? এখন কী আমরা মুক্ত মত প্রকাশ করতে পারব স্বাধীনভাবে? মুক্ত মত প্রকাশের দায়ে এখন কী আর আমাদের নামের হিট লিস্ট করে হত্যার জন্য হামলা চালাবে না তারা? আমাদের বিশিষ্ট নাগরিকদের কাছে এখন কী আর হত্যার হুমকি সম্বলিত কোন পত্র আসবে না?

২০০৫ সালে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলাম, জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (জেএমজেবি), জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি), হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামি বাংলাদেশ (হুজিবি) ও শাহাদাত আল হিকমাতকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। সর্বশেষ ২০০৯ সালের ২২ অক্টোবর হিযবুত তাহরীরকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এতে করে কী এই উগ্রপন্থীদের কর্মকাণ্ড এই দেশ থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল? তারা কি বোমা হামলা, হত্যার মতো কর্মকাণ্ড সংঘটিত করেনি?

ছোট বেলায় যখন কোন কিছুর জন্য খুব বায়না করতাম তখন আমাদের শান্ত করার জন্য হাতে একটা লেবেনচুষ ধরিয়ে দেয়া হতো। আমরাও আমাদের বায়না ভুলে মনের আনন্দে লেবেনচুষ চুষতে থাকতাম। আনসারুল্লাহ বাংলা টিমকে নিষিদ্ধর বিষয়টি কী তেমনই বাচ্চা ভুলানোর মতো লেবেনচুষ মার্কা নয়?

একের পর এক ব্লগার খুন, হামলা, হুমকির কারণে যখন আপামর জনতা ক্ষুব্ধ সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার উপর, সরকারের নীতি নির্ধারকদের উপর। যখন ক্ষুব্ধ-বিক্ষুব্ধ মানুষ সোচ্চার হলো ধর্মীয় এই উগ্রপন্থী, জঙ্গি সংগঠনগুলোর মূল খোঁজে তা উৎপাটন করার দাবীতে। তখন সরকার সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে আমাদের সাথে একরকম মস্করাই করলো। এটি কী সরকারের একটা চালাকি নয়?

আড়ালে-আবডালে থেকে এই আনসারুল্লাহ বাংলা টিম বা অন্যান্য ধর্মীয় উগ্রপন্থী সংগঠনগুলো একের পর এক কর্মকাণ্ড সংঘটিত করে গিয়েছি। এদের অস্তিত্ব কখনোই প্রকাশ্যে ছিলো না। ঝড়ের বেগে এরা এসেছে আর লক্ষ্য মতো খুনের হোলি খেলে আবার নির্বিঘ্নে চলেও গিয়েছে।

ধর্মীয় উগ্রপন্থী জঙ্গি গোষ্ঠীর কারণে আমরা হারিয়েছে হুমায়ূন আজাদ স্যারের মতো একজন মানুষকে। তাদের কারণে আমরা আরো হারিয়েছি ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তারা ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দারকে। একই বছরের ১৪ জানুয়ারি ব্লগার আসিফ মহিউদ্দীনকে এবং ৭ মার্চ সানিউর রহমান জঙ্গি হামলার শিকার হন। তাদের জীবন এখনো শঙ্কাযুক্ত নয়। এছাড়া আমরা হারিয়েছি ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তারা মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী অভিজিৎ রায়কে। এমনকি একইদিন জঙ্গিরা কুপিয়ে আহত করে তাঁর স্ত্রীকে। এছাড়া গত ৩০ মার্চ ব্লগার ওয়াশিকুর রহমানকেও কুপিয়ে হত্যা করে ধর্মীয় উগ্রপন্থী জঙ্গিরা।

এসব ঘটনায় মানুষ যখন ক্ষুব্ধ, আন্দোলিত হয়ে বিচার দাবি করে, তখন দুই একজনকে আটক করে পুলিশ। আটককৃতরা হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দিও দেয়। কিন্তু এতে করে কাজের কাজ কি কিছু হয়েছে? সম্ভব কি হয়েছে আটকৃতদের জবানবন্দি থেকে এসব ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের মূল খোঁজে উৎপাটন করা? এতে বরাবরই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে গোয়েন্দা সংস্থাসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বন্ধ করতে পারেনি এই ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের জঙ্গি তৎপরতা।

এই সংগঠনটি নিষিদ্ধ করায় এখন কী বন্ধ হবে এদের জঙ্গি তৎপরতা? সরকার কি নিশ্চয়তা দিতে পারে যে, জঙ্গি হামলায় আর একজনও প্রাণ হারাবে না? এমন নিশ্চয়তা সরকার কখনোই দিতে পারবে না—যতদিন পর্যন্ত এদের মূল খোঁজে বের করা সম্ভব না হয়।

এদেশ থেকে জঙ্গি তৎপরতা বন্ধ করতে হলে এদের মূল খোঁজে তা উৎপাটন করা অত্যাবশ্যক। কিন্তু সরকার তা না করে এসমস্ত নিষিদ্ধকরণ খেলা খেলে জনগণের সাথে একরকম তামাশা, মস্করা করছে। যে সংগঠনটির কার্যক্রম কখনোই প্রকাশ্যে ছিলো না, তেমন একটি সংগঠনকে নিষিদ্ধ করাটা কী আমাদের সাথে মস্করা করার নয়?

একটি গাছের শিকড় না কেটে যখন তার শিখর কাটা হয়, তখন কিন্তু আর যাই হোক গাছটির মূল উৎপাটন হয় না। ফলে শিকড় কর্তন না করা গাছটি তার শাখা-প্রশাখা বিস্তার করবে এটা যেমন স্বাভাবিক তেমনি এই উগ্রপন্থী সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করলেই এরা এদের উদ্দেশ্য থেকে সরে যাবে না। কিংবা ধর্মীয় উগ্রবাদের উল্লাসে এরা আবারও যে কোনো ব্লগারকে হত্যা করবে না—এটা ভাববার কী কোনো কারণ আছে?

তাই এই দেশকে আফগানিস্তান, উজবেকিস্তান, পাকিস্তান, লিবিয়া কিংবা সিরিয়ার মতো যদি দেখতে না চাই। যদি জঙ্গি দমনে সরকারের সদিচ্ছা সত্যি সত্যিই থেকে থাকে—তাহলে শুধু এই নিষিদ্ধকরণ খেলা না খেলে এদের মূল খোঁজে বের করা হোক। খোঁজে বের করা হোক এদের অর্থের উৎসাহ দাতা। খোঁজে বের করা হোক এদের নেপথ্য মদদদাতা। এরপর এদের সমূলে উৎপাটন করা হোক এই সোনার বাংলা থেকে। সরকার প্রমাণ করুক জঙ্গি দমনে তাদের আন্তরিকতা। আমরা সকলেই যেন সমস্বরে বলতে পারি—জয় হোক মানবতার।