ক্যাটেগরিঃ মানবাধিকার

 

 

কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার ‘নারী কবিতায় লিখেছিলেন—সাম্যের গান গাই-/আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই।/বিশ্বে যা-কিছু মহান্ সৃষ্টি চির-কল্যাণকর/অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।/বিশ্বে যা-কিছু এল পাপ-তাপ বেদনা অশ্রুবারি/অর্ধেক তার আনিয়াছে নর, অর্ধেক তার নারী।/নরককুণ্ড বলিয়া কে তোমা’ করে নারী হেয়-জ্ঞান?/তারে বল, আদি-পাপ নারী নহে, সে যে নর-শয়তান।

কবি তাঁর কবিতায় নারী পুরুষকে সমান দৃষ্টিতেই দেখেছেন। এই কবিতায় তিনি সম-অধিকারের কথাটাই তুলে এনেছেন বারবার। নারীর প্রতি সম্মানের বিষয়, নারীর প্রতি পুরুষতান্ত্রিক সমাজের গতানুগতিক দৃষ্টি পরিবর্তনের কথাই তিনি বলেছেন।

কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজে—নারীরা কী আদৌ সম-মর্যাদা, সম-অধিকার পাচ্ছে? তাহলে নারীকে কেনো নিজের নিরাপত্তার দাবী নিয়ে আন্দোলন করতে হয়? নারীকে কেনো পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি, পুরুষের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে হয়? এই সমাজে আজো কেনো নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি? লিঙ্গ বৈষম্যের শিকার কেনো নারীকে বারবার হতে হয়? নারী কেনো কোথাও, চেনা-অচেনা পুরুষের কাছে নিরাপদ বোধ করে না?

রাস্তা-ঘাট, হাট-মাঠ, বাস-ট্রেন, স্কুল-কলেজ, কর্মস্থল কিংবা আপন গৃহস্থল—কোথায় নারী নিরাপদ? শিক্ষক, ডাক্তার, কর্মচারী, পুলিশ, আত্মীয়-স্বজন, চাচা-মামা-খালু, দুলাভাই—কার কাছে নারী নিরাপদ?

গাড়িতে পুরুষ যাত্রী, বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন, চাচা-মামা-খালু, দুলাভাই, স্কুল-কলেজে শিক্ষক, কর্মস্থলে সহকর্মী কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দ্বারা—যৌন নিপীড়নের শিকার হতে হয় নারীকে। শুধু তাই নয়, ধর্ষণ বা গণ-ধর্ষণের মতো ভয়ঙ্কর ঘটনার শিকারও হতে হচ্ছে নারীকে। কোনো কোনো সময় ধর্ষণ-গণ-ধর্ষণের পর খুনের শিকারও হতে হয়।

কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফিরবে নারী—নিরাপদে ফিরবে! কর্মস্থলে নির্বিঘ্নে কাজ করবে নারী—নিশ্চয়তা আছে? মেয়ে স্কুল-কলেজ গিয়েছে—ঠিকঠাক বাড়ি ফিরবে? চাচা-মামা-খালু কিংবা দুলাভাইয়ের সাথে মেয়েটি আছে—নিরাপদ!

নিশ্চিত নিরাপদ তারা, এমনিট কী আমরা বলতে পারি? নাহ, কোথাও নারী নিশ্চিত নিরাপদ নয়। ছাত্রী, শিশু, যুবতী, আয়া, বুয়া, গৃহবধূ—কে নিরাপদ! নারী বুক উজাড় করে দু’দণ্ড মুক্ত নি:শ্বাস ফেলবে, সে নিশ্চয়তা কোথায়? ধর্ষণ-যৌন নিপীড়ন—এর থেকে যেন নারীর নিস্তার নেই! তাহলে কী নারী জন্মটাই পাপ?

বর্ষবরণের দিন টিএসসিতে জনসমক্ষে, স্বামীর সামনে স্ত্রী, সন্তানের সামনে মা, মায়ের সামনে মেয়েকে হতে হয়েছে যৌন নিপীড়নের শিকার! অথচ বর্ষবরণকে ঘিরে ওই এলাকায় নেয়া হয়েছিলো তিন স্তরের নিরাপত্তা! দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিসি ক্যামেরায় সার্বিক পরিস্থিতি মনিটরিং করা হচ্ছিলো—এরপরও এমন ন্যক্কারজনক একটি ঘটনা ঘটে—যে ঘটনায় পুরো জাতী, বিশ্ব হতভম্ব!

