ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

 

‘আমি একটা জিন্দা লাশ, কাটিস না রে জংলার বাঁশ, আমার লাইগা সাড়ে তিন হাত কবর খুঁড়িস না, আমি পীড়িতের অনলে পোড়া, মরার পরে আমায় পুড়িস না, তোরা- মরার পরে আমায় পুড়িস না। প্রেমে পোড়া যায় না চেনা, দেইখা শুধু মুখ, চেনা যায় যার জীবনে নাই, একটুখানি সুখ’। একটি গানের অনুষ্ঠানে বারী সিদ্দিকীর গাওয়া এই গানটি গাইছিলেন একজন প্রতিযোগি।

গানটি চলছিলো, বিচারকের আসনে বসে বসে অঝরে কাঁদছিলেন হুমায়ূন ফরীদি। তখন তার সাথে সূবর্ণার বিচ্ছেদের কিছু সময় পেড়িয়েছিলো। সূবর্ণাও হুমায়ূন ফরীদির সাথে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেন।

সেই গানের অনুষ্ঠানটি ছিলো ‘চ্যানেল আই’য়ের। সেখানে অতিথি বিচারক হয়ে এসেছিলেন তিনি (সম্ভাবত ক্ষুদে গানরাজের অনুষ্ঠান ছিলো সেটি)। সেখানে কেঁদেছিলেন এই অভিনেতা। আমি ঘরে বসে অনুষ্ঠানটি দেখছিলাম। হুমায়ূন ফরীদির সেদিনের কান্না ভেজা চোখ আর মুখ এখনো ভুলতে পারিনি। এখনো তার সেই মুখ ভেসে উঠে চোখের সামনে। স্পষ্ট দেখতে পাই, তিনি অঝরে কাঁদছেন, তিনি কাঁদছেন। কী এমন কষ্টে সেদিন তিনি অমন করে কেঁদেছিলেন! জানা হয়নি।

তাহলে কী সে কান্নাটার পিছনে ছিলেন সূবর্ণা মুস্তফা! সূবর্ণার সাথে তার বিচ্ছেদটা সে কী মেনে নিতে পারেননি! হয় তো সেদিনের কারণ এটাই ছিলো। বড় ভালোবাসতেন তিনি সূবর্ণাকে। সত্যিই প্রচন্ড ভালোবাসতেন তিনি সূবর্ণা মুস্তফাকে।

সূবর্ণা মুস্তফাকে কতোটা ভালোবাসতেন হুমায়ূণ ফরীদি তা যেমন সূবর্ণা জানতেন তেমন তিনি নিজেও। হয়তো এতোটা ভালো এই অভিনেতা দ্বিতীয় আর কাউকে বাসতে পারেননি, এমনকি নিজের জীবনটাকেও না। তাই সূবর্ণার সাথে তার বিচ্ছেদের পর নিঃসঙ্গ জীবনে মদ্য পান শুরু করেন।

হয় তো সূবর্ণার সাথে বিচ্ছেদের পর থেকেই এই শক্তিমান অভিনেতা ভেতরে ভেতরে একটু একটু করে শেষ হচ্ছিলেন, কিন্তু বুঝতে দেননি কাউকে। এমনকি তাদের বিচ্ছেদের পর কিংবা সূবর্ণার দ্বিতীয় বিয়ের পর কোনো মিডিয়াতে কখনোই কোনো কুটক্তি করেননি হূমায়ূন ফরীদি, আর এতেই প্রতিয়মান হয় সূবর্ণাকে তিনি কতোটা ভালোবাসতেন।

সুবর্ণা মুস্তফার সাথে একবার তার (হুমায়ূন ফরীদি) প্রচন্ড ঝগড়া হল, রাগ করে সূবর্ণা অন্য রুমে গিয়ে দরজা আটকে শুয়ে পড়লেন। সকালে উঠে দরজা খুলে দেখেন, যেই রুমে ঝগড়া হয়েছিল, সেই রুমের মেঝে থেকে ছাদের দেয়াল পর্যন্ত, ‘সূবর্ণা, আমি তোমাকে ভালোবাসি’ এই একটি কথাই লিখে পুরো রুমকে ভরে ফেলা হয়েছে।

তাহলে অনুমান করাই যায় যে, হুমায়ূন ফরীদি কতোটা ভালোবাসতেন সূবর্ণাকে। অথচ এতোটা ভালোবাসাও শেষ পর্যন্ত তাদের বিচ্ছেদ ঠেকাতে পারেনি! হায় ভালোবাসা! শেষ পর্যন্ত ২০০৮ সালে ডিভোর্স হয় তাদের!

এক ইন্টার্ভিউতে ফরীদিকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল- ‘আপনারা আলাদা হয়ে গেলেন কেন’? উত্তরে বলেছিলেন- ‘এটা তোমার সুবর্ণাকে জিজ্ঞাসা করতে হবে। আমি তো সুবর্ণাকে ছাড়িনি। ও আমাকে ছেড়েছে’।

হুমায়ূন ফরীদি সবসময় বলতেন, ‘বাঁচ আর বাঁচতে দাও’। আরও বলতেন ‘জীবনটা অনেক দামি, এটার যতœ কর। পৃথিবী নামক গ্রহে তোমার কোন অবদান থাকবে না, এটা কীভাবে হয়? হ্যাঁ, এই গ্রহে অনেক সমস্যা, কিন্তু সেটাই সব না। এই গ্রহে সবাই বুশ না, এই গ্রহে রবীন্দ্রনাথ ও আছেন’। (সূত্র : সৈয়দ নাজমুস সাকিব)

সবসময়ে জীবন সম্পর্কে কথা বলা, বেঁচে থাকার উৎসাহ দেয়া লোকটা, নিজেই একসময় খুবই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন, কেউ তার খোঁজ নেননি। নিয়মিত মদ্য পান করতেন, সেটা আবার স্বীকারও করতেন। এভাবে নিবৃতে একটি জ্বলজ্বলে তারা নিভে গোলো! নাকি এই তারাটি নিভে যাক, কেউ নেপথ্যে এমনটিই চেয়েছিলেন?