ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

২০০২ সালে হাজার হাজার হিন্দু ধর্মাবলম্বী উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যায় প্রাচীন বাবরি মসজিদে হামলা চালায়। হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে তারা মসজিদটি ভেঙে ফেলে।

বাবরি মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়াকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট দাঙ্গায় বিশ্বকে হতবাক করে দেয় গুজরাট। ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র হুমকির মুখে পড়ে। ধসে পড়ে দেশটির সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধন। ওই রাজ্যে তখন মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন নরেন্দ্র মোদী। এর পর থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে রয়েছেন ভারতের এই নেতা। এরপর থেকেই পুরো বিশ্ব তাকে একজন হিন্দু কট্টরপন্থী নেতা হিসেবেই জানে।

ওই দাঙ্গার রেশ বাংলাদেশেও ছড়িয়ে পড়েছিলো। ভারতে যেমন মুসলমানদের উপর হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন হামলা-নির্যাতন চালিয়েছিলো, তেমনিভাবে এই দেশের হিন্দুদের উপর কট্টর ইসলামপন্থীরাও হামলা-নির্যাতন চালায়। আর সেসময়কার রূপ ছিলো ভয়ানক। এ নিয়ে তসলিমা নাসরিন তার ‘লজ্জা’ বইটিতে লিখেছিলেন চমৎকার।

আজ সেই নরেন্দ্র মোদী ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী। তিনি বাংলাদেশ সফরে আসছেন ৬জুন। তাকে নিয়ে এই দেশের সকল দলের মধ্যে চলছে উন্মাদনা। উচ্ছ্বাসও কম নেই মোদীর ঢাকা সফরকে কেন্দ্র করে। অথচ তার (মোদী) দল আর বাংলাদেশের জামায়াত ইসলামের সাথে কোনো ফারাক আছে? বিজেপি আর জামায়াত ইসলামি উভয় দলই তো মৌলবাদ-দুষ্ট। তাহলে এমন একটি দলের নেতাকে নিয়ে আমরা কেন এতোটা লাফালাফি করছি! এতে করে কী বাংলাদেশ সরকারের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র হুমকির মুখে পড়বে না?

কি আর করা, যে দেশে কমরেডরা হজ্ব পালনে সৌদি আরব যেতে পারে। সে দেশের রাজনৈতিকরা নীতি আর আদর্শকে জলাঞ্জলি দিয়ে নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য সবই করতে পারে—এটাই তো স্বাভাবিক, তাই নয় কী? তারপরও মোদী আমাদের অতিথি। তিনি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী। আমরা তাকে স্বাগত জানাই প্রাণভরে।

কিন্তু মোদীর এই সফরকে ঘিরে আমাদের প্রশ্ন একটাই—তার এই সফরে আমরা লাভবান হচ্ছি? মোদী আমাদের কিছু দিতে আসছেন, নাকি দু’হাত ভরে কেবল নিতেই আসছেন?

তবে হাস্যকর হচ্ছে—ভারতীয় এই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফর নিয়ে প্রতিদিনই আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে চলছে নানা ধরনের বচসা। একদল আরেক দলকে রাজনৈতিক কুট-কৌশলে চাচ্ছে পরাভূত করতে। তবে উভয় দলই স্ব স্ব অবস্থানে অনড় রয়েছে, কোমর বেঁধে।

মোদীর সফর নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতারা বিএনপিকে লক্ষ্য করে নানা ধরনের উস্কানিমূলক বক্তব্য কম-বেশি প্রতিদিনই দিয়েই চলেছেন। বিএনপি নেতারাও নিজ নিজ অবস্থান থেকে পাল্টা জবাব দিচ্ছেন। বলা যায়—মোদীর বাংলাদেশ সফর নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিকাঙ্গন এখন বেশ উত্তাপ ছড়াচ্ছে।

আওয়ামী লীগ প্রকাশ্যে না হলেও ভেতরে ভেতরে চাচ্ছে—মোদীর সাথে বিএনপি নেত্রী যেন সাক্ষাৎ করতে না পারে। কিন্তু বিএনপি আদাজল খেয়ে মাঠে নেমেছে—যে কোন মূল্যে তারা মোদীর সাথে সাক্ষাৎ করবেই। আবার মোদী চাচ্ছে আওয়ামী লীগ-বিএনপি উভয় দলীয় প্রধানের সাক্ষাৎ!