এ ঘটনায় চারিদিকে যখন নিন্দা আর প্রতিবাদের ঝড়, তখন পুরো জাতী আরো একবার হতাশ, হতবাক হয়—এ-ঘটনার প্রতিবাদ, নিন্দ ও বিচার দাবী করতে গিয়ে পুলিশের দ্বারা যখন প্রতিবাদকারী নারীরা নির্যাতনের শিকার হয়। এ দু’টি ঘটনা বাঙালির ইতিহাসে ঘৃণিত একটি অধ্যায় বলা যেত পারে। এই ঘৃণিত কাজ দু’টি অপরাধবিজ্ঞানীর কোন সংজ্ঞায় ফেলা যায়?—তা অন্তত আমার জানা নেই।

টিএসসির ওই ঘটনা এবং পরবর্তীতে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে পুলিশী আচরণের ঘটনায় যখন সচেতন মানুষগুলো ক্ষুব্ধ-বিক্ষুব্ধ, ঠিক তখনই (২২ মে,২০১৫) রাজধানীতে ঘটে আরো একটি ঘৃণিত, ন্যক্কারজনক ঘটনা! এদিন একদল নরপশু একটি গারো মেয়েকে মাইক্রো-বাসে তুলে নিয়ে গণ-ধর্ষণ করে! আবার এ ঘটনার দু’দিনের মাথায় (২৩ মে, ২০১৫) স্বামীকে অচেতন করে চলন্ত ট্রাকে আরেক নারী শ্রমিক পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়! এছাড়া এসব ঘটনার সপ্তাহ আগে রাজধানীর পাশের জেলা নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে চলন্ত বাসে গণ-ধর্ষণের শিকার হয় এক পোশাক-শ্রমিক!

অপরদিকে (২৬ এপ্রিল, ২০১৫) লুবনা জেবিন নামের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষিকাও যৌন-নিপীড়নের শিকার হয় নিজ ক্যাম্পাসে একই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেতা দ্বার! এছাড়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক কর্তৃক শিক্ষিকা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রী যৌন-নিপীড়নের ঘটনা—অমরা সকলেই জানি।

যে দেশে সর্ব্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদের মতো নারী নেত্রী রয়েছে। সে দেশেই নারী নির্যাতন, যৌন-নিপীড়ন, ধর্ষণ, নারীর প্রতি সহিংস আচরণের মতো ঘৃণ্য কাজ মহামারি আকার ধারণ করছে! —এ কি উদ্বেগের কারণ নয়?

পুলিশ সদর দফতর হতে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, ২০১৪ সালে ৪ হাজার ৬৪২টি ধর্ষণ মামলা দায়ের করা হয়েছে। ২০১৩ সালে এ সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৫৩৮টি। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে সারাদেশে ৭৯৭টি ধর্ষণ মামলা দায়ের হয়েছে। এ তথ্য অনুসারে, প্রতিমাসে প্রায় ৩০০টি ধর্ষণ মামলা দায়ের হচ্ছে। তবে বাস্তবে ধর্ষণ ঘটনার সংখ্যা মামলার চেয়ে দ্বিগুণ হবে। কেনো না, অনেকেই আছে মামলার ঝামেলায় জড়াতে না চেয়ে বিষয়টি চেপে যায়। যা পরবর্তীতে প্রকাশ পায় না।

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির দেওয়া তথ্য অনুসারে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৩ মে পর্যন্ত সারা দেশে ২৪১টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। সংস্থাটি মতে, ২০১০ সাল থেকেই ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে চলেছে। তাদের হিসেব অনুযায়ী, ২০১৪ সালে ৭৮৯, ২০১৩-তে ৭১৯, ২০১২-তে ৮৩৬, ২০১১-তে ৬০৩ এবং ২০১১-তে ৪১১টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।

আক্ষেপের বিষয় হলো—কেউ কেউ এ সমস্ত ঘটনার মূলে নারীদেরকেই দায়ী করছেন! তারা বলছেন, এসব ঘটনার মূলে নারীদের চলাফেরা, খোলা-মেলা পোশাক দায়ী!

বেশ, তাদের এ যুক্তি না হয় মেনে নিলাম। মেনে নিলাম, নারী খোলামেলা পোশাক পড়ে চলাফেরা করে, নিতম্ব দুলিয়ে দুলিয়ে হেঁটে যায়, তাদের উন্মুক্ত পিঠ, চিবুক, উন্নত বক্ষ-দ্বয় পুরুষের মাঝে কাম উত্তেজনা সৃষ্টি করে, যার কারণে পুরুষের ইয়ে আড়মোড়া দিয়ে দাঁড়িয়ে যায়, মুহূর্তের মধ্যে পুরুষ হয়ে উঠে হিংস্র নেকড়ে!

কিন্তু যে শিশুটি এখনো বুঝতে শিখেনি যৌনতা কি? যে শিশুটি নিতম্ব দুলিয়ে হাঁটতে জানে না, যে শিশুটির নেই উন্নত বক্ষ-দ্বয়, কাম উত্তেজনা সৃষ্টি করার মতো কোন কিছুই বিদ্যমান নেই যে শিশুটির মধ্যে—সে শিশুটি কেনো ধর্ষণের শিকার হয়? —এর কোনো উত্তর জানা আছে কি?

পশ্চিমা অপসংস্কৃতি আর ভিনদেশী সংস্কৃতির আগ্রাসনের কারণে ধর্ষণ বা যৌন-নিপীড়নের মতো ঘটনা ঘটছে, বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে দাবী করে থাকেন অনেকে!—নারী নির্যাতন, যৌন-নিপীড়ন এবং ধর্ষণের মূলে সত্যিই কি এ কারণ দায়ী? এসব খোঁড়া যুক্তি—‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা’। যৌন-নিপীড়ন, ধর্ষণ ঘটনার নেপথ্যে এ কারণ হয় কী করে! ধর্মান্ধতা, সেকেলে দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানবিক গুণাবলি না থাকায়ই নারী নির্যাতন, যৌন-নিপীড়ন, ধর্ষণের নেপথ্য কারণ।—তাই নয় কি?

এছাড়া প্রচলিত আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়া, তদন্তে ধীরগতি, বিলম্বিত বিচার প্রক্রিয়া এবং নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ধর্ষণের সংখ্যা বৃদ্ধির আরো একটি বড় কারণ।

আমাদের সমাজে তরুণী থেকে শুরু করে বয়স্ক নারীরাও ধর্ষণের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। অভিযুক্ত ধর্ষকদের বেশিরভাগ সময়েই কোনও শাস্তি হচ্ছে না। আর শাস্তি না হওয়ায় এ ঘটনাগুলো ক্রমেই বেড়ে চলেছে। উৎসাহিত হচ্ছে অন্যরাও ধর্ষণের মতো নিকৃষ্ট কাজে নিজেদের জড়াতে।

ঢাকা মহানগর হাকিম আদালত সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবছর মাত্র ২ শতাংশ ধর্ষণ মামলার বিচার হয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ধর্ষণ মামলার ক্ষেত্রে অভিযোগ দায়ের করার পর খুব কম ক্ষেত্রেই বিচার হয়।

ঢাকার ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের গত ১৪ বছরের তথ্য সংগ্রহ করে দেখা যায়, কমপক্ষে ৫ হাজার ৩২১ জন নারী এই সেন্টারে সহযোগিতা চেয়েছেন। যারা মানসিক কিংবা শারীরিকভাবে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। কিন্তু এসব ঘটনায় মাত্র ৪৩ জন সাজা পেয়েছেন।

চলমান আইনের প্রয়োগে শিথিলতা, কার্যকর পুলিশি তদন্তে ব্যর্থতা এবং বিচার প্রক্রিয়ার বিলম্ব ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধির জন্য দায়ী। সামাজিক ও রাজনৈতিক দায়িত্বশীলতা এবং জবাবদিহিতার অভাবের ফলেই এ সমস্যা তৈরি হয়েছে। নির্যাতিতাকে সুরক্ষার নীতি না থাকা এবং পুলিশি তদন্তের দীর্ঘসূত্রিতা ধর্ষণ বৃদ্ধির একটা কারণ।