উভয় দল সাক্ষাৎ করুক মোদীর সাথে, গলাগলি করুক, কোলাকুলি করুক—এমনটা আমরা চাই! মনে হয় কেউ কেউ চাই। মনে হয় কেউ কেউ মোদীর সফরটাকে বেহুদাই মনে করি। কেন না, বহু আকাঙ্ক্ষিত তিস্তা চুক্তি মোদীর সফরে হচ্ছেনা! আর তিস্তা চুক্তি যেহেতু হচ্ছে না, সেহেতু মোদীর সফর নিয়ে লাফালাফি করার কী কোনো কারণ আছে?

মোদীর বাংলাদেশ সফর নিয়ে শুধু বাংলাদেশে নয়, খোদ ভারতেই এই সফরটি বেশ আলোচিত হয়ে উঠেছে নানা কারণে। এর অন্যতম একটি কারণ হলো—মোদীর সফর সঙ্গী মমতা হচ্ছেন আবার হচ্ছেন না মার্কা নাটক নিয়ে। তবে শেষ পর্যন্ত মমতা নাটকের সমাপ্তি ঘটেছে। মমতা মোদীর সফর সঙ্গী হয়ে বাংলাদেশে আসছেন। তবে এটা এখন আর নতুন আলোচ্য বিষয় নয়। বিষয় হচ্ছে—মমতা বাংলাদেশে আসছেন শর্ত-সাপেক্ষ! তার শর্ত একটাই—তিস্তা চুক্তি নিয়ে এই সফরে কোনো কথা হবে না! মোদীর পক্ষ থেকেও তাকে আশ্বস্ত করা হয়েছে—হ্যাঁ তিস্তা চুক্তি নিয়ে কোনো কথা হবে না।

তবে নতুন কথা হলো—মমতা এদেশে আসছেন বিশেষ একটা উদ্দেশ্য নিয়ে। তার সেই উদ্দেশ্য হলো—স্থল-সীমান্ত চুক্তি ৫৬ বছর আটকে আছে আর সে জন্যই বাংলাদেশ তিনি (মমতা) আসছেন! গতকাল সোমবার কলকাতার টাউন হলে শিল্পোদ্যোগদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের কাছে তিনি (মমতা) এমনই দাবী করেছেন। সেই সাথে তিনি আশা প্রকাশও করেছেন—৬ জুন ঢাকায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার (পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির) উপস্থিতিতেই স্থল-সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। এ ছাড়াও কলকাতা-ঢাকা-আগরতলা বাসের উদ্বোধন হবে। এরপর মমতা স্থল-সীমান্ত চুক্তি হয়ে যাওয়ার পরেই, একই দিন (৬ জুন) কলকাতা ফিরে যাবেন!

তাহলে আমাদের প্রাপ্য কী! তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির বিষয়টি অধরাই রয়ে যাবে? তাহলে কী মোদীর এই সফরে আমরা দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, পাওয়ার জন্য নয়?

কেউ কেউ মনে করছেন—মোদীর বাংলাদেশ সফরে সীমান্ত রক্ষীবাহিনী বিএসএফ’র আগ্রাসন হ্রাস পাবে। সীমান্ত হত্যা কমবে বা বন্ধ হবে—আদৌতে কি তা সম্ভব? বাংলাদেশ সরকার কী পারবে মোদী সরকারের কাছ থেকে এমন কোন প্রতিশ্রুতি আদায় করতে? আর প্রতিশ্রুতি আদায় করতে পারলেও তা কতোটা সফলতা পাবে?

আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে জোরালো-ভাবে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির বিষয়টি উঠে আসছে না। আবার বিএনপিও এ বিষয়টি নিয়ে জোরালো কোন ভূমিকা রাখছে না। তারা উভয়ই চাচ্ছে মোদী সরকারের সাথে সু-সম্পর্ক তৈরি করতে। তাদের এই সম্পর্ক স্থাপনের ফলে বাংলাদেশ তথা এ দেশের মানুষ কতোটা লাভবান হবে? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে একটাই উত্তর ধ্বনিত হবে—তারা দেশ নয়, নিজ নিজ স্বার্থ রক্ষায় মোদী সরকারের সাথে সু-সম্পর্ক গড়ার কাজে ব্যস্ত। আপাত দৃষ্টিতে এটাই প্রতীয়মান।