এছাড়া কোনো কোনো সময় পুলিশ মামলা নিতে দেরি করায় ধর্ষকরা পালানের সুযোগ পেয়ে যায়। তাছাড়া মামলা হলেও ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবে অনেক সময় মামলা শেষ হয়ে যায়। এসব কিছুই ধর্ষণ বা যৌন-নিপীড়নের মতো ঘৃণ্য অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধির নেপথ্যে কাজ করে থাকে।

ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়ন সংক্রান্ত অনেক আইন রয়েছে। আমাদের তা যথাযথভাবে প্রয়োগ করা দরকার। এ অপরাধ সম্পর্কে আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ধর্ষণের বিরুদ্ধে লড়াই করা সম্ভব।

নারী আন্দোলনের সাথে জড়িতরা মনে করেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, সামাজিক চাপ ও সমাজে নিগৃহীত হওয়ার আশঙ্কার ফলে ইতোমধ্যেই বিচারের জন্য লড়াই করার মানসিকতা হারিয়ে ফেলেছেন নারীরা। এছাড়াও ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেয়েও যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ না করার প্রবণতাও অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে দেখা যায়।

এদিকে, পুলিশ ২০১৩ সালে ২ হাজার ৯২১ এবং ২০১৪ সালে ২ হাজার ৯১৮টি মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করলেও এখন পর্যন্ত এসব মামলার একটিরও বিচার হয়নি। ২০১৩ ও ২০১৪ সালে পুলিশ চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে যথাক্রমে ১ হাজার ৪৩৭ ও ১ হাজার ৫৬৪টি। মজার ব্যাপার হলো দাখিল করা অভিযোগপত্র গুলো ২০১৩ কিংবা ২০১৪ সালের নয়, তার আগের বছরের।

২০১৪ সালের শেষ দিকে ১ হাজার ২৮০টি ধর্ষণ মামলার তদন্ত চলছিল এবং ১৮ হাজার ৬৬২টি মামলা বিচারাধীন ছিল। তার আগের বছরের শেষ দিকে ৯৮০টি মামলার তদন্ত চলছিল এবং বিচারাধীন ছিল ১৭ হাজার ৪১৪টি।

তবে এটাই প্রতীয়মান যে, বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা এবং বেশিরভাগ ঘটনায় ধর্ষকদের শাস্তি না হওয়াতে অপরাধীরা ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য কাজে উৎসাহিত হচ্ছে। এছাড়াও আইনের ফাঁক গলে ধর্ষকরা জামিন পেয়ে বাইরে এসে ফের ধর্ষণ করছে। এটা একটা চক্রে পরিণত হয়েছে।

এছাড়াও ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধির ফলে নারীর প্রতি সামাজিক মনোভাবও একটা কারণ বলে মনে করেন নারী আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্তরা।

নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের কারণেও যৌন সহিংসতার ঘটনার বৃদ্ধি ঘটাচ্ছে। শৈশব থেকেই ছেলেরা পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠছে। নারীকে সম্মান করার বিষয়ে তারা খুব কম শেখার সুযোগ পায়। যৌন শিক্ষা নিয়ে যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করছে তারাও পর্যাপ্ত জ্ঞান এবং সচেতনতা সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হওয়ার ফলেও ধর্ষণ বৃদ্ধির আরো একটি কারণ হতে পারে।

যদি এমনভাবে চলতে থাকে। আর যথাযথভাবে আইনের প্রয়োগ না হয় এবং বিচার নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে ধর্ষণের মতো অপরাধ একের পর এক এদেশে ঘটতেই থাকবে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে একটা সময় এ দেশে যৌন-নিপীড়ন, ধর্ষণ মহামারি আকার ধারণ করবে। একটা সময় দেখা যাবে বাধ্য হয়ে নারীকে ঘরের চার দেয়ালের মধ্যেই বন্দি হয়ে থাকতে হবে। এটাই যেন বর্তমান ঘটনাগুলো আমাদের ইংগিত করছে।

তবে যৌন নিপীড়ন, ধর্ষণ ঘটনা রোধে যথাযথ আইন প্রয়োগের কোন বিকল্প নেই। প্রচলিত আইনের মাধ্যমে অভিযুক্তদের সর্ব্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হলেই এ ধরনের ঘৃণ্য কাজ সমাজ থেকে হ্রাস পাবে। আর যদি প্রচলিত আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে যৌন নিপীড়ন, ধর্ষণ ঘটনায় সর্ব্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব না হয়, তাহলে হয় তো একদিন নারীদেরকেই বাধ্য হয়ে পথে নামতে হবে কাটারি নিয়ে—আমাদের দুই উরুর মাঝের ছয় ইঞ্চির যন্ত্রটা কেটে দিতে।

তবে অবাক করার কথা হচ্ছে মহিলা ও শিশু বিষয়ক সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান রেবেকা মোমেনের মতো  নারীদের নিয়ে। যিনি মহিলা ও শিশু বিষয়ক সংসদীয় কমিটির মতো একটি জায়গার চেয়ারম্যান। অথচ সেই তিনিও ধর্ষণের জন্য নারীকেই দায়ী করে বক্তব্য রাখেন!

২৭ নভেম্বর, ২০১৪ বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ আয়োজিত ‘নারী নির্যাতন প্রতিরোধে আমাদের অর্জন ও ব্যর্থতা’ শীর্ষক সেমিনারে ওই নারী তার বক্তব্যে বলেছিলেন, নারী তার শালীনতা, নৈতিকতা ও পারিবারিক শৃঙ্খলা বজায় রেখে চললে দেশে ধর্ষণ এবং নারী নির্যাতনের মাত্রা কমে যাবে। নারীর অশালীন চলাফেরাই নারী নির্যাতনের মূল কারণ!

এখানে আমরা হতাশ ও অবাক হই। ভাবতেও আমাদের কষ্ট হয় যে, এমন মন-মানসিকতার একজন মহিলাকে সরকার কী করে অমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব দিয়েছেন! তার মতো একজন মহিলা যদি এ পদে থেকে যান, তাহলে এদেশে নারী নির্যাতন, যৌন-নিপীড়ন এবং ধর্ষণের ঘটনা হ্রাস পাবে না বৃদ্ধি পাবে? কেন না, তার অমন আবাল মার্কা বক্তব্যের ফলে ধর্ষকরা উৎসাহিতই হয়েছিলেন বলে মনে করাটা অবাঞ্ছনীয় নয়।

কথায় আছে ‘ঘরের শত্রু বিভীষণ’। তসলিমা নাসরিনও একটি কলামে বলেছিলেন—‘নারীরাই নারীদের সবচেয়ে বড় শত্রু’। আর এ কথারই প্রতিফল ঘটলো রেবেকা মোমেনের বক্তব্যে।

তবে তসলিমা নাসরিন ওই মহিলার বক্তব্যে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন ওইদিনই ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে। তিনি তার ফেসবুকে লিখেছিলেন—‘এই রেবেকা মোমেন বেটিরে পাছায় লাত্থি দিয়ে নারী ও শিশু কল্যাণ কমিটি থেকে এক্ষুনি বের করে দেওয়া উচিত! মূর্খ বেটি নাকি আবার কমিটির প্রধান! যেমন দেশ, তেমন এদের মগজ! খুঁজে খুঁজে কারা এইসব জঞ্জাল যোগাড় করে কমিটির জন্য! নারীর কল্যাণের নামে এই জঞ্জালগুলো অকল্যাণ ছাড়া আর কিছু করে না’।

তসলিমা নাসরিন রেবেকা মোমেনের বক্তব্যে যে ভাষায় প্রতিবাদ করেছেন তা যথার্থ বলেই মনে হচ্ছে। তসলিমা নাসরিন আবারো প্রমাণ করলেন, তিনি যা বলেন, যা লিখেন সত্যিকার অর্থে তা নিরপেক্ষ অবস্থান থেকেই বলেন, লিখেন। এমন জোরালো ভাষার প্রতিবাদের জন্য তসলিমা নাসরিনকে হাজারবার কুর্ণিশ করলেও বোধ করি কম হয়ে যাবে। তবুও বলছি—তসলিমা নাসরিন লাল সেলাম। জয় হোক মানবতার